এই উপসর্গগুলো আগেও দেখেছি। ক্ষমতার মদমত্ততা, নির্ভুল পদক্ষেপ। শতভাগ সাফল্য। বলাবাহুল্য, এই বালখিল্যতাগুলোই সরকার বা ক্ষমতাসীনদের পতনের পূর্বলক্ষণ। এগুলোর অন্তসারশূন্যতা_যারা তা করে তারাও বোঝে। তবু ব্যর্থতা যখন দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়, এগুলো করেই টিকে থাকতে হয় বা সব ঠিকঠাকের ভান করতে হয়। এই জীবনকালেই অনেক কিছুই দেখলাম, যার কিছু কিছুকে ঐতিহাসিকও বলা যায়। পঞ্চাশের দশকে আইয়ুব খান দোর্দণ্ড প্রতাপে পাকিস্তানের মসনদে আরোহণ করেছিলেন। সম্ভবত দীর্ঘমেয়াদের পরিকল্পনা নিয়েই ছিল তাঁর ক্ষমতারোহণ। কিন্তু মাত্র ১০ বছরের মাথায় তাঁর দেশশাসনের পুঁজিপাতি শেষ। মাত্র ১৭ দিনের জন্য ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করে আইয়ুবের পাকিস্তান সর্বস্বান্ত। শেষরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে পাকিস্তানের লৌহমানবকে উদ্ভাবন করতে হলো উন্নয়নের দশকের।
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পর্যবেক্ষকরা তখনই বুঝতেন এর অর্থ। বুঝতেন যে, হালে পানি নেই বা পালে হাওয়া নেই। শেখ হাসিনা অবশ্য প্রচলিত অর্থে কোনো যুদ্ধ করেননি। কিন্তু মাও সে তুংয়ের পরিভাষায়, রাজনীতি মানেই যুদ্ধ। আর সেই রাজনীতি যদি হয় গতানুগতিক, পরিত্যক্ত ও সামন্তবাদী। লক্ষ করলেই পাঠক অনুধাবন করবেন, আওয়ামী লীগের সব সাফল্য তুলনাবিহীন ও সর্বশ্রেষ্ঠ। যদিওবা দলনেত্রীকে মাঝেমধ্যে কিছু হেরফের এনে তাঁর রাজনীতির যুক্তিজাল বুনতে হয়। বেচারীকে দোষারোপই বা করা যায় কিভাবে! সামান্য গৃহবধূ থেকে 'বিশ্বনেতায়' উত্থান কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। জাতির জনকের কন্যাকে তো সময়ে জাতির জনকের সমকক্ষ হতে হয়। লক্ষ করুন, কী অবলীলায় শুধু হিলি্ল-দিলি্লই নয়, ওয়াশিংটন, জাতিসংঘ এবং কোপেনহেগেন মাত করেন তিনি। তবে সংশয় জন্মে শুধু এক জায়গায়ই, যখন তিনি সর্বত্রই সুপারলেটিভে কথা বলেন।
আওয়ামী সরকারের শুরুই হয়েছিল পিলখানা বিশৃঙ্খলার ভেতর দিয়ে, যার যৌক্তিক সুরাহা আজও হয়নি। সংশ্লিষ্টরা আজও ঘটনাকে ঘিরে অসংখ্য প্রশ্নবাণে জর্জরিত। প্রায় এক বছর পর এই সেদিনও প্রধানমন্ত্রী বললেন, তিনি পিলখানা রহস্যেরও উদঘাটন করেই ছাড়বেন। কিন্তু এই শ্লথগতিতে যদি সমস্যার জটই শুধু খুলতে হয়, তাঁর ক্ষমতাকালও তো অনেক দীর্ঘ হতে হবে। কোনো সমস্যার সমাধান-প্রক্রিয়ার জন্যও তো প্রলম্বিত সময় দিতে হয়। এই একই প্রসঙ্গে শেরেবাংলার দিনবদলের সংগ্রাম নিয়ে এগিয়ে চলুন। এই স্লোগান দিয়ে আয়োজিত দিনব্যাপী একটি বর্ধিত সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ হাসিনা, যাতে বোঝা যায়, অনেক প্রতিশ্রুতি পূরণের প্রক্রিয়া অসমাপ্ত রয়ে গেছে বা শুরুই হয়নি। অনেক বিচারের নতুন প্রতিশ্রুতি।
তিনি পূর্বে ইনিয়ে-বিনিয়ে বললেও এবারে স্পষ্ট করেই বললেন, আওয়ামী লীগের নবগঠিত সরকারকে উৎখাত করতে পিলখানা বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছিল। এটা কি বছরাধিককাল ধরে পরিচালিত তদন্তের ফলাফল, না প্রধানমন্ত্রীর নিছক ধারণা! যেটাই হয়ে থাকুক, এর ফলাফল জনসমক্ষে আজও তুলে ধরা হয়নি কেন? এমনই নানা প্রশ্ন যখন জনগণের মাথায় ঘুরপাক খায়, তখনই উঠে আসে দেশপরিচালনায় আওয়ামী লীগের অপরিহার্যতার প্রসঙ্গ, যোগ্যতার মাপকাঠিতে আওয়ামী লীগেরও বিকল্প খুঁজে পাওয়ার সমস্যা।
যেকোনো পতনোন্মুখ সরকারের (দেশ নয়) জন্য অনেক ফন্দি-ফিকির আঁটতে হয়। এগুলো কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। তবে একথাও ঠিক যে, এসব করে সরকারের পতনকে ঠেকানো যায় না। সমস্যা যে, যখন কোনো সরকার প্রচুর ভোটাধিক্যে ক্ষমতারোহণ করে তখন সরকারের সুস্থ চিন্তাধারা কিছুটা বিগড়ে যায়। নিজেদের সম্পর্কে অনেক কথাই ভুলে যায় তখন সে-দলটি। সেটাই হয় ক্ষমতাসীন দলটির জন্য কাল। তারা ভাবতেই পারে না যে, তাদের নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে আরো হাজারো কারণ সক্রিয় থাকতে পারে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে তাদের দেশশাসনের একবছর কাটিয়ে দিয়েছে। এরই মধ্যে বিভিন্ন মহল থেকে 'ষড়যন্ত্রের' অভিযোগ করা হয়েছে বহুবার। তাদের ব্যর্থতা মানেই কোনো অজ্ঞাত মহল থেকে তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, যদিও তার সত্যাসত্য কদাচিৎ যাচাই করা সম্ভব হয়েছে। বোঝাই যায় যে, বাকি চারবছরে দেশশাসন বা সরকার-পরিচালনায় আওয়ামী চেহারা বিকৃত হবে আরো অনেকটা।
শাসকরা কদাচিৎ অভিযোগ করে। বরং তারা অভিযোগ খণ্ডন করে ও সেগুলোর উত্তর দেয়। কিন্তু বছরাধিককাল আওয়ামী সরকারের অভিযোগ_তাও আবার ষড়যন্ত্রের_দলটির কার্যক্রমকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। তাই অনিবার্যভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পাল্লা ছিল হালকা। প্রতিশ্রুতি পূরণ তো দূরের কথা, জনগণকে শুধু উপদেশবাণীই শুনতে হয়েছে। বছরের পুরো সময়টা দ্রব্যমূল্য নিয়ে উভয়পক্ষ থেকে প্রচুর খিস্তিখেউড় থাকলেও, জননিরাপত্তার ক্রমাবনতি হতে থাকলেও এবং আওয়ামী সংগঠনগুলোর লুটপাট, বাড়াবাড়ি বা অপ্রতিরোধ্য টেন্ডারবাজির মতো ঘটনা ঘটতে থাকলেও সামন্তবাদী রাজনীতির প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে_যখন বাকি সময়টুকু দ্রুত ফুরিয়ে যেতে থাকবে। যার ফলে, প্রত্যাশীদের অসহিষ্ণুতা, অস্থিরতা এবং প্রতিযোগিতা বেড়ে যেতে থাকবে।
রাজনীতির সামন্তপ্রভুর কাছে ক্লায়েন্টদের চাহিদার শেষ থাকে না। প্যাট্রন বা প্রভুর সে-সবকে জোড়াতালি বা গোঁজামিল দিয়ে পূরণ করতে হয়। আদর্শবর্জিত ক্লায়েন্ট-প্যাট্রন সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল শাসনকাঠামোতে তো কোনো মান্ডেলার উদ্ভব ঘটবে না। এখানে গোঁজামিলই একমাত্র পরিত্রাণের পথ, সেখানেও আছে অসংখ্য তদবিরের অজ্ঞাত হাত। মনে রাখতে হবে যে, এই লেনদেনের নীতি হলো ঈঐঅজওঞণ ইঊওেঘঝ অঞ ঐঙগঊ। এই হোমটা (ঐঙগঊ) যে কোথায় বা কোথায় তার শুরু, তা নিয়ে কি অস্পষ্টতা আছে! তাই প্রধানমন্ত্রীর বাকি সময়টার ধরন ও জটিলতা কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা জানা না-থাকলেও আন্দাজ করা যায়।
জনগণকে আসন্ন সঙ্কটে আশ্বস্ত করতে গিয়ে অনেক অতিশয়োক্তি করতে হয়। অতীতেও তা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা না হয়ে পারবে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের দুর্দিনে পরাজয় যখন দ্বারপ্রান্তে, সেখানকার শাসকরা দেশবাসীকে হিমালয় ডিঙিয়ে চীনাদের আগমন ও বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের কথা বলেছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট্ট ঝুলি দিয়ে আগামী চার বছরের প্রতিশ্রুতিমালা কিভাবে পূরণ হবে, এখনো তা ধাঁধা।
- এম. আবদুল হাফিজ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



