সরকার পিলখানা হত্যাকান্ডের সাথে জঙ্গি কানেকশন নিয়ে এতো হৈ চৈ কেন করছেন তা বুঝতে হলে নিচের রিপোর্টটি পড়া দরকার। অনেক আঁতেল বলবেন এর সুত্র কি এবং তা কতটুকু নির্ভরযোগ্য? খবরটি বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এর ব্যাখ্যা দেয়া, নতুবা প্রতিবাদ করা।
পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের পরিকল্কপ্পনার বিষয়টি অনেক আগে থেকেই জানতেন সরকারদলীয় কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি। এমনকি খোদ স্বরাস্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এমপি শেখ সেলিম এবং ব্যারিসল্টার ফজলে নহৃর তাপস এমপিও বিষয়টি আগে থেকেই অবগত ছিলেন বলে তদন্তসংস্থা নিশ্চিত হয়েছে। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে বিদ্রোহী জওয়ানরা একাধিকবার বৈঠক করেন। এই বিদ্রোহে প্রত্যক্ষ ইন্ধন যোগান মাঠপর্যায়ের এক আওয়ামী লীগ নেতা। রিমান্ডে থাকা বিডিআর জওয়ানরা টাস্ট্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই) জিজ্ঞাসাবাদে তদন্তসংস্থা সিআইডিকে এসব তথ্য জানান।
গত ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার তদন্তসংস্থা সিআইডি চাঞ্চল্যকর বহু তথ্য জানতে পেরেছে। বিশেষ করে সিআইডি এই বিদ্রোহের নেপথ্য কারণ, প্রেক্ষাপট ও ইন্ধনদাতাদের সম্পর্কে তদন্তে নেমে যে তথ্য পেয়েছে, তাতে তদন্ত সংস্থাও বিস্মিত হয়েছে। বিদ্রোহে সরাসরি নেতৃত্বদানকারী বিডিআর জওয়ানদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে স্পর্শকাতর এসব তথ্য। গ্রেফতারকৃত একাধিক বিডিআর জওয়ান টিএফআই সেলে জবানবন্দি দিয়েছেন যে, বিগত সংসদ নির্বাচনের আগেই তারা প্রস্তুতি শুরু করেন। বিভিন্ন দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য
প্রার্থী ব্যারিসল্টার ফজলে নুর তাপসের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেন। ব্যারিস্টার তাপস আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বেশকিছু দাবিদাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাসও দেন বলে বিডিআর জওয়ানরা জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে ঢাকা মহানগরী আওয়ামী লীগের ৫৮ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি হাজী তোরাব আলী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্কপ্পনাকারী বিডিআর সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে বৈঠক করার ব্যবস্থা করে দেন। তার ছেলে শীর্ষ সন্ত্রাসী কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য হারুন অর রশিদ লিটন ওরফে লেদার লিটন এবং তার ভগ্নিপতি পিলখানার ঠিকাদার রেজাউল করিম রাজুর বিরুদ্ধেও
বিদ্রোহে ইন্ধনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিডিআর সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর পালানোয় সহযোগিতা এবং হত্যাকাণ্ডের সমর্থনে মিছিল
বের করাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে।
টিএফআই সুত্রে জানা যায়, ২৫ ফেব্রুয়ারি বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার আগে ১৭ অথবা ১৮ ডিসেম্বর বেশ কয়েকজন বিডিআর সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নহৃর তাপসের অফিসে যান। তারা তাপসের সঙ্গে বিডিআরের দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় উপস্তিত ছিলেন হাবিলদার মনির, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী তারেক, সিপাহী আইয়ুব, ল্যান্স নায়েক সাইদুরসহ ২৫/২৬ জন জওয়ান। সংসদ নির্বাচনের আগের দিন সন্ধ্যায় দরবার হল মাঠে বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী বিডিআর জওয়ানরা বৈঠক করেন। বৈঠকে নৌকায় ভোট দিয়ে ফজলে নহৃর তাপসকে এমপি নির্বাচিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। ব্যারিস্টার তাপস এমপি নির্বাচিত হতে পারলে তাদের দাবিদাওয়ার বিষয়টি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করবেন বলে
প্রতিশ্রুতি দেন। ৪৪ ব্যাটালিয়নের সিপাহী সেলিম ও অবসরপ্রাপ্ত বিডিআর সুবেদার কাঞ্চন আলীর ছেলে ব্যারিস্টার তাপসের নির্বাচনী প্রচারনার দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগ কর্মী জাকির হোসেন টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে এই তথ্য জানান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ৩/৪ দিন পর বিদ্রোহের নেতৃত্ম্বদানকারী জওয়ানরা ব্যারিস্টার তাপসের নির্বাচনী অফিস ঝিগাতলার স্কাই স্টারে যান। সেখানে এমপি তাপসের সঙ্গে সিপাহী সেলিমের বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিপাহী মইন ও সিপাহী কাজল তখন বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় বিডিআরের বিভিন্ন দাবিদাওয়ার কথা তাপসকে জানালে তাপস শুধু রেশনের বিষয়টি পূরণ করা সম্ভব বলে জানান। অন্য দাবিগুলো মানা সম্ভব নয়, তবে বিষয়গুলো হবু প্রধানমন্ত্রীকে জানাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে সিপাহী সেলিম এই তথ্য জানিয়েছেন।
ডিএডি হাবিব টিএফআইকে জানিয়েছেন, বিডিআর বিদ্রোহের দাবিদাওয়া নিয়ে তারা সরকারের প্রভাবশালী এমপি ও সাবেক মন্ত্রী শেখ সেলিমের
সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টায় শেখ সেলিমের বনানী চেয়ারম্যানবাড়ির বাসায় বিদ্রোহী জওয়ানদের একটি গ্রুপ যায়। শেখ সেলিমের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে শেখ সেলিম জানান, এটা তার বিষয় নয়, এটা স্বরাষ্ট্র মল্প্পণালয়ের বিষয়। তিনি প্রধানমল্প্পীকে বিডিআরের দাবিদাওয়া জানানোর জন্য একটি লিখিত কপি চান। বৈঠকে ডিএডি জলিল, ডিএডি হাবিব, সিপাহী সেলিম, সিপাহী কাজল, ল্যান্স নায়েক রেজাউল, হাবিলদার মনির, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী একরাম, সিপাহী আইয়ুব, সিপাহী মইন, সিপাহী রুবেল, সিপাহী মাসুদ, সিপাহী শাহাদাত এবং বেসামরিক নাগরিক জাকির উপস্তিত ছিলেন। টিএফআই সেলে জিজ্ঞাসাবাদে শেখ সেলিমের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বৈঠক করার বিষয়টি জানিয়েছেন সিপাহী কাজল, ডিএডি হাবীব, ডিএডি জলিলসহ অন্য জওয়ানরা।
শেখ সেলিমের সঙ্গে দেখা করার পর বিদ্রোহের পরিকল্কপ্পনাকারী জওয়ানরা সিদ্ধান্ত নেন যেহেতু বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মল্প্পণালয়ের অধীন, সেহেতু তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে দাবিদাওয়াগুলো উত্থাপন করবেন। শেখ সেলিমের সঙ্গে যে দলটি সাক্ষাৎ করে সেই একই দল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করে। তারা ৩ বার ইমপেরিয়াল রেস্ট হাউস ও বেইলি রোডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যান। এর মধ্যে একদিন ২২ ফেব্রুয়ারি তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু দেখা না হওয়ায় মন্ত্রীর এসিএসের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে আসেন। সিপাহী রেজাউলসহ কয়েকজন জওয়ান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য সিপাহী সেলিম টিএফআইকে জানিয়েছেন।
মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে দেখা করার পর বিডিআর জওয়ানরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পণা নির্ধারণ করেন। এর অংশ হিসেবে নিজেদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বৈঠক করেন তারা। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রথম বৈঠক করে সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের বাস্কেট বল মাঠে। বৈঠকে সিপাহী রেজাউল প্রস্তাব দেন দাবি করে লাভ নেই। অফিসারদের জিম্মি করে দাবি আদায় করতে হবে। এর পরে তাদের মধ্যে আরো কয়েকটি বৈঠক হয়। বৈঠকে হাবিলদার মইনউদ্দিন, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী তারেক, হাবিলদার মনির, সিপাহী আইয়ুব ও হাবিলদার খায়রুলসহ ৮/১০ জন উপস্তিত ছিলেন। টিএফআই সেলে আওয়ামী লীগ কর্মী জাকির জানান, রেকর্ড উইংয়ের হাবিলদার মনির কমিপিউটারে কম্পোজ করার জন্য তাকে একটি লিফলেট দেয়। জাকিরের শ্যালক অপু লিফলেটটির ৪/৫টি কপি কমিঙউটারে কম্পোজ করে দেয়। এগুলো ফটোকপি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, শেখ সেলিম এমপি, ব্যারিস্টার ফজলে নুর তাপস এমপির অফিসে পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত হয়। হাবিলদার মনির ও জাকিরের ছোটভাই কবিরকে দিয়ে লিফলেটগুলো ব্যারিস্টার তাপসের এপিএস টুটুলের মাধ্যমে তাপসের কাছে পৌঁছানো হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর কাছে লিফলেট পৌঁছে দেন সিপাহী শাহাবুদ্দীনসহ দু-তিনজন। আনুমানিক ২১ অথবা ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ সেলিম এমপির বাসায় লিফলেট নিয়ে যান ডিএডি জলিল, ডিএডি হাবিব, হাবিলদার মনির, সিপাহী শাহাবুদ্দীন, সিপাহী তারেক ও সিপাহী আইয়ুবসহ ১৫-২০ জন। দাবিদাওয়া সংবলিত লিফলেটটি প্রধানমল্প্পী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের সিপাহী মফিজকে। মফিজ তার শ্বশুরের মাধ্যমে লিফলেটের দুটি কপি প্রধানমন্ত্রীর
কাছে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেন।
তদন্তে সিআইডি আরো জানতে পারে যে, বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা আরএসইউ এবং জেডএসএসও অফিসারদের কাছে বিডিআর
জওয়ানদের লিফলেট পৌঁছানো হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি আরএসইউ অফিসার মেজর শাহনেওয়াজ লিফলেটটি হাতে পান। ওইদিন সকাল ১০টায়
আরএসইউ-এর কমান্ডিং অফিসার মেজর আসাদ এ বিষয়ে মেজর শাহনেওয়াজ ও মেজর আসাফউদ্দৌলার সঙ্গে আলোচনা করেন।
২৩ ফেব্রুয়ারি ডিএডি তৌহিদ, ডিএডি রহিমসহ ৩/৪ জন ডিএডি ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের এক সৈনিকের বাসায় বৈঠক করেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি ৪৪ রাইফেলের মাঠে বৈঠক হয়। এই বৈঠকে লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় আলোচনা হয়নি। পরে তারা পিলখানার বাইরে ৫ নম্বর গেটের কাছে একটি টিনশেড বাসায় বৈঠক করেন। বাসাটি প্রাইম কোচিংয়ের এক শিক্ষকের। এই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বিডিআর ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল ও ডিডিজি এবং অন্যান্য অফিসারকে জিম্মি করা হবে। কোনোরকম বাধা এলে ডিজি ও ডিডিজিকে গুলি করা হবে, তবে হত্যা করা হবে না। ডিজিকে সিপাহী মইন, ডিডিজিকে কাজল অস্ত্র ধরে জিম্মি করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ডিজির মাধ্যমে অন্য অফিসারদেরও ১৩ রাইফেল স্কুলের সামনে এনে জিম্মি করা হবে। ওইদিন জওয়ানরা মিটিং শেষ করে শপথ নেন। চূড়ান্ত এই সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটনার দিন সকাল ৭টায়
পূর্ব পরিকল্পণা অনুযায়ী দরবার হলের মাঠে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করেন নেতৃত্বে থাকা জওয়ানরা। এরপরই দরবার শুরু হলে পরিকল্কপ্পনা অনুযায়ী ডিজি ও ডিডিজিকে জিম্মি করা হয়।
প্রাথমিক পরিকল্পণা না থাকলেও তারা সেনা অফিসারদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেন। কারা কি কারণে সেনা অফিসারদের হত্যা করলেন সিআইডির কাছে সেই তথ্যও পরিস্কার হয়ে গেছে।
২০০৯-০৪-১১ : ফকরুল আলম কাঞ্চন
দৈনিক আমার দেশ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

