somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পৌত্তলিকতা- অপসারিত বাউল মুর্তির পাশে আমার সাথে দাঁড়ান

২০ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ১১:৩৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১.
আমার দাদাবাড়ীর ঠিক সামনেই প্রাচীন একটা বটগাছ ছিলো। আমার শৈশব জুড়ে ছিলো সেই গাছ। ঝাঁকড়া শেকড় চারপাশে ছড়িয়ে বহুদিন বেঁচে ছিলো, দিনে দিনে স্থানের পরিচায়ক হয়ে উঠা গাছটির কারণেই দাদাবাসার সামনের জায়গাটা ছিলো বটগাছ তলা মোড়।

একদিন হঠাৎ সামান্য ঝড়েই গাছটা উপড়ে গিয়ে পড়লো দাদা বাসার সামনের ঘরে, ঘর ভেঙে গেলো, তবে নিজের ঘর ভাঙবার দুঃখ পান নি দাদা, বরং এত দিনের সম্পর্ক ভেঙে গেলো বলে ভীষণ দুঃখিত ছিলেন।

স্থানিক ঐতিহ্য বলেই পরদিন সকালেই ছোটো একটা বটের চারা লাগানো হলো সেখানে,

দিন যায়, বছর যায়, সেই চারা গাছটা এখন ধীরে ধীরে তার ঝুড়ি নামাচ্ছে চারপাশে, নিজের পরিচয় তৈরি করছে দিনে দিনে। এভাবেই বস্তু নির্জীব কিংবা সজীব, নিজের অস্তিত্বের শেকড় ছড়ায়, নিজের পরিচিত নির্মাণ করে। চারা বটগাছটি শুধু সেই প্রাচীন বটগাছের স্মৃতির সম্প্রসারণ ছিলো, তবে সময়ের সাথে এই গাছের সাথেও মানুষের সম্পৃক্ততা হয়েছে। মানুষ এই গাছের বাকলে স্মৃতি জমিয়েছে।

এভাবেই স্মৃতি জমে জমে, স্মৃতি জমে জমে স্মারক গড়ে উঠে। আমাদের অস্তিত্বের কিয়দংশ সেখানে সমর্পিত হয়। সেইসব স্থানিক চিহ্নের ভেতরে আমরাও বেঁচে থাকি প্রতি দিন।
২.
দিনাজপুর পৌরসভার সামনে মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে একটি ভাস্কর্য স্থাপিত হবে, নির্মাতা আমার এক বন্ধু, ঠিক তার সামনেই নামাজের স্থান, সুতরাং আল্লাহর ঘরের সামনে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক কোনো মুর্তি স্থাপিত হবে না। এই নিয়ে দিনাজপুর উত্তাল। এক পক্ষে ভাস্কর্যস্থাপনের সপক্ষে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা এবং ইসলামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ধর্মপ্রাণ মুসলিম গোষ্ঠি যাদের দাবি এই বেদায়াতি ঘটনা ঘটতে দেওয়া উচিত হবে না ।

সুতরাং শুধুমাত্র জোহরের নামাজ হতো যেখানে, সেখানে রাতারাতি জামে মসজিদ তৈরি হলো। মিছিল-মিটিং সমাবেশ, অবশেষে একটি আপোষ হয়, পোরসভার বাগানে স্থাপিত ভাস্কর্যের সামনের দেয়াল উঁচু করে বানানো হলো ওজুর জায়গা। ভাস্কর্য স্থাপিত হলো, সবাই খুশী, একটা সম্মানজনক সমাধান হলো সেই ঘটনার।

৩.
ঐতিহ্য হয়ে উঠবার সময় পায় না অনেক স্থাপনাই, বিখ্যাত হয়ে উঠবার সুযোগ পায় না অনেক শিশুই। সবার ভেতরেই সম্ভবনা থাকে, স্মারক হয়ে উঠবার সীমিত প্রতিশ্রুতি নিয়েই স্থাপনা নির্মিত হয়। আমাদের বস্তুর সাথে যোগাযোগের ভেতরেও হয়তো কোনো না কোনো ভাবে পৌত্তলিকতা রয়ে যায়।

মোহাম্মদ যখন মক্কা বিজয়ের পরে আর্তনাদ করে তারা আমার জন্য এখানে একটা ঘরও রাখে নি, তখন বিজীত মক্কা নগরী তার পদতলে লুটিয়ে আছে, তবে মোহাম্মদের আক্ষেপ থাকে , ১০ বছর পরের মক্কা নগরীতে তার কোনো স্মারক নেই, স্মৃতি স্থাপিত হয় নি এর কোনো গৃহে। বসবাস আর জীবন যাপনের স্মৃতিচিহ্ন ধরে না রাখলে গৃহত্যাগের যন্ত্রনা পেতো না মানুষ, মৃত্যুর অনুভুতির মতোই করুণ অনুভুতি তৈরি হতো না স্থাপনা বিলীন হয়ে গেলে।

প্রতিটা স্থাপনার সাথে আমাদের কিছু স্মৃতি মুছে যায়, মুছে যাচ্ছে প্রতিদিন। সুতরাং আমরা আরও বেশী স্পর্শ্বকাতর, ঐতিহ্যানুরাগী। প্রত্নতত্ত্ব আমাদের শেকড়ের গভীরতা মাপে। আমাদের ঐতিহ্যলগ্নতা, আমাদের সংস্কৃতিচর্চা, সবকিছুই মূলত আমাদের আশৈশব অভ্যাস এবং অভ্যস্ততাযাপন।

৪.
এয়ারপোর্টের সামনে বাউলমুর্তির গলার দড়ি দিয়ে টেনা নামানোর চেষ্টাতে আমি আক্রান্ত হই না, সেই স্থানের সাথে আমার স্মৃতিলগ্নতা নেই, এমন কি সমাপ্ত না হওয়া সেই মুর্তি কোনো স্মৃতিকাতরতাও তৈরি করতে পারে নি। তবে এরই ধারাবাহিকতায় যখন আমিনী দৃঢ় স্বরে ঘোষণা দেয় এরপর বাংলাদেশের সকল মুর্তি ভেঙে ফেলা হবে, তখনই আমি আক্রান্ত বোধ করি, আমার স্মৃতির সাথে যুক্ত অনেক মুর্তি ও স্মারক বাংলাদেশে ছড়িয়ে আছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে একাত্ম হয়ে উঠা এইসব স্মারক আমাদের প্রাত্যহিকতা, আমাদের উৎসব এবং আমাদের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। মতিঝিলের শাপলা, দিলকুশার বলাকা, বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল, কলা ভবনের অপরাজেয় বাংলা, এইসব স্মৃতিচিহ্নের সাথে নিত্যদিনের বসবাস আমার।

কোন এক দিন হঠাৎ করেই এইসব নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এই আশংকাই আমাকে বিক্ষুব্ধ করে। ধর্মীয় চেতনার বেড়াজালে নোংরা রাজনীতি টেনে আমাকে ঐতিহ্যলুপ্ত করে ফেলবার কোনো পায়তারাই আমি সহ্য করবো না।


৫.
মোহাম্মদের চেয়ে মৌলিক মুসলিম হয়ে উঠা মৌলবাদীদের মুর্তিপূজার কথিত অভিযোগে বাউল মুর্তি অপসারণ আমার স্মৃতি উপড়ে না ফেললেও আমার শেকড়ে ঘুন ধরায়। আমার ঐতিহ্যে ক্রমাগত কুড়ালের কোপ পড়তে থাকে, আমি আজ প্রতিহত না করলে একদিন আমার তাবত ঐতিহ্যকে গলায় রশি বেধে ভুলুণ্ঠিত করবে মৌলিক মৌলবাদীরা। উপাস্য হয়ে উঠবার বুজরুকি মেনে নেওয়ার বাসনা আমার নেই। আমার শেকড়ে ঘুনপোকা বাসা বাধছে।

প্রেম করবার দিন নয় অদ্য, সদ্যজাগা প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গে ফুঁ দিয়ে দাবানল করে তুলতে পারি আমরাই। তরবারী ক্ষুরধার হলেও আর তীক্ষ্ণতা সসীম। কতজনকে আহত করতে পারে একটি আঘাতে? কিন্তু মৌলবাদীর স্থাপনা উপাস্য হয়ে উঠতে পারে এমন বুজরুকি ঐতিহ্যশূণ্য করে ফেলতে পারে সামগ্রীকভাবে।

সুতরাং আমি যাবো, শনিবার বিকাল ৩টায়। যেখানে বাউল মুর্তি নির্মিত হওয়ার কথা ছিলো, সেখানে গিয়ে কজন বন্ধু নিয়ে দাঁড়াবো। হয়তো প্রতিরোধ আসবে, রাষ্ট্র প্রতিহত করবে, হয়তো মৌলবাদী শ্বাপদের আঁচর লাগবে শরীরে, এরপরও সব ভয় ঠেলে আমাকে যেতেই হবে।

আজ অন্তত স্পষ্ট করে বলবার দিন এসেছে,
এই অপসারিত বাউল মুর্তিই বাংলাদেশের মাটিতে সর্বশেষ অপসারিত স্থাপনার উদাহরণ হোক।

স্থাপনা স্মৃতি ধরে, স্থাপনার নিরেট দেয়ালে স্মৃতির অস্পষ্ট দিনলিপি, আর স্থাপনার পাশেই নির্বাক আমার পৌত্তলিক হয়ে উঠবার দিন।

৯টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিলেন মমতার দলকে?

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২২


শেখ হাসিনাই ধ্বসিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিভাবে? দুই দফায় পানিচুক্তি হতে দেননি মমতা। কংগ্রেসের মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এবং বিজেপির Narendra Modi প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন দুবার দুজনই বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, দুবারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×