২০ অক্টোবর বৃহস্পতিবার। প্রতিদিনের মতো আজো ভোরে হাঁটতে বেরুলাম। সংসদ ভবনের পেছনে চন্দ্রিমা উদ্যানে ভোর ৬টায় পৌঁছি। সুন্দর সকাল। ইতোমধ্যে চন্দ্রিমা উদ্যান স্বাস্থ্য-সচেতন মানুষের কলরবে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। প্রথমে জাহাঙ্গীর সেলিমের সঙ্গে, পরে বিজ্ঞান চেতনা পরিষদের প্রাণপুরুষ কাদের সাহেবের সঙ্গে দেখা। বেশ কিছুদিন পর তিনজন একত্রে হাঁটলাম। হঠাৎ করে দুটি যুবক পাশ থেকে এসে তার হাতের মাইক্রোফোনটা ধরে বললো, ‘স্যার একটা কথা’। বিরক্তই হলাম। ছেলেরা বুঝতে পারলো আমার মনোভাব। বললো, ‘স্যার এক মিনিট’। তখন জিজ্ঞেস করি ‘কী’? ওরা বললো, ‘স্যার গতকাল রোডমার্চের সময় বিভিন্ন জনসভায় খালেদা জিয়া বলেছেন আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করেনি। জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। স্যার, আপনি কী বলেন?’ আরো বেশি বিরক্ত হলাম। কারণ এই বিষয়টার অবতারণা দেশদ্রোহিতার সমতুল্য। দেশপ্রেম থাকলে কেউ এরকম বিদঘুটে প্রশ্ন করে না। যাক, আমি এক কথায় বললাম, ‘মিথ্যা। হানড্রেট পারসেন্ট মিথ্যা।’ বলে আবার হাঁটতে শুরু করি। দেখি কখন আমাদের পাশে আর এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রশ্নোত্তর শুনছেন। তিনি ক্ষণিকের বিরতি শেষে হাঁটতে শুরু করলেন। তার মুখ দিয়ে রাজনীতিবিদদের এরকম মিথ্যাচারের প্রতি একটি বিদ্রƒপাত্মক মন্তব্য ছুড়ে দিলেন। সেটি আমি বুঝতে পারিনি।
এর আগেও খালেদা জিয়া বহুবার আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে উদ্ভট মন্তব্য করেছেন। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এবং বিএনপি ঘরানার বুদ্ধিজীবীরা বহুবার দাবি করেছেন যে, জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। এ নিয়ে তর্কে নামতে রুচিতে বাধে। তবুও এর আগে এ নিয়ে আমাকে বেশকটি লেখা লিখতে হয়েছিল। তাই আজ আর এ নিয়ে লিখবো না। ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে এরা আশ্রয় নেবেন। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যখন আন্দোলন করছেÑ অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করছেÑ তখন জিয়াউর রহমান এবং তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোথায় ছিলেনÑ কী করেছিলেনÑ সে কথাটা একবার বললে দেশবাসী বড় উপকৃত হবেন।
দুই. লেখাটির মাঝখানে দরজায় কলিংবেলটা বেজে উঠলো। উঠে গিয়ে দরজা খুললাম। দেখি কাল্লু মিয়া। বহুদিন পর তার দেখা পেয়ে যুগপৎ আনন্দ পেলাম ও শঙ্কিতও হলাম। শঙ্কার কারণ কোনো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পেলেই সে আমার কাছে আসে। জানি না আজ কী প্রশ্ন নিয়ে সে এসেছে। মনে মনে তৈরি হতে থাকি। দেখি তার হাতে ঐদিনের সমকাল পত্রিকা। কাল্লু মিয়া পত্রিকার ডানদিকের দুই কলামব্যাপী একটি খবর আমার সামনে তুলে ধরলো। তারপর যে প্রশ্নটি ছুড়ে দিলো, ‘তাহলে স্যার, স্বাধীনতা বিরোধী কে?’ আমি কোনো উত্তর না দিয়ে মনোযোগ দিয়ে খবরটি পড়লাম। হেডিংটা হলো ‘নিজামী মুজাহিদ সাঈদী স্বাধীনতাবিরোধী নন।’ চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে হাসান শিমুল/আমিনুল ইসলাম জানাচ্ছেন ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেন, সরকার স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদী ও সাকা চৌধুরীকে আটক করেছে। ৃঅবিলম্বে নেতাদের মুক্তি দিতে হবে। ইসলামী ঐক্যজোট নেতার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার পাঁচ মাস ধরে তাকে গৃহবন্দী করে রেখেছে। তাকে গ্রেপ্তার করা হলে এর পরিণতি শুভ হবে না।’ (সমকাল ২০.১০.২০১১)। খবরটা পড়ে আমি তার মুখের দিকে তাকালে সে বললো, ‘স্যার, এরা স্বাধীনতা বিরোধী নন। স্যার, আমি বুঝতে পারছি না, তাহলে স্বাধীনতা বিরোধী কে বা কারা?’ সেই প্রশ্নের সঙ্গে তার চোখেমুখে দার্শনিকসুলভ অভিব্যক্তি ফুটে উঠলো। স্বাধীনতার অর্থ বলতে খালেদা জিয়া কী বোঝেন জানি না। একাত্তরে পাকিস্তান গণহত্যাকারী বাহিনী ও তার এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের কাছে পাকিস্তানের টিকে থাকাটাই বড় ব্যাপার ছিল। সেজন্য তারা নিরীহ বাঙালিদের নির্বিচারে হত্যা, মা-বোনদের ধর্ষণ, ঘরবাড়ি আগুন দেয়াÑ সব রকম মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পিছপা হয়নি। কিন্তু স্যার, একটু ভাইবা দেখেন, পাকিস্তান যেন টিকে থাকে, এটা প্রতিটি পাকিস্তানিই কামনা করেছে। তারা অবশ্যই স্যার পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য দেশপ্রেমিক। যারা পাকিস্তান রক্ষা করার জন্য জীবন দিয়েছে পাকিস্তানের কাছে তারাই তো হিরো স্যার। খালেদা জিয়া আজ কইছেন নিজামীরা স্বাধীনতা বিরোধী নন। তাহলে তারা অবশ্যই দেশপ্রেমিক স্যার। একাত্তরে তৃতীয়পক্ষ ছিল না স্যার। হয় মুক্তিযোদ্ধা নয় স্বাধীনতা বিরোধী।’ আমি হাঁ করে কাল্লু মিয়ার যুক্তির বহরটা বোঝার চেষ্টা করছি। সে বলেই চলে, ‘স্যার, শাহ আজিজ জাতিসংঘে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষেÑ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানাইলেন। জিয়াউর রহমান নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই তিনি একজন স্বাধীনতা বিরোধীকে প্রধানমন্ত্রী বানাইতে পারেন না। তাই জিয়াউর রহমানের চোখে শাহ আজিজ নিশ্চয়ই একজন দেশপ্রেমিক ছিলেনÑ স্বাধীনতা বিরোধী নন। রাজাকার আলীমকে মন্ত্রী বানাইলেন। তারা যদি স্বাধীনতা বিরোধী হইতেন, তাহলে কী মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান তাদের প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী বানাইতেন। কিন্তু তিনি বানাইছিলেন। কারণ জিয়াউর রহমানের চোখে তারা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাÑ স্বাধীনতা বিরোধী নন। পাকিস্তানিদের কাছে তারা যেন দেশপ্রেমিক ছিলেন। তাই বলছিলাম স্যার, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া, আমার মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তারা কোন পক্ষের লোক ছিলেন? বাংলাদেশের মানুষের কাছে যারা রাজাকার-আলবদর-খুনি-একাত্তরের ঘাতক, খালেদা ও জিয়ার কাছে তারাই দেশপ্রেমিকÑ এটা ক্যামনে হয় স্যার? আপনে আমারে একটু বুঝিয়ে দেবেন স্যার?’ আমি বলি, কাল্লু মিয়া তুমি এতোক্ষণ যা বললে, সেটাই আমার কাছে এক নতুন ব্যাখ্যা। এরপর আমি কী বলবো?
তিন. ‘স্যার, খালেদা জিয়া আরো বলেছেন’ বলে কাগজের একটা অংশ আমাকে দেখালো দাগ দিয়ে রেখেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘পাকিস্তানের শৃঙ্খল থেকে দেশ স্বাধীন করেছি, ভারতের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবার জন্য নয়।’ আমার পড়া হলে সে বললো, ‘স্যার, খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, এমন কোনো প্রমাণ আছে স্যার?’ আমরা তো জানি, যুদ্ধ শুরুর আগে উনি স্বামীর সঙ্গে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ছিলেন। জিয়াউর রহমান যখন দেশে থাকতে পারলেন না তখন ভারতে বলে যান। শোনা যায় সে সময় জিয়াউর রহমান তার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু খালেদা জিয়া তার সঙ্গে ভারতে না গিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসেন এবং পাকিস্তানের জেনারেলদের সঙ্গে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পুরো মুক্তিযুদ্ধের সময় কাটিয়ে দেন। এটা তো সত্যি, তাই না স্যার?’ আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে সে বলতেই থাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের নটা মাস যিনি পাকিস্তানের ক্যান্টনমেন্টে শক্র-পরিবেশিত হয়ে ছিলেন, তিনি কী করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন। কিভাবে দেশ স্বাধীন করার যুদ্ধে লিপ্ত হলেন? তাই স্যার আমার মনে প্রশ্ন জাগে সত্যি যদি তিনি স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করে থাকেন, তাহলে কাদের স্বাধীনতা? আমাদের নাকি নিজামী-সাঈদী-সাকা চৌধুরী-ইয়াহিয়া খান-জুলফিকার আলী ভুট্টোদের স্বাধীনতার? তিনি তো আজ স্বীকার করলেন ‘নিজামী-মুজাহিদী-সাঈদী-সাকা চৌ.Ñ এরা কেউ স্বাধীনতা বিরোধী নন। তাহলে এরা কী? মুক্তিযোদ্ধা? যদি মুক্তিযোদ্ধা হন, তাহলে তারা কার বা কাদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ করেছিলেন? খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই তাদের সঙ্গে ছিলেন? জিয়াউর রহমানও? স্যার, আমার এই চিন্তা থেকে আপনি আমাকে মুক্তি দেন। আমরা জানতে চাই কে বা কারা মুক্তিযোদ্ধা, আর কে স্বাধীনতা বিরোধী?’
আমার পক্ষে কাল্লু মিয়ার এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। একজন অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ আমাদের মতো শিক্ষিত মানুষের চেয়ে যে অনেক কিছু ভালো বোঝে কাল্লু মিয়ার কথা তাই প্রমাণ করে। আমি বলি, কাল্লু মিয়া, আজ আমাকে কিছুই বলতে হলো না। বাঁচলাম। তোমার কাছ থেকেই আমি আজ অনেক কিছু শিখলাম। কাল্লু মিয়া জিভ কেটে বললো, ‘না, না, স্যার। ছি ছিÑ আপনাকে শেখাবো সে ক্ষমতা আমার নাই। তবে শেষে এটা কথা বলি স্যার, খালেদা জিয়ার কথার শেষ উত্তরটা হলো বাংলাদেশের এক নম্বর স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কেননা, তিনিই পাকিস্তান ধ্বংস করার প্রধান কা-ারি। পাকিস্তানিদের কাছে শেখ মুজিবই তাদের প্রধান শত্রু। পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ধ্বংসকারী।’
শহিদুল ইসলাম : সাবেক অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



