somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অবলোকন

২৪ শে নভেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:১৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেয়েটাকে দেখেই নেপালের কথা মনে পড়লো, দেশটা ছোটো কিন্তু উঁচু উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের পাশেই দেখলাম তেনজিং নেরগেকে। চুঁড়ায় উঠতে চাইছে। রমনা পার্কে সন্ধ্যার সামান্য আগে এমন প্রেমের দৃশ্য বিরল নয়, প্রেম থাকবে, শাররীক উষ্ণতার খোঁজ থাকবে, মানুষ আরও একটু অন্তরঙ্গ হতে চাইবে- এমনটাই স্বাভাবিক প্রেমর প্রবনতা। তবে সবারই তো বন্ধুর খালি ঘর নেই, সুতরাং পার্কের বেঞ্চিতে যতটুকু ঘনিষ্ঠতা সম্ভব।

ছেলেকে নিয়ে মাঝে মাঝেই বিকাল বেলা রমনা পার্কে ঘুরতে আসি, ঢাকা শহরে ঘরের জানাল দিয়ে আকাশ দেখা যায় না এখন, জানলা খুললেই পাশের এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের বারান্দায় মেলে দেওয়া অন্তর্বাস আর নানা রংএর কাপড়ের উজ্জলতা।

মানুষের নির্জনতা নেই, এমনকি ব্যক্তিগত গোপনীয়তাও নেই। সিঁড়িতে দাঁড়ালে পাশের এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের আড়াল। কোথায় আকাশ দেখবে ছেলে? প্লেনের আওয়াজ শুনে ছেলে জানালায় দাঁড়িয়ে আকাশ খুঁজে। তবে নতুন তৈরি হওয়া এপার্টমেন্টের খাঁচা মুখ ভ্যাঙায় ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম ছেলেকে নিয়ে, সেদিন ভর্তি পরীক্ষা চলছে। যতটা ভীড় আশা করেছিলাম, ভীড় তার তুলনায় কম। কিংবা বিশাল চত্তরে একলক্ষ মানুষও কম মনে হয়। একজন পরীক্ষার্থী তার সাথে আরও ২ জন এসেছে, পরীক্ষা উপলক্ষে সপরিবারে বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমন বলা যায় এটাকে।

পরীক্ষার দিন সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়ে যায়। সকল রাজনৈতিক দলই নিজেদের সংগঠনের শক্তিমত্তা প্রকাশ করে মিছিল করে, এবং এই পরীক্ষার হলের সামনে দিয়েই বিকট আওয়াজে মিছিল করে নবীনদের সংবর্ধনা জানায়। নবীনদের আগমন শুভেচ্ছা স্বাগতম।

ছাত্র ফেডারেশনের এক কর্মী- অদ্ভুত বিষয় হলো ছাত্র ফেডারেশনের কর্মীগুলো সবাই ইচ্ছে করেই আলুথালু থাকে, একটা ছদ্মবিপ্লবী ভড়ং ধরে ঘুরে ক্যাম্পাসে, এদের অবধারিত ভাবেই খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি থাকবে, চোখের কোনে না ঘুমানো কালো রেখা থাকবে এবং গায়ে মোটা কাপড়ের চাদর থাকবে। হাতে হ্যান্ড মাইক নিয়ে পরীক্ষার রেজাল্ট জানুন ঘোষণা দিচ্ছে। একটা ডেস্কের উপরে কিছু কাগজ রাখা, তার পাশে হ্যান্ড মাইক-

ছেলের ঠেলাঠেলিতে সেখানে গিয়ে থামলাম, তারও ইচ্ছাএকটু হ্যান্ড মাইকে কথা বলবে, ওকে বুঝাতে পারলাম না, এই দেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মী যখন হাতে মাইক তুলে নেয় তখন তার কাছে মাইক চাওয়া আর বাঘের মুখের গ্রাস কেড়ে নেওয়ার ভাবনা সমান রকমের বিপজ্জনক, কামড়ে দিতে পারে ওরা।

ছোটো মানুষের মন ফুরুৎ ফুরুৎ বদলায়, ছাত্র দলের বিশাল মিছিল, হাত তালি দিয়ে ছুটছে ওরা, ছেলের আব্দার ওদের পিছনে তালি দিতে দিতে যাও।
ছাত্র দলের মিছিলের পিছে সামান্য দুরত্ব রেখে হাঁটলাম কিছুক্ষণ। একটু শঙ্কিত হয়েই, ছাত্রলীগের মিছিল আসছে অন্য পাশ থেকে, নির্বাচনের সুবাতাস বইছে, এখন একটা ঝামেলা না হলেই হয়।

ছাত্রলীগের যে ছেলেটা শ্লোগান দিচ্ছে, সাইজে ছোটো, চিকনা মতো, একটু নীচ থেকে উপরে উঠে এক একটা শব্দ বলছে, অনেকটা তোফায়েলের মতো, এই ব্যাটার কথা শুনলেই মনে হয় নিউটনের তৃতীয় সূত্রের পরীক্ষা হচ্ছে, প্রতিটা ক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। সে একটা কথা বলা আর পাছাটা একটু তুলে, আবার থেমে যায়, এমন কোঁতাতে কোঁতাতে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে যাওয়া তোফায়েলের ভাবশিষ্য হতে পারে এই শ্লোগানকর্মী। দেশে কোনো নেত্রী আছে? আরে বলি এই দেশে কোনো নেত্রী আছে, আরেএএ বাংলা দেশে কোনো নেত্রী আছে-কোন সে নেত্রী শেখ হাসিনা, কোন সে নেত্রী শেখ হাসিন, চলছে লড়াই চলবে শেখ হাসিন লড়বে।
অবশ্য কোথায় লড়াই চলছে সেটাই জানা নেই আমার, ছেলের আব্দারে এই মিছিলের পেছনেও কিছুক্ষণ হাঁটতে হলো। সেখান থেকে বের হয়ে সোজা টিএসসি, ডাসের সামনের স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্ত্বরে বাঁশ গাছ লাগানো আছে। আগে খেয়াল করি নি আমি। কয়েক দিন আগে খবরে আসলো বাঁশ কাটলে না কি রস পড়ছে, এইসব বাঁশ গাছের কয়েকটার ডগা কাটা। কিংবা নতুন রাজনীতিবিদ যাদের পেছনের ফুটা এখনও ছোটো, তাদের দেওয়ার জন্যও কঞ্চি কেটে নিয়ে যেতে পারে মানুষ। নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যায় না, গ্রাহকবান্ধব পরিবেশ বাংলাদেশে।

সেখানে এক মেয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে ছেলে বললো সরি, সরি,
মেয়েও মু্গ্ধ। আমিও মুগ্ধ ওর সহবতজ্ঞানে।

এত মানুষের ভীড় ,সেখান থেকে রমনার পরিবেশে এসে ওর উৎসাহ আরও বেশী, যারা যা করছে সেটাই অনুকরণ করছে, কেউ পা ছড়িয়ে হাঁটছে, তার পাশে পাশে সে রকম করেই হাঁটছে, কেউ জগিং করলে তার পেছনে জগিং শুর করছে, কখন কাকে অনুকরণ আর অনুসরণ করবে কিছুই বলা যাচ্ছে না, তার উপরে কানে আইপড আর উর্ধমুখী স্বাস্থ্যার্থী মানুষেরা যেভাবে দৌঁড়াচ্ছে তাতে ওর নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়েই ওকে রাস্তা থেকে নামিয়ে এনেছি মাঠে।

সে ফুলের কেয়ারী লাফাচ্ছে জোড়া পায়ে, অন্তত এই জায়গাটাতে কিছু দুর্ঘটনা ঘটালে সামাল দেওয়া সম্ভব।তাকে নিয়েই দৌঁড়াচ্ছি মাঠে, এমন সময় নেপালী মেয়েটা আর তেনজিং নেরগেকে দেখলাম। পারলে কোলের উপরে উঠে বসে আদর করে, সম্ভব হচ্ছে না। তাদের কিছুটা দুরে একটা জুটি বোধ হয় কোনো তাবলীগের পাল্লায় পড়েছে, বিরস বদনে উপদেশ শুনছে তারা। আমি ছেলেকে নিয়ে আস্তে আস্তে যাই।
পার্কের বেঞ্চির নাম্বার গুনছে ছেলে, চার একে চার, পাঁচ একে পাঁচ। ও দশ এর বেশী গুনতে পারে না। সেখানে থেকে একটু দুরে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে চীনের কথা মনে হলো। যার নিয়ন্ত্রনে আছে সে অনেক নাড়াচাড়া করছে তবে বোরখার আড়াল থেকে সেই আন্দোলনের কোনো সংবাদই বাইরের বিশ্বে পৌঁছাচ্ছে না।

সেখান থেকে সামনে গিয়ে ছেলের মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তার উৎসাহ ছিলো রমনা পার্কের নিয়মিত বিনোদন প্যাকেজের অবসানে যেই আইসক্রিম পাওয়ার কথা সেটা তার জন্য বরাদ্দ নেই। ওর ঠান্ডা লেগে আছে সুতরাং এইসব ঠান্ডা জিনিষ খাওয়ানো নিষেধ। বিষন্ন বদনে ঘুরছে ছেলে, নিয়মের বরখেলাপ করে আইসক্রীম কিনে দেওয়ার কথাও ভাবছিলাম।

কিছুক্ষণ পরে যখন গেটে পৌঁছালাম, তখন এক স্বাস্থ্যার্থীনীকে দেখে বুঝলাম মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে। অন্তত এইরকম সুতনু মেয়ের এই প্রায় সন্ধ্যায় কানে আইপড লাগিয়ে দৌঁড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই, রমনা পার্কের নিয়মিত যারা দৌঁড়ায় তাদের পেটে তিন থাক চর্বি না জমলে তারা স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠে না। এই মেয়ে মেদবিহীন শরীর নিয়ে দৌঁড়াচ্ছে কেনো?
যে যা খুশী করুক আমার কি, রমনার গেটে আইসক্রিমওয়ালা উধাও। অন্তত একটা অপরাধবোধ থেকে রেহাই পেলাম। ছেলে উৎসাহ নিয়ে রাস্তা পেরুতে চায়, আমি বাধা দেই, প্রায় নিসঙ্গ রাস্তা হলেও এই নির্জন রাস্তায় মানুষের হঠাৎ করেই ফর্মুলা ওয়ান রেসিংয়ের বাতিক চাপে, ভোঁ করে গাড়ী ছুটিয়ে দেয়।

সুতরাং বাবা দেখেশুনে রাস্তা পার হতে হবে। ওদের অনেক সম্পদ আছে, অনেক বিলাসিতা, আমার একটাই বিলাসিতা আপাতত তুমি, একটু বুঝে শুনে ইনিংসটা খেলতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে নভেম্বর, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৩৫
৬টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×