ভারতের যে কোন প্রান্তে যাবতীয় সন্ত্রাসী হামলার জন্য মুসলিম জঙ্গীদের দিকে আঙ্গুল তোলা ভারতে একটা চালু রেওয়াজ। কখনো সে হামলাকারী সন্ত্রাসী আসে সীমান্তের ওপার (তা সে পুব বা পশ্চিম যে কোন সীমান্ত হোক না কেন)থেকে সরাসরি- কখনো সে দেশের ভেতর থেকেই আসে-বাইরে থেকে প্রশিক্ষন প্রাপ্ত হয়ে।প্রতিবেশী দেশ গুলোর সাথে এ নিয়ে ভারত সরকারের চাপান উতোর লেগেই থাকে।
কিন্ত বিগত কয়েকমাস যাবৎ ভারতের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মধ্যে নতুন ধরনের কিছু ঘটনা আর সেগুলোর মধ্যে যোগসুত্র স্থাপনের ভিতর দিয়ে যে ভিন্ন ধরনের এক ছবি ফূ্টে উঠছে—এত দিনকার পরিচিত ছক থেকে এটা একদমই আলা্দা। অন্ততঃ বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ভারতের বিভিন্ন শহরে গত কয়েক মাসে ঘটেছে যে গুলোর ক্ষেত্রে আগের মত মুখস্ত বুলি হিসাবে মুসলিম জঙ্গীদের দিকে আর আঙ্গুল তোলা যাচ্ছে না।
বরং নতুন কিছু সন্ত্রাসী দলের নাম সামনে উঠে আসছে-যে গুলো পরিচালিত হচ্ছে উগ্র হিন্দুত্ববাদ দ্বারা। ভারতের সাম্প্রদায়ীক শক্তি তাদের কর্মসুচী বাস্তবায়নের জন্য বেছে নিচ্ছে উগ্র জঙ্গীপনার রাস্তা-গড়ে উঠছে নতুন নতুন সন্ত্রাসী গোষ্ঠি- যারা বিশ্বাস করে সহিংস পন্থাই হিন্দু মৌলবাদকে প্রতিষ্ঠার একমাত্র রাস্তা। পশ্চিমা প্রচার মাধ্যম নতুন এই প্রবনতাকে হিন্দু তালেবানী পন্থা হিসাবে আখ্যায়িত করছেন।
মুম্বাই এর মালেগাঁও বিস্ফোরন এর বিস্তৃত বর্ননায় যাওয়ার আগে জনৈক ইজাজ আহমেদ এর সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেই- (ছবিতে দেখেন) মালেগাঁও বিস্ফোরনে আহত এক চা এর দোকানের মালিক ইজাজ আহমেদ ওয়াশিংটন পোষ্টএর সাংবাদিক রাম লক্ষীকে বলছিলেন- আমরা সব সময়ই জানতাম হিন্দু জঙ্গীরা এই বিস্ফোরনের ঘটনার পিছনে আছে, কিন্ত আমরা কখনও ভাবিনি সরকার তাদের গ্রেফতার করার সাহস দেখাবে। সন্দেহের তীর তো সবসময় মুসলমানদের দিকে। এখন মনে হচ্ছে আমরা ন্যায়বিচার পেতে পারি……
বিগত কয়েক মাস যাবৎ মহারাষ্ট্রের এন্টি টেররিষ্ট স্কোয়াড (এ টি এস) বলে আসছিল রাজ্যের সাম্প্রতিক কয়েকটি বোমা হামলার ঘটনায় উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলির যোগাযোগ আছে। যথারীতি রাজনৈতিক মহলে এটা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়- বিজেপি বলতে থাকে হিন্দুবাদীদের পক্ষে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানো অবাস্তব কথা- এটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বলা হচ্ছে-আর কংগ্রেস বলে- ঠিক আছে, তদন্ত চলুক। দেখা যাক কি পাওয়া যায়!!
এ বছরের মে-জুন মাস থেকে গুজরাত, আহমেদাবাদ, জয়পুর, আসামে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে-মুম্বাই এর কাছাকাছি মালেগাঁও বিস্ফোরন তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য। মালেগাঁও মুম্বাইএর উত্তর প্রান্তে নাসিকে অবস্থিত। টেক্সটাইল শিল্পের কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত, আর আছে সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গার ঐতিহ্য। শতকরা ৭৫ ভাগ অধিবাসী মুসলীম এই শহরে ২০০১ সালে ঘটেছিলো বিভৎস দাঙ্গা।
এ বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর পবিত্র ঈদের কয়েকদিন আগে রমজান মাসে এই মালেগাঁওতে বোমা বিস্ফোরনের এক ঘটনা ঘটে। মারা যায় ৭জন, আহত হয় কুড়ি জনের মতো। ব্যাস্ত ঈদের বাজারে এক হিরো হন্ডা মোটর সাইকেলের মধ্যে এই বোমা বাধা ছিল এবং দূর থেকে এই বিস্ফোরন ঘটানো হয়। যদিও পুলিশের মতে এটা ছিল ঘরে তৈরী একটা মাঝারী মাপের বোমা।
মহারাষ্ট্রের এন্টি টেররিষ্ট স্কোয়াড (এ টি এস) এই ঘটনার তদন্ত শুরু করে।যথারীতি গ্রেফতার করা হয় ঝাকে ঝাকে মুসলিম সংগঠনের কর্মীদের এবং ঘটনার দায়ীত্ব স্বীকারকারী ইন্ডিয়ান মুজাহিদীনের সদস্যদের। কিন্ত পুলিশের খটকা লাগে মসজিদ, মুসলিম অধ্যুসিত কিছু এলাকাতেও যখন বিস্ফোরন ঘটানো হয়।
মালেগাঁও এর ঘটনার তদন্ত প্রথম মোড় নেয় যখন ফরেনসিক রিপোর্টে প্রকাশ পায় এই মোটর বাইকের মালিক জনৈক প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর। বিজেপির ছাত্র সংগঠনের একজন প্রাক্তন নেত্রী। অক্টোবর মাসের ১০ তারিখে সুরাট থেকে গ্রেফতার হয় প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর সহ আরও ১০ জন। । গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে আরো ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসার। মেজর রমেশ উপাধ্যায় এবং জনৈক কর্নেল। এছাড়াও আছেন জনৈক সমীর কুলকার্নি এবং সংগ্রাম সিং। এই মামলার সরকারী পক্ষের উকিল (পি পি) অজয় মিশ্র তেহেলকা ডট কম কে জানায় আমাদের কাছে প্রজ্ঞার টেলিফোনে বলা কথাবার্তার রেকর্ড আছে, এছাড়াও সেল ফোনের তথ্য, ব্যাঙ্ক ষ্টেটমেন্ট, ডায়রী, ল্যপটপ কম্পুউটারের ডাটা এবং বিভিন্ন অভিযুক্তদের স্বীকারোক্তি আছে, যা আমরা আদালতে পেশ করবো।
মহারাষ্ট্রের এন্টি টেররিষ্ট স্কোয়াড (এ টি এস) দাবী করে পুনা থেকে গ্রেফতারকৃত এই সমীর কুলকার্নি ঘটনার মুল পরিকল্পনাকারী, যিনি একসময় বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের সদস্য ছিলেন।বলা হচ্ছে তিনি থাকতেন ভুপালে, কাজ করতেন এক ছাপাখানায়। যদিও পুলিশের দাবী-মোটেও এত নিরীহ গোছের সাধারন মানুষ তিনি নন, সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত দুজনের সাথে যোগাযোগের কাজটা তিনিই করতেন, এবং সামরিক কৌশল তথা বিস্ফোরক বিষয়ে তার ভাল ধারনা আছে। আলোচ্য মালেগাঁও বিস্ফোরনের মাল-মশলা তিনিই সংগ্রহ করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর রমেশ উপাধ্যায়ের মাধ্যমে।
৩৭ বছর বয়সের প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের রাজনীতির হাতে খড়ি বিজেপির ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের মাধ্যমে। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ পর্যন্ত তিনি এই সংগঠনের রাজ্য পর্যায়ের সাধারন সম্পাদক ছিলেন। ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পর তিনি হিন্দুত্ববাদি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বজরং দল, তাদের মহিলা সংগঠন দুর্গাবাহিনী, রাষ্ট্রীয় জাগরন মঞ্চ, অভিনব ভারত ইত্যাদি বিবিধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করতে থাকেন। কি কাজ? হিন্দু রাজ্য (রাম রাজ্য) কায়েমের আহবান জানিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়ীক বক্তব্য দেওয়া, মুসলিম জঙ্গীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার ডাক দেওয়া এবং খোলাখুলি মুসলমানদের দেশ থেকে বিতাড়িত করা। প্রজ্ঞার গ্রেফতারের পরে কিন্ত বিজেপি বজরং দল সহ সবাই প্রজ্ঞার সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করতে থাকে, স্বয়ং আদভানী বক্তব্য দেন এ বিষয়ে-এবং সুরও বদলে ফেলেন যখন প্রমানিত হয় প্রজ্ঞা সিং তাদের ছাত্র সংগঠনের নেত্রী ছিলেন।
গতবছর এলাহাবাদে হিন্দুদের পবিত্রস্থান প্রয়াগে এই প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর বিখ্যাত হিন্দু গুরু স্বামী অভাদেশানন্দ গিরির শিষ্যত্ব গ্রহন করেন এবং মহিলা সাধু (সাধ্বী?)তে পরিনত হন। যদিও সাম্প্রতিক গ্রেফতারই তাকে প্রচারের আলোয় নিয়ে আসে-রাতারাতি তিনি সংবাদপত্রের শিরোনামে পরিনত হন।
পুলিশ বলছে গ্রেফতারকৃতদের প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে ‘অভিনব ভারত’ বা নব ভারত নামক এক সশস্ত্র সংগঠনের সাথে যুক্ত। ১৯০৪ সালে হিন্দুত্ব জাতিয়তাবাদী নেতা সাভারকার এর হাতে এই উগ্র সংগঠনের জন্ম। দীর্ঘদিন নিস্ক্রিয় থাকার পর ২০০১ সালে যার নতুন করে সৃষ্টি- বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে এর প্রতিষ্ঠাতা বিনায়ক সাভারকার এর নাতনী হিমানী সাভারকর এর দ্বারা যিনি মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের আত্মীয়া। বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে আরো আছেন অজয় রাহিরকার, সমীর কুলকার্নি, এবং মেজর (অবঃ)উপাধ্যায়।গ্রেফতারকৃত সংগ্রাম সিং এই সংগঠনের অফিস সহকারী।
মাত্র এক বছরের মধ্যে এই সংগঠনের বিস্ময়কর উত্থান লক্ষ্য করা গেছে যারা সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে একটা মজবুত প্রভাববলয় গড়ে তোলা সহ বিভিন্ন রাজ্যে শক্তিশালী একটা নেট ওয়ার্ক গড়ে তোলে। পুলিশের অভিযোগ সামরিক বাহিনীর কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত অনেকেই এই সংগঠনের সাথে যুক্ত।সংগঠনের সামরিক শাখার প্রশিক্ষন এবং সশস্ত্র ইউনিটের দায়ীত্বে থাকা সমীর কুলকার্নির সাথে সামরিক অফিসারদের নিয়মিত যোগাযোগের বিস্তর প্রমান পুলিশ হস্তগত করেছে। এই অভিযোগ আরো গাঢ় হয় সামরিক বাহিনীর কর্মরত লেঃ কর্নেল প্রসাদ পুরোহিত এর গ্রেফতার এর মধ্য দিয়ে। ওয়াশিংটন পোষ্টের সাংবাদিক রামলক্ষী জানাচ্ছেন- এমন কি গ্রেফতার হওয়ার পরেও লেঃ কঃ পুরোহিত এর মোবাইল থেকে পাঠানো এক মেসেজ পুলিশ উদ্ধার করেছে, বক্তব্য হচ্ছেঃ ক্যাট ইজ আউট অফ ব্যাগ, সিং (প্রজ্ঞা সিং) হ্যাজ সাং, প্লিজ ডিলিট মাই নাম্বার। পুলিশের জেরায় সমীর কুলকার্নির স্বীকারোক্তি--বাংলাদেশের অনেকেই তার সংগঠনের সদস্য এবং তাদের নিয়মিত জমায়েতে বাংলাদেশ থেকে অনেকেই নাকি নিয়মিত অংশগ্রহন করে।
পুরোহিত সম্পর্কে প্রধান অভিযোগ হচ্ছে জম্মু ও কাশ্মীরে কর্মরত থাকার সময় তিনি অবৈধ ভাবে বিপুল পরিমান বিস্ফোরক আর ডি এক্স নিজের হেফাজতে রাখেন এবং তার একটা অংশ রমেশ উপাধ্যায় আর কুলকার্নিকে ব্যবহার করতে দেন। এমনকি পুলিশ অভিযোগ করছে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারীতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলাচলকারী সমঝোতা এক্সপ্রেস নামক ট্রেনে যে নাশকতা চালানো হয়, যার ফলে মারা যায় প্রায় ৬৮ জন, যাদের অধিকাংশই পাকিস্তানি, সেই ঘটনায় ব্যাবহৃত আর ডি এক্সও লেঃ কঃ পুরোহিত এর সরবরাহ করা। মহারাষ্ট্রের এন্টি টেররিষ্ট স্কোয়াড (এ টি এস) এর প্রধান হেমন্ত কারকারে (যিনি সাম্প্রতিক মুম্বাই হামলার ঘটনায় নিহত হয়েছেন) তেহেলকা ডট কমকে জানাচ্ছেন-তারা জম্মু এবং কাশ্মীরে যাওয়ার প্লান করছেন আরো কিছু তথ্য প্রমান সংগ্রহ করার জন্য, তবে তাদের কাছে ইতিমধ্যেই যথেষ্ট প্রমান আছে যা সামরিক অফিসারদের সংশ্লিষ্টতা প্রমান করবে……
সামরিক অফিসারদের এই গ্রেফতার সামরিক বাহিনীতে তোলপাড় ফেলে দেয়, রাজনৈতিক চাপও বাড়তে থাকে- কিন্ত সরকারীভাবে এবং সামরিক কর্তৃপক্ষের দিক থেকেও এ ঘটনা গুরুত্বের সাথে নেওয়া হয়। প্রয়োজনে যে কোন সামরিক বাহিনীর অফিসার বা সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অবাধ অনুমতি দেওয়া হয় এন্টি টেররিষ্ট স্কোয়াড (এ টি এস)কে। যা খুবই বিরল একটা ঘটনা। সামরিক বাহিনীর ডেপুটি চিফ লেঃ জেনারেল এস পি এস ধিলোন বলেন-দোষী কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, এ টি এস এর চার্জশীট পাওয়া গেলেই আমরা যথাযথ ষ্টেপ নিব। তিনি আরও বলেন লেঃ কঃ পুরোহিত এর গ্রেফতার আর্মির ভাবমুর্তি দারুন ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
(এই লিখার যাবতীয় তথ্য ওয়াশিংটন পোষ্ট, উইকিপিডিয়া এবং তেহেলকা ডট কম থেকে নেওয়া হয়েছে। )

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

