
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর আবাসিক ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্বে ছিলেন আ ফ ম মহিতুল ইসলাম। পরবর্তীতে তিনিই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়ের করেন। মহিতুল ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গৃহকর্মী আব্দুর রহমান শেখের (রমা) আদালতে দেওয়া সাক্ষ্য থেকে সেই রাতের হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার খণ্ডচিত্র তুলে এনেছেন সুমন মাহবুব।
"প্রচন্ড গোলাগুলি হচ্ছিল। এক পর্যায়ে কামাল ভাইয়ের (শেখ কামাল) আর্তচিৎকার শুনলাম। বঙ্গবন্ধু দোতলায় এসে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। এক সময় গোলাগুলি থেমে গেল। বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে বাইরে এলে সেনা সদস্যরা তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললো। আমি পেছনেই ছিলাম। সেনা সদস্যদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু বললেন, তোরা কি চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে? তারা বঙ্গবন্ধুকে সিড়ির দিকে নিয়ে গেল। সিড়ি দিয়ে ২/৩ ধাপ নামার পর নিচের দিক থেকে বঙ্গবন্ধুকে লক্ষ্য করে গুলি হলো। বঙ্গবন্ধু সিড়িতে লুটিয়ে পড়লেন।"
এই বিবরণ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতের। বর্ণনাকারী ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বঙ্গবন্ধুর বাসার গৃহকর্মী আব্দুর রহমান শেখ (রমা)। সে রাতে একদল সেনা সদস্য রাজধানীর ধানমন্ডিতে ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িতে বাংলাদেশের তখনকার রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বড় ছেলে শেখ কামাল, মেজো ছেলে শেখ জামাল, ছোট ছেলে শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, শেখ জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের ও পুলিশের বিশেষ শাখার সাব ইন্সপেক্টর সিদ্দিকুর রহমানকে হত্যা করে।
রমা আদালতের কাছে সে রাতের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন ১৯৯৭ সালের ১৪ জুলাই।
ওই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে এ ব্যাপারে একটি মামলা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর ওই বছর ২ অক্টোবর আ ফ ম মহিতুল ইসলাম ধানমন্ডি থানায় এ মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের রাতে মহিতুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর আবাসিক ব্যক্তিগত সহকারীর দায়িত্বে ছিলেন।
আদালতে মহিতুল ইসলাম ও আব্দুর রহমান শেখের দেয়া জবানবন্দি থেকে সে রাতের হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
১৪ আগস্ট রাত আটটা থেকে পরের দিন সকাল আটটা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাসায় দায়িত্বরত ছিলেন মহিতুল ইসলাম। তিনি অবস্থান করছিলেন বাড়ির নিচ তলায়। সেনা সদস্যরা আক্রমণ করার পর শেখ কামাল তিন তলা থেকে নিচে নেমে আসেন। এ সময় তাকে তাকে হত্যা করা হয়।
মহিতুল আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে বলেন, "সেনা সদস্যদের মধ্যে খাকি পোশাক পরিহিত মেজর বজলুল হুদা এ সময় শেখ কামালের পায়ে গুলি করেন। শেখ কামাল লাফ দিয়ে আমার পায়ের কাছে এসে পড়ে বলেন, 'আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, আপনি ওদেরকে বলেন'। আমি সেনা সদস্যদের বিষয়টি বলতেই শেখ কামালকে লক্ষ্য করে ব্রাশ ফায়ার করে তারা।"
মহিতুল ইসলামের জবানবন্দি অনুযায়ী, শেখ কামালকে হত্যার পর খুনিরা পুুলিশের বিশেষ শাখার উপ পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমানকে হত্যা করে। এরপর তার যায় বাড়ির দোতলায়। কিছুক্ষণ পর দোতলা থেকে প্রথমে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর, তারপর অনেক গুলির শব্দ এবং মহিলাদের আহাজারী ও আর্তচিৎকার শুনতে পান মহিতুল।
আব্দুর রহমান শেখ (রমা) তার জবানবন্দিতে বলেন, "ভোর ৫টার দিকে বেগম মুজিবের কাছে আক্রমণের কথা শুনলাম। বঙ্গবন্ধু তখন বাড়ির অভ্যর্থনা কক্ষে পিএ'র সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি পেছনের সিড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে দেখি বেগম মুজিব দোতলায় ছুটাছুটি করছেন। তার সঙ্গে আমি তিন তলায় গিয়ে কামাল ভাইকে উঠাই। কামাল ভাই তাড়াতাড়ি প্যান্ট ও শার্ট পড়ে নিচে যান। আর আমি তার স্ত্রী সুলতানকে নিয়ে দোতলায় আসি। একইভাবে জামাল ভাইকেও ঘুম থেকে ওঠাই। তিনিও পোশাক পড়ে স্ত্রীকে নিয়ে মায়ের ঘরে যান।"
এর কিছুক্ষণ পর নিচে শেখ কামালের আর্তচিৎকার শুনতে পান রমা। সেনা সদস্যরা দোতলায় উঠে আসে এবং বঙ্গবন্ধু তার ঘর থেকে বাইরে এলে তাকে ঘিরে ধরে সিড়ির দিকে নিয়ে আসে সেনা সদস্যরা। সিড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নামতেই বঙ্গবন্ধুর ওপর ব্রাশ ফায়ার করা হয়। পেছন থেকে এ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন রমা।
"আমি তখন সেনা সদস্যদের পিছনে ছিলাম। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করলে জানাই, আমি এ বাড়িতে কাজ করি। তখন তারা আমাকে ভেতরে যেতে বলে। আমি তখন বেগম মুজিবের ঘরের বাথরুমে আশ্রয় নেই। সেখানে বেগম মুজিবকে বলি, ওরা বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেছে।"
একই বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিনে সুলতানা কামাল, শেখ জামাল, রোজী জামাল, শেখ রাসেল ও শেখ নাসের। কিছুক্ষণ পর সেনা সদস্যরা আবার দোতলায় আসে। তারা দরজায় ধাক্কা দিতে থাকলে ফজিলাতুন্নেসা মুজিব বাথরুমের দরজা খুলে দেন। এরপর ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচতলায় নিয়ে আসা হয়। বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে ফজিলাতুন্নেসা চিৎকার করে বলে ওঠেন, "আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।"
সেনা সদস্যরা এরপর ফজিলাতুন্নেসাকে তার ঘরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর সে ঘর থেকে গুলি আর নারী কণ্ঠের আর্তচিৎকার শুনতে পান রমা।
জবানবন্দিতে রমা বলেন, "সেনা সদস্যরা নাসের, রাসেল ও আমাকে নিচ তলায় এনে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে সাদা পোশাকের একজন পুলিশের লাশ দেখি। সেনা সদস্যরা পরিচয় জানতে চাইলে শেখ নাসের তার নাম বলেন। তাকে নিচ তলায় বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার পর গুলির শব্দ আর আর্তচিৎকার শুনতে পাই।"
শেখ রাসেল তখন 'মার কাছে যাব' বলতে বলতে কাঁদছিলেন। মহিতুল ইসলামের কাছে সে জানতে চায়, "ভাই, আমাকে মারবে নাতো?"। এ সময় একজন সেনা সদস্য বলে, "চলো, তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাই'।
বালক রাসেলকেও দোতলায় নিয়ে যায় খুনিরা। এরপর একইভাবে গুলির শব্দ; আর আর্তচিৎকার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

