অগভীর ভাবনা- ধর্মীয় সংঘাত
২৮ শে আগস্ট, ২০০৯ সকাল ১০:৫৯
ধর্ম একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেয়ে যাওয়ার পরেই মূলত ধর্মের চরিত্র বদলে যায়। প্রচলিত সকল ধর্মের উৎস আসলে মানুষের শুভবোধ এবং এই ধর্মীয় বিধি মূলত সামাজিক স্থিরতা আনবার মানবীয় উদ্যোগ। তাই ধর্মত্যাগীদের অধিকাংশই নিপীড়িত মানুষ। তারা ধর্মপ্রণেতার শুভবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে ধর্মান্তরিত হয় এবং নতুন একটি জীবনযাপনের ধরণকে আত্মস্ত করে।
কোনো ধর্মই নির্যাতনকে গ্রহনযোগ্য বলে না, কোনো ধর্মই বলে না বিশ্বাসের পার্থক্যের জন্য অন্য একজন মানুষকে নির্যাতন এবং নিপীড়নের ভেতর দিয়ে যেতে হবে, কিন্তু ধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠবার সাথে সাথে ধর্মের এই নমনীয়তা কমে যায় এবং ধর্মের ভেতরে গোঁড়ামি বেড়ে যায়।
যীশু নাজারেথে যতদিন ছিলেন, তার জীবনের অধিকাংশ সময়ই অবশ্য কেটেছে নাজারেথে, সেখানে তার শুভবোধ ও মানবহিতৈষ্যি ভাবনায় উদ্বুদ্ধ মানুষেরা যীশুর উপরে নির্যাতন করে নি । তবে তার ক্রুশবিদ্ধ হওয়াটাকে ধর্মীয় গুরুরা যেভাবে প্রচার করেছে, যখন প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে শক্তিশালী একটা অবস্থানে এলো খ্রীষ্টান ধর্ম, যখন ধর্মটি রাষ্ট্র এবং ক্ষমতার আনুকল্য পেলো তখনই মানবতার সকল কষ্ট সহ্য করা যীশুর অনুসারীরা নিজেরাই একেকজন নির্যাতক হয়ে উঠলো।
ডাইনী সন্দেহে মানুষ পুড়িয়ে মারা, বিধর্মীদের শিকার করা, এবং চার্চের বিরোধিতাকে নিষ্ঠুর ভাবে দমন করা- এবং এভাবেই তারা রাষ্ট্রের সাথে সংঘাতে লিপ্ত হয়, মানুষের নৈতিক গুরু এবং মানুষের শাসনতান্ত্রিক প্রধানের ভেতরে দ্বন্দ্ব নিয়ে লড়াই হয়েছে, খুনোখুনী হয়েছে, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছে পুরোহিত.
এই গল্পগুলোর পুনরাবৃত্তি হয় শুধুমাত্র, ক্ষমতার লোভ এবং ক্ষমতাসীনদের চরিত্র বদলায় না।
এরও আগে মিশরে সম্রাট, ইশ্বরপূত্র এবং পুরোহিতদের সাথে লড়াই হয়েছে- ধর্ম এবং ধর্মাচার এবং সংস্কৃতি যখনই প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেয়েছে তখনই ধর্মের দ্বৈরাত্ব বেড়েছে, বেড়েছে মতবিরোধিতা দমনের নামে নির্যাতন, মানুষের সহিষ্ণুতা এবং উদারতা কমেছে এবং একই সাথে এই প্রেক্ষাপটই নতুন ধর্মের সুতিকাগার হিসেবে কাজ করেছে।
মানুষ নৈতিকতার বিরুদ্ধে ছিলো না কখনও, মানুষ কখনই মনুষ্যত্বের বিরোধীতা করে নি, মানুষ বিরোধিতা করেছে এবং করে ক্ষমতাসীনদের নৈরাজ্য এবং অনাচারের। তারা নিজেদের নিরাপত্তা এবং জীবনযাপনের সংস্কৃতিতে কতৃপক্ষীয় খবরদারি, নিজস্ব বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং অবিশ্বাসের স্বাধীনতা চায়, ধর্মরাজ্যগুলো ততদিনই সুন্দর ভাবে চলেছে , যতদিন এই রাজ্যের সম্রাট নিজেকে ধর্মন্যাস্ত রেখেছে , যখনই রাজা নীতিচ্যুত তখনই অন্য মানুষের নৈতিক দায়িত্ব হলো রাজাকে নীতিতে বহাল করা কিংবা রাজাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
এই ক্ষমতার পালাবদলে পুরোহিত জড়িয়ে পড়ে, জড়িয়ে নানা মতাবলম্বি মানুষেরা। এবং আমরা একটার পর একটা রক্তাক্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখি। এবং একটা পর্যায়ে ইউরোপ বাধ্য হয়েই পুরোহিত এবং সম্রাটের ভেতরে কিংবা পুরোহিত এবং রাজ্যের ভেতরে একটা সীমারেখা টেনে দিয়েছে, ইউরোপের নৈতিক রাজধানী ভ্যাটিকান কিন্তু সেটা অন্তত ১৫টা সম্রাজ্যে বিভক্ত ছিলো। সেখানে রাজতন্ত্র চলছিলো, এবং চলছে এখনও অনেক দেশে আলংকারিক ভাবে।
এই পরিবর্তন উপমহাদেশে এসে নি এখনও , এখনও এখানে ধর্ম, রাষ্ট্র, পুরোহিত এবং এদের সীমনাগুলো অচিহ্নিত, যদিও সাংবিধানিক ভাবে আমরা এইসব সীমারেখা এঁকে দেওয়ার প্রচেষ্টা দেখি এখানকার রাষ্ট্রগুলোতে তবে মানুষ এখনও চুড়ান্ত ভাবেই পৌত্তলিক রয়ে গেছে এখানে।
মুহাম্মদের সময়েও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষদের উপরে নির্যাতন হয় নি তেমন করে, যতটা হয়েছে তার অনুসারীদের হাতে ক্ষমতা যাওয়ার পরে, এবং মুহাম্মদের মৃত্যুর ৫০ বছর পরে এটা কোরাঈশদের নিজস্ব গোত্রগত লড়াইয়ের বিস্তৃত্ব রুপ পেয়েছে। মুবাইয়া ইয়াজিদ এবং এই বংশের শাসনামল থেকে মুহাম্মদের চাচা এবং কা'বার রক্ষক আব্বাসীয়দের হাতে ক্ষমতা চলে যাওয়া এবং সেখান থেকেই ভিন্ন সম্রাজ্যের কা'বা ধ্বংস করতে চলে আসা এবং সেখান থেকে তুর্কি অটোমান সম্রাজ্য এবং এই সম্পূর্ণ সময়টাতেই লড়াই রক্তাক্ত ছিলো।
এই সময়টাতেই ধর্মিয় গোঁড়ামি চরম রূপ ধারণ করেম উমর ক্ষমতায় আরোহন করবার সময় যেটার মৃদু চর্চা শুরু হয়েছিলো তা ক্রম ক্রমে আরও বেশী অসহিষ্ণু এবং রক্তাক্ত রূপ ধারণ করেছে।ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র একে অসহিষ্ণু এবং মৌলবাদী করে তুলে। এবং সেখানে বিভেদ এবং বিচ্ছেদের সূচনা হয়। অনড় সংস্কৃতির জন্ম হয় সেখানে এবং নীতিলগ্নতার চর্চা করতে গিয়ে মনুষত্ব্য পরাজিত হয়।
অশোক বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহন করে লড়াই ছেড়েছিলেন কিন্তু তার শাসনামলে হিন্দু মন্দির ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় নি, ধর্ম তাকে রক্তপাত থেকে বিরত রেখেছিলো, কিন্তু বিধর্মীর ধর্মনাশের প্রচেষ্টা থেকে তাকে রুখতে পারে নি।
ধর্ম সব সময়ই শুভবোধের পক্ষে থাকলেও এটাকে যারা মৌল জ্ঞান করে তাদের মৌলবাদীতায় ধর্মের সহিষ্ণুতা এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের ধারণা থেকে ধর্মের সরণ ঘটে, পতন ঘটে, এবং ধর্ম নিজেই নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠে, সেই ধর্ম অবিশ্বাসীর রক্তে নিজের বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি কামনা করে।
প্রকাশ করা হয়েছে: অগভীর ভাবনা বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মার্চ, ২০১১ রাত ৮:৩৩ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
লেখক বলেছেন: লেখা আমার,
এই মতামত ধারণ করে এমন মানুষের কমতি নেই। ধর্ম যখন প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠে তখন ধর্মের নমনীয়তা লোপ পায়, ধর্মীয় আচার এবং ধর্মীয় সংস্কৃতিকে অবিকৃত চর্চা করবার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে ধর্ম মানবিকতা হারায়। এই হলো বক্তব্যের সারাংশ।
মুছাব্বির বলেছেন:
*তথ্য বহুল
কঁাকন বলেছেন:
ধর্ম নিয়ে আপনার এই বিশ্লেষন টা খুব ভালো লাগলোঅসাধারন বিশ্লেষন
ধর্ম সব সময়ই শুভবোধের পক্ষে থাকলেও এটাকে যারা মৌল জ্ঞান করে তাদের মৌলবাদীতায় ধর্মের সহিষ্ণুতা এবং সর্বাঙ্গীন মঙ্গলের ধারণা থেকে ধর্মের সরণ ঘটে, পতন ঘটে, এবং ধর্ম নিজেই নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে উঠে, সেই ধর্ম অবিশ্বাসীর রক্তে নিজের বৃদ্ধি ও সমৃদ্ধি কামনা করে।
ভালো থাকুন
সাধারন মানুষ বলেছেন:
আপনি কি বলতে চান কোন ধর্মই সঠিকভাবে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এমনকি আমাদের ইসলাম ধর্মওযযয.ঋমডপযগপদিু.যডনসগিড.েগম
লেখক বলেছেন: ধর্ম কখনও প্রতিষ্ঠিত হয় কি আদৌ?
ধর্মীয় অনুশাসনের আলোকে মানুষ জীবন যাপনের সংস্কৃতি বেছে নেয়, সে সংস্কৃতি তাকে কিছু বিশ্বাস গিলতে বাধ্য করে, কিছু আচরণের চর্চা করতে বাধ্য করে। এইসব চর্চা থেকে ধর্ম কি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়?
|জনারন্যে নিসংঙগ পথিক| বলেছেন:
একজন মোটামুটি ধর্মপ্রাণ মানুষ তবে ধর্মকে সামনে রেখে নেতি কাজগুলো প্রশ্ন জাগাতো।
আপনার বিশ্লেষন ভালো, কিন্তু আমার মনে হয় শুধু ধর্ম না, যেকোন মতামত বা কাঠামোই (সেটা ছোট হোক আর ব্যাপক ) প্রাতিষ্ঠানিক রৃপ পাবার পরই বিপরীতকে দমন এর দিকে যায়। খুব সোজা একটা উদাহরণ আছে, যেমন নির্যাতন নিবর্তন এর শিকার আমরাই অকল্পনীয় ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি পাবার পর সেই একই নিবর্তন চাপিয়ে দিয়েছি আদিবাসীদের উপর।
লেখক বলেছেন: মতবাদ মতবাদ দমন করতে চায়, সাম্যবাদী মতবাদও একই দোষে দুষ্ট- কিন্তু এইসব দোষত্রুটির সমালোচনা করলে ব্লাসফেমীর দায়ে পড়তে হয় না। রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ হয়েছে ৫ বছর, অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে, তবে এই মতবাদের সাথে কোনো ঐশী অনুপ্রেরণার সংস্রব ছিলো না কিংবা এরা কোনো উপাসনালয় তৈরি করে নি।
ধর্মীয় সংঘাত এবং মানবীয় মতবাদের পার্থক্য তৈরি করে বিশ্বাসীর মন। এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে গিয়ে ধর্মের বিরুদ্ধাচারণও করে।
রাসেল ( ........) বলেছেন:
ধর্ম কি মসজিদের মিনার না গীর্জার চুঁড়া, আমি ইট, কাঠ, সুরকি সিমেন্ট মিলিয়ে গেঁথে দিলাম আর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো? ধর্ম সে অর্থে কোনো সেতু কিংবা মহাসড়ক না যে আমি গিয়ে ভিত্তিপ্রস্তর লাগিয়ে দিয়ে শুভ উদ্বোধন করলাম, টেন্ডার ফেললাম আর পয়সা দিলাম সেটা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলো।ধর্ম মোটা দাগে মানুষকে সামাজিক কর্তব্যাদি সম্পর্কে সচেতন করে, তাকে বিভিন্ন সামাজিক পরিবেশে কি আচরণ করতে হবে এটা বলে দেয়। তার এই কর্তব্যগুলো সামাজিক সম্পর্ক এবং সামাজিক অস্থিরতা দুর করতে সহায়ক হবে এমনটাই ধারণা ধর্মপ্রণেতার।
এই রাজা বা রাষ্ট্রনায়ক বা পার্টিপ্রধান -- এদের সততা ও নৈতিকতার ব্যাপারটা রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সত্য ।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
















"ধর্ম একটা প্রাতিষ্ঠানিক রুপ পেয়ে যাওয়ার পরেই মূলত ধর্মের চরিত্র বদলে যায়"- মুল বক্তব্যের সাথে সম্পুর্ন একমত হতে পারছি না। তবে পোশট পড়ে ভাল লাগছে। ধন্যবাদ লেখার জন্য।