আমরা ভুলে গেছি সব কিছু। যে ছেলেটা বুকের পাজরে ডিনামাইট বেধেঁ ঝাপিয়ে পড়েছিলো পাকিস্থানি যন্ত্রদানবের নীচে; অস্বীকার করেছিলো নিজের সব ভোগ আর প্রাপ্তিকে: আমরা ভুলে গেছি তার কথা ! যে উঠতি কিশোর মায়ের চোখের সব জল আর আকুলতাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছিলো একটি অতি সাধারন রাইফেল হাতে দানবসদৃশ পিশাচ নিধনে; আমরা ভুলে গেছি তার কথা!তিন মাস বয়সি দুধের বাচ্চাটাকে বাচাঁবার তাগিদে যে মা তার সমস্ত সম্ভ্রম লুটিয়ে দিয়েছিলো হিংস্র দানবের আদিমতার কাছে: আমরা ভুলে গেছি তার কথা! কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে দু:খিনী বোনের দেহছিন্ন স্তনের সমস্ত কাতরতার কথা আমরা ভুলে গেছি! যে বৃদ্ধ বাবা একমাত্র পুত্রকে যুদ্ধে পাঠিয়ে সকাল-সন্ধা জায়নামাজে বসে কাটিয়েছেন অস্থির প্রহর,আমরা যুদ্ধোত্তোর সময়ে ভুলে গেছি সন্তান-না-ফেরা সেই বৃদ্ধের ভঙ্গুর সংসারের কথা! একাত্তরের গনসংগ্রামে যে গ্রাম রেখেছিলো প্রধানতমভূমিকা ;আমরা ভুলে গেছি সে গ্রামের সব কৃতিত্বকে ! স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে আমরা গ্রামকে অবহেলায় ছুরে দিয়েছি আস্তাকুড়ে,হাত ধরেছি শহরের!কৃষকের সব ঘাম আর পরিশ্রমের শস্যকে মজুত করেছি শহুরে দালানে। বিনিময়ে কৃষককে দিয়েছি হাড্ডিসার দেহ আর এক শরীর অপুষ্টি। গ্রামের কঙ্কালসার দেহের উপর নির্মাণ করেছি চাঁদ ঢেকে দেয়া আকাশছোয়া দালান !
ইতিহাসের চিত্রায়ন বুঝি এমনই ! যাদের থাকার কথা ফ্রন্ট পেইজে; তাদেরকে যেতে হয় ব্যাক পেইজে! আর সে কারনেই মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তি সময়ে পঙ্গু-বেকার মুক্তিযোদ্ধাদের বেছে নিতে হয়েছে আতœহননের সহজ (!) পথ! আর যারা শত অবহেলা পেয়েও নিজেদের মূল্যবান(!)জীবনকে অস্বীকার করতে পারেননি,তাদের কেউ কেউ এখনও রিক্সার চাকায় বয়ে বেড়াচ্ছেন জীবনের ক্লান্তি;পঙ্গু শরীরে টেনে চলছেন স্বাধীনতার গৌরবহীন ক্ষত ! দেশের স^াধীনতা নির্মাণে যে কৃষক-মজুর-ছাত্রসমাজ এগিয়ে গিয়েছিলো; যুদ্ধ পরবর্তি সময়ে তারা হয়ে ওঠে অপ্রয়োজনীয়।মাসেল-মানি আর রিলিজিয়নকে পুজি করে দেশের শাসন কাঠামোতে আরোহন করে নতুন মোড়কের একদল পুরানো শাসক! দাড়ি-টুপি পরিহিত ঘাতক-দালালেরা হয়ে উঠেছে দেশের প্রধানতম পুরুষ। ’৭১-এর পরে দেশের শাসকদের মুখোশ বদলিয়েছে সময়ে-অসময়ে।কিন্তু বদলায় নি শাসকদের আদশির্ক অব¯থান।গনতন্ত্রের গর্ভে এই দেশ বার বার জন্ম দিয়েছেএকনায়কতন্ত্র।এদেশের জনগণের জন্য একাত্তর মানে কেবল কিছু মুখোশের অদল-বদল। সমাজতন্ত্র,ধর্ম নিরপেক্ষতা ,গণতন্ত্র জাতীয় কিছু কাগুজে বুলি।ভাতের বদলে এদেশের মানুষেরপেট ভরে গণতন্ত্রের মিথ্যা বুলিতে। সম্প্রচার মাধ্যমে এডুকেশন, ইন্টারটেইনমেন্ট আর ইনিফরমেশনের পরিবর্তে এদেশের সাধারন পাবলিকের মগজ ভরেছে ক্ষমতাসীন রাজনীতিক দলের প্রচারনা আর দলবাজির নানা কান্ড-কীর্তিতে।
যে স্বপ্নকে বুকে পুষে কৃষক ছুটে গিয়েছিলো মুক্তিযুদ্ধে;এতদিন তার সেই সব স্বপ্নকেহাসিনা-খালেদা করে রেখেছিলো রাজণীতিক পণ্য। রাজণীতিক স্বার্থকে হাসিল করারতাগাদায় ওরা ছোট ছোট অবুঝ শিশুদের মস্তিষ্ক ভরে তুলে ছিলো বিকৃত ইতিহাসে।পাচঁ বছরের অদল-বদলে বদলে যেতো মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত গৌরবগাথাঁ। অথচ এখন সময় অন্যরকম! বদলে যেতে বসেছে দেশের প্রচলিত রাজণীতিক মানচিত্র।একে একে খসে পড়ছে দেশের সমস্ত ক্ষমতালোভী রাজণীতিকদের মুখোশ। দেশের ভালোমানুষ(!)রাজনীতিকদেরমানবিক মুখোশের আড়ালে লালিত অমানবিক হিংস্র পশুরা কাগজ আর টেলিভিশন পর্দা কাপিঁয়েবের হয়ে আসছে সাধারন জনগনের সামনে।দেশের সামগ্রিক কাঠামোতে হচ্ছে রিফর্মেশন।রাজনৈতিক দলগুলো ঢাকঢোল পিটিয়ে নেমেছেন তাদের রাজনীতিকদেহের পচেঁ যাওয়া মাংসকর্তনের প্রতিযোগিতায়।এখানে একটি কথা বেশ পষ্টাপষ্টি বলতে চাই-বর্তমান সময়ে রাজনৈতিকদলগুলো সংস্কারের যে হুজুগে নেমেছে,তা যেন ক্যাবল কিছু মুখোশের অদল-বদল আর কাগুজে নীতিহীন নীতিমালার ব্যাপার-স্যাপার না হয়ে দাড়ায়।যদি কোন পরিবর্তন; যদি কোন সংস্কারকরতেই হয় আমাদের রাজনৈতিক কালচারে,রাজনৈতিক নেতৃত্বে-তবে তা অবশ্যই হতে হবে মস্তিষ্কজাত;চেতনাজাত। এতো দিনে যে সব মলমূত্র আর আবর্জনা মস্তিষ্কজাত করেছেন আমাদের নেতারা;আগে চাই তার শুদ্ধি। তারপরে অন্য সব সংস্কার,অন্য আলোচনা।আর এ জন্য সমর্থন, বিরোধিতা আর আলোচনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে সকল স্তরের মানুষকে। যেমন তারা এগিয়ে এসেছিলেন একাত্তরে।উনসত্তুরে। চুয়ান্নোতে। বায়ান্নে। ...।
যারা সাধারন মানুষ, যারা রোজ এনে রোজ খায়- ওদের হাত গুলো বড়ো নরম;ক্ষমতাহীন।ওদের কারো একজোড়া হাত কখোনো ভাঙতে পারে না দলবাজী রাজনীতিকদের অপশাসনের শৃঙ্খল। অথচ ওরা যখন হাতেহাত রাখে;বদলায় নিজেদের চেতনজাত অবস্থানÑঅমনি ঘটে যায় দেশের বড়ো রকমের রিফর্মেশন।যেমন ঘটেছিলো অতীতে ,যেমন ঘটেছে চলমান সময়ে। রোগাক্রান্ত;অসুস্থ আমাদের প্রিয় এই দেশটা ওয়ান-ইলিভেন পরবর্তি সময়ে যে নতুন পথে যাত্রা করেছে,সে পথে সে খুজে পেয়েছে ভালোডাক্তার আর খুজে পেয়েছে প্রয়োজনীয় দাওয়াই। হাজার সীমাবদ্ধতা সত্যেও একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠছে অসুস্থ এই দেশ।
সুযোগ জিনিসটা বড্ড বেয়ারা। সব সময় ওকে হাতের নাগালে পাওয়া যায় না।যখন সুযোগ এসেছে পঙ্গু এই দেশটাকে কাধেঁ তুলে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার;তখন আমরা যারা এদেশে বসবাস করি;তাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে ।কাধেঁ তুলে নিতে হবে দেশের ভালো-মন্দের সব দায়। গ্রাম থেকে ছুটে আসতে হবে কৃষককে;শহর থেকে ছুটে আসতে হবে পেশাজীবিকে।শহর-গ্রাম,নারী-পুরুষ,রাজনীতিক-কৃষক Ñহাতে হাত মিলিয়ে জন্ম দিতে হবে আর একটি একাত্তরের।আর একটি মুক্তির।একটি জোতির্ময় বাংলাদেশের। যে দেশেতে রাজনীতিক দাড়াবে গণমানুষের পক্ষে। যে দেশের প্রতিটি মানুষ তার সমস্ত অনুভূতি দিয়ে বুনবে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন। যে দেশের স¤প্রচার মাধ্যমগুলেতে চিত্রায়িত হবে সাধারন মানুষের আশা-আকাঙ্খার সরল কথন। আমরা সবাই অপেক্ষা করে আছি এমন একটি দেশের ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


