somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গ্রামীণ ব্যাংক, ইউনূস ও হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গ

১৪ ই মে, ২০১১ দুপুর ১২:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :






ডা. এম এ হাসান: ( আমাদের সময়--১৪/০৫/২০১১ )_____

ড. ইউনূসকে নিয়ে বিতণ্ডা কেন শেষ হয়েও হয় না শেষ সেটা অদ্যাবধি আমার নিকট বোধগম্য নয়। ড. ইউনূসের বোধোদয় এবং সরকারের সহমর্মিতা এ বিতর্কের ইতি টানতে পারে। সত্যকে মেনে নিয়েই সব কিছু করতে হয়। সেক্ষেত্রে দেশের সম্মান, ড. ইউনূসের সম্মান এবং জনগণের স্বার্থের বিষয়টি দেখতে হবে। এই বিতণ্ডায় স¤প্রতি যোগ দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি ড. ইউনূসের মান বাঁচাতে যুক্তি প্রয়োগ করে বলেছেন, ‘যদ্যপি আমার গুরু শুড়িবাড়ি যায় তদ্যপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রায়’।

আমাদের জাতীয় নীতি, নৈতিকতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই চরিত্র ও চিত্র সামঞ্ছস্যপূর্ণ নয়। ব্যক্তি হিসাবে বা আদর্শ হিসাবে এমন ব্যক্তি কখনই অনুসরণযোগ্য নয়। তারপরও জনাব হুমায়ূন আহমেদ মান্যজনের অপরাধকে মেনে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদ ভ্রান্ত দর্শনের কারণে এমন কথা বলেছেন। যাইহোক, এতে প্রকৃত অর্থে ড. ইউনূসের মান বৃদ্ধি পায়নি।

জনাব হুমায়ূন এদেশে জননন্দিত লেখক হিসাবে মান্যবরেষু ব্যক্তি। এ কারণেই তিনি ভোগ করেন জনগণের পূজা ও অর্ঘ্য। তিনি তার দায় ও দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন না। তিনি যাই লেখেন না কেন, সেটা যে মানেরই হোক না কেন, বলার অপেক্ষা রাখে না তিনি জনগণের নিকট বিশেষ করে তরুণ স¤প্রদায়ের নিকট ‘আইকন’। তার চরিত্রগুলোও তাই। এক্ষেত্রে তিনি তার দায়িত্বটা অনুধাবন করলে মঙ্গল হতো। উদ্ভট ও অসম্ভবের বলয় থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যদি ইতিহাসের প্রকৃত নায়কদের নায়ক বানাতে পারতেন, মানুষের অম্লান আদর্শগুলো যদি ছড়িয়ে দিতে পারতেন তাতে জাতি উপকৃত হতো। পাকিস্তান হকিদলের প্রধান লে. কর্নেল আতিক মালিক, মেজর সাজ্জাদ, ক্যাপ্টেন এজাজ যেভাবে তার পিতাকে ’৭১-এ হত্যা করেছে, ৪ মে পটুয়াখালিতে ৩০ হাজার মানুষকে নিশ্চিহ্ন করেছেÑ তাও যদি তার লেখায় ফুটত তাহলে কাজের কাজ হতো।

নন্দিত নরকে মধ্যবিত্তের ক্রন্দন ও এবং সাদামাটা সংঘাতের চিত্রায়ন সমাজ ভাঙার পথ নয়। লেখকের দায় ও দায়িত্বটা তিনি শিখতে পারেন পতিসরে রবীন্দ্রকর্ম অনুধাবন করে। মানিক বন্দোপাধ্যায় সমাজ ব্যবচ্ছেদ অনুসরণ করে। সুবোধ ঘোষের মতো যন্ত্রকে নায়ক না বানালেও চলবে, কাফকার মতো মানুষের অক্ষমতা প্রকাশ না করলেও চলবে। ‘ফেয়ার ওয়েল টু আর্মস’ কিম্বা ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ পর্যন্ত যেতে হবে না। গল্পের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্নকে ছড়াতে পারলেই অনেক কিছু হতো।

ড. ইউনূস কার্যকরভাবে বেশ কিছু ভালো কাজ করেছেন। তিনি ক্ষুদ্রঋণকে এদেশে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। ৮৩ লাখ সদস্যকে সংঘবদ্ধ করেছেন এবং উন্নয়নের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। অনেককেই প্রকৃত অর্থে ভাগ্যোন্নয়নের পথ দেখিয়েছেন। আবার অনেককেই অপ্রস্তুত অবস্থায় ঋণ দিয়ে অপব্যয়ের দিকে ধাবিত করেছেন এবং চিরকালের জন্য ঋণের পঙ্কে নিমজ্জিত করেছেন। তিনি নানাভাবে এদেশের দরিদ্র জনগণের বেঁচে থাকার অধিকার, জীবনের অধিকার ও সম্মান প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি নারীর অধিকার, সম্মান এবং আপেক্ষিক অর্থে নারীমুক্তি প্রতিষ্ঠিত করে প্রগতির চাকা যেমন ঘুরিয়েছেন, তেমনি মৌলবাদ রুখেছেন।

নেতিবাচক অর্থে তিনি যা করেছেন তা হল, ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক ব্যবসার ধারণাটি নিজের বলে প্রচার করেছেন। সেই সামাজিক ব্যবসার নামে মূল সামাজিক ব্যবসার ধারণাটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। এছাড়া সরকারকে সামলাতে লেঠেল ভাড়া করেছেন এবং আইন ভঙ্গ করেছেন। আইনানুগ সুনাগরিকের পরিচয় না দিয়ে তিনি শক্তি প্রদর্শনের পথ বেছে নিয়েছেন।

ভেবে দেখতে হবে সেই দিনের কথা যখন গ্রামীণ সদস্যদের মধ্যে মিনিটে সাত টাকা হারে ‘পিসিও সিম’ বিতরণ করা হয়েছে এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে মুক্তকচ্ছ লুণ্ঠন করা হয়েছে জনগণকে। তখন ভারতে মিনিটে এক টাকা হারে ব্যবসা চলছে। এসব সম্ভব হয়েছে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যসহ জনগণকে ব্যবহারের মাধ্যমে। এর ইতিবাচক দিকটা লক্ষ্য করে সহনীয় হারে যদি ব্যবসা চলত সেটাই হতো সামাজিক ব্যবসা। ভেবে দেখুন গ্রামীণ কৃষক অ্যাডিডাসের জুতো পরে শক্তির দই নিয়ে সামাজিক বাজারের ঝান্ডা নিয়ে যাচ্ছে! কী অসম্ভব ও অবাস্তব চিন্তা।

অনেকেই মোবাইল ফোন সূত্রে রাজস্ব আয়ের কথা বলেন। কিন্তু তারা এর নেতিবাচক প্রচার অকারণে কথাবার্তার মাধ্যমে কর্মঘণ্টা ও জাতির জীবন নষ্টের কথা ভাবেন না। এতে জাতির সৃষ্টিশীল চিন্তা এবং কর্মোদ্দীপনা কতটা ব্যাহত হচ্ছে তা রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে।

সা¤প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ ২০ ভাগ। এখানে বলা প্রয়োজন যে ১০ হাজার টাকা ঋণে, প্রদানের শুরুতেই ৮০০ টাকা কর্তন করলে ৯২০০ টাকার বাৎসরিক সুদ দাঁড়ায় ২৮০০ টাকা। এর সঙ্গে আরো কয়েকশত টাকা নানা খাতে কেটে নিলে সুদের হার ৩০ ভাগ বা এর কিছু উপরে দাঁড়ায়। প্রথমাংশের সুদই হয় প্রায় ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। সাপ্তাহিক বা মাসিকভিত্তিক সুদ ও আসল কর্তন করলে বাৎসরিক সুদ আরো বেড়ে যায়। এখানেই আমাদের আপত্তি। সুদটা সহনীয় পর্যায় রাখতে হবে। নোরাডসহ অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর সরল দান বা ১ দশমিক ৫-১ দশমিক ৮ শতাংশ সুদে প্রাপ্ত অর্থ এত বিপুল সুদে খাটানো গ্রামীণের জন্য যৌক্তিক কিনা তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। এ পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তটা উপেক্ষা করে আদালত নিয়োজিত অডিট ফার্মের একটি প্রতিবেদন কাম্য।

তবে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে গ্রামীণের ভূমিকা অন্যান্য এনজিওর তুলনায় অনেক ভালো। এর অর্থ এই নয় যে, এ যুক্তিতে এটা গ্রহণযোগ্য হবে। বরং সকল ক্ষুদ্রঋণকে সহনীয় পর্যায়ে এনে এর ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে। বৈদেশিক ঋণ ও দান নিয়ে এনজিওদের নানামুখী ব্যবসা ও ভোগবাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। বন্ধ করতে হবে জনগণের দুঃখ দুর্দশার বিপণন। প্রত্যেকের কাজ ও অঙ্গীকার অর্থবহ হতে হবে। বিশেষ করে তা যখন জনগণের স্বার্থ, সম্মান, অর্থ, দেশের সম্মান ও সম্পদ সংশ্লিষ্ট হয়।

সামাজিক ব্যবসার কথা বলে লুটেরা বাণিজ্য করা যাবে না। লুটেরা বাণিজ্য প্রতিরোধেই সরকারকে সামাজিক ব্যবসা ও সামাজিক অর্থনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। এটা সরকারের ঐচ্ছিক বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী অনেকটাই বাধ্যবাধকতা। অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাম্যভিত্তিক সমাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম অংশ। যে কৃষক লাঙল ছেড়ে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছে, দেশের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে তার স্বার্থ রক্ষিত হবে না, তার ভাগ্যোন্নয়ন হবে নাÑ এটা কোনভাবেই মানা যায় না।
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×