অগভীর মানুষের গভীর ভাবনা ২
১৩ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ৮:০৪
ব্যক্তির সংজ্ঞা না থাকায় প্রতিষ্ঠানের সংজ্ঞা নিয়ে বিভ্রম তৈরি হয়। যেখানে শেষ করেছিলাম, সেখান থেকেই শুরু করি, পুলিশ কিংবা সামরিক বাহিনী, গ্রামীণ ব্যংক কিংবা ইউডিডিএল- সবই প্রতিষ্ঠান- প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যক্তি তুচ্ছ, তাকে প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ দাবি পুরণ করে জীবনযাপন করতে হয়, কারণ এই প্রতিষ্ঠানের সাথে তার সম্পর্ক অর্থনৈতিক।
গ্রামীণ ব্যংকের কর্মচারীর সাথে গ্রামীণ ব্যংককে গুলিয়ে ফেলে গ্রামীণের প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভার তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া যেমন অনুচিত তেমনই একজন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তার সাথে প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলানোর অস্বাভাবিক ভাবনার চিহ্ন।
প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ঠ্য এবং চরিত্র ব্যক্তি ধারণ করবে কি করবে না এটা প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নির্ধারণ করে দেয়, তবে প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত অর্থনৈতিক যোগাযোগের কারণে ব্যক্তি প্রাতিষ্ঠানিক যেসব আচরণ করবে সেটা অর্থনীতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন।
তবে প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝেই ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানের সাথে বিযুক্ত ভাবতে পারে না, এক্ষেত্রে সামাজিক মানুষের ব্যর্থতা এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা আমাদের সামাজিক অনগ্রসরতার পরিচায়ক।
পুলিশের একজন সদস্য যখন অপরাধ করে তখন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোনো অপরাধ যে করে না, প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতাবলয়ের নিরাপত্তার কারণে কারো কারো অপরাধ প্রবনতা বাড়তে পারে, তবে শেষ পর্যন্ত এটা ব্যক্তি মানুষের দুর্বলতা- তবে সামাজিক ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন এই অপরাধীকে ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত না করে প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই অপরাধী পুলিশের পিঠ বাঁচাতে প্রতিষ্ঠান নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহন করে। সেটা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ক্ষমতা অক্ষুন্ন রাখবার প্রবনতা।
প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাচর্চার কারণে অপরাধপ্রবন হয়ে উঠতে পারে, সেটাও প্রতিষ্ঠানের পরিচালনার ত্রুটি। সেখানে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তবে তারও আগে প্রয়োজন সংশোধনের জন্য প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে নিয়ে গিয়ে ভাবা।
কয়েক দিন আগে একজন মেজর তার শালার দুর্নীতির বিরুদ্ধে মামলা করবার জন্য একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। এটা ব্যক্তিগত অপরাধ স্খলনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাবলয়ের অনৈতিক ব্যবহার।
ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের কাছে সেবা গ্রহন করে, এবং এই সেবা গ্রহনের কারণে ব্যক্তি পারিশ্রমিক প্রদান করে, ব্যক্তিকে সেবা দেয় প্রতিষ্ঠান, তবে এই সেবাদান প্রক্রিয়াও সম্পাদিত হয় অধিকাংশ সময়ই অন্য কোনো ব্যক্তির মারফতে। সেই ব্যক্তির সাথে প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কও অর্থনৈতিক, নির্দিষ্ট সেবা প্রদানে সহায়তার জন্যই প্রতিষ্ঠান তাকে পারিশ্রমিক প্রদান করে। তবে এই বিনিয়মগুলো কাগুজে লেনদেনের বাইরে গিয়ে যখন ব্যক্তির অস্তিত্বের সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে যায় তখন অস্তিত্বের প্রয়োজনেই ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানের গলগ্রহ হয় এবং প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির কাঁধে ভর করে।
একটি প্রতিষ্ঠান যখন ধর্ম নিরপেক্ষ হয় তখন তার প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদান প্রকল্প কিংবা তার প্রতিষ্ঠানের চরিত্রে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনার গোড়ামিটা থাকে না। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের সদস্য প্রতিটা ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মবোধ বিদ্যমান। কিন্তু উজবুকের দল এই সাধারণ সত্যকে অস্বীকার করতে চায়। ব্যক্তিকে ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণা দিতে চেয়ে।
যখন ব্যক্তি মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করে তখন সে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নয় বরং একজন ধর্মান্ধ মানুষ, একজন সাম্প্রদায়িক মানুষ।
একটা রাষ্ট্র যখন একেবারে জাতীয়তার ধারণা গ্রহন করে তখন জাতিয়তার চিরন্তন সংজ্ঞাকে কোনো ভাবে ধারণ করতে হয় তাকে। রাষ্ট্র যখন জাতীয়তাবাদী পরিচয় ধারণ করে তখন রাষ্ট্রের অংশীদার জাতিসত্ত্বাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে কিছু ভিনজাতি বৈষম্যের শিকার হয়ে উঠে। এবং যখন এই বৈষম্য এবং নিপীড়নের মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠে তখন সেই রাষ্ট্রকে ফ্যাসিবাদী বলা যায়, কিন্তু যখন একজন ব্যক্তি মানুষ নির্দিষ্ট একটা জাতীয়তার মানুষকে বিশেষ প্রাধান্য দেয়, তখন সে বর্ণবাদী, সে সাম্প্রদায়িক, তবে তাকে ফ্যাসিবাদী বলা যাবে না।
যতক্ষণ ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানবিযুক্ত ততক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কোনো দায় সে বহন করে না। প্রতিষ্ঠানের মুখপত্র এবং প্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে সে সক্রিয় কিংবা নিস্ক্রিয় বর্ণবাদী বৈষম্য প্রকাশ এবং ভিন্ন বর্ণ ও ভিন্ন সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ণ কিংবা দমনের প্রচেষ্টা নেয় শাররীক এবং মৌখিক ভাবে তখন সে প্রতিষ্ঠানের চরিত্রকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানকে নির্মাণের জন্যই ফ্যাসিবাদী।
তবে সবাই কি প্রতিষ্ঠানের অংশ? একজন সাধারণ মানুষের ভারতবিদ্বেষ তার বর্নবাদী, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় মানসিক বৈকল্য- তাকে সেই অবস্থান থেকে উগ্র জাতীয়তাবাদী উজবুকে পরিণত করবার জন্য আমাদের একটা প্রতিষ্ঠাপন প্রয়োজন, বিশেষত যখন সেই মানসিক বিকারের শিকার মানুষটি এমন একটি প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় সদস্য যেই প্রতিষ্ঠানটি এই বৈষম্য এবং বিভেদ, সামাজিক বৈকল্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তখন এই ব্যক্তিমানুষটি নিছক ব্যক্তি নয়, তার রাজনৈতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় এবং সংযুক্তির কারণেই উগ্রজাতীয়তাবাদী উজবুক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়ে আমাদের অনগ্রসরতা হলো আমাদের রাজনৈতিক মতবাদ এবং এই রাজনৈতিক মতবাদ প্রতিষ্ঠার প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি ইমেজে পরিচালিত। লেলিন মার্ক্স, মুজিব, জিয়ার আদর্শ এবং তাদের ব্যক্তি ইমেজের বাইরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নেই। আওয়ামী লিগ মুজিবের বাইরে গিয়ে আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান নয় যার নিজস্ব লক্ষ্য আছে, বরং মুজিবের স্বপ্ন, স্ব্প্নদোষ, তার স্খলন এবং তার নির্মানের বাইরে এই প্রতিষ্ঠান বের হয়ে আসতে পারে নি। সুতরাং এটা অনেক বেশী ব্যক্তিনির্ভর এবং এই প্রতিষ্ঠানকে বিকল করতেও ব্যক্তিগত চরিত্রহননের নিরন্তর প্রচেষ্টা চলতে থাকে।
বিএনপিও সেই একই অর্থে জিয়ার ব্যক্তিসত্ত্বার বাইরে আসতে পারে নি, প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা চরিত্র ধারণ করতে পারে নি বলেই এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে আদর্শের ভিত্তির জন্য বহন করতে হয়। যোগ্যতার ভিত্তিকে কোনো পরিচয় নির্ধারিত হয় না। নেতৃত্ব নির্দিষ্ট হয় না, বরং কতিপয় বংশবদ ব্যক্তিপূজা আর হস্তমর্দনের চর্চা চালিয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমানুষের নৈরাজ্য এবং স্বৈরাচারের শিকার হয়।
অন্যমনস্ক শরৎ বলেছেন:
অনেক প্রশ্ন জইমা গেল আলাপ আরো বিস্তৃত করবানে....
হাসিব মাহমুদ বলেছেন:
উদ্ধৃতিগ্রামীণ ব্যংকের কর্মচারীর সাথে গ্রামীণ ব্যংককে গুলিয়ে ফেলে গ্রামীণের প্রাতিষ্ঠানিক দায়ভার তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া যেমন অনুচিত তেমনই একজন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তার সাথে প্রতিষ্ঠানকে গুলিয়ে ফেলানোর অস্বাভাবিক ভাবনার চিহ্ন।
খুব জুইতের হৈলো না কথাটা । আমার এক পরিচিত ফ্রেঞ্চ আছে এইখানে । সে ইএডিএস (কোম্পানিটার নাম অপরিচিত হলে বলি, এরা বোয়িঙের প্যারেন্ট কোম্পানি)-এর প্রগামার । যুদ্ধবিমানের চালানোর জন্য সে প্রগ্রাম লেখে । এখন এখানে একটা পক্ষ হলো ইএডিএস । যারা নিন্দনীয় মানুষ মারার যন্ত্র বানাইতেছে । আরেকটা পক্ষ হৈলো ঐ আন্দ্রিয়াস নামের লোকটা যে যেনে শুনে ঐ মানুষ মারার যন্ত্র বানানোতে নিজের মেধা নিয়োগ করছে । দুই পক্ষের ঘাড়েই কিন্তু ঐ মানুষ মারার যন্ত্র বানানোর দায়িত্ব বর্তায় ! আমি এইখানে ভিন্ন পার্সপেক্টিভে দুইজনরেই নিন্দা করি ।
লেখক বলেছেন: প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতার সময় আমি আন্দ্রিয়াসকে আক্রমনের বাইরে রাখতে চাই, যখন আমি এই প্রতিষ্ঠানের হামলা করবো তখন আমি চাইবো প্রতিষ্ঠানের বিনাশ, কিন্তু ব্যক্তি আন্দ্রিয়াসের বিনাশ আমি চাই না।
অর্থের বিনিময়ে মেধা বেচার কাজটার বাইরে অন্য কোনো স্বাধীন পেশার অস্তিত্ব থাকলে আন্দ্রিয়াস মানুষ মারবার সহযোগী হতেও পারতো, না ও হতে পারতো, আন্দ্রিয়াস এখনও হয়তো একই ভাবে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে পারে-
আন্দ্রিয়াস যদি এই মানুষ মারবার যন্ত্রকে আরও নিঁখুত বানানোর প্রক্রিয়াটাকে অপরিহার্য ভাবে তবে তার সাথে আমার একটা আদর্শিক সংঘাত থাকবে, আমার ঘৃনাও হয়তো থাকবে তার প্রতি- অমানবিক একটা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করবার জন্য সহায়ক যেকোনো যন্ত্রকে যেভাবে ঘৃনা করি একই রকম ভাবে তার এই ভুমিকাকে আমি ঘৃনা করবো- তবে এর বাইরে অর্থনৈতিক যোগাযোগের বাইরে তার অন্য কিছু ব্যক্তিগত পরিচয় আছে, তার অবদান আছে, সেইগুলোকে কি আমি নাকচ করে দিবো?
আমার অবস্থান আমি তার নির্দিষ্ট একটা ভুমিকাকে অপছন্দ করবো কিন্তু তার অস্তিত্বকে নাকচ করে তার বিনাশে মত্ত হবো না।


















