somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কক্সবাজার ভ্রমন ০১

১১ ই অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অনেক মানুষের সাথেই আমার একবারের বেশী দুইবার দেখা হয় নি, তবে প্রথম দেখায়ই একটা ছাপ রেখে চলে যাওয়া মানুষগুলোর ভেতরে একজন আছে এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশনের সদস্য। কোথাও যাওয়ার কথা উঠলেই আমার তার কথা মনে হয়। তার নাম মনে নেই, লিটন, বিল্টু, মিল্টন, অনেক কিছুই হতে পারে তার নাম , তবে বিশিষ্ট চেহারার অধিকারী এই মানুষটিকে সময়ে অসময়ে মনে পড়ে। হয়তো এই মানুষটা এখনও আস্ট্রোনলিক্যাল এসোসিয়েশনের সদস্য -

তার মাথার সামনে তেমন তেজী চুল না থাকলেও পেছনে বাবরি ছিলো, লম্বায় তেমন না, মাঝারী উচ্চতা, পরনে জিন্স এবং সেটা ক্ষয়ে যাওয়া। শরীর দেখে বুঝবার উপায় নেই তার আত্মবিশ্বাস এবং তার পরিশ্রম করবার ক্ষমতা কতটুকু, শীর্ণ শরীর নিয়ে তিনি হঠাৎ একদিন আড্ডায় উপস্থিত হলেন। বাবারী চুলের ঝোকা নিয়ে উপস্থিত হওয়া মানুষটিকে নিয়ে আগ্রহী হওয়ার যথেষ্ট কারণ না থাকলেও তখন এস্ট্রোনমিক্যাল এসোসিয়েশন বর্ষবরণ নামক একটা সংস্কৃতির সূচনা করেছে।

বর্ষবরণ উৎসব হবে, স্থান কেওক্রাডাং, হাইকিং হবে, হিলট্রাকস নিয়ে তার স্বপ্নময় বর্ণনার মিনিট পাঁচেক পরে যখন পাহাড়ে সুর্যোদয়ের বর্ণনা শুরু হলো তখন সবার জিভ দিয়েই পানি পড়ছে।

ডিমের কুসুমের মতো উদীয়মান সূর্য্য, তার চারপাশে মেয়নিজের মতো মেঘ, সব মিলিয়ে চমৎকার ডেজার্ট সমেত একটা ফুলকোর্স ব্রেকফাস্ট সূর্যোদয়ের সাথে আড্ডায় উপস্থিত হলো।
প্রবল উদ্দীপনায় জিজ্ঞাসা করালম পৌঁছানোর উপায়টা কি?
পথের ধকল এবং তিন হাজার ফুট উঁচু চড়াই-উৎরাই পায়ে হেঁটে পাড়ি দেওয়ার প্রকল্প শুনে তেমন আগ্রহ ধরে রাখতে পারলাম না। পিঠে বোঝা নিয়ে এইসব পরিশ্রমে, ক্যাম্পিং নিয়ে আমার তেমন কোনো আগ্রহ নেই। আমি সমতলের মানুষ।আজীবন ১০ ফিট উঁচু ঢিবিকেই পাহাড় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে অভ্যস্ত। এইসব পাহাড় ডিঙিয়েই আমার শৈশব কেটেছে। এমন অনেক পাহাড় ডিঙানোর পরে এখন ইদানিং এইসব পাহাড় জয়ের আগ্রহে ভাটা পড়েছে আমার। তবে মুখের উপরে না বলা সম্ভব হয় না অনেক সময়ই, তাই মৌন সমর্থন জানালাম। অবশ্যই প্রস্তাবটা বিবেচনাযোগ্য।

যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসলো, আমারও একটা কল্পিত কাজের ব্যগ্রতা তৈরি হলো। আমি পাহাড়ে রাত্রিযাপন এবং সূর্যউৎসবের লোভ খসিয়ে দিব্য মুক্ত মানুষ হয়ে আড্ডা দিলাম টিএসসির দেয়ালে বসে বসে।

তবে সব সময়ই এমন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই যখন কক্সবাজার যাওয়ার প্রস্তাব উত্থাপিত হলো আড্ডায় তখন স্বভাবের দোষেই আগ্রহী হয়ে রাজি হয়ে গেলাম। অবশ্যই যাবো। রোজার সময়ে ইফতারের পরে এই নিয়ে বন্ধুদের আলোচনা চলে, আমি আলোচনার অগ্রগতি জানতে পারি টেলিফোনে। অবশেষে একদিন ফান্ডের অর্থের পরিমাণ জানলাম। জেনে ভিমড়ি খাওয়া অবস্থা আমার।

অঙ্কটা প্রথমে শুনে মনে হয়েছিলো বিষয়টা নেহায়েত রসিকতা। তবে ক'দিন পরে উপলব্ধি করলাম আদতে বিষয়টা রসিকতার নয় বরং নিরেট সত্য। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করলে অধম আমি ব্যতিত আমাদের সাথে থাকা বন্ধুরা অনেকেই নতুন একটি কর্পোরেট সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
আমার টংয়ের দোকানে চা খাওয়ার অভ্যাস এখনও অব্যহত থাকলেও আমার সাথের বন্ধুদের অনেকেই এই অভ্যাস ত্যাগ করে নতুন একটি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত। ছাত্রজীবনের পরিচিত জীবনযাপনের ধারা থেকে আমি বের হয়ে আসতে পারি নি, তবে অনেকেই পরিবর্তিত হয়েছে।

নিজস্ব সীমাবদ্ধতায়, কিংবা আমার সামর্থ্য নেই বলেই এই সংস্কৃতি চর্চায় আমি অভ্যস্ত নই। তবে দেশের পরিস্থিতি বুঝে বেশ বদলে ফেলতে হয়। যেমন সঙ্গ তেমন অনুসঙ্গ মেনে নিয়েই আমার নিজস্ব প্রচলিত সংস্কৃতিকে ব্যহত না করেই আমি আড্ডা দিয়ে যাচ্ছি। আমার প্রিয় বন্ধুদের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনটুকু আয়ত্ব করতে না পারলেও, সেটাতে অভ্যস্ত হতে না পারলেও, নিতান্ত আত্মপীড়ণে ভুগতে ভুগতে নতুন সংস্কৃতি চর্চার প্রচেষ্টা করি। প্রতি নিয়ত ভেতরে লজ্জা অনুভব করি। অর্থ যতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিতে পারে তার সবটুকু ভোগ করা কোনো ভাবেই অপরাধ নয়। এরপরও একটা চোরা অপরাধবোধ আমাকে তাড়া করে।

অর্থ সংকুলান হবে কোথা থেকে এই নিয়ে একটু চিন্তিত ছিলাম। অবশ্য গত কয়েক মাস বই না কেনায় সামান্য অর্থ সঞ্চয় হয়েছিলো, কোনো মতেই সেটা ফান্ডের সমপরিমাণ নয়। এরপরেও নিজস্ব সামর্থ বিবেচনা করলে এই ভ্রমনে আনন্দের তুলনায় অপরাধবোধই থাকতো বেশী।

যাত্রার দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসে, আমার নিস্তেজ অস্তিত্ব আদৌ সমর্থন করে না। অনেক রকম ছুঁতা খুঁজতে চেষ্টা করি, অংশগ্রহন না করবার তেমন কার্যকর কোনো অজুহাত খুঁজে পাই না। অবশ্য এতে তেমন কোনো সমস্যা হয় নি। বন্ধুর কল্যানে আমার কোনো অর্থই খরচ হয় নি এই ভ্রমনে।

ঈদের পরের দিন যাত্রা শুরু হবে, আমাদের যাত্রার সূচনা হবে নটরডেম কলেজের সামনে থেকে। গ্রীন লাইনের এসি বাসে চেপে আমরা যাবো কক্সবাজার। বাস ছাড়বে রাত ১২টায়।
বৌয়ের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই ঠিক ১১টা ৩০এ বাসা থেকে বের হলাম। আমার এখান থেকে নটরডেম পৌঁছাতে লাগবে খুব বেশী হলে ১৫ মিনিট। এর ভেতরেই বন্ধুর ফোন। ঠিকমতো আসিস, আমি পৌঁছায়া গেছি, তুই ব্যাটা জলদি আয়া পর।
ঈদের পরদিনের ফাঁকা শহরে রাত ১১টা ৩০এ শুনসান রাস্তায় আমি রিকশার অপেক্ষায় থাকি। সবারই জমা দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। উল্টো পথে কেউ যেতে আগ্রহী না। একটা রিকশাওয়ালা রাজী হওয়া মাত্রই কোনো রকম কথা না বলে চেপে বসলাম, কায়দা করে ফোন করলাম বন্ধুকে, একটু অপেক্ষা কর, ধর ২০ মিনিট আমি পৌঁছাচ্ছি।

২০ মিনিট পার হওয়ার আগেই বন্ধুর ফোন, আমি তখন গ্রীনলাইনের কাউন্টারের সামনে। এমন সব সময়ে অস্থিরতা বেড়ে যায় আমার। বাসের অপেক্ষা করছি, বাসের দেখা নাই। আশে পাশে অনেক যাত্রীই অপেক্ষা করছে। চিটাগাং সিলেট, কক্সবাজার, উত্তর বঙ্গ, দক্ষিণ বঙ্গ সব এলাকার বাস ছাড়ে এখান থেকে।
সময় কাটানোর উপায় উদ্ভাবন করতে হয়,চা সিগারেট শেষ করেও বাসের দেখা পাই না। ঘড়িতে সময় দেখি ১২টা।
অবশেষে বাসটা এসে থামলো- আমরাও উঠে পড়লাম বাসে। গন্তব্য কক্সবাজার। ৩ দিনের কর্মসূচি নিয়ে যাচ্ছি। বাসের ভেতরে ঢুকে মনে হলো ঈগলুর ভেতরে ঢুকে পড়লাম। এমন ঠান্ডা। পয়সা দিয়ে এমন শীতের অত্যাচার সহ্য করবার কোনো মানেই হয় না।

আমার এই উপলব্ধি জানানো মাত্রই আশেপাশের লোকজন ট্যারা চোখে তাকালো। আমিও নার্ভাস একটা হাসি দিয়ে বললাম- এইটা পুরা শীত কাল বানায়া রাখছে ভাই। এত পয়সা খরচ করে কেউ এই শীতের ভেতরে বসে থাকে?

বিবেচক বলেই হয়তো সীটের উপরে কম্বল রাখা। কম্বল গায়ে জড়িয়ে বাসভ্রমনজাতীয় অভিজ্ঞতা পূর্বে হয় নি, তবে যেমন অবস্থা দেখছি তাতে এই যাত্রায় সেই অভিজ্ঞতা হয়ে যেতে পারে।
১২টা ০৫:
বাসটা স্টেশন ছাড়লো কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে।
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×