মানুষ আনন্দে কাঁদে, দুঃখে কাঁদে, কাঁদে আশ্চর্য হলে। নির্মমতায় কাঁদে, মমতায় কাঁদে।ব্যর্থতা- সাফল্যে কাঁদে। প্রিয়জনের সান্নিধ্যে কাঁদে, কাঁদে প্রিয়জনের বিয়োগেও। আশ্চর্য দুই চোখ আর এর অশ্রু, কত আবেগ প্রকাশ করে, কত আবেগ প্রশমিত করে।
সব কান্নাই সব আবেগকে প্রকাশ করতে পারে না। বড় কোনো প্রকাৃতিক দুর্বিপাকে সব হারানো মানুষ হাহাকার করে, আর্তনাদ করে, অবরুদ্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ে না। উর্ধাকাশের তাকিয়ে অসহায় তাকিয়ে থাকে বিস্মিত হয়ে। যিনি দেন তিনি কত সহজেই সব কিছু দেন, আবার যখন সব কিছু মুছে নিয়ে যান তখন এমন কি প্রিয়জনের চিহ্নটুকুও থাকে না জমিনে।
এই জমিনে একদিন আমার বসত আছিলো বুঝলি, ঐ যে , বলে নদীর মাঝ খানে আঙ্গুল দেখিয়ে ফোঁকলা দাতে হাসেন বৃদ্ধা, কিন্তুন নদি খায়া ফেললো একদিন, উপরওয়ালার মর্জি, তিনি কখন কি নিয়ে যাবেন বুঝা যায় না।
এই হাসিতে বিষাদ লুকানো থাকে, ছেলেবেলা লুকানো থাকে এই হাসির পরতে পরতে। ডাঙর নদীর কথা কইয়ে লাভ নাই খুঁড়ো, যাও দেখো ঐ পার কি মচ্ছব বইসছে। করিমুদ্দির চরে চরক মেলা হচ্ছে গত দুই বছর ধরেই।
আমার ছেলেটা, আমার ছেলেটা, মেলার শেষ বেলায় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে কাঁদে সেলিনা। হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে ছেলে ধরা ধরে নিয়ে গেলো, নাকি বস্তায় ভরে বিদেশে পাঠায়া দিলো এই আশংকা থেকে মুক্তি পেয়ে পরিতৃপ্তির কান্না কাঁদে, ছেলের পিঠে ছদ্ম দুইটা কিল বসিয়ে হাসে আর কাঁদে। আর কখনই যাবি না আঁচল ছেড়ে। মা ছেলে দুজনেই কাঁদে, মমতায় আদ্র হয় চোখ।
অসহায়ত্বের কান্না কাঁদছে লোকটি, এটাকে হাহাকার বলা যাবে না, নির্ব্যক্ত অভিমান থাকে হাহাকারে। নিজের অসহায়ত্বের বয়ান থাকে নিরাকারের কাছে, পরম শক্তিশালী কারো কাছে অনুযোগের কান্না কাঁদে দুর্বিপাকে, তবে এই কান্না তেমন কান্না নয়। এই কান্না অবদমিত কান্না, চেপে রাখা কান্নার সাথে হাহাকার বুকের ভেতর দিয়ে বুদবুদ হয়ে বের হয়ে যাচ্ছে।
লোকটা তার ফলের ঝুড়ি নিয়ে বসে আছে নির্মম ইট কাঠের কারাগার, এই শহরের এক উঁচু অট্টালিকার সামনে। সে কাঁদছে না, বরং প্রাণপনে চেষ্টা করছে কান্নাকে লুকাতে। তবে এই কান্না অপমান আর অসহায়ত্বের কান্না। স্বজাতির কাছে প্রতারিত হওয়ার কান্না এটা। ক্ষমতাবানদের সামনে ক্ষমতাহীনেরা যেভাবে বিলাপ করে এ কান্না তেমন বিলাপ।
ক্ষমতাবানের অস্ত্র থাকে, আইনের জোর থাকে, থাকে নিয়মিত লেঠেল বাহিনী। তারা সন্ত্রস্ত করে রাখে পুরো জনপদ, মানুষ ভয়ে কাঁদতে ভুলে যায়, মানুষের চোখের পানি চোখের অলিন্দে এসে শুকিয়ে যায় ভয়। তারা কান্না চুরি করতে শিখে যায় প্রতিদিনই। প্রতিদিনই তারা কান্না চুরি করে লুকিয়ে রাখে কোনো গোপন প্রকোষ্টে।
তবে সব কান্না গোপন প্রকোষ্টে জমা থাকে না, বরং সিন্দুকের আগল গলে মাঝে মাঝে বের হয়ে আসে। আমি লোকটাকে দেখি। লোকটার অবরুদ্ধ অবদমিত কান্না বোধ হয় সহানুভুতির অপেক্ষায় ছিলো।
এই কান্না নিরাপদ প্রকাশের পথ খুঁজে, এই কান্না বুকের ভিতরে নিয়ে ঘুরছে যারা তারা বুঝে কতটা চাপ হয়ে বসে থাকে বুকের পাথর।
আমি- আর কোনো শব্দ শোনা যায় না লোকটার মুখে থেকে। বয়স্ক একজন মানুষ সম্পূর্ণ অকারণে রাস্তায় বসে বিলাপ করবে এমনও না, কোনো একটা কারণ নিশ্চিত আছে, এই প্রবল ভীতি এবং কান্না লুকিয়ে রাখবার কোনো কারণ নিশ্চিত আছে।
প্রচন্ড ভয়ে মানুষটা নিজের কান্না লুকিয়ে রাখতে চাইছে প্রাণপনে, কোনো অভিযোগ করবার সাহস পাচ্ছে না। এমন কি নিজের কাছেও নিজের নিরাপত্তা নিজের জীবন আর প্রিয় পরিজনের মায়া প্রবল হলে মানুষ সচারাচর ঘাঁটাতে চায় না।
হয়তো লোকটা হিস্টেরিক , হয়তো লোকটা তার অতীত মনে করে কাঁদে, এই নির্মম শহরে অনেক দিন পরে নির্বাচন এসেছে। নির্বাচনের সুযোগে বের হয়ে এসেছে সব শ্বাপদেরা। তারা যুথবদ্ধ হয়ে নৌকা আর ধানের শীষের মিছিল করে।
এ্যঁই শ্লোগান কেমন জমছিলো।
ভালোই জমছিলো ওস্তাদ।
জমলে তো ভালো। ২৯ তারিখে বুঝন যাইবো কে কি করছোস।
এরা এতদিন ঘাপটি মেরে ছিলো হয়তো। তবে আজ সন্ধ্যায় মিছিল শেষ করে যাওয়ার পথে এই ফেরীওয়ালা ফল বিক্রেতার সারাদিনের উপার্জন হাতিয়ে নিয়ে গেছে তারা। অবশ্য পৃথিবী শক্তিমানের ভক্ত। তাদের সংঘবদ্ধতার শক্তি আছে। তারা যাওয়ার আগে শাসিয়ে গেছে, অবশ্য শাসানোর প্রয়োজন ছিলো না, এই ফেরীওয়ালা এই গলিতে নতুন। এখানের মানুষকেও চিনে না সে। প্রতিহিংসা কিংবা প্রতিশোধের আকাঙ্খা নেই তার। শুধু কিছুটা আক্ষেপ আছে এই বিলাপের সাথে,
যদি, যদি শুধু মাত্র একটু আগে বুঝতে পারতো, এই মিছিল শেষ হওয়ার পরে যখন সবাই যে যার রাস্তায় চলে যাচ্ছে, তখন এই মিছিলের সামনে থাকবার দুর্মতি যদি তার না হতো,
যদি, যদি শুধুমাত্র এইটুকু বুঝতে পারতো-
এই কান্না সহানুভুতি খুঁজে , খুঁজে আশ্বাস। আর তাই বহুতল অট্টালিকার দারোয়ানের টেবিলের উপরে ঝুঁকে কাঁদতে থাকে। কিংবা তার এই উদগত কান্নাকে দমানোর চেষ্টা করতে থাকে প্রাণপনে।
গণতন্ত্র স্বাগতম- স্বাগতম নির্বাচন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

