
[ডিসক্লেইমারঃ শিরোনামে গল্প কথাটি উল্লেখ করা থাকলেও আসলে এই পোস্টের শুধুমাত্র নামগুলো বাদে প্রতিটি চরিত্র ও ঘটনা সম্পূর্ণ বাস্তব। খুব কাছ থেকে দেখা আমার কয়েকজন বন্ধু এবং তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েনের বয়ান বলা যেতে পারে এটাকে। লেখার মধ্যে বারবার ঘুরেফিরে কিছু ফেসবুকীয় টার্ম কাহিনীর অনুষঙ্গ হিসেবেই চলে আসবে, কাজেই এই সাইটটি নিয়ে যাদের অ্যালার্জি আছে তারা খানিকটা বিরক্তি বোধ করতে পারেন।]
অফিসে এসে ফেসবুক ওপেন করে রাজন অবাক হয়ে গেলো।
একটা 'অ্যাড রিকোয়েস্ট' এসেছে ঝুমার কাছ থেকে।
বেশি দিন আগের কথা নয় যখন ঝুমা আর রাজন কলিগ ছিলো, কিন্তু এখন আর তা নেই কারণ ঐ কোম্পানী রাজন ছেড়ে চলে এসেছে অলরেডি। এক্স-কলিগদের মধ্যে খোমাবইয়ে বন্ধুত্ব হতেই পারে কিন্তু যখন তারা কলিগ ছিলো তখন তো ঝুমা একবারও অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠায়নি। তাকে দেখে বোঝাই যেতো না যে তার মধ্যে বন্ধুত্ব করার আদৌ কোনও ইচ্ছে আছে। রাজন খুব আমুদে স্বভাবের মানুষ, ঝুমাও খুবই হাসিখুশি, বন্ধুভাবাপন্ন... কিন্তু কোনও কারণে রাজনকে দেখলেই ঝুমা কেমন যেন গুটিয়ে যেত। রাজন নিজে থেকেই বেশ কয়েকবার আগ্রহ করে কথা বলার চেষ্টা করেছে তার সাথে... কিন্তু ঝুমার সেই একই শীতল ব্যবহার দেখে সে আর এগোয়নি। কলিগদের সবার সাথেই তার দারুণ ভালো সম্পর্ক, শুধুমাত্র একজনের পাত্তা না পেলেই তার জব লাইফ বৃথা হয়ে যাবে, এমন মনে করার কোনও কারণ নেই! কাজেই রাজনও যথাসম্ভব নিজেকে তার থেকে দূরে রেখে অন্যান্যদের সাথেই সময় কাটাতো। আর যেহেতু তারা এক টিমে কাজ করতো না, কাজেই তাদের পরষ্পরের মুখোমুখি হবার খুব বেশি প্রয়োজনও পড়তো না।
তারপর দেখতে দেখতে পার হয়ে গেলো অনেক দিন। নতুন চাকরির অ্যাপ্লাই, বিয়ের তোড়জোড়--- এসব নিয়েই কেটে গেলো রাজনের অনেকটা সময়। মানসিক চাপও গেছে প্রচুর। শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছের বিরূদ্ধে একটি মেয়েকে বিয়ে করতে গিয়ে যে প্রবল অন্তর্গত ধকল তাকে নিতে হয়েছে সেটা না চাইলেও সারাজীবন তার মনে থাকবে। না, এরকম মনে করার কোনও কারণ নেই যে রাজনের স্ত্রী (মেয়েটির নাম শোভা) বউ হিসেবে অঘা। সে শিক্ষিতা, সুন্দরী, খুবই ভালো একটি চাকরি করে, পারিবারিক স্টেটাসেও রাজনদেরই সমকক্ষ, এমনকি তারা দু'জন কিছুদিন প্রেমও করেছে!
সবই তো ঠিক ছিলো, আর যেমনটি ঠিক ছিলো হয়েছেও তো ঠিক তেমনটিই... কেন তাহলে রাজনের মন কাঁদতো অন্য একটি মেয়ের জন্য? কেন রূপে গুণে অতুলনীয়া একজনকে কাছে পেয়েও রাজনের মনে হয়েছে... না না, একে নয়... তার তো আরেকজনকে চাই!
কাহিনী এতদূর পড়ে মনে হতে পারে যে রাজনের মন চাইতো ঝুমাকে। আসলে কিন্তু তা নয়। এটা যদি একটা মুভির গল্প হতো তাহলে ঝুমা সেখানে হতো নেহাতই গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স। ঝুমার কথা এই গল্পে একেবারেই আসতো না শুধুমাত্র যদি না সে ঐ অ্যাড রিকোয়েস্টটি পাঠাতো।
একটু পেছনের দিকে চলে যাওয়া যাক।
রাজন বরাবরই একটু 'রমণীমোহন' টাইপের ছেলে। তার পেছনে ঘোরার মত মেয়ের অভাব ছিলো না কখনোই। খুব স্বাভাবিক... কারণ ভালো চেহারা, ভালো লেখাপড়া, ভালো চাকরি, কোনও কিছুরই কমতি ছিলো না তার। কাজেই নিত্য নতুন মেয়েদের সাথে ঘোরা খাওয়া আর ফোনে আড্ডা মারা আর কথার মারপ্যাঁচে তাদের ঘায়েল করা, এই ছিলো তার রুটিন।
এমনি করতেই করতেই তার একদিন পরিচয় হয় ভার্সিটি পড়ুয়া মায়ার সাথে। যে ছেলেটি কেবল ডাকাতি করতেই জানতো, এই মেয়েটির কাছে এসে সে নিজেই একেবারে আমূল ভিখিরি হয়ে গেলো!
এই মায়ার সাথেই তার স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি, কারণ বহুদিন ধরে মায়ার আরেকটি ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো এবং তাদের ব্যাপারটি পরিবার থেকে অ্যাপ্রুভড ছিলো।
রাজনের কোনও সমস্যা ছিলো না কোথাও। সে বরাবরই মুক্ত বিহঙ্গ, অনেকের সাথে যোগাযোগ থাকলেও নিজেকে সে বাঁধা দেয়নি কারও কাছেই, কাজেই মায়া একবার হ্যাঁ বললেই সে বিনা দ্বিধায় বিনা বাধায় চলে আসতে পারতো তার কাছে। কিন্তু মায়া নিজেও রাজনকে পাগলের মত ভালোবাসলেও কিছুই করতে পারেনি। পারেনি, কারণ তার ধারণা ছিলো, সে অনেক আগে থেকেই যাকে ভালোবাসে, যার সাথে তার বিয়ে পর্যন্ত ঠিক হয়ে আছে, সেই ছেলেকে ভুলে গিয়ে সে যদি রাজনের প্রেমে পড়তে পারে, তাহলে কি এটাও সম্ভব নয় যে কোনও একদিন সে রাজনকে ফেলে অন্য কোনও ছেলের প্রেমে পড়ে যাবে?
মায়া নিজের মনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলছিলো একটু একটু করে।
রাজন মায়াকে অজস্রবার বুঝিয়েছে যে সে যদি সম্পর্কটাকে নিয়ে সামান্যতমও সিরিয়াস হয়ে থাকে তবে যেকোনওভাবেই যেন পুরনো রিলেশন ভেঙে তার কাছে চলে আসে, সে দু'বাহু বাড়িয়ে তাকে গ্রহণ করবে। কিন্তু মায়ার সাহস ছিলো না। সে নিজের বাগদত্তকে ঠকিয়েছে এ নিয়ে তার খুবই একটা অপরাধবোধ তো ছিলোই, তাছাড়াও আর একটা ব্যাপার, মায়ার বাগদত্ত মায়াকে খুবই পাগলের মত ভালোবাসতো। মায়ার একটা ভয় ছিলো যে সে যদি এই ছেলেটিকে ছেড়ে রাজনের কাছে চলে যায়, কষ্টে দুঃখে যন্ত্রণায় ছেলেটি আত্মহত্যা করে বসবে। এতবড় একটা ব্যাপার তো কল্পনা করাও কঠিন। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই মায়া আর কিছুতেই রাজনের আহবানে সাড়া দিতে পারেনি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ঝুমা এই গল্পে এলো কোত্থেকে?
মায়ার সবচেয়ে ভালো বন্ধুটি যার সাথে মায়া সবকিছু শেয়ার করতো সে ছিলো সোমা, আর ঝুমা হচ্ছে তারই বড়বোন। যেহেতু এসব ব্যাপার সোমা সবই জানতো এবং ঝুমার সাথে শেয়ার করতো, কাজেই বলাই বাহুল্য এই গল্পের সবকিছুই ঝুমাও জানতো।
মজার ব্যাপার হলো, রাজনও খুব ভালো করেই জানতো যে ঝুমা তার প্রেমকাহিনী সবই জানে।
যাই হোক, রাজন আর ঝুমা কেবলই সহকর্মী ছিলো। নেহাত ভূতপূর্ব কলিগ হিসেবেই ঝুমা তাকে অ্যাড রিকোয়েস্টটি পাঠিয়েছিলো (পাঠাতেই পারে, রাজন নিজেও পাঠাতে পারতো ঝুমাকে, দোষের ছিলো না কিছুই)। কিন্তু তবু... এই অ্যাড রিকোয়েস্টটি দেখে রাজনের কি যে তীব্র রাগ হলো! মায়ার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ছিলো না, কিন্তু তার খুব শখ ছিলো রাজনের ছবি দেখার (মেয়েটি আসলেই খুব ভালোবাসতো রাজনকে, হয়তো দ্বিচারিণীর মত, তবু সত্যিকারের ভালোবাসাই ছিলো ওটা)। যখনই তার খুব ইচ্ছে করতো রাজনের ছবি দেখতে, সে সোমাকে বলতো ঝুমার অ্যাকাউন্ট দিয়ে ফেসবুক খুলতে। সোমার ফেসবুকের প্রতি কোনও আগ্রহ ছিলো না, নেহাতই খুব দরকার হয়ে পড়লে সে ঝুমার অ্যাকাউন্টটা ব্যবহার করতো একটু আধটু। ঝুমা আর রাজন ফেসবুকে বন্ধু ছিলো না ঠিকই কিন্তু রাজনের ফেসবুক অ্যালবাম সেটিংটা সবার জন্য ওপেন করা ছিল তাই তার সব ছবি সবাই দেখতে পারতো।
কাজেই যখন রাজন আর শোভার বাগদান প্রোগ্রাম হয়ে গেলো তখন মায়া কিছুতেই নিজেকে আর ঠেকাতে পারলো না, আবার সোমাকে নিয়ে বসলো ফেসবুকের সামনে, রাজন আর শোভার ছবি দেখতে।
সোমা একটার পর একটা ছবিগুলো ওল্টাচ্ছিলো আর মায়া কেবল কাতর স্বরে বলছিলো, দ্যাখ... ওদের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে... আমার এমন কি নেই যা শোভার আছে? কেন আমি রাজনকে পাবো না?... আমি কোন অংশে শোভার চেয়ে কম?...বল!
সোমা ম্লান হেসে উত্তর দিয়েছিলো, দ্যাখ... রাজনের তো কোনও দোষ নেই এখানে... ও তো আসতেই চেয়েছিলো তোর কাছে, তুই-ই তো আর ওর আসার পথ রাখিসনি। কি লাভ এখন আফসোস করে?
নীরবে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না মায়ার।
এরপর মাত্র দু'সপ্তাহের ব্যবধানে রাজনের বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো শোভার সাথে, ঠিক যেভাবে মায়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছিলো তার বাগদত্তের সাথে।
বিয়ের পর রাজন নিজের ফেসবুক অ্যালবামগুলোর সেটিং চেঞ্জ করে সেগুলো যারা বন্ধু নয় তাদের জন্য লক করে দিয়েছিলো।
তারও বেশ কিছুদিন পর একেবারে কোনওরকম আগাপাশতলা চিন্তা না করেই রাজনকে অ্যাড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিলো ঝুমা। সে ভেবেছিলো, এক জায়গায় চাকরী করা অবস্থায় তাদের ফেসবুক বন্ধুত্ব না হলেও এখন তো তা হতেই পারে। তাদের বেশ কিছু মিউচুয়াল বন্ধু আছে, আর সম্পর্কটা একটু শীতল হলেও খারাপ তো আর ছিলো না। কি আর হবে, বড়জোর রাজন রিকোয়েস্টটা ইগনোর করে দেবে। সে করুকগে, কে কোন রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করবে আর কোনটা ইগনোর করবে ওটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার, সেটা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই ঝুমার।
কিন্তু তার ধারণাও ছিলো না যে সামান্য একটা অ্যাড রিকোয়েস্টের জবাব হিসেবে তাকে এমন নিজের গাল বাড়িয়ে একটা চড় খেতে হবে।
ফেসবুক খুলে ঝুমা দেখলো রাজন লিখেছে,
হ্যালো ঝুমা, ভালো আছেন নিশ্চয়ই। খুব ভালো লাগলো আপনার রিকোয়েস্টটি পেয়ে, কিন্তু যখন আমরা একসাথে চাকরি করতাম তখন অ্যাড না করে এখন করলেন যে? ও বুঝেছি, সোমার আর মায়ার এখন খুব শখ হয়েছে আমার বিয়ের ছবি দেখার, তাই অ্যাড করেছেন, এই তো!
হতভম্ব ঝুমা লজ্জায় ঘৃণায় ক্ষোভে নিজের অজান্তেই লিখলো-
রাজন
কোনও এক বিচিত্র কারণে মায়া এখন আর আপনার নামও শুনতে চায় না, আপনার ছবি দেখতে চাওয়া তো দূরের কথা।
আর সোমা চাকরি শুরু করার পর দিনের মধ্যে ১৫-১৬ ঘন্টা তাকে থাকতে হয় কর্মস্থলে, কারও বিয়ের ছবি দেখতে চাওয়ার মত ইচ্ছে বা ফুরসত কোনওটাই তার আর নেই।
আমার নিজের কথা বলি। আমি কোনও কারণ ছাড়াই অ্যাড করেছি আপনাকে। যদি ঘুণাক্ষুরেও জানতাম যে এই সামান্য অ্যাড রিকোয়েস্টের বিনিময়ে আমাকে আপনার কাছ থেকে এই জাতীয় কথা শুনতে হবে তাহলে ভুলেও এই কাজটি করতাম না।
জানি আপনি আমার রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট করবেন না। তবু এখন এটাই অনুরোধ করবো রিকোয়েস্টটা ইগনোর করে দেয়ার জন্য। রাজন সাহেব, দয়া করে আমার অ্যাড রিকোয়েস্টটা ইগনোর করে দিন। শুধু একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ যেখানে এরকম রূঢ় প্রশ্নের জন্ম দেয়, সেখানে বন্ধুত্ব না করাই সমীচীন। আমি নিজে অন্ততঃ তাই বিশ্বাস করি।
আমার ব্যবহারে আঘাত পেয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেবেন। কোনও ব্যক্তিগত আক্রমণের উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এই কথাগুলো লিখিনি।
পরম করুণাময় আপনাকে সপরিবারে ভালো থাকার তৌফিক দিন। খোদা হাফেয।
......................................
আর এভাবেই অনেক দীর্ঘশ্বাসের প্রান্তে এসে মৃত্যু হলো একটি সম্ভাব্য বন্ধুত্বের।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



