এই দেশ আমার , মাটি আমার................

প্রযুক্তি কি আমাদের জীবনকে জটিল করে তুলছে?

২২ শে জুন, ২০০৮ সকাল ৭:০০

শেয়ারঃ
0 0 0

সকালবেলা। এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। তবে তার রেশ এখনো রয়ে গেছে রাস্তায়। বৃষ্টিতে ভিজে চকচক করছে পাড়ার মোড়ের পিচঢালা পথটি। দেখতেও বেশ আরাম লাগছে। চমৎকার ফুরফুরে একটা ভাব। এই ফুরফুরে আমেজ নিয়ে প্রাত:ভ্রমণ করছেন আপনি। আজ যেহেতু ছুটির দিন, তাই অতটা তাড়া নেই। তখনই মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। পকেট থেকে ধীরেসুস্খে ফোনটি বের করলেন। ফোন করেছে গ্রাম থেকে এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়। রাতের গাড়িতে ঢাকায় এসেছেন তিনি। মাত্রই গাড়ি থেকে নেমেছেন। এখনই যেন তাকে নিতে যান, এমন অনুরোধ ফোনে। মুরব্বি স্খানীয় মানুষ তিনি। তার অনুরোধ ফেলা যায় না। অগত্যা এই সাতসকালে রওনা দিতে হয় বাসস্টেশনে।
সুন্দর এই সকালটা এক উটকো ঝামেলা এসে নষ্ট করে দিলো বলে আপনার মন দারুণ খারাপ। মেজাজটাও খানিকটা বিগড়ে গেল। আর আপনি যত রাগ ঝাড়লেন আপনার মোবাইলের ফোনের ওপর। আপনার ইচ্ছে হলো এখনই ফোনসেটটি আছড়ে ফেলে দেন। কিন্তু সেটাও পারছেন না। কারণ আপনি ভালো করেই জানেন, মোবাইল ফোন ছাড়া আপনার একটা দিনও চলবে না। এই যখন আপনি ভাবছেন, তখন মোবাইলে মেসেজ টোন বেজে উঠল। মেসেজ ওপেন করে দেখলেন, বসের জরুরি নির্দেশ, মালগুলো যেন আজই পৌঁছায়, তার ব্যবস্খা নিতে। আপনার দিনটাই যেন মাটি হয়ে গেল। সাথে খানিকটা টেনশন বাড়ল। চাপ তো অবশ্যই।
যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন অনেক সহজ করে দিয়েছে। দূরকে করেছে কাছে। যোগাযোগ প্রযুক্তির কল্যাণে সবাই যেন একই সুতোয় গাঁথা। একই নেটওয়ার্কে আবদ্ধ। তবে এই যোগাযোগ প্রযুক্তিই কিনা কেড়ে নিচ্ছে আমাদের যাবতীয় আরাম-আয়েশ আর একান্ত ব্যক্তিগত নিজস্বতা। যত দূরেই যান না কেন, আপনি সবসময় থাকছেন নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত। অনেকটা মোবাইল কোম্পানির সেই বিজ্ঞাপনের মতো­ পালাবে কোথায়।
যোগাযোগ প্রযুক্তির বাঁধন থেকে পালানোর আসলে কোনো পথই নেই। সে দিন সে কথাই বলছিলেন একটি বিজ্ঞাপনী সংস্খার এক ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। তিনি বলছিলেন, মোবাইল ফোন আর ইন্টারনেট প্রযুক্তি মানুষের একান্ত নিজস্ব জগৎ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিজস্বতার ভেতরে হুটহাট ঢুকে পড়ছে বাইরের বিশ্ব, যা শুধু তার স্ট্রেসই বাড়িয়ে তুলছে। ঘরে কিংবা সবখানেই যেন সে কর্মেবন্দী হয়ে থাকছে। কথা প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, মোবাইল ফোন ছাড়া যদি চলা যেত, তাহলে জীবনটা অনেক সুন্দর হতো। অন্তত তার তাই ধারণা।
শুধু যে মোবাইল ফোন তা কিন্তু নয়, ইন্টারনেট প্রযুক্তিও মানুষের জীবনকে স্ট্রেসপূর্ণ করে তুলতে সমান ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। সকালবেলা আপনি অফিসে ঢুকেই ই-মেইলটা খুললেই পেয়ে যাচ্ছেন একগাদা মেইল। এর বেশকিছু অবশ্যই আর্জেন্ট। কিছু ধীরেসুস্খের, আর কিছু অকাজের মেইল। তবে যাই হোক, এত মেইল দেখে কিন্তু আপনি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিছুটা টেনশন বাড়ে আপনার।
স্ট্রেসমুক্ত থাকতে আপনি হয়তো ভাবছেন, মোবাইল কিংবা ইন্টারনেট ব্যবহার না করলেই হলো। কিন্তু একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে আপনাকে সারাক্ষণ এগুলোর সাথেই বসবাস করতে হবে। আর এর ফলে আপনি হারাবেন আপনার বিনোদনের মুহূর্তগুলো, পরিবারকে সময় দেয়ার দমটুকু কিংবা একান্ত নিজস্ব মুহূর্তটুকু। আমেরিকার সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন পরিচালিত এক জরিপে অংশগ্রহণকারীর অর্ধেকই জানিয়েছেন, তারা পাঁচ বছর আগের চেয়ে এখন অনেক অনেক বেশি পরিমাণ স্ট্রেস অনুভব করেন। তারা এও জানিয়েছেন, তাদের এই স্ট্রেসের বেশিরভাগই আসে কর্মক্ষেত্র থেকে।
যোগাযোগ প্রযুক্তি ‘মাল্টি টাস্কিং’ বলে এক কেতাবি শব্দের সাথে আমাদের বেশ ঘটা করে পরিচয় করে দিয়েছে। ‘মাল্টি টাস্কিং’ হলো একই সময়ে একই সাথে একের অধিক কাজ করা। বর্তমানকালে যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে একজন এক্সিকিউটিভকে আদতেই ‘মাল্টি টাস্কিং’ কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। কিন্তু একজন মানুষের পক্ষে ‘মাল্টি টাস্কিং’ কতটা সম্ভব? শুনুন না ‘ক্রেজিবিজি’ বইয়ের লেখক ড. এডওয়ার্ড এম হ্যালোওয়েলের মন্তব্য­ ‘একজন মানুষের পক্ষে একই সময়ে একই সাথে সাধারণ মাপের দ’ুটি কাজই করা সম্ভব। একটি হলো ফাইল করা আর আরেকটি হলো গান শোনা।’ এবার তাহলে বুঝুন, যারা ‘মাল্টি টাস্কিং-এর ঠেলা সামলান, তাদের কী অবস্খা?
এদিকে ইনফরমেশন এনজাইটি টু বইয়ের লেখক রিচার্ড সল উরম্যান বলেছেন, মানুষের প্রবণতা হচ্ছে, সে সবই করতে পারে। আর সবই করতে গিয়ে তাকে সারাক্ষণ সংযুক্ত থাকতে হয় মোবাইল ফোনের সাথে, ইন্টারনেটের সাথে। ফলে তার কাজের সময় অনেক বেড়ে গেছে। সত্যি বলতে, তার অফিসের সময় শেষ বলে যেন কিছু নেই। আর উরম্যান এ জন্যই মোবাইল ফোন এবং ব্ল্যাকবেরিকে কালপ্রিট বা নাটের গুরু বলে অভিযুক্ত করেছেন। কেননা এগুলো যে কাউকেই যেকোনো সময়ে কানেক্ট করার সুযোগ করে দিচ্ছে। উরম্যান অবশ্য এর সাথে সাথে আরো একটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। আর তা হলো ওভার ইনফরমেশন [তথ্যভারাক্রান্ত অবস্খা]। কারণ ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কেউ এক মুহূর্তে হাজারো তথ্য পেয়ে যাচ্ছে। এই তথ্যগুলোর কোনো কোনোটি কারো জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ সৃষ্টি করছে।
এই লেখাটি পড়ে আপনি হয়তো ভাবছেন, তাহলে কী আমরা যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাদ দিয়ে আগের অবস্খায় চলে যাব? না, এটা মোটেই কোনো সমাধান নয়। মাথায় ব্যথা বলে মাথা কেটে ফেলে দেয়া কোনো সমাধান নয়। তবে যোগাযোগ প্রযুক্তি যাতে আমাদের জীবনযাপনকে কোনোভাবেই জটিল করে তুলতে না পারে, সেই সমাধান খুঁজে বের করাই সবার কাম্য। কিভাবে এর সমাধান করা যায়? ব্লগারবৃন্দ কি জানেন?



 

বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ২২ শে জুন, ২০০৮ সকাল ৭:১৮
নতুন বলেছেন: আমাদের দিন >>> দিন দিন আরো ব্যাস্তো হবে.. :)
২. ২২ শে জুন, ২০০৮ সকাল ৭:২৩
রাজনীতি বলেছেন: ভালই লিখচ। এজন্য ধন্যবাদ। গতকালের কথা যেন মনে থাকে। বিকালে রুমে আইসো।
৩. ২২ শে জুন, ২০০৮ সকাল ৯:২০
ইফতেখার ভূইয়া বলেছেন: আমার মতে, মোবাইল ফোনটা অত্যন্ত জরুরী বিষয়, এটার সাথে কোন কমপ্রোমাইজে আসা যাচ্ছেনা। তবে এটাও সত্যি যে মোবাইলের চেয়ে আমরা ইন্টারনেটেই বেশী সময় নষ্ট করি। জীবনকে আমরাই জটিল করে তুলছি। ইন্টারনেটে চ্যাট করে প্রচুর সময় নষ্ট হয়, আমিও করেছি অস্বীকার করার কিছু নেই। ইন্টারনেটের ব্যবহারের ব্যাপারে একটু সচেতন হলে প্রচুর সময় সেইভ করা সম্ভব।

জীবনটাকে আমরাই কমপ্লেক্স করে তুলছি, মোবাইল কথা বলার ডিভাইস, তাতে ভিডিও, গেইম, মিউজিক, ওয়েব যোগ করা হয়েছে, বলছিনা সেটা খারাপ, তবে এখনকার দিনে আমরা কিন্তু ওদিকটাতেও কম সময় ব্যয় করছিনা। আসলে ইচ্ছে থাকলে নিজেকে অনেকটাই অর্গানাইজড রাখা সম্ভব, সমস্যা হলো আমরা অনেকেই জানিনা নিজেকে কিভাবে অর্গানাইজড রাখতে হয়। লিখার জন্যে ধন্যবাদ।

 

মোট সময় লেগেছে ০.৯৩৫৪ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
সুস্থ মনের সকল ব্লগারদের এই ব্লগে স্বাগতম । লেখার উপর কোন বাজে মন্তব্য গ্রহনীয় নয়। আশকরি সকলেই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন।...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই