ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই দেখি রবি সানন্দার পাতা উল্টাচ্ছেন। আমি ঢুকেই বললাম- আপনি এসেছেন ভালো হয়েছে। আমি আপনার কাছেই যাবো ভাবছিলাম। রবি বললেন, তাহলে ব্যাপার নিশ্চয় খুব গুরুতর। আমি বললাম- না তেমন কিছু না, জাস্ট আপনার একটা সাক্ষাতকার নেয়ার জন্য।
এরপর শুরু করলাম প্রশ্নোত্তর পর্ব। প্রথমেই জিজ্ঞাসা করলাম- অনেকেই আপনাকে এখন বৃটিশের দালাল বলে প্রমাণ করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আপনি নাকি রাজা পঞ্চম জর্জের প্রশস্তি গেয়ে গান রচনা করছিলেন।
রবি মুচকি হাসলেন। গান আমি লিখেছিলাম সত্যি। তবে সেটা যে জর্জের প্রশস্তি গাঁথা নয়, বরং স্রষ্টার উদ্দেশ্যে। গানের কথাগুলি ভালো করে খেয়াল করলে একটা শিশুরও তা বুঝতে কষ্ট হবে না।
আপনার বিরুদ্ধে আরেকটি অভিযোগ হলো, আপনি বৃটিশদের অনুগত ছিলেন। স্বদেশকে মুক্ত করার জন্য কিছু করেননি।
রবি প্রশ্ন করলেন- আমাকে আগে বলো এগুলো কারা বলছে?
অনেকগুলো ওয়েসাইট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
রবি শুনে হাসলেন। তোমার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে একটা কথা বলি। হলোকাস্টের মতো ন্যাক্কারজনক সত্যিকে মিথ্যে প্রমাণ করার জন্য তুমি শ'কয়েক ওয়েবসাইট পাবে। সেক্সপিয়ারের লেখাগুলি নাকি তার নিজের নয়, অন্য একজনের ডায়েরি তিনি কিভাবে যেন হাতে পেয়ে যান। এসব অপপ্রচারের লোকের কখনো কোন অভাব হয় না। তবে সত্যি সবসময় আপন মহিমায় ভাস্বর। এখন তোমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।
--- আমি গান্ধীর সমর্থক ছিলাম। তাঁর সব কর্মকান্ডে আমার পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা ছিলো। এমনকি বৃটিশ শাসন অবসানের লক্ষ্যে করণীয় নিয়ে অনেকগুলি বৈঠকও আমার জোড়াসাঁকোর বাড়িতে হয়েছিলো। সবার আন্দোলনের ধরণ একরকম হয় না। আমি ছিলাম স্পিরিচুয়াল রিভোল্যুশনের পক্ষে। আমার কবিতায় আমি বার বার সেটাই চেয়েছি। আর বৃটিশদের অনুগত হলে কখনোই জালিওয়ানওয়ালাবাগের নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করতাম না। ইংরেজী শিক্ষার দৌর্দন্ড প্রতাপের মাঝেও প্রাণের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করতাম না।
কিন্তু এটাতো ঠিক আপনি সক্রিয়ভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেননি। আপনি অনেক মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারতেন যেটা আপনি করেননি। অনেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য কারাভোগও করেছেন, কিন্তু সেখানে আপনি প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা রাখেননি।
তার আগে তোমার পরিবেশ নিয়ে ভাবা উচিত। আমার জন্য আর দশজনের মতো সবকিছু কার সম্ভব ছিলো না। তার মূল কারণ- আমার পরিবারের পরিচিতি। আমি ছিলাম সহস্র বন্ধনে আবদ্ধ। কোন পিছুটান না থাকলে হয়তো সেটা সম্ভব ছিলো। তবে আমি কিছু করিনি এটা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। আগেই বলেছি আমার মূল লক্ষ্য ছিলো স্পিরিচুয়াল মুভমেন্ট। আমার অজস্র কবিতায় আমি শুধু স্রষ্টার কাছে আকুল আবেদন করেছি, আমার দেশের মানুষের মুক্তির স্পৃহা জাগিয়ে তোলার জন্য। 'চিত্ত যেথা ভয়শূন্য' কবিতার কথাই ধরো। শেষ লাইনেই লিখেছিলাম- 'মাই ফাদার, লেট মাই কান্ট্রি এওয়েইক।' এটা কিন্তু দেশের মানুষকে জাগ্রত করার জন্য প্রার্থনা।
ততকালীন পূর্ব বাংলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আপনি বিরোধিতা করেছিলেন। এটা কি আপনার একটা উল্লেখযোগ্য ভুল নয়।
সেটা আমি অস্বীকার করি না। মানুষ মাত্রেই কিছু না কিছু ভুল করে। আর আমিও কোন মহাপুরুষ নই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা বৃটিশরা কোন মহত উদ্দেশ্যে নিয়ে করতে চায়নি। বঙ্গভঙ্গের সময় পূর্ববঙ্গের বিক্ষুব্ধ মানুষকে নিরত রাখার একটা কৌশল ছিলো মাত্র। আমি বাংলার খন্ডিত রূপ দেখতে চাইনি বলে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলাম।
এবার আসি একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে। একটা বড় অভিযোগ আছে আপনার বিপক্ষে সেটা হলো মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য আপনি কিছু করেননি। আপনার সাহিত্যে তারা অবহেলিত রয়ে গেছে।
বৃটিশ শাসনামলে দাঙ্গাবিক্ষুব্ধ কলকাতায় যে শান্তি মিছিল বের হয়, সেটার নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি। কলকাতার বড় মসজিদের ইমাম সাহেবের হাতে রাখি বন্ধন পরিয়ে তাঁকে ভাই করে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলাম সেসময়। এটা সত্য- আমার সাহিত্যকর্মে মুসলিম সমাজের উপস্থিতি খুব কম ছিলো ( 'মুসলমানীর গল্প' নামে একটা অসাধারণ ছোট গল্প অবশ্য আপনি লিখেছিলেন আমি মনে করিয়ে দেই।) । এর একটা কারণ হতে পারে চারপাশের পরিবেশ। আমার চারপাশে যে সম্ভ্রান্ত পরিবারের দেয়াল ছিলো সেটার বাইরে যাওয়া খুব বেশি সম্ভব হয়নি। এটাও মানুষ হিসেবে আমার বড় সীমাবদ্ধতা।
আপনিই একমাত্র কবি যাঁর লেখা গান দুটো দেশের জাতীয় সঙ্গীত। কিন্তু বর্তমানে আপনার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অনেকেই বলছে, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তন করার জন্য। এ সম্পর্কে আপনার অভিমত বলুন।
দেশপ্রেম বিবেচনার মাপকাঠি কি সেটা আমার জানা নেই। তবে আমি যে এই দেশকে যে মনে প্রাণে ভালোবেসেছি সেটা আমার কবিতার পরতে পরতে প্রকাশ করেছি। ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠোকাই মাথা। দেশকেই আমি স্রষ্টার মতো ভালোবেসেছি, বিশ্বময়ের ছায়া দেখেছি। জাতীয় সঙ্গীত পরিবর্তনে আমার কোন আপত্তি নেই। তোমরা কি তোমাদের মহান অর্জন মু্ক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অপরিবর্তিত রাখতে পেরেছো? পারনি। যাদের তোমরা একদিন শত ধিক দিয়েছো, তারাই এখন তোমাদের সংবিধান সংশোধন করে। আর জাতীয় সঙ্গীত সে তো একটা হৃদয়স্পর্শী গান। তোমাদের ইচ্ছে হলে তবে পরিবর্তন করতে পারো। তাতে আমার কোন আপত্তি নেই।
এরপর আরো অনেক বিষয়ে কথাবার্তা হলো। এরই মাঝে মা এসে উপস্থিত। হাতে বাসন ভর্তি কয়েক রকমের পিঠা। তালের পিঠা রবির খুব পছন্দের খাবার। তাই মা এরই ফাঁকে এতো আয়োজন করে ফেলেছেন। কিন্তু এতোগুলি আইটেমের মাঝে কাঁঠাল পাতা মোড়ানো তালের পিঠা দেখতে না পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেলো। আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম- কি ব্যাপার? কাঁঠাল পাতার পিঠা বানালে না আজ?
মা মৃদু স্বরে বললেন- আর বলিস নে, অনেক খুঁজেও কাঁঠাল পাতা পাওয়া গেলো না। জানা গেছে, সামহয়্যারইন ব্লগের এক ছাগুরাম দেশের সমস্ত কাঁঠাল পাতা খেয়ে ফেলেছে।
আমি শিউরে উঠলাম। ছাগুরামের খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। এক্ষণে সে যদি অন্য সব গাছের পাতা খেতে শুরু করে তবে তো সামনে কলাপাতারও প্রাদুর্ভাব দেখা দিবে। তখন পিঠা খাওয়ার কি হবে? রবির সোনার বাংলার সব গাছ যে উপনয়নকৃত হয়ে যাবে।
আহার শেষে আমি আর রবি ঘর থেকে বের হলাম। বাইরে অদূরে শ্যামল মাঠে ঘাসের উপর রোদ চিকচিক করছে। সেখানে এক তিন পা' বিশিষ্ট ছাগশিশু (!) লাফ-ঝাঁপ করছে। রবি সেদিকে তাকিয়ে বললেন- আহা ছাগশিশুটার আনন্দ দেখো। কষ্ট লাগছে তার একটা পা নাই দেখে। একটা পা কম থাকাতে সে ভালো করে লাফাতে পারছে না।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। রবি তো জানে না, এই ছাগশিশুর শুধু একটা পা' -ই ঘাটতি নেই, এর বুদ্ধিতেও অনেক অনেক ঘাটতি আছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

