somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পানি নিয়ে ভাবনা

২৭ শে জুলাই, ২০০৮ বিকাল ৫:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত ২ দিন চাতক পাখীর মতো তাকিয়ে ছিলাম ট্যাপের দিকে। বাসায় পানি নেই। এমনিতে ঢাকা শহরের অপরিকল্পিত আবাসন এবং বেঢপ বিস্তারের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারে নি ঢাকা শহরের পানি সরবরাহ কত্বপক্ষ। এর উপরে বাড়তি চাপ নতুন নতুন উঁচু দালান।

একটা এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের পানির চাহিদা একটা প্রাক্তন মহল্লার সমান। আমাদের মহল্লায় আগে বাস ছিলো ১৬টা পরিবারের। এখন একটা এপার্টেমন্ট কমপ্লেক্সের ভেতরে অন্তত ১০০ পরিবারের বাস। কেউ কাউকে চিনে না।

আমিও আমার প্রতিবেশীদের মুখ চিনি, তবে এখনও কারো নাম জানি না। এই আত্মবিচ্ছিন্নতা হয়তো আমার নিজস্ব সমাজবিরোধি চরিত্রের কারণে।

এখানে পানি আসে না, ওয়াসার লাইন আছে, ঠিক বাসা থেকে ৫০০ গজ দুরেই স্থানীয় পানির ট্যাংক। তবে গত কয়েক বছরে এখানে এপার্টমেন্ট গজিয়েছে অন্তত ১০০টি। এমন কি ৪ বছর আগে যখন এখানে এসেছি তখন এখানে এপার্টমেন্ট ছিলো সর্বসাকুল্যে একটা, নির্মানাধীন, এখন সেই একটা গলিতে ১২ টা এপার্টমেন্ট এবং নির্মাণ চলছে আরও ৪টার।

সেই সময় নেই আর। তবে মূলত পানি নিয়ে বিষম সমস্যা হয়ে গেছে। গত বছর যখন রাজউক অপরিকল্পিত ভাবে এইসব এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স প্রসব করলো তখন পানির সংকট মোকাবেলার জন্য এই বাসায়ও পাম্প লাগানো হলো। এখন পানি শুধু ছাদের ট্যাংকিতে তোলার জন্য পাম্প না, বরং ওয়াসার লাইন থেকে বাসায় পানি টানতেও একটা লাইন।

গত ৪ দিন সেই পাম্প নষ্ট। কেয়ারটেকারকে বলেও কোনো লাভ হয় নি। প্রচন্ড গরমে মনে হয় অনেক রকম ব্যস্ততা এই মেকানিকদের। তাই ২ দিন পরে যখন মেকানিককে ধরা হলো তখন বাসায় পানির সঞ্চয় তলানিতে।

গত দুই দিনে বাসায় পানি নেই এক ফোঁটাও। খাবার পানি না হয় কিনে আনা যায়, ৫০ টাকায় ৫ লিটার খাওয়ার পানিতে না হয় দুই বেলা তৃষ্ণা নিবারণ হলো, কিন্ত অন্য সব কাজে ব্যবহারের পানি কেনার উপায় তো নেই।

তৃষ্ণার্ত চোখে পানির ট্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকি। মেশিন ঠিক করে লাগানো হয়েছে গতকাল সকালে। পানি টানার পাম্প চলছে অন্তত যেটুকু সময় লোড শেডিং ছিলো না তার সবটুকু সময় জুড়েই। কিন্তু বন্ধ্যা পাইপে কোনো পানি আসে নি।

সকাল থেকে দুপুর গেলো, সবাই পানির অপেক্ষায় বসে আছে, সময়ের সাথে বাসার মানুষের মেজাজ তিরিক্ষি। গা গোসল কিছু নেই, বাসন ধোওয়ার পানি নেই। শুকনো খাবার খেয়ে গলায় মরুভূমি, আর পেটে চর পড়েছে।

কিছু বলাও যায় না আসলে, বলতে গেলেই বিপদ। ভাবছিলাম পানির জন্য অন্য কোনো পরিচিতের বাসায় হিজরত করবো। আমি গোসল করেছি এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে। নীচ থেকে বালতি বালতি পানি টেনে অনেক ব্যয়াম হয়েছে সত্য তবে দীর্ঘ দিন কায়িক শ্রমের অভ্যাস নেই, বেকায়দা এত দিন পরে এই ২৫ লিটার আর ৪০ লিটার পানির বালটি টেনে পায়ে টান খেয়ে চুপচাপ পড়ে আছি বিছানায়।

পানি আসবে না। চলো যাই অন্য কোথাও কাটিয়ে আসি সপ্তাহান্ত। আম্মাকে এ প্রস্তাব দেওয়া মাত্রই আম্মা রেগে বিস্ফোরিত। যাবো ক্যানো?

আমি কথা বাড়ানোর সাহস পাই না। কি বলবো। যা পড়েছি তাতে হয়তো এই পাম্পের ত্রুটি নির্ণয় করা যায় তবে সেটাকে সারানোর কারিগরী যোগ্যতা আমার নেই। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে ইঞ্জিনিয়াররা অথর্ব পুঁথিগতবিদ্যার অধিকারী এক উচ্চ শিক্ষিত মানুষ, যে ছবি আর ডায়াগ্রাম দেখে বলতে পারে এটাতে কি আছে। দশক পুরোনো চোথা আর ফটোকপি সম্বল করে বেড়ে ওঠা দেশের সেরা সন্তানেরা হাতে কলমে কোনো শিক্ষা পায় নি।

রাস্তার অশিক্ষিত পুলাপান মেক্যানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের গাড়ীয় ইঞ্জিনের ত্রুটি সারায় আর ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের বাসার রিমোটের তার ছিড়ে গেলে সেটা সারায় অন্য কোনো মেকানিক।
এই নিয়ে হতাশার কিছু নেই। এখানে অতিরিক্ত যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষেরাই উচ্চশিক্ষায় আসে, এবং তাদের চোথা আর লেকচার নোট ছাড়া কিছু পড়তে হয় না, মেয়েদের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাশের কাজ করে দেয় ল্যাব এটেনডেন্ট এবং প্র্যাকটিক্যাল খাতা লিখে দেয় ছেলে বন্ধু, পরীক্ষার দিনে সেটা প্র্যাকটিক্যাল মিলিয়ে দেয় ল্যাবের মামা। এটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছবি। এর ভেতরে ব্যতিক্রম নেই এমনটা বলছি না, তবে অধিকাংশ সময়ই গল্পটা এমনই।

বুয়েটে অবশ্য প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা বলে তেমন কিছু নেই শুনেছি বন্ধুদের মুখে। তারা দুই দিনএকটা প্র্যাকটিক্যাল করে একটা রিপোর্ট জমা দেয়, সেটাই নাকি পরীক্ষায় যোগ হয়।

শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি বিচ্যুতি থাকবেই। আমাদের গিনিপিগ বানিয়ে যখন অস্ট্রেলিয়ার পশু চিকিৎসক শিক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগে। সে টেকনোক্র্যাট হিসেবে যোগ দিয়েছে। তার মতামত এবং পরামর্শে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সিলেবাস নির্ধারিত হবে।

গত কাল রাতে প্রত্যাশিত পানি আসে নি। যতবার ম্যাশিন ছাড়া হয়েছে ঠিক সে সময়েই লোড শেডিং । এখন বাংলাদেশের সময় মাপার নতুন একক লোড শেডিং। ঠিক এক ঘন্টা এটার মাপ। এক ঘন্টা পার হবে বাতি জ্বলবে, ফ্যান ঘুরবে।
অনেক আশা নিয়ে শেষ রাত ১০টায় আবার নীচে নামতে হলো পানি নিয়ে আসবার জন্য। সেই পানি এনে রাতে ঘুমিয়েছি। সারা রাত পানি জমেছে । সকালে পৌনে সাতটায় ম্যাশিন ছাড়া হয়েছে, সম্পূর্ন ট্যাংকি না কি ভর্তিও হয়েছে, তবে আমার পানির পাইপ সে সংবাদ জানে না।

ঘুম থেকে উঠে পানি না পেয়ে যেমনটা লাগতে পারে তেমনটাই মানসিক অবস্থা। আর সহ্য করা যায় না। নিজের হাতে কাজ করতে হবে। নীচে গিয়ে বেচারা কেয়ার টেকারকে একটু ঝেড়ে আসবো ভাবলাম

গেলাম নীচে,
কেয়ার টেকার কিছুক্ষণ বুঝানোর চেষ্টা করলো, এই পানি কেউ জমিয়ে রেখেছে। বুঝলেন ভাই ধরেন পানি উঠতেছে আর কেউ পানির লাইন খুলে রেখেছে, তাহলে পানি সেই লাইন দিয়ে বাইরে চলে যাবে কিন্তু আপনাদের পাইপে যাবে না

আমি সব মেনে নিলাম। বললাম আপনার কথা শত ভাগ সঠিক ভাই। কিন্তু বলেন কোন যাদুবলে এখানের সকবকয়টা বাসার মানুষ এখনও পানি পেলো না। কারো না কারো কাছে পানি জমা আছে, কিন্তু সবাই তো একই অভিযোগ করছে যে তার বাসায় পানি নেই।

এটা আমি কিভাবে বলবো বলেন, তবে আমি পানি ছেড়েছি ঠিক মতোই।

বিক্ষুব্ধ সকালের পরে দুপুরে সামান্য সময়ের জন্য পানির দেখা পেয়েছিলাম আজকে।

কি চমৎকার মূর্ছনা। ট্যাপ দিয়ে পানি পড়ছে বালতিটে। চমৎকার এই সোনাটা শুনে ভাবলাম ঠিক আছে একটু আয়েশ করে গোসলটা করি।ময়লা পানি তাতে কি হয়েছে ময়লা দিয়ে ময়লা ধুয়ে ফেলবো।

নিয়মমতো কাপড় খুলে ফেলবার সাথে সাথে লোড শেডিং। পানির পাম্প বন্ধ। ট্যাপের পানির ধারা ক্ষীণ হতে হতে অদৃশ্য। কয়েক ফোঁটা পড়বার পরে থেমে গেলো

আমি অপেক্ষায় আছি। আবার সোনাটা শুরু হবে কখন।
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×