পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরের সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ট্রাজেডির জন্য আমরা কাকে দায়ী করতে পারি? জরুরী এই প্রশ্ন তোলার আগে সাদামাটা কিছু আলোচনা এখানে তুলতে চাই......
দেশ চালাবে রাজনীতিবিদ, তাদের রাজনৈতিক দল--এটাই তো সবচেয়ে সঙ্গত এবং স্বাভাবিক কথা। সেটাই গনতান্ত্রিক পন্থা। আমাদের দূর্ভাগ্য, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা সবসময় ঘটে না। যাদের হাতে দেশ পরিচালনার দ্বায়ীত্ব থাকার কথা—আমাদের সেই সব রাজনীতিবিদগন প্রায়শই এমন সব সঙ্কটে পতিত হন যে--সেনা ছাউনি থেকে বেড়িয়ে জেনারেলরা ক্ষমতার মসনদে চেপে বসেন। কেউ দুই বছর বা কেউ বা তার চেয়ে বেশি—
সাময়িক ভাবে এই ব্যবস্থা মেনে নেওয়ার পরেও আমাদের যাবতীয় রাজনৈতিক সঙ্কট আর অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার চুড়ান্ত লক্ষ্য, যাবতীয় রোডম্যাপের গন্তব্য হিসাবে আমরা চিহ্নিত করি—একটা সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ সাধারন নির্বাচন, গনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা অর্পণ। যাতে দেশ পরিচালনার দ্বায়ীত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে থাকে।
বিগত নির্বাচনে বিশাল বিপুল ভাবে জনগনের রায় নিয়ে আওয়ামীলীগের ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসাবে যারা দেশ চালিয়েছেন, তারা কেউ রাজনীতির লোক ছিলেন না। সেনা ছাউনি থেকে হয়তো তারা আসেন নাই, কিন্তু গনমানুষের দাবীদাওয়া আর তার অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই লড়ে যাওয়ার যে রাজনীতি- তা থেকে বহুদুরের, ভিন্ন এক জগতের মানুষ ছিলেন সরকার প্রধান ফকরুদ্দিন এবং তার উপদেষ্টাবৃন্দ। তবুও তাদের শাসনামলে জনগন খুব যে খারাপ ছিল, বা প্রশাসক হিসাবে তারা যে ব্যার্থ, সে কথা জোর গলায় বলা যাবে না। তাদের অনেক অর্জন এখনো আমরা মুক্তকন্ঠে স্বীকার করি।
তারপরেও আমরা চাই না রাজনীতির লোকেরা সংকটে পড়ুক আর রাজনীতির বাইরের লোকেরা এসে দেশ পরিচালনার দ্বায়ীত্ব গ্রহন করুক। দেশ চালাবে রাজনীতিবিদগন এবং তাদের সেই রাজনৈতিক দল যাদের সাংগঠনিক শিকড় প্রত্যন্ত জনগনের মধ্যে দৃঢ় ভাবে প্রোথিত। জনগনের সমস্যা এবং তাদের চাওয়া নিয়ে সংগ্রাম লড়াইয়ের যার দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য আছে। জনগনের দুঃখ কষ্ট নিয়ে যারা ওয়াকেবহাল। এটাই আমাদের চাওয়া।
এবারের সাধারন নির্বাচনেও জনগন বিপুল ভাবে অংশগ্রহন করেছে এবং প্রত্যাশার অতিরিক্তভাবে তাদের রায় আওয়ামীলীগকে দিয়েছে। তারা সুস্পষ্টভাবেই মনে করেছে আওয়ামীলীগই হলো সেই দল-যাদের রয়েছে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের ঐতিহ্য, যার সাংগঠনিক কাঠামো রয়েছে দেশব্যপি, ফলে জনপ্রতিনিধিত্ব বলতে যা বোঝায়, স্থানীয়ভাবে জনগনের মতামত সঠিক ভাবে বোঝা এবং তা সমাধানের কাজটা একমাত্র তার পক্ষেই সবচেয়ে ভাল ভাবে করা সম্ভব।
সাধারন মানুষের সমস্যা অন্য যে কারো চাইতে তারই সবচেয়ে বেশি ভাল বুঝতে পারা উচিত, জাতীয় সংসদে যার রয়েছে প্রায় ২৫০টা আসন।
নির্বাচনে অংশ গ্রহনের প্রাক্কালে এবং জেতার পরে ক্ষমতা গ্রহনের আগে যে কোন রাজনৈতিক দলই তার টপ প্রায়োরিটি ইস্যুর একটা তালিকা প্রস্তুত করে। দেশের কোন কোন বিষয় স্পর্শকাতর, কোথায় জমে রয়েছে বিস্ফোরক পরিস্থিতি, কোন বিষয়টা আশু মনো্যোগের দাবী রাখে এই সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে টপ প্রায়োরিটির সেই লিস্টে।
ডাল ভাত কর্মসুচি নিয়ে বিডিআর জওয়ানদের ক্রমশঃ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠা এবং তাদের ছুটি-ছাটা সহ আর্থিক সুবিধাদি নিয়ে তাদের অসন্তোষ কোন মাত্রায় গেছে—জনগনের রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামীলীগ তা অনুধাবন করতেই পারে নাই। বিগত তত্ত্বাবধায়কের আমলে সেনাবাহিনি এবং বিডিআর এর একটা অংশ বেসামরিক প্রশাসনের তথা জনগনের দৈনন্দিন কাজকর্মের সংস্পর্শে এসছিল, যার মধ্যে বিডিআর ছিল ডাল-ভাত কর্মসুচির মধ্যে দিয়ে পন্য আমদানি বিপননের মতো কার্য্যক্রমের সাথে জড়িত। যেখানে অর্থকড়ি টাকাপয়সার বিষয়টা এসেই যায়। যে কোন দক্ষ রাজনৈতিক দলেরই পক্ষেই এটা অনুধাবন করা সম্ভব- এসব ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী এবং বঞ্চিত—দুইটা পক্ষের পরস্পর বিরোধি উপস্থিতি।
আওয়ামীলীগের সেই দলীয় উইং (যে কোন রাজনৈতিক দলের এ ধরনের উইং থাকা স্বাভাবিক, আমি বিশ্বাস করতে চাই আওয়ামীলীগেরও তা আছে) যা প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়ে ডিল করে, এটা ছিল তাদের দ্বায়িত্ব, বিডিআর জওয়ানদের ক্রমশঃ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠার বিষয়টা আমলে নেওয়া এবং দলীয় হাইকমান্ডের নজরে আনা। সাধারন জওয়ান—যারা আদতে উর্দি পরিহিত কৃষক, তারা মোটেও আওয়ামীলীগের নাগালের বাইরের কোন জনগোষ্ঠি নয়? আর পাঁচটা পেশাজীবির মতো তারাও একজন, ছুটিছাটায় দেশের বাড়ীতে বেড়াতে গেলে হামেশা যাদের সাথে আমাদের মোলাকাত হয়, যাদের সুখ-দুখ নিয়ে গপসপ হয়।
বিডিআর ইস্যু নিয়ে আশু কোন কর্তব্য, কোন করনীয় আওয়ামীলীগের টপ প্রায়োরিটির সেই লিস্টে ছিল না, বোঝাই যাচ্ছে। অথচ দীর্ঘ দিনের সংগ্রামী সেই সব পোড় খাওয়া ঝানু রাজনীতিবিদদের দল হিসাবে আওয়ামীলীগের (সংসদে যার রয়েছে প্রায় ২৫০টা আসন) এই ব্যর্থতা কি ভাবে মেনে নেওয়া যায়? এই সঙ্কট অনুধাবনে আওয়ামীলীগের যে ব্যর্থতা এবং তা ঢাকার জন্য তার বাকচাতুরি আর বাকোয়াজিকে আমরা কিভাবে মাফ করতে পারি??

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

