আমেরিকান আদিবাসী নেতা 'চিফ সিয়াটল' এর একটা চিঠি

১৪ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:০৮

শেয়ারঃ
0 4 0

ওয়াশিংটন থেকে প্রেসিডেন্ট সাহেব জানিয়েছেন যে তিনি আমাদের জমি-জিরাত কিনতে চান। কিন্তু আকাশ কি কেনা-বেচা করা যায়? যায় জমি কেনাবেচা করা? আমাদের কাছে এই ধারনা খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে। বাতাসের সজীবতা, জলের স্বচ্ছতা তো আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। তাহলে? কি করে কিনবেন তাদের?

এই ধরিত্রীর প্রতিটি ধূলিকণা আমার লোকদের কাছে পবিত্র; প্রতিটা পাইন পাতার কাটা, প্রতিটি বালুবেলা, ঘনান্ধকার অরণ্যের প্রতিটি শিশিরকণা, প্রতিটি মাঠ, প্রতিটি গূন্জরিত পতঙ্গ। আমার লোকদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতায় এরা সবাই পবিত্র।

গাছ রস টেনে নেয় গোপন পথে- আমারা তা জানি, যেমন জানি রক্ত আমাদের ধমনি বেয়ে চলে। আমরা এই পৃথিবীর অংশ, যেমন এই পৃথিবী আমাদের অংশ। সুরভিত ফুলেরা আমাদের বোন। ভালুক,হরিন,ঈগল -এরা সবাই আমাদের সহোদর ভাই। পাহাড়ের চূড়া, সবুজ প্রান্তরের রস, ঘোড়ার শরীরের ওম, আর মানুষ সবাই আমরা একই পরিবারের সদস্য।

ঝরনায়, নদীতে স্ফটিক-স্বচ্ছ যে জল গড়িয়ে যায় সে তো নেহায়ত জল নয়, আমাদের প্রপিতাদের শরীরের স্বেদ, রক্ত। আমরা যদি আপনাকে জমি বিক্রি করি তো অবশ্যই স্মরণ রাখবেন যে জমিটা পবিত্র। ঝিলের স্বচ্ছ জলে অলৌকিক ছায়া পড়ে। তার প্রতিটিতে আমার লোকদের জীবনের স্মৃতি আর ঘটনা প্রতিফলিত হয়। বনের মর্মরধ্বনিতে আমি আমার পিতামহের ডাক শুনতে পাই।

নদীরা আমাদের ভাই। তাদের জলে আমাদের তৃষ্ণা মেটে। ওরা আমাদের নৌকা বয়ে নেয়, আমাদের সন্তানদের মুখের গ্রাস জোগায়। অতএব আপনি অবশ্যই নদীকে সেই রকম দ্য়া করবেন যেমনটা করবেন আপনার ভাইকে।

আমরা যদি জমি বিক্রি করি তো মনে রাখবেন যে সেই জমির ওপর প্রবাহিত বাতাস আমাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। হাওয়া তার উদ্যমের অংশ দান করে তার সমস্ত পোষ্যকে। হাওয়া যেমন প্রথম ফুৎকারে আমাদের প্রপিতামহকে দিয়েছে ফুসফুসে দম, তেমনি গ্রহণ করেছে তার অন্তিম শ্বাসবায়ুও। আমাদের শিশুদেরও বাতাস দেয় জীবনের উদ্যম। অতএব আপনাকে জমি বিক্রি করলে আপনি অবশ্যই সেই জমি বিশেষ যত্ন করে রাখবেন যেন সেখানে লোকে মাঠের ফুলের মিষ্টি ঘ্রান পাওয়ার লোভে সমবেত হয়।

আমাদের সন্তানদের যা শিখিয়েছি, আপনারাও কি আমাদের সন্তানদের তা-ই শিখাবেন? আমরা শিখিয়েছি যে ধরণী আমাদের মা। এই ধরণীর কিছু হলে এর সন্তানদের সবারই তা হবে।

আমরা এটুকু জানি: মাটি মানুষের নয়, বরং মানুষই মাটির। রক্ত যেমন আমাদের একত্রে বেধেছে, তেমনি সমস্ত জিনিসও পরস্পরে বাধা। জীবনের জাল মানুষ বয়ান করেনি। সে তো এই জালে কেবল বাধা। এই জালের ক্ষতি করা মানে নিজেরই ক্ষতি করা।

আপনাদের ভবিষ্যৎ আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হয়। গরু-মহিষ সব জবাই করলে কি হবে অবস্থাটা? বুনো ঘোড়া পোষ মানিয়ে চালাবেন? অরণ্যের গোপন অঞ্চলগুলো যখন মানুষের ঘামের গন্ধে উঠবে ভরে, এবং উচু পাহাড়ের চূড়া আলাপি তারের আড়ালে পরবে ঢাকা, তখন কি হবে? ঝোপঝাড়, বনবাদাড় যাবে কোথায়? সব উধাও? ঈগল পাখি যাবে কোথায়? উধাও,উধাও। আর ক্ষিপ্রগতি ঘোড়া আর শিকারকে অকালে বিদায় জানাতে হলে কেমন হবে ব্যাপারটা? তখন ফুটে উঠবে জীবনের অন্তিম দশা এবং শুরু হবে ধুকে ধুকে জীবনের পথ চলা।

যখন একেবারে শেষ লাল মানুষটিও তার নিধুয়া দিগন্ত পাড়ে হাওয়া হয়ে গেছে, এবং তার স্মৃতি কেবল ভাসমান মেঘের মত প্রেইরির পাথরে থেকে থেকে ছায়াসম্পাত করে বেড়াচ্ছে, তখনো কি এই সমুদ্রতট, এই অরণ্যরাজি থাকবে যেমন আজো আছে? তখনো কি আমাদের আত্না মিশে থাকবে এদের আনাচে কানাচে?

নবজাতক যখন মায়ের হৃদস্পন্দন ভালোবাসে, তেমনি আমরা ভালোবাসি এই পৃথিবীকে । অতএব আমরা জমি বিক্রি করলে আপনিও একে আমাদের মতই ভালোবাসবেন। আমরা এর যেমন যত্ন নিয়েছি, আপনাকেও সেরকম যত্ন নিতে বলি। জমি সম্প্রদানের অবিকল স্মৃতি মনে ধরে রাখুন। সমস্ত সন্তানদের জন্য জমি রক্ষা করুন, জমিকে ভালোবাসুন যেমন ঈশ্বর আমাদের ভালোবাসেন।

আমরা যেহেতু সবাই ভূমির অংশ, সে জন্য আপনিও এর অংশ। জমি আমাদের কাছে মুল্যবান, তেমনি আপনার কাছেও । একটা বিষয়ে আমরা নিশ্চিত : ঈশ্বর এক। মানুষ সে লালই হোক আর সাদাই হোক, কখনো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে নাহ; হাজার হলেও আমরা তো পরস্পরের ভাই।

মুল চিঠির লিংক Chief Seattle's LETTER TO ALL

অনুবাদটা 'নৃ' নামের একটা বই থেকে নেয়া।

 

সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:৩৪ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ১৪ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:৪০
আকাশচুরি বলেছেন: মাথামোটা আমেরিকান সরকার এই চিঠির মাহাত্ম যদি বুঝতো!
১৪ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:৪৫

লেখক বলেছেন: হুমম, আমরাও কি বুঝতেছি?

১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:০২

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ

৩. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:০৪
নাজমুল হক রাসেল বলেছেন: লেখক বলেছেন: হুমম, আমরাও কি বুঝতেছি?
১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:০৩

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ

৪. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১২:৩৩
আকাশচুরি বলেছেন: বুঝলে কি আর পাহাড়ে আগুন জ্বলে?
১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:০৩

লেখক বলেছেন: হুমম

৫. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:০৬
নাজমুল হক রাসেল বলেছেন: @ আকাশ্চুরি: পাহাড়ের আগুনের সাথে এই চিঠির মৌলিক তফাত আছে বলেই আমার ধারনা। এই চিঠি হল ভারতীয় দর্শনের সেই আদি রুপ 'ধরিত্রি মাতা' বা আমাজন বেসিনের 'মাচু পিচু' এর লিখিত রুপ। যেখানে প্রকৃতি এ জীবনের দর্শন।

আর আম্রা তো প্রতিনিয়ত প্রকৃতি কে ধর্ষন করি
১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:২৬

লেখক বলেছেন: চিঠিটাতে দুইটা ব্যপারি আছে, মানুষের সাথে প্রান,প্রকৃতি,পৃথিবীর সম্পর্ক, আবার আমেরিকান দ্বারা আদিবাসীদের উপর ভুমি সন্ত্রাসীগিরি । দুইটাই।

বাংলাদেশের পাহাড়ের সাথে তুলনীয় কিন্তু আবার এক করা ঠিক হবে নাহ।

৬. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:১৮
পারভেজ রবিন বলেছেন: চিফ সিয়াটল আর অনুবাদকের পরিচয় দিলে ভাল করতেন।
আমিরিকার আদিবাসী বিষয়ে আমার পোস্ট দেখার অনুরোধ রইল- Click This Link
Click This Link
১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১:২৯

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ লংক গুলার জন্যে।

অনুবাদকের নাম খালেকুজ্জামান ইলিয়াস।

৭. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ দুপুর ২:৩২
লেখাজোকা শামীম বলেছেন: এই হল মানুষের আসল দর্শন।
৮. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ৯:০৩
আইরিন সুলতানা বলেছেন: সামান্য যোগ করছি, যে কারণে এই চিঠিটি লিখতে হয়েছিল সিয়াটলের আদিবাসী প্রধানকে -

১৮৫৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সিয়াটলের আদিবাসী বাসিন্দাদের সেই এলাকা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, এর কারণ ছিল সেখানে আধুনিক শহর গড়ে তোলা হবে।

সিয়াটলের আদিবাসী প্রধান তার চিঠিতে প্রেসিডেন্টকে সম্বোধন করেন 'সাদা-সর্দার' বলে।


সেলিনা হোসেন এই চিঠির অনুভূতিকে আমাদের প্রেক্ষাপটের সাথে তুলনা করে আমাদের বাঙালি-আদিবাসী পরিস্থিতিকে যথাযথ রূপে তুলে ধরেছেন এভাবে ---

"বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের জীবনও এই চিঠিটির প্রতিধ্বনি। এই সব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সেই জনগোষ্ঠি, যারা জাতি হিসেবে বিকশিত হওয়ার নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়েও সুযোগের অভাবে বিকশিত হয়ে উঠতে পারেনা। কারণ জাতি হয়ে ওঠা নিয়ন্ত্রণ করে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের ভূমিকা এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত। বাংলাদেশ যে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র এই সত্যটি উপেক্ষিত হয়েছে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দেয়ার কারণে। এর ফলে আদিবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষিত হয়নি। "
১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:৪৫

লেখক বলেছেন: "বাংলাদেশ যে একটি বহুজাতিক রাষ্ট্র এই সত্যটি উপেক্ষিত হয়েছে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না দেয়ার কারণে। এর ফলে আদিবাসীদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষিত হয়নি।"

আদিবাসীদের ঠিক কোন কোন ব্যপারগুলা সংবিধানে আলাদা ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত বলে মনে করেন? বা স্পেসিফিকেলী আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি বলতে কি বোঝাচ্ছেন?

১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১০:৪৭

লেখক বলেছেন: ভ???

১০. ১৫ ই মার্চ, ২০১০ রাত ১১:৩৮
আইরিন সুলতানা বলেছেন: কথাটা আমি বোঝাইনি, আগেই বলেছি, সেলিনা হোসেন এর বক্তব্য। তবে অধিকার, সংবিধান এসব নিয়ে কমবেশী অনেক আলোচনা আমার পোস্টে মন্তব্যের ঘরে হয়েছে। সময় হলে পড়ে দেখতে পারেন।
১১. ২০ শে মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:০৮
মানবী বলেছেন: এই চিঠির ব্যাপকতা অন্যরকম! আমেরিকান আদিবাসীদের এই কান্নার সাথে আর কোন কিছুর তুলনা হয়না...


যে মুক্তযুদ্ধ নিয়ে আমাদের গর্ব, যে মুক্তযুদ্ধে ৩০ লক্ষ আপনজন হারাবার কষ্ট আমরা বয়ে বেড়াই, এই বিশাল সংখ্যা যে কখনও কম মনে হতে পারে, তা একজন আমেরিকান আদি বাসীর সাথে আলাপের আগে জানা ছিলোনা।।


বাংলাদেশের পার্বত্য সংকটের সাথে এই চিঠির প্রেরকদের সমস্যার কোন তুলনা হয়না।

ভীষণ সংবেদশীল এই চিঠিটি শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ জাতিষ্মর।।

২০ শে মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:৫৪

লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ আপনাকেও

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৬৯৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই