সারাদিন বিভিন্ন রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যখন বাসায় ফিরে আসি তখন সারাদিনের ধকলে শরীর জুড়ে ক্লান্তি আমার। তবে ঘরে ফিরবারও আয়োজন থাকে, তাই লোকাল বাসের ভীড়ে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে, ভাই পা সামলে, ভাই গায়ের উপরে উঠে পড়বেন না কি, ভাই দেখে চলতে পারেন না, ইত্যকার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত আপত্তি ও গালিগালাজ গায়ে মেখে যখন অবশেষে বাসের দরজা গলে প্রায় চলতে শুরু করা বাসের পাদানি থেকে নীচে লাফিয়ে পড়ি , তখনও ক্লান্তির শেষ আঁচড় গায়ে লেগে থাকে।
আমি ঠিক মতোই আইল্যান্ডের ফাঁক-ফোকর গলে রাস্তা পার হই, সামনেই অবশ্য ফুট ওভারব্রীজ, তবে সেখানে নাগরিক প্রেমিকের দল এবং হকারের হল্লা, হাজার পসরা আর ভিখারীর বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে উপেক্ষা করে, উদভ্রান্ত ও উজ্জীবিত প্রেমিক-প্রেমিকাদের মুগ্ধ সমর্পিত দৃষ্টিকে পাশ কাটিয়ে অনেক উঁচু দিয়ে রাস্তা পার হতে ভালো লাগে না। তাই রিকশা বাস, সিএনজি, প্রাইভেট কারকে পাশ কাটিয়ে রাস্টার আইল্যান্ডে উঠে পড়তে পারলেই অন্য দিকের রাস্তার ট্রাফিকের দিকে মনোযোগী হওয়া।
সেটাকে কোনোভাবে পাশ কাটালেই প্রবেশ পথ কিংবা সুরঙ্গ। সেখানে প্রবেশের নানাবিধ নিয়মকানুন, ঠিক সুরঙ্গের সামনেই দুটো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শাখা। তার সামনের দোকান থেকে নিয়মিত একটা সিগারেট কিনি। সেটা টানতে টানতে হাঁটি। মোটামুটি ৫ মিনিট লাগে শেষ হতে। তখন আমি বাসার সামনের দোকানে, সেখানে থেমে কয়েক পদের লজেন্স কিনতে হয়, ম্যাঙ্গো বাইট কিনতে হয়। তারচেয়েও বড় কথা যাপিত দিনের রাগ-অনুরাগ, ক্ষোভ আর আক্ষেপ বোচকা বেধে সদরের সামনে রেখে এসে বাবার মুখোশটা সতর্কভাবে মুখে আঁটতে হয়। ঘরে ফিরলেই ছেলে পকেটে হাত দিয়ে খুঁজে আজকে তার জন্য কি আনলাম বাইরে থেকে।
প্রতিদিন সকালে যখন বাইরে যাই তখন ছেলে অঘোরে ঘুমায়, তবে কোনো কোনো দিন জেগে থাকলে প্রতিশ্রুতি দিয়েই বের হতে হয়, বাবা ফেরার সময় নিয়ে আসবো যা চাও। সেই প্রতিশ্রুতিতেই সারাদিন আমার অপেক্ষায় থাকে ছেলে। বাবা তার প্রতিশ্রুত দ্রব্যাদি নিয়েই ফিরবে ঘরে। তার এই প্রত্যাশাভঙ্গ করতে ইচ্ছা করে না।
ক্রমশ আরও বেশী বাঙালী হয়ে উঠা ছেলে এখন আর কিটক্যাট, এলপেনলিবে চায় না, বরং প্রাণ আর বিংগো খুঁজে। আমিও প্রাণ ম্যাংগো খুঁজি দোকানে গিয়ে। নিয়মিত এই নিজস্ব প্রতিশ্রুতি পুরণ আর প্রত্যাশা পুরণের আনন্দময় সময়টুকুই ঘরে ফিরে আসা আমার পারিশ্রমিক।
এরপর খাওয়ার সময় থাকে না। গতকালও এমনই একটি বিক্ষুব্ধ দিনে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে ঘরে ফিরে স্থবির বসে আছি। ছেলে পড়াশোনা করছে মনোযোগ দিয়ে। তবে ছেলের চেয়ে আমার পড়াশোনা হচ্ছে বেশী। বাবা স্বরে অ লিখো। বাবা স্বরে আ লিখো। বাবা ছবি আঁকো। ধুত্তোর, আরে ধ্যুৎ এইটা না , অন্যটা লিখো। এরোপ্লেন মানে কুনোজাহাজ লিখো, বেনানা মানে কলা লিখো।
অদ্ভুত পরিস্থিতির ভেতরেই বন্ধুর ফোন, কি রে তুই কই?
বাসায়। কেনো?
আসবি না?
এখন? কই যাবো?
এক বন্ধুর বোনের গায়ে হলুদে যাওয়ার কথা ছিলো। তবে আমি দিনকানা, ক্যালেন্ডার দেখি না, নিয়মিত পেপার পড়া হলেও পেপারের মাথায় থাকা দিন-তারিখ দেখা হয় না। আমার জীবন যাপন মানেই রবি বার সকাল, এরপরে ঘুরে ঘুরে বৃহঃস্পতিবার সন্ধ্যা, সপ্তাহান্তে বকেয়া ঘুম দেনা পাওনা সমেত মেটাতে হবে। এই জীবনে ক্যালেন্ডারের পাতার তেমন গুরুত্ব নেই। সুতরাং ২৮ তারিখ যাবো বলেছিলাম, কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় যে ২৮ তারিখ এই তথ্য মনে আসলো বন্ধুর ফোনে।
শুরু হয়ে গেছে। ঠিক আছে আসতেছি।
দাড়ি কাটতে হবে। কোনোমতে প্যান্টে দুই পা ঢুকিয়ে শার্ট গায়ে দিয়ে মোবাইল পকেটে নিলাম। ছেলের জন্য টম এন্ড জেরী ছেড়ে দিয়ে বললাম, বাবা আসতেছি, সুন্দর করে খেয়ে নিবে। লক্ষী ছেলের মতো। কোনো ঝামেলা করবে না, বাবা কিন্তু অনেক রাগ করবে বুঝছো।
ছেলে বালিশের উপরে বসে মগ্ন হয়ে টম এন্ড জেরীর কাজকারবার দেখছে। আমিও এই অবসরে বাসা ছেড়ে বের হয়ে গেলাম।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ কাশ্মীরি শরবত। এক গ্লাস খেলে না কি ১ ঘন্টা কেউ খাওয়ার কথা মুখেই আনবে না। আমিও এই বেশেহতি শরবতের রসস্থ বর্ণনা দিয়েছি গত কয়েক দিন। মুখিয়ে ছিলাম খাওয়ার জন্য। কাশ্মীরি বালিকারা ফাঁকি দিয়ে ভিনদেশি হয়ে গেলো, আমার সাধের কশ্মিরি লুঙ্গিও প্রায় স্বচ্ছ বলেই পরিধেয় হয়ে উঠলো না, তবে কাশ্মীরি শরবতও এমন ফাঁকিবাজি করবে সেটা কে জানতো?
রিকশা চেপে যাচ্ছি ওয়ারি। ঢাকা শহরের ফুটপাত হকার, ছিন্নমূল মানুষ, পতিতা আর নেশাসক্তদের দখলে থাকে সব সময়ই। ফুটপাতের একপাশে হকারের বসবাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাতে , মেডিক্যালের সামনে আর যক্ষা ইনস্টিটিউটের সামনে নিয়মিত বসে নেশাসক্তদের আড্ডা, সেখানেই ৮ ইঞ্চি ইনজেকশন দিয়ে গরু অজ্ঞান করার ওষুধ শিরায় শুকিয়ে নেশা করে মানুষ। সারা হাতে ফুটো, পায়ের শিরায় ইনজেকশন ঢুকায় তারা। আর ঝিম ধরে পড়ে থাকে, ছবির হাটের নেশাসক্ত গাছের পাশেও এমন ইনজেকশনের আড্ডা বসে। প্যাথিড্রিন আর হেরোইনের নিয়মিত নেশার পয়সা জোগানোর ক্ষমতা নেই যাদের তারা আরও একটু বাড়তি ধ্বকের আশায় পশুর চেতনানাশক ইঞ্জেকশন পুশ করছে শরীরে।
নেশাসক্ত মানুষগুলোর অধিকাংশই টোকাই। তারা পার্কের ডাল- পাতা আর বোতল সংগ্রহ করে বেচে। পরিচ্ছন্নতা কর্মী বলা যায় তাদের। প্রেমঘন ঢাকা শহরের পার্কে প্রচুর আরসি লেমন আর প্রাণ, ফ্রুটিকার বোতল গড়াগড়ি যায়। সেইসব বস্তায় ভরে বিক্রী করে আসা মানুষগুলো বিকেল বেলায় বস্তার পাশে দুই পা ছড়িয়ে বসে থাকে। মনোযোগ দিয়ে এক অন্যকে ইনজেকশন নিতে সাহায্য করে।
তবে প্রধান পুলিশ হাসপাতালের সামনের ফুটপাতে এই দৃশ্য আশা করি নি। তখনও অফিস থেকে বাসায় ফিরছে মানুষ, জনাকীর্ণ না হলেও জনবিরল নয় রাস্তা। সেখানে রোড আইল্যান্ডের উপরে বসে একজন অন্য জনের পায়ের শিরায় ইনজেকশন পুশ করছে, ঠিক তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ভ্রুক্ষেপহীন ট্রাফিক। তাদের সামনেই একজন চায়ের দোকান নিয়ে বসে আছে, আশে পাশে গাড়ীর ভীড়। দৃশ্যটা তেমন আলাদা কোনো অনুভুতি তৈরি করলো না। র্যাব দল বেধের মাদকব্যবসায়ীদের ধরবে, নকল স্পিরিট খেয়ে মানুষ অসুস্থ হবে, মারা যাবে, ইয়াবা ব্যবসায়ি ধরা পড়বে ,ছাড়া পাবে। যৌনউত্তেজক ট্যাবলেটের চালান আসবে বাংলাদেশে, ঢাকা শহরের বিশিষ্ট উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত ড্রইং রুমে সেক্স অবসেসড যৌননিরাসক্ত মানুষেরা নেশা করে সঙ্গমের তাড়না বোধ করবে, এইসব শহুরে দিনলিপিতে অবসাদগ্রস্থ এই যুবকদের কোনো অংশগ্রহন নেই। তারা ঝিমাবে ফুটপাতে, তাদের পা পচবে, তাদের মাংস খসে পড়বে, পুঁজ গড়াবে। এইসব অসাস্থ্যকর দৃশ্য দেখে নিরাপদ একটা লোকালয় খুঁজে নেওয়া সম্ভব হবে না। বিষাক্ত পরিবেশ, পরিবেশের বিষ সব এলাকাকেই কম বশী নষ্ট করেছে। সুতরাং আসন্ন উৎসবের আমেজে মত্ত থাকি।
অনুষ্ঠানে পৌঁছানোর পরে আমি কাশ্মীরি শরবত খুঁজি, আশেপাশের বন্ধুদের প্রশ্ন করি, তারা কেউই এর সংবাদ দিতে পার না। অবশেষে জানলাম সব কিছুই এসেছে ফর্দ মোতাবেক কিন্তু কাশ্মীরি শরবতের কথা ক্যাটারার ভুলে গেছে বেমালুম।
গায়ে হলুদের সাজস্বজ্জা দেখে মনে হলো হঠাৎ করেই কিঁউ কি শাস ভি বাভি বহু থা'র সেটে চলে এসেছি। সেই রকমই চড়া মেকাপ নিয়ে আশে পাশে মেয়েরা ঘুরছে, তাদের বিবর্ণ লাগছে। চামড়ার স্বাভাবিক রংয়ের সাথে খাপ খায় না এমন চড়া মেকাপের ভার আর সেইসাথে শাড়ী নামক পরিধেয়টিকে কতটা আলুথালু জড়ানো যায় এই প্রদর্শনীতে হিন্দি সিরিয়ালের কথাই মনে পড়লো প্রথমে, সেখানেই বোধ হয় এমন শাড়ী পড়া মানুষদের দেখা পাওয়া যায়।
সামনে একটা ছেলে গীটার টিউন করছে, বয়েস হবে ২১-২২। ক্ষ্যাপে গায়ে হলুদ আর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বাজায়। এটাও একটা স্বীকৃত পেশা, উৎসবে হিন্দি ছবির অনুকরণ বলবো এটাকে? গায় হলুদের অনুষ্ঠানে ওয়েডিং সিঙ্গারের প্রচলন বাংলাদেশে ব্যপক মাত্রায় শুরু হলো কবে? এলআরবি, জেমস, মাইলসও গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছে একটা সময়ে, তবে সেই সময়েও যাদের তেমন সংগতি ছিলো তারাই ভাড়া করা বাদক দল দিয়ে অনুষ্ঠানে আগত অতিথিদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করতো। তবে এখন এটা সময়ের দাবি। প্রেস্টিক ইস্যু হয়ে উঠেছে, সংস্কৃতির হ্যাপাই এমন, পালন না করলে ঠিক জাতে উঠা যায় না।
শেষ পর্যন্ত শুরু হলো গান, আমার ঠিক সামনেই বিশাল একটি সাউন্ডবক্স, এল শেপড ছাদের এক দিল ১৫ বাই ৩০ ফিট অন্য দিক ২০ বাই ৩০ ফিট হবে। এপাশে খাওয়ার ব্যবস্থা আর গাইয়ে দলের সামনে ৮ সারি চেয়ার বসানো। অন্য পাশে হলুদের স্টেজ। চমৎকার স্টেজ, তার উপরে প্রদীপ রাখা, গায়ে হলুদের চিরায়ত সজ্জা নয় বলেই মন কাড়লো। সেখানেও ১০ সারে চেয়ার বসানো। এসবের সামনেই সিঁড়ি ঘরে, সিঁড়ি ঘরের পাশেই সাউন্ড কন্ট্রোল প্যানেল। সেখানে একজন বসে আছে। তার পাশে আলোকনিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা। ছাদে লেসার লাইট বসানো হয়েছে। গাইয়ে দলের পাশ থেকে মাঝে মাঝে ধোঁয়া বের হচ্ছে, সেখানে লেজারের ঝলক।
প্রথম গানটা আমার প্রিয় একটা গান, যেখানে সীমান্ত তোমার- তবে গাইয়ে যখন গাইলো তখন প্রিয়ের খাতা থেকে মুছে ফেললাম গানটাকে, এর পরের গান পরী, বাপ্পার গানের সুরে প্যাঁচ আছে অনেক রকম। সেটাও ঠিক আনন্দ দিলো না। পেশাদার গাইয়ে হলেও তেমন দক্ষ গাইয়ে না। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী গাওয়ার বদলে শ্রোতার চাহিদা পুরণের চেষ্টা করতে গিয়ে বিষয়টা ফ্লপ হয়ে গেলো।
এরপর গাইতে আসলো একটি মেয়ে, সন্ধ্যার গান আর শাহনাজ রহমতুল্লাহর গান গাওয়া সহজ না। সেখানে তাল কেটে গেলে কানে খোঁচা দেয়। এত বেশি শোনা হয়েছে গানগুলো যে তাল, মীর প্রায় স্মৃতিতে গাঁথা হয়ে আছে।
গানের উৎপীড়নের ভেতরেই অন্য একজন ফোন দিলো। তার সাথে কথা বলে মনে হলো অনেক ক্ষুধার্ত আমি। ঘড়ি দেখে, খেয়ে সামাজিকতা, সৈজন্যতার ধার না ধেরেই চলে আসলাম। বদ্ধ দুয়ারে আঘাত হেনে দারোয়ানকে জাগিয়ে রাতে ঘরে ফিরতে ভালো লাগে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

