মাঝে মাঝে স্মৃতিকাতরতা রেশমের ফাঁসের মতো গালয় চেপে বসে, দমবন্ধ লাগতে থাকে পুরোটা সময়, অনেক দিন পর পুরোনো শহরে গিয়ে নিজেকে মনে হলো অচেনা আগন্তুক, আমি এই শহরের কেউ না, কাউকে চিনি না, এখানের চলমান জীবনে আমার কোনো স্পর্শ্ব নেই, এমন কি আমি এর অস্তিত্বও ধারণ করি না। এই অপরিচিত বোধটাই সঙ্গী হয়ে থাকলো সবটা সময়। আমি জীবন্মৃত মানুষের মতো পুরোনো শহরের পথে পথে হাঁটলাম।
বন্ধুরা সবাই ব্যস্ত, নিজেদের জীবনে স্থিতু, কেউ শহর ছেড়েছে, কেউ আড্ডা ছেড়েছে, পুরোনো লোক ভবনের সামনের চায়ের দোকানে একটু অপেক্ষা করলে হয়তো কিছু পরিচিত মুখ দেখা যেতো, তবে পৌঁছেছি যখন, এই শীতের রাতে কাউকে আশা করাই বৃথা, কালামের চায়ের দোকানের নিভে যাওয়া আঁচে কিছুক্ষণ অতীত সেঁকে নিয়ে বাসায় পৌঁছালাম।
প্রকৃতি বদলে গেছে, বদলে গেছে শীতের ধরণধারণাও, নইলে ঠিক এ সময়ে একটা পাতলা টি শার্ট পড়ে দিনাজপুরের রাস্তায় হাঁটবার কথাও ভাবতে পারতাম না। কিন্তু এখন শহরটা বিশাল একটা বিপনিবিতান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সব মাঠ আর পুকুর ভরাট করে উঠছে শপিং মল, বাহারী নাম, বাহারী অঙ্গসজ্জা, আর আমি নিতান্ত অতিতচারী, এই শাকিলের বাসার সামনের বাগানটা নেই, সেখানে বড় একটা শপিং মল, শান্তনুর বাসার দরজা আর দেখা যায় না, ট্রান্সকমের দখলে আছে সেটা, স্বপনদের বাসায় এখন কিভাবে ঢুকতে হয় আমি জানি না।
ইটভাটার মালিকদের নিয়ে একটা কুসংস্কার আছে, ওরা মায়ের বুকে আগুণ দেয় বলে ওদের সংসারে সব সময়ই আগুণ লেগে থাকে, ওরা কেউই সংসারে সুখী হয় না, সবটা সময় পুড়তে থাকে, এটাই না কি প্রকৃতির অভিশাপ। মাটির বুকে আগুণ লাগলে সেটার আঁচ জমে থাকে অনেকটা সময়, চুলার ভেতরে জমে থাকা কয়লা আর আশের নিকোনো বারান্দায় বসে থাকা মা'কে দেখে বুঝলাম আমাদের সময়ের ঘড়িটা টিকটিক করে অনেকটা পথা পাড়ি দিয়েছে। সে আগুণে নিভে গেলে শীতের রাতে কোনো এক ঘেঁয়ো কুকুর এসে শুয়ে থাকতো রান্না ঘরে, হেইইইইইই, ছিক ছিক, দুর হ মরার কুকুর বলে তাড়িয়ে দিলে চলে যেতো কিন্তু একটু অন্ধকার নামলেই আবার কুকুরটা ঠিকই ভাঙা বেড়ার ফোঁকর গলে ঠিকই এসে শুয়ে পড়তো রান্না ঘরে, নিজেকে তেমন উদ্বাস্তু অনাহূত এবং উপদ্রবের মতো মনে হলো সারাদিন, যেনো শহরটা আমার মুখের উপরে বেশ্যার মতো সাজিয়ে রাখা দোকানের সব সম্ভার সাজিয়ে বলছে ছ্যাঁক ছ্যাঁক, হ্যাট হ্যাট, দুরে যা মরার কুকুর। আমি সেই অনাদর হজম করতে পারলাম না, তাই সারাদিন কাটিয়ে দিলাম ঘরের ভেতর। গলির মাথায় গিয়ে কোনো মতে সিগারেট শেষ করে আবার ঘরে ফিরে আসা।
অনেকেই অনেক দিন পর শহরে কিংবা গ্রামে ফিরে গিয়ে বাসার বাইরে বের হয় না, অনেকের ভালো লাগে না, হয়তো তাদেরও আমার মতো অনাহুত অনুভুতি বুকে বাজে, মনে হয় এই ভীরে কেউ নেই যাকে নিয়ে একটু অতিতে ভ্রমন করে আসা যায়, যার টানে ঘর ছেড়ে বাইরে যাওয়া যায়।
ফিরে আসবার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলাম, এই অভিশপ্ত শহর ছেড়ে যত দ্রুত যত দুরে সটকে পড়া যায় ততই মঙ্গল, বাসস্টেশনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম, টিকেট পেয়ে মনে হলো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি, কিন্তু সেই বাস আর আসে না। আমি চুপচাপ বসে আছি, বন্ধ থাকা চায়ের দোকানে হেলান দিয়ে বসে আছি, পড়ছি কিন্তু পড়ার চেয়ে বেশী তাকিয়ে আছি রাস্তার দিকে এই বুঝি আমার মুক্তির সংবাদ নিয়ে আসবে ঢাকাগামী বাস।
অনেকটা দেরি করে বাস আসলো, আমি এক ছুটে গিয়ে বাসের সীটে গিয়ে বসে পড়লাম, আমার সামনের সীটে বসে আছে আহ্লাদী এক মেয়ে, ঠোঁট ঝুলিয়ে বসে আছে, বয়েস খুব বেশী হলে ৩০, চোখে সবুজ মাশকারা, মাথার চুল রং করেছে, তার চোখের দিকে তাকালাম, সুবুজ আবরণ সরিয়ে দেখলাম সেখানে কোনো গভীরতা নেই, বরং অগভীর স্রোতস্বীনির মতো সে চোখ কোথাও স্থির নেই, হয়তো তার জীবনেও তেমন স্থিরতা নেই, কে জানে?
একে একে সবাই উঠছে বাসে, আমার সামনের সীটের পুরুষ বেশ গুরুগম্ভীর এবং নিয়মনিষ্ট , অবশ্য গড়পরতা বাঙ্গালীর মতো তাদের শুঁচিবাই আর কর্মোদ্দীপনা বৃহৎ পরিসর ছোঁয় না, এরাই বদলাতে চায়, যেকোনো অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে, সামান্য উলোটপালোট হলে রিকশাওয়ালার গালে চড় মারে, ছিনতাইকারী ধরলে পিটিয়ে খুন করে ফেলা এইসব মানুষেরা আপাতত বাসের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ভীষন ভাবিত, তাই বাসের বাইরেরটা ধো্যা হলো কয়েকবার, ব্যাটা এইখানে ব্রাশ লাগা, এখনও কিন্তু এইখানে ব্রাশ পৌঁছাইলো না, তোরা কি করিস?
বাস ছাড়ার সাথে সাথেই ঠিক আমার পাশের সারিতে বসে থাকা ছোকরার গালে মনে হলো কষে একটা চটকানা লাগাতে পারলে মনটা শান্ত হতো, কোট প্যান্ট পড়া খেলুরে ছোকরা পাশে সবা মেয়েটার সাথে ছোঁক ছোঁক করছে, মেয়েটা বলছে- আমি আপনার সাথে কথাই বলবো না, একটা প্রাণবন্ত সংলাপের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ছোকরা এবং মেয়েটা তার পূর্বপরিচিত, ছোকরার সাথে তার ছেলে, সে ছেলেকে বলছে বাবু তুমি একটু সরে আন্টিকে বসবার জায়গা দাও-
মেয়েটা ছেলেটাকে কোলে নিয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ, আমার ভেতরের নারীরক্ষক পুরুষের উপস্থিতি ছিলো না নিশ্চিত ভাবেই, কিন্তু ফ্রম হোয়াট আই সি, ইট ইজ লিবোডো ইন একশন।
মনে হচ্ছিলো হারামজাদার গালে কষে একটা চটকানা দিতে পারলে হাতের নিশপিশ ভাবটা একটু কমতো, তার বিনীত বিগলিত কথা শুনে মেজাজটা তিরিক্ষি হয়ে গেলো, এ পারফেক্ট পেইন ইন এ্যাস যাকে বলে, এই জুটি আগামি ৮ ঘন্টা আমার পাশে বসে একই ন্যাকামি করে যাবে, বিষয়টা ঠিক মেনে নেওয়া যায় না।
ঠিক তার পেছনে বসে আছে এক মহিলা, বয়েস সম্ভবত ৪০এর কোঠায়, বেচারা চোখা চোখে তাকিয়ে আছে, কোনো কারণ নেই এমন তাকানোর, তবে ইদানিং মাঝে মাঝেই কেউ কেউ রাস্তায় এভাবে তাকিয়ে থাকে, আমি কোনো মতে রাস্তার পাবলিকের চোখ এড়িয়ে প্যান্টের জিআপর চেক করে দেখি, বোধ হয় খোলা আছে, নইলে এমন দৃষ্টির মাজেজা কি। তবে তার দিকে দ্বিতীয় বার তাকিয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেলো, হঠাৎ করেই মনে হলো শুধু জিপার চেক না করে যদি কোনো অলৌকিক উপায়ে প্যান্টের উপরে আরও একটা আন্ডারওয়্যার চাপিয়ে দেওয়া যেতো খুব ভালো হতো, সেটা সম্ভব হবে না বুঝতে পেরেই জানালার বাইরের দৃশ্যে মনোযোগী হয়ে উঠলাম।
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে নিশ্চিত ভাবেই, ফসলের ক্ষেতের উপরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লিচুর চাষাবাদ হচ্ছে, দিনাজপুরের লিচু বিখ্যাত হয়ে উঠেছে গত এক দশকে, এবং বাসায় ১০টা লিচু গাছ থাকলে আর সারা বছরের খোরাকি নিয়ে ভাবতে হয়, মানুষ ধান তামাক বাদ দিয়ে লিচু গাছ লাগাচ্ছে ফলসী মাঠে।
সেইসব সারিবাঁধা লিচু গাছের মাঝে অন্য কারো ক্ষেত, লুণ্ঠিত ক্ষেতে অবহেলায় পড়ে আছে কেটে নেওয়া ধানের গোড়া, শীতে জবুথুবু পুকুর আর ফসলশূণ্য মাঠ- এই দৃশ্যপটের বাইরে ভেতরে একই দৃশ্য চলছে-
তুমি বলো, তোমাকে ভালোবাসি বলেই না এত দুর থেকে আসলাম, বিশ্বাস করো আমি যাকে ভালোবাসি তার জন্য একেবারে নিঃস্ব হয়ে যেতে পারি,
আপনের সাথে আমার কোনো কথা নেই, কিন্তু মেয়েটারও গালয় এই আবেগ বাসা বাঁধছে-
ছেলেটা মাকরসার জতো কথার জালে পেচাচ্ছে মেয়েটাকে, ধীরে ধীরে সংলাপ সামনে আগায় আর মেয়েটার প্রতরক্ষাব্যুহ আলগা হয়ে যায়-
এট দ্য এন্ড ইয়োর ইনস্টিঙ্কট ড্রাইভস ইয়্যু, ইট মে ড্রাইভ ইয়্যু নাট, বাট বিলিভ মি, উই আর সিম্পলি যাস্ট এনাদার এনিম্যাল, উইথ মে বি এ ওয়েল প্রোপোরশনেট বডি, এন্ড দ্যাটস অল, দ্যাটস দ্য এ্যডভ্যান্টেজ উই হ্যাভ, অল দ্য স্টোরি রানস তুওয়ার্ডস দ্য সেম এন্ড-
আপনি আমার কথা বলছেন বাসায়?
মেয়েটা জালে আটকা পড়া পোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল তাকিয়ে থাকে, আর একটার পর একটা কথার জাল গুটিয়ে অবশেষে শিকার ধরা দেয় , কিংবা মেয়েটাও শিকারি হয়ে উঠে, বাঁকা হাসিতে বধ করে ছেলেটাকে-
আমি তো তোমার দেওয়া গান ছাড়া অন্য কিছু শুনি না, মোবাইলে পুরোনো দিনের হিন্দি গান বাজে হঠাৎ হঠাৎ, আর তারা মোবাইলের হের ফোন দুজন দুই কানে দিয়ে একই গান শুনতে শুনতে নিজেদের ভেতরে মগ্ন হয়ে যায়, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসে, আমার সামনের সবুজ মাশকারার গালে চকিত চুম্বন করে সরে যায় সম্ভবত তার স্বামী, আমার পেছনের চোখা চোখের মহিলা কাউকে ফোনে ঝাড়ি দেয়, এত প্রশ্ন করে লাভ আছে, বাস দেরীতে ছাড়ছে, বাসায় পৌঁছাতে দেরী হবে,
আমার পাশের ছোকরা আর মেয়ের প্রচুর মিথ্যা বলছে, আর একটু হলেই বাসায় পৌঁছে যাবো আম্মা,
ভাবী আপনাকে আমি কি যে ভালোবাসি, আপনার সাথে দেখা করে যাইতে পারলাম না বুঝলেন তো মাত্র একদিন বাসায় থাকিছি, এই চলে আসতি হলো, পরের বার গেলে দেখা করবানি ।
তুমি জানো না, যদি সময় থাকতো তাইলে তোমারে নিয়ি যাইতাম আমার এক খালার বাসায়, সেই খালা আমারে কি যে আদর করে, বলি বুঝানো যাবি নে, তারা তো তোমায় পালি এক্কেরে মাথায় তুলি রাখতো।
বাদ দেন এইসব কথা আপনি, আপনি আমার কথা কইছেন বাসায়।
মামা আমরা তো পৌঁছায়া গেছি প্রায়, কি যে বলেন না মামা , আপনি আপনার ভাগনিরে চিনেন না, সন্দেহ করেন আমাকে, বললাম তো অফিসে কাজ আছে, আর থাকা গেলো না।
অন্ধকার আরও গভীর হয়, মিথ্যার পরিমাণ বাড়তে থাকে, হঠাৎ করেই ছোকরা বৌকে প্রবোধ দেয়- এইতো আর বেশি সময় নাই, কুষ্টিয়া থেকি বাহির হলাম, এখন যমুনা ব্রীজের উপরে আছি, পৌঁছায়া যাবা নে সময় হলিই-
আরে আরিচা দিয়া আসবো কেনো, একটু ঘুইর্যা আইছি বুঝছিস, ঐ রাস্তায় আলি পরে না আরিচা ঘাট পারানোর কথা, রুট চেঞ্জ করিছি, টিকিট কি আর পাওয়া যায়-
আমি অন্ধকারে তাকিয়ে হাসি, অবৈধ প্রেম মানুষকে মিথ্যাবাদী বানিয়ে দেয় এবং মিথ্যার সৌধ গড়ে উঠতে থাকে শহরের আনাচে কানাচে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

