বাংলাদেশের পরিচয় কি? বারো আউলিয়ার দেশ, লালনের দেশ, ভাববাদীতার চুড়ান্ত সংক্রামন বাংলাদেশের জনতার প্রধান অসুখ, এদের ভেতরে ভাববাদ এমনই জেঁকে বসেছে যে এরা কখনই এই ভাববাদকে ছাপিয়ে যেতে পারে নি।
বাংলাদেশ দলের ভেতরেও একই রকম ভাববাদী সংক্রামন বিদ্যমান, তারাও পরাজিত হতেই ভালোবাসে, সন্তসুলভ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ম্যাচ শেষে উপলব্ধি করে ক্রিকেট কেনো যেকোনো খেলায় এক দল জয়ী হয়ম এক দল পরাজিত হবে, খেলার নিয়মেই হার জিত থাকবেই, এটাতে বিষন্ন হওয়ার কিছু নেই, উদযাপন করতে হবে পরাজয়ও, তাই খেলার শেষে তাদের চেহারায় বিন্দুমাত্র বিমর্ষতা থাকে না, বরং তারা পরাজয়ের গ্লানি ভুলেই পুরুস্কার প্রদানের অনুষ্ঠানেই হাসি ঠাট্টায় মেতে উঠতে পারে।
আমাদের উদাসীনতা, আমাদের প্রশ্রয় এবং আমাদের জাববদিহিতাহীনতা বাংলাদেশ দলের বিদেশ সফরগুলোতে পরাজয়ের লজ্জায় নীচু করে দিলেও যারা আমাদের সম্মিলিত প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে নামে তাদের চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই, তারা সব সময়ই একই রকম উদাসীন, জয়ের চেষ্টাই নেই, পরাজয় থেকে শেখবার আগ্রহ নেই, প্রতিটা ব্যাটসম্যান একই রকম ভুল বার বার করে যাবে, ভুল থেকে শিখবে না, তারাই বাংলাদেশের মূল স্টার, একই রকম চরিত্র বাংলাদেশে ভোটারের তারাও বার বার ভুল প্রতিনিধি নির্বাচিত করবে এবং আবার সুযোগ পেলে আবারও সেই একই ভুল করবে আনন্দিত চিত্তে।
ডারউইনের মাঠ একটু স্লো, সেখানে স্লো বোলাররাই সব সময় প্রাধান্য বিস্তার করে, টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া আশরাফুল হয়তো ভেবেছিলো তাদের আসলে পেস বোলিংয়ে সমস্যা, স্লো বোলারদের ভালো মতোই খেলতে পারে তারা।
তবে বাংলাদেশ দল যেকোনো ব্যাটিং সহায়ক পীচকেও ভেজা গ্রীষ্মের ইংলিশ সিমিং পীচ বানিয়ে খেলে, তাই সকাল বেলা যখন বাংলাদেশের পেস বোলারদের জিহ্বা ঝুলে গেলো , যখন মাশরাফী ১০ ওভার খেটেও একটা উইকেট ঝুলিতে পুরতে পারলো না তখন অস্ট্রেলিয়ার সমস্যা হয়েছে বাংলাদেশের স্পীনারদের খেলতে, স্লো পীচে বল আরও একটু ধীরে আসে, এই সময়ের হের ফেরেও ব্যাটসম্যানদের ভুল হয়ে যায়,
তবে দুপুরে যখন পীচ থেকে সব আদ্রতা মুছে গেছে তখন পীচে সীমারদের কিছুই করবার থাকে না,
উষ্ণঅঞ্চলের পীচ তেমন ভাবে বোলিং সহায়ক হয়ে উঠে না এ কারণেই। তবে বাংলাদেশের ব্যাটিং রিপোর্ট কার্ড দেখলে বিষয়টা অদ্ভুত বোধ হবে, তাদের অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলারদের খেলতে সমস্যা হয়েছে, তাই স্পীনারদের উপরে চড়াও হতে গিয়ে খুব দ্রুতই আউট হয়ে গিয়েছে।
ডারউইনের পীচেই প্রথম টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়া সফরে, ২০০৩ সালে, অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ, বাংলাদেশ সেই টেস্টে পরাজিত হয় ইনিংসের ব্যবধানে, এবং এই টেস্টে ২৬.১ ওভার বল করে ৮৬ রানে ম্যাকগিল নিয়েছিলো ৭টা উইকেট, যদিও প্রথম দিনে ৪২.২ ওভারে অল আউট হওয়ার সময় ২৯ ওভার বল করে পেসারত্রয়ী নিয়েছিলেন ৮ উইকেট মাত্র ৭০ রানে।
বাংলাদেশের ওয়ান ডে রেকর্ডও এখানে তেমনই খারাপ, অবশ্য বাংলাদেশের ওয়ান ডে রেকর্ড এমনিই খুব খারাপ, ক্লাশের সবচেয়ে খারাপ ছাত্রের রিপোর্ট কার্ড দেখতে যেমন রুচি হয় না তেমনই বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক এক দিনের ম্যাচে জয় পরাজয়ের তালিকা দেখতেও রুচি হয় না, বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশ টেস্টেখেলুরে দেশগুলোর বিপক্ষে জয় পেয়েছে মাত্র ৭টি ম্যাচে, এবং এই তালিকায় নাম আছে ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার। তবে ডারউইনের প্রথম ওয়ান ডে ম্যাচে বাংলাদেশে হেরেছিলো ১১২ রানে, ৪৭ ওভার ব্যাট করে করেছিলো ১৪২ রান, সর্বোচ্চ রান করেছিলো অলক কাপালি।
ডারউইন মাঠে ওয়ান ডে হয়েছে মোট ২টি, দুটোই খেলেছে বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে ১১২ রানে হারের পর দ্বিতীয় ম্যাচে ১৮০ রানের পরাজয়, দুটি ম্যাচই খেলেছে এমন খেলোয়ার বাংলাদেশ দলে ৩ জন, অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল, প্রথম ম্যাচে ৪ রানের পরে এই ম্যাচে করেছে ৫ রান, অলক কাপালী প্রথম ম্যাচে ৪৯ রান করবার পরে এই ম্যাচে ১২ রান করে রান আউট হয়েছে,
ম্যাচ শেষে আশরাফুলের প্রতিক্রিয়া যথারীতি সন্তসুলভ, অবশ্য বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা এই সন্তসুলভ মানসিকতা, আশরাফুল বলেছে, যদি ম্যাচের প্রথম ২০ ওভারেই আপনি ৫টি উইকেট হারান তবে ম্যাচে ফিরে আসা অনেক কঠিন, এই আউট হওয়া ব্যটসম্যানের তালিকায় ছিলো তামিম, আশরাফুল ,মেহরাব, সাকিব, কাপালি, তবে এই বিশাল পরাজয়ে কি বাংলাদেশ দল অনুতপ্ত?
বাংলাদেশ দলের পরাজয়ে অনুতপ্ত হওয়ার কোনো নজির নেই, বাংলাদেশ দল মানেই সন্তসুলভ মনোভাবের ১৫ জন পর্যটক, যারা অপেশাদার এবং যাদের ভেতরে এখনও পেশাদারী মনোভাব তৈরি হয় নি। তারা জয়- পরাজয়কে একই ভাবে দেখে, পেশাদারী দলগুলোও অবশ্য জয়ী হতে হতে এখন তেমন ভাবে জয় উদযাপন করে না, তাদের কাছে এই নিস্পৃহতার শিক্ষাটা নিয়েছে বাংলাদেশ, তাই প্রতি ম্যাচে লজ্জাজনক পরাজয়ের পরেও তাদের এই বিষয়ে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না, আগের ম্যাচের চেয়ে ভালো করবার চেষ্টা করবো, আমরা ভালো খেলবো, ভালো করবো, ৫০ ওভার টিকে থাকলে পরাজয়ের ব্যবধান আরও কমতো, এইসব রোমাঞ্ছিত অবাঞ্ছিত কথার পয়মালে ভেজা থাকে বাংলাদেশের ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলন এবং ম্যাচের আগের বিকেলের সংবাদ সম্মেলন।
দেশপ্রেমের মতো কঠোর শব্দ টেনে না এনেও বলা যায় বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যে সমস্যা সেটা বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা- গণমানুষের প্রতিনিধিত্ব করবার বোধটাই জন্ম হয় না অধিকাংশ জনপ্রতিনিধির, বাংলাদেশের খেলোয়ারেরা যে বাংলাদেশের সম্মিলিত জনতার মুখপত্র, প্রতিটা বাংলাদেশী যে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে একটা সুখের, আনন্দে ভেসে যাওয়ার মতো সংবাদের জন্য, বাংলাদেশের প্রতিদিনের পরাজিত মানুষেরা যে একদিন অন্তত এই ১৫ জনের কাঁধে ভর করে জয়ী হতে চায় এক দিন, একদিন অন্তত জয়ের স্বাদ পেতে চায় পরাজয়ের আলুনি খেয়ে বিরক্ত বাংলাদেশের মানুষেরা, এই বোধটুকু কখনই জন্মায় না এইসব মেগাস্টারদের, তারা এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনে লৌড়ালৌড়ি করে, তারা সব তেল না খেয়ে বিশেষ একটি কোম্পানির তেল খায়, এইসব ফাজলামি করে বেড়ানো দলটির অপেশাদারিত্র শুধুমাত্র খেলার মাঠে, বিশেষ করে জাতীয় দলের হয়ে খেলবার সময় তাদের অপেশাদিরত্বের চুড়ান্ত সীমা দেখা যায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিকেরাও অবশ্য গণমানুষের কাছে একই অপরাধে দোষি, কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ প্রশ্রয় দিয়ে চায়, তাদের অপরিসীম প্রশ্রয়ে দেশে দুর্নীতির চাষাবাদ হয়, সেই দেশের সোনার ছেলেরা বাইরে গিয়ে জঘন্য ভাবে পরাজিত হলেও হাসি মুখেই এই পরাজয় মেনে নেয় বাংলাদেশ, প্রশ্রয় দিয়ে বলে আশরাফুলের সব আছে, আশরাফুল নিজের দিনে বিশ্বের সেরা ব্যটসম্যান, তবে শেষ পর্যন্ত ক্রিকেট ব্যক্তিগত খেলা নয়, দলীয় খেলা, একজন সুপারস্টার যে দলকে কিছু দিতে পারে না, তার চেয়ে ১১জন নিবেদিত প্রাণ খেলোয়ার যারা সম্মিলিত ভাবে দেশকে কিছু দিতে পারে এমন খেলোয়ারদের মাঠে চাই আমি।
সেই তালিকায় কখনই আশরাফুল কিংবা তামিম নেই, আমি চাই বাংলাদেশ এর পরের ম্যাচে আশরাফুল এবং তামিমকে বাদ দিয়ে খেলতে নামুক, অপেশাদারিত্ব বিবেচনা করলে এই দুই জন বাংলাদেশ দলের সবচেয়ে বেশী অপেশাদারিত্বমূলক মনোভাবের খেলোয়ার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

