বাংলাদেশে কিংবা পূর্ববঙ্গে গভীরভাবে ইসলামী বিধিব্যবস্থার বিশ্লেষণ কিংবা ব্যবচ্ছেদ হয় নি, আমরা যখন বাঙালী থেকে মুসলিম হওয়া শুরু করলাম সে সময়েই ডারউইন বিবর্তনবাদ প্রকাশ করেছেন, ইউরোপের সমাজের ধর্মীয় অনুশাসনের তীব্রতা কমতে শুরু করেছে, সে সময়ে আমরা কিংবা আমাদের ধর্মীয় নেতারা অনুভব করলেন উপমহাদেশে শাসক হিসেবে মুসলমানদের ব্যর্থতার একটা কারণ উপমহাদেশের মানুষজন প্রকৃত ইসলাম থেকে দুরে সরে গিয়েছে।সুতরাং আমাদের মৌলিক ইসলামঅভিমুখী যাত্রা শুরু করতে হবে। বিশুদ্ধ ইসলামে ফিরে যাওয়ার এই আহ্বান এবং রাজনৈতিক প্রচারণা শীঘ্রই সহিংস প্রতিরোধ হয়ে উঠলো, যেহেতু দেশটা ইংরেজাধিকারে অনৈসলামিক হয়ে গিয়েছে এবং এমন অনৈসলামিক দেশে জীবনযাপন সম্ভব নয় সুতরাং এই মতাদর্শ অনুসারীরা জেহাদ শুরু করেছিলো।
সুফীদের প্রচারিত ইসলামে ধর্মীয় বিধিবিধান অনুসরণের কঠোরতা ছিলো না, যারা দীর্ঘ সময় পূর্ব বঙ্গ এবং উপমহাদেশ শাসন করেছে তাদের অধিকাংশ সম্রাটই শুধুমাত্র মুসলমানদের বিভিন্ন বিরোধ ও ঝুটঝামেলা মীমাংসার জন্য ইসলামি বিধান অনুসরণ করেছেন, বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলীম কিংবা নিম্ন শ্রেণীর ধর্মান্তরিত মুসলীমদের ইসলামী অনুশাসন পালনে বাধ্য করেন নি তারা, তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে কোনো নতুন ধর্মাচার কিংবা জীবনাচার তারা প্রবিষ্ট করেন নি। আমাদের পূর্ববঙ্গের মুসলমানগণ কার্যত নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবিচ্যুত হয় নি, ইসলামের আগমণে এদের পীর ফরিক পয়গম্বরের তালিকায় নতুন নতুন নাম সংযুক্ত হয়েছে, তাদের আদিম বিশ্বাস থেকে তারা বিন্দুমাত্র পশ্চাতসরণ করে নি।
দিল্লীতে যখন ঘোষিত হলো ইংরেজ শাসনের ফলে ভারত অনৈসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে সেখানে জুম্মার নামাজ হারাম, সে সময়ে সে মতবাদের অনুসারী ব্যক্তিরা পূর্ববঙ্গে এসে ঘোষণা করলেন এটা দারুল হার্ব, এখানে প্রথাগত ধর্মাচার পালন করা অনুচিত। শুক্রবারে জুম্মা পড়া উচিত কি অনুচিত এ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে বাহাস হয়েছে, দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে, অমীমাংসিত এইসব বিতর্কে সাধারণ মানুষের ধর্মভাবনা আলোড়িত হয়েছে, মসজিদে শুক্রবারের জামাতে লোকসংখ্যা বেড়েছে।
একই সময়ে পাঞ্জাবে ইংরেজ এবং শিখদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পূর্ববঙ্গীয় স্বেচ্ছাসেবকেরা গিয়েছে শহীদ হতে। এই যুদ্ধে সহায়তার জন্য প্রতিটি পরিবারেই মুষ্ঠিভিক্ষার ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে, জেহাদে নিয়মিত সৈন্য সরবরাহ করলেও নেতৃত্ব পর্যায়ের মতদ্বৈততায় এখানেও জেহাদ শুরু হয় নি, সুতরাং বলা যায় দিল্লীর অনুশাসনের চেয়ে পূর্ব বঙ্গের মানুষজন ফারায়েজী আন্দোলনে আলোড়িত হয়েছে বেশী। হাজী শরীয়তুল্লাহর ফারায়েজী আন্দোলন স্থানীয় মোল্লাতন্ত্রকে সুসংগঠিত করেছে, ধর্মউদাসীন পুর্ব বংলার মুসলমানেরা মোল্লাদের নিজেদের নেতা বানিয়ে নিয়েছিলো, অধিকাংশ ব্যক্তিই যেহেতু ধর্ম সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতো না সুতরাং সেখানে স্বল্পশিক্ষিত মসজিদের ইমাম এবং অশুদ্ধভাবে কোরান পড়তে পারা মোল্লা পুরুতেরাই পীরের আসনে বসেছিলেন।
পরবর্তীতে ফারায়েজী আন্দোলনের সাথে আহলে হাদীস আন্দোলনও বেগবান হয়, বিভিন্ন স্থানীয় ইমাম এবং পীরের অনুসারীগণ বিভিন্ন তরিকা প্রচার করেছেন পূর্ব বাংলায়। গুরুমুখী বিদ্যানুসারী বাঙালী পীরানুসারী হয়ে জীবন যাপন করেছে। যদিও সৎকর্মসংক্রান্ত বোধ ও বিচার এদের ছিলো তদাপিও এদের সেসব সৎকর্ম ও সদাচারের উদ্দীপনা এসেছে পীরের নির্দেশনায়।
ধর্মউদাসীন পূর্ব বাংলার মুসলমানেরা প্রতিবেশী সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে সুখে শান্তিতেই বসবাস করছিলো, হিন্দুদের পূজাপার্বনেও তারা অংশগ্রহন করছিলো, ধর্মীয় স্বাতন্ত্রতার বিকারে তাদের সাংস্কৃতিক জীবনকে তছনছ করে দিলো অল্প শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত ইমাম ও মোল্লাগণ। ধর্মীয় বিশুদ্ধতার বানী যত বেশী জোরদার হলো তত বেশী সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা বাড়লো, প্রতিবেশীদের সাথে তুলনীয় নিয়মিত জীবনযাপনের অভ্যাসগুলো কিংবা যা বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ধর্মনির্বিশেষে যা চর্চিত হয়ে আসছিলো দীর্ঘদিন, মুসলিম হয়ে উঠবার তীব্রচাপে সেসব জীবনযাপন ও সংস্কৃতিবিসর্জন দিলো বাংলার মুসলীম। গত ১৫০ বছরের ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অনুসরণের ধারাবাহিকতা এতই প্রচন্ড ইদানিং উদ্ভট উদ্ভট আরবী শব্দ নাম হিসেবে উঠে আসছে আমাদের পরিবারগুলোতে। নামের আগে মোহাম্মদ কিংবা পরে আহম্মদ লাগানোর রীতিও সেসময় থেকে শুরু, মুসলীম নাম হবে আরবি ফার্সি উর্দুতে এই সংস্কৃতি চর্চা করতে গিয়ে ইদানিং বাচ্চাদের নামকরণে কোরান হাদিস আর আরবিতে সুন্দর নামের বই ঘাঁটে বাঙালী মুসলিম।
পূর্ব বাংলার মুসলিমদের আদাব-লবজে মুসলীম হয়ে উঠবার তীব্র বিকার এবং "বাংলা ভাষা সংস্কৃতের দুহিতা " ফোর্ট উইলিয়ামের ইংরেজদের ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং তাদের কর্মচারীদের হাতে বিকলাঙ্গ বাংলা ভাষা সংস্কৃতাকীর্ণ হয়ে উঠবার প্রতিবাদে মুসলমানী বাংলা চালু করে সেটাই মুসলমানদের লবজ বানানোর প্রচারণা এখনও সমাজকে বিভক্ত করে রেখেছে।
সাম্প্রদায়িকতার প্রভাবে সাংস্কৃতিক এবং ভাষিক বিচ্ছিন্নতার উন্মাদনা এবং সমাজের উপরতলার আশরাফ মুসলমানদের নিজেদের রাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের কুকুর লড়াইয়ে বলি হয়েছে আমাদের সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য। আশরাফ এবং আতরাফের লড়াই অনেকাংশেই সামাজিক প্রতিষ্ঠার লড়াই ছিলো, যদিও অর্থে বিত্তে আশরাফগণের প্রতিপত্তী সীমিত ছিলো কিন্তু তাদের বংশগৌরব এবং তাদের সম্ভ্রান্ত পূর্বপুরুষের রক্তের তেজ তখনও তীব্র ছিলো, এরা অপরাপর আতরাফ ঘরে নিজেদের মেয়ে বিয়ে দিতো না।
যেহেতু বংশ গৌরবে আতরাফ কখনই আশরাফ সমকক্ষ হতে পারবে না কিংবা তারা আশরাফ সমাজের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল বাঙালী আতরাফ আশরাফীদের অনুসরণ করা শুরু করে, তাদের মাতৃভাষা বাংলা ছিলো না, তারা উর্দু ফার্সীদের নিজেদের ভেতরে বাতচিত করতো, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা পাওয়ার পর এরাও উর্দু-ফার্সীর চর্চা শুরু করলো, বাংলা অন্ত্যজ জনের ভাষা হিসেবে পরিগণিত হলো।
আশরাফদের সাংস্কৃতিক অনুসরণে থেমে ছিলো না সামাজিক প্রতিষ্ঠার লড়াই বরং অতিশীঘ্রই সেটা হয়ে দাঁড়ালো পারিবারিক পদবী পরিবর্তনের লড়াই। ১৯০১ সালের আদম শুমারীতে দেখা গেলো ১৮৯১ এর আদমশুমারীতে যারা নিজেদের খন্দকার দাবি করছিলো তারা নিজেদের শেখ দাবি করছে, মুসলীম প্রধান একটি জেলায় মোট অধিবাসীদের ৮০% এর বেশী নিজেদের শেখ হিসেবে দাবি করলো, তাদের ধারণা ছিলো সরকার বাহাদুর সমাজে কার কতটা গুরুত্ব সেটা নির্ধারণের জন্যই এই আদম শুমারী প্রকল্প গ্রহন করেছে , সুতরাং ১৯০১ সালের রাজনৈতিক সামাজিক বাস্তবতা হলো এসময় সনাতম ধর্মাবলম্বী অনেকই নিজেদের বর্ণ পরিবর্তন করলো, অর্থনৈতিক ভাবে সচ্ছল মুসলমানেরাও শেখ সৈয়দ পাঠান হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া শুরু করলো।
একজন ডেপুটি কালেকটর বেশ রসিকতা করেই বলেছেন বাংলাদের প্রত্যন্ত একটি জেলায় যে পরিমাণ শেখের বসবাস খোদ আরবের সম্পূর্ণ এলাকায় এত বেশী শেখ নেই , এদের অধিকাংশই এখানে জন্ম নেওয়া সাধারণ মানুষ, যাদের কারোই পূর্বপুরুষ আরবমুল্লুক থেকে এদেশে আসে নি। এটা খুবই আশ্চর্য বিষয় হবে যদি তারা বিশেষত এই স্থানটিকেই হিজরতের জন্য মনোনীত করে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ শেখই এভাবে সামাজিক প্রতিষ্ঠালোভী শেখ। তাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা, তাদের আশরাফী চাল এবং আশরাফীদের রাজনৈতিক ইচ্ছা অনিচ্ছায় নিজেদের মানসিক সমর্পনের প্রভাবে বাংলাদেশে খুব অল্প সময়েই মুসলীম লীগের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছিলো। এরাই নির্বোধের মতো ব্যালটে সিল মেরে পাকিস্তান কায়েম করেছিলো, পাকিস্তান জন্ম নিয়েছিলো উদ্ভট একটি দেশ হিসেবে।
পাকিস্তানের বিচ্ছিন্ন দুটো অংশের ভেতরে কোনো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিলো না, ভাষা ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিবিহিত বিচ্ছিন্ন একটি রাষ্ট্র শুধুমাত্র ধর্মীয় ঐক্যের ভিত্তিতেই বাস্তবায়িত হয়েছে এটা বিশেষজ্ঞদের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। পাকিস্তানের ব্যর্থতা একটি বিষয়ই নিশ্চিত করেছে ধর্মীয় সম্প্রীতিতে একটা সম্প্রদায় গঠিত হতে পারে, কোনো জাতি নির্মিত হতে পারে না। ধর্ম জাতীয়তাবোধের উপকরণ হিসেবে তেমন পোক্ত কিছু নয়। ভাষা এবং সাংস্কৃতিক ঐক্য যতটা সহজে জাতিয়তাবোধের জন্ম দেয় ধর্ম তেমনভাবে জাতীয়তাবোধের জন্ম দিতে পারে না। ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের ২৪ বছর মূলত ধর্মীয় জাতীয়তাবোধ নির্মাণের প্রক্রিয়া বিষয়ে চলমার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ধর্মবিপন্ন জিগির তুললেই পাকিস্তান কায়েম করা মুসলীম লীগের পান্ডাদের স্বদেশী জাতীয়তাবোধ নিশ্চিহ্ন হয়ে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধের উন্মাদনা বৃদ্ধি পেতো।
সমাজের উপরের তলায় শিক্ষার প্রসার ঘটে বেশী, সমাজের উপর তলার আলোড়ন তেমন ভাবে সমাজের নীচের তলায় পৌঁছায় না, ঔপনিবেশিক শাসনামলে সমাজের উপরতলার মুসলমান, তাদের ইংরেজদের আনুকল্য পাওয়ার লোভ লালসা এবং নিজেদের উপমহাদেশের তাবত মুসলমানদের কণ্ঠস্বর হিসেবে উপস্থাপিত করার সময়ও তাদের সাথে নিম্নস্তরের মানুষের সামাজিক যোগাযোগ ছিলো না। সামাজিক স্তরায়নের প্রভাবেই উপরতলার মুসলমানেরা নিম্ন স্তরের মুসলমানেদের হীন ভাবতো, তাদের ভাবনার কোনো অনুরণন পৌঁছায় নি নীচের তলায়। নিম্ন স্তরের মুসলমানেরা উদ্দীপ্ত হয়েছে স্থানীয় অল্প শিক্ষিত মোল্লাদের প্রচারণায়।
পাকিস্তানের ২৪ বছরে শিক্ষিত মুসলিম মধ্যবিত্ত এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত রাজনৈতিক এলিটগণ যখন পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে অগ্রহনযোগ্য ফতোয়া দিলেন তাদের এই উপলব্ধিটুকু সমাজের নিম্নস্তরে সঞ্চারিত হয় নি। ৭০ এর নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণ ধর্মনির্বিশেষেই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছে, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং স্বাধীকারের লড়াইয়ে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিলেও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মীগণ সমাজের মোল্লাতন্ত্রের শেকড় উপড়ে ফেলতে ব্যর্থ হয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ধর্মীয় বৈষম্যমুক্ত সেক্যুলার রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চেয়েছেন, তাদের উপলব্ধি নিম্ন স্তরে সঞ্চারণের দায়িত্ব ছিলো রাজনৈতিক কর্মীদের, এদের অনীহা কিংবা অযোগ্যতায় ক্ষুদ্রতম কিংবা গ্রামপর্যায়ে নেতৃত্ব তখনও মোল্লাতন্ত্রের হাতেই ছিলো।
আমরা কাগজে কলমে সেক্যুলার রাষ্ট্র হয়ে উঠবার ঘোষণা দিয়েও স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে মোল্লাতন্ত্র কিংবা সাম্প্রদায়িকতা উচ্ছেদ করতে পারি নি। রাষ্ট্র সেক্যুলার হয়ে গিয়েও মুসলমান হতে বাধ্য হয়েছে। স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব, পীর-মোল্লা-মাশায়েখদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং মানুষের ধর্মীয় অনুভুতির তরলতা মোল্লাতন্ত্রের হা্ত থেকে স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব কেড়ে নিতে পারে নি। সেক্যুলার সমাজ নির্মাণের প্রধানতম বাধা এই স্থানীয় নেতৃত্বকাঠামো।
হয়তো আমাদের মুসলমান হয়ে উঠবার লড়াইয়ের ভ্রান্তি ছিলো আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের বাতিক। আমরা মাদ্রাসা স্থাপন ও মসজিদ নির্মাণে পূণ্য খুঁজেছি, সমাজ সংস্কার এবং সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ততটা আগ্রহী হয়ে উঠতে পারি নি, আমাদের মাদ্রাসাশিক্ষিত মানুষেরাই গ্রামপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে, এখনও দিচ্ছে, মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকায়নের ব্যর্থতায় আমাদের এইসব স্থানীয় নেতারা এখনও উনবিংশ শতকে মুসলমানী বাংলার রচিত এবং সাম্প্রদায়িকতাআচ্ছন্ন ধর্মবিশ্লেষণ পড়ে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব প্রদান করেন, তাদের কাছে মানুষের সাম্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রতিবেশী হিন্দুদের সাথে নিজেদের সাংস্কৃতিক বিভেদ রেখাটা আরও স্পষ্ট করে তুলবার তাগিদ।
পূর্ব বাংলার মুসলিমদের আদাব-লবজে মুসলীম হয়ে উঠবার তীব্র বিকার , অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পিছিয়ে পরে সমাজের উপর তলার মুসলমানদের ইংরেজানুকল্য পাওয়ার তীব্র ব্যকুলতা, কিয়দংশে খ্রীষ্টান মিশনারীদের ধর্মান্তকরণ ও খ্রীষ্টের বানী সম্প্রচারের আগ্রহে হিন্দু-মুসলীম ধর্মবিরোধী প্রচারণা, শাসক ইংরেজের ভ্রান্তি এবং তাদের প্রশ্রয়ে সংস্কৃতাকীর্ণ আধুনিক বাংলা ভাষার প্রসার এবং এসবের প্রতিক্রিয়ায় স্থানীয় মোল্লাতন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ আন্দোলন ভাষায় সাম্প্রদায়িক বিভাজন রেখা স্পষ্ট করেছিলো।
আশরাফ বংশীয় মুসলীম নেতাগন স্থানীয় মোল্লাতন্ত্রকে ব্যবহার করেছেন, তারা অধিকাংশ সময়েই নিজেদের স্থানীয় মুসলমানন্দের মুখপত্র ঘোষণা করেছেন যদিও নিম্ন স্তরের মুসলমানদের সাথে এদের কোনো সামাজিক যোগাযোগ ছিলো না।
এই শুণ্যস্থানটুকু কেউই পুরণ করতে পারেন নি, আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকেরা শহুরে হয়ে উঠেছে, অগ্রজদের মতো ধর্মউদাসীন হয়েছে, তারা রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের কাছে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি জানিয়েছে কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতাকাঠামো থেকে মোল্লাতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে পারে নি।
বাংলাদেশের রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম। যদি ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি মেনে জীবন যাপন করতে হয় তবে শুক্রবারের খুৎবা দিতে হবে শেখ হাসিনার নামে। ধর্মনিরপেক্ষতার জিগির তোলা আওয়ামীলীগের কার্যকর কোনো ধর্মীয় অঙ্গ সংগঠন নেই, ওলামা লীগ, ঈমাম লীগ তেমন প্রভাবশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়। মাদ্রাসা শিক্ষা আধুনিকায়নে অনাগ্রহ, ওলামা লীগের নেতাদের ভেতরেও রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব, তাদের ব্যর্থতা এবং উচ্চস্তরের মানুষদের জনবিছিন্নতা সব মিলিয়ে আমাদের রাষ্ট্র আরও বেশী ইসলামপন্থী হয় উঠবে, আমাদের এই অন্ধকারযাত্রা শেষ হওয়ার নয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

