অনেক মানুষের ভীড় এখন এখানে। কিন্তু তার মাঝেই তারা ঠিক চিনে নিলো পরষ্পরকে।
বহু বছর পর দেখা, কিন্তু চিনতে না পারার কোনও কারণ ছিলো না। এতো অনেকটা আয়নায় নিজের মুখ দেখার মত, মানুষ আর যাই ভুলে যাক নিজের চেহারা কি আর ভুলতে পারে কখনও?
হতবাক হয়ে তারা কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো পরষ্পরের দিকে। তারপর আপনা থেকেই একজন এগিয়ে এলো আরেকজনের কাছে। বিস্ময়মাখা চোখে বলে উঠলো, "কেমন আছিস! কেমন আছিস!"
তার কন্ঠে বিপুল উচ্ছাসের ছোঁয়া।
মৃদু হেসে অপরজন আস্তে আস্তে বললো , ভালো... তুমি... তুমি ভালো আছো?...
- হ্যাঁ... আছি। কত বড় হয়ে গেছিস রে তুই!...
- তুমিও তো বড় হয়ে গেছো অনেক।
- হ্যাঁ...
তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা। ছেলেবেলার সেই পাগলামি করার দিন তো আর নেই ওভাবে। তারচেয়েও বড় কথা হলো, প্রযুক্তির এই চরম ও পরম পরাকাষ্ঠার যুগেও এত বছর তাদের মধ্যে কোনও যোগাযোগ হয়নি। একেবারেই না। কথা না বলার যে বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে, সেটা অতিক্রম করতে তাদের সময় লেগে গেলো অনেকটা।
নীরবতা যখন ভাঙলো ততক্ষণে তারা ভীড়ভাট্টা পেরিয়ে এসে ছোট্ট একটা গাছের ছায়ায় বসেছে পা মেলে দিয়ে।
গোধূলির আলো এসে পড়ছিলো তাদের মেলে রাখা পায়ের ওপর। মাথার ওপরের গাছটা আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে বাতাস করার চেষ্টা করছিলো তাদের। পাশ দিয়ে হাঁটি হাঁটি পা পা করে হেঁটে যাচ্ছিলো ছোট ছোট কিছু পশুশাবক।
মুখ খুললো প্রথমজন।
- জানিস, মা এখন কেমন যেন হয়ে গেছে। হাসে না, কথা বলে না।
- তাই? কিন্তু আগে মা কত হাসিখুশি ছিলো, না? কত গান শোনাতো আমাদের!
- এখন আর নেই সেসব কিছু। নিষ্প্রাণ লাগে খুব।
- আমার এখনকার মা অবশ্য খুব হসিখুশি।
- তাই?
- হ্যাঁ, তবে আমার সাথে না। তার নিজের সন্তানদের সাথে।
প্রথমজন খুব অবাক হলো একথা শুনে। একটু কষ্টও পেলো বোধহয়। থেমে থেমে বললো,
- উনি তোকে ভালোবাসেন না?
- বাসে হয়তো। লোক দেখানো ভালোবাসা। হাজার হলেও, আমি তো আর তার নিজের ছেলে না। হয়তো আমি অন্যের সন্তান এটা প্রত্যেক বেলা মনে করিয়ে দেয় না, কিন্তু খুব একটা আন্তরিকতাও দেখায় না।
- ও... আচ্ছা অল্পবয়সে তুই কি খুব জ্বালাতি ওনাকে?
- নাহ... সেই স্কোপ কোথায়? মানুষ তো তাকেই জ্বালায় যার কাছে সে কিছু প্রশ্রয় পায়। উনি তো কোনও প্রশ্রয় দেননি আমাকে।
- আর বাবা? বাবা তোকে ভালোবাসতেন না?
দ্বিতীয়জন চট করে উত্তর দিতে পারলো না এ কথার। হয়তো তার অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু কেন যেন মুখ ফুটে বেরোলো না সেই কথাগুলো। প্রথমজন খুব উদ্গ্রীব হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছিলো কিন্তু দ্বিতীয়জন দমে যাওয়ার কারণে সেও কেমন যেন খানিকটা হোঁচট খেয়ে গেলো। তারপর বললো, বুঝতে পারলাম।
দ্বিতীয়জন মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলো, কি বুঝতে পারলে?
- বুঝতে পারলাম এটাই যে, বাবা এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারেননি।
- বাইরের দেশগুলোতে আসলে এই ব্যাপাগুলো অনেক টাফ। তোমরা দেশে থাকো, তোমরা হয়তো বুঝবে না। দেশের পারিবারিক অ্যাটমোস্ফিয়ার অনেক ভালো হয় বাইরের থেকে।
প্রথমজন তীব্রভাবে বললো, দেশ হোক আর বিদেশ হোক, একজন মানুষ তার নিজের ছেলেকে ভালোবাসতে ভুলে যাবে? তাও এমন একটা ছেলে যাকে সে দেশ থেকে, নিজের মায়ের কাছ থেকে জোর করে আলাদা করে নিয়ে এসেছে!
দ্বিতীয়জন ম্লানভাবে বললো,
- এভাবে কয়জন ভাবে বলো? এত ভাবার সময় কোথায়?
প্রথমজন নিরুত্তর। অত্যধিক রাগের মাথায় চেঁচিয়ে ওঠার কারণে সে কিছুটা লজ্জায় পড়ে গেছিলো। উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টায় কিছুক্ষণ সে কোনও কথাই বলতে পারলো না।
তার অবস্থা দেখে দ্বিতীয়জনই মুখ খুললো আবার।
- দ্যাখো, মেয়েদের বোধহয় এই ক্রাইসিসটা কিছুটা কম হয়। তুমি একটা মেয়ে, তুমি এটা ভালো বুঝতে পারবে।
প্রথমজন ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
-কি রকম?
দ্বিতীয়জন কি যেন একটু চিন্তা করে বলল,
-ইফ আই অ্যাম নট রঙ... তুমি যদি আমার অবস্থায় পড়তে, হয়তো এত কষ্ট পেতে না। আসলে মেয়েদের একটা ব্যাপার থাকে, ওরা অনেক বেশি আদর কাড়তে পারে। ওরা... ওরা অনেক মিশে থাকে সবকিছুর সাথে, ছেলেরা পারে না ওভাবে। আর ওখানে ব্রোকেন ফ্যামিলি ব্যাপারটা আসলে ডালভাতের মত, একটা ব্রোকেন ফ্যামিলি বয় খুব বেশি ম্যাটার করে না কারও কাছে।
এতক্ষণে প্রথমজনের মুখে কিছুটা হাসি ফোটে।
- নাহ, তুই আসলেই বড় হয়ে গেছিস অনেক।
- আমার উপায় ছিলো না বড় না হয়ে।
তারপর আবার কিছুটা নীরবতা নামে তাদের মাঝে।
প্রথমজন যথারীতি চেষ্টা করে নীরবতা ভাঙার।
- তোর এখনকার ভাইবোনেরা কেমন সবাই?
- আছে। খারাপ না।
- ও তাই! আমি তো আবার ভাবলাম তারা বোধহয় খুবই বেশি ভালো!
- কেন এরকম ভাবলে কেন?
- এতক্ষণ ধরে কথা বলছিস অথচ একবারও আপা বলে ডাকলি না, তো আর কি ভাববো!
- যাব্বাবা! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি বড় হয়ে গেছো, এখন তো দেখি সেই ছিঁচকাঁদুনেই আছো!
- ঐ ঐ ঐ, ছিঁচকাঁদুনে আমি ছিলাম না তুই ছিলি অ্যাঁ!
- মোটেও আমি ছিঁচকাঁদুনে ছিলাম না!
- আচ্ছা! খুব যে ঠোঁট ফোলাতি, মনে নেই!
- হ্যাঁ আর আমি ঠোঁট ফোলালেই তুমি একটা রাম খামচি দিতে, তাও খুব মনে আছে!
কিছুক্ষণ তারা মেতে ওঠে তাদের সোনালি শৈশবের গল্পে।
কিছুক্ষণ তারা ভুলে থাকে যে তাদের সোনালি শৈশব কিছু ধূসর কৈশোর আর বর্ণহীন বয়ঃসন্ধি ছাড়া তাদের আর কিছু উপহার দিতে পারেনি।
কিছুক্ষণ পর স্বপ্নময় স্বর্গ থেকে বাস্তবতাময় মর্ত্যে নেমে এলে তারা আবার তাদের কষ্টের ঝাঁপিগুলো খুলে বসে।
- তোমার এখনকার বাবা মানুষটা কিরকম?
- বাবা... বাবা... বাবা...
বারকয়েক 'বাবা' শব্দটা আনমনে আওড়ায় সে।
- বাবা... আছেন একজন বাবা। থাকতে হয়, তাই থাকা। আমার সাথে তো তার প্রয়োজনের সম্পর্ক। তাঁর কোনও কিছু প্রয়োজন হলে তিনি বলেন, আমি করে দিই।
- তুমি ওনাকে কিছু বলো না?
- আগে একটু আধটু চেষ্টা করতাম বলার। এখন আর তাও করি না। ভালো লাগে না রে! যেখানে মনের কোনও টান নেই সেখানে প্রয়োজন-অপ্রয়োজন কিংবা চাওয়া-পাওয়ার কি মূল্য আছে বল?
- উনি নিশ্চয়ই মায়ের সাথেও ভালো ব্যবহার করেন না?
বোনটি প্রায় চমকে উঠে বললো, "কি করে বুঝলি!"
ভাইটি আবার তার স্বভাবসুলভ মৃদু হাসিটি হেসে বললো, তা যদি না-ই হবে তবে মা বদলে গেছে কেন? আর হাসে না কেন? গান গায় না কেন?
দু'জন কেমন যেন শুন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পরষ্পরের দিকে।
চলচ্চিত্রের ফ্লাশব্যাকের মত তাদের মনে পড়তে থাকে তাদের এক সময়ের সুখের জীবনের কথা... সংসার ভেঙে যাওয়ার কথা... তাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা... তারপর আবার নতুন একটা সংসারে আশ্রিতের মত বছরের পর বছর কাটিয়ে দেয়ার কথা... কি হয়েছে শেষ পর্যন্ত? এত দীর্ঘ সময় পরও যদি লাভ ক্ষতির খাতা খুলে বসে হিসেব মেলানো না যায়, তাহলে কিসের জন্য এত কিছু?
হঠাৎ কেউ একজন তাদের নাম ধরে ডেকে উঠলে তাদের খেয়াল হয় যে তাদের চলে যাবার মুহূর্তটি উপস্থিত হয়েছে, আবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সময় হয়েছে...
এবং এটাও নতুন করে উপলব্ধি হয় যে, তাদের আপন বাবার মৃত্যু না হলে এতবছর পর এভাবে তাদের কাছাকাছি আসার সুযোগ হতো না।
... ...
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই নভেম্বর, ২০১০ রাত ৮:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



