মন খারাপ নিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। অফিসের গাড়ি আসবে তুলে নিতে। গাড়ির আসার কোনো টাইম-টেবিল নেই। প্রায় যানজটে আসতে দেরি হয়। তাই বলে দেরি করা যায় না। যেদিন একটু গড়িমসি করি, এসে দেখি আমাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গাড়ি চলে গেছে। তাই ঠিক সময়টায় এসে দাঁড়াই। অনেক ক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তখন গাড়ির ধুলো গায়ে মাখা ছাড়া আর কোনো কাজ থাকে না। ভীষণ অস্বস্তি লাগে। মন খারাপ আর পারিপার্শ্বিক অস্বস্তি দুয়ে মিলে মনটা বিষিয়ে আছে।
দূরে একটা পাগলকে দেখলাম সিগন্যালে আটকে যাওয়া গাড়িগুলোকে লাঠির ভয় দেখিয়ে পয়সা নিচ্ছে। অন্য সময় হলে হয়ত মন দিয়ে দেখতাম। মজা লুটতাম। এখন ভাললাগছে না। মুখটা ফিরিয়ে নিলাম। সিগন্যাল ছেড়ে দিল। গাড়িগুলো ছুটল। পাগলটা গুটি গুটি পায়ে আমার দিকে এগিয়ে আসে। আমি আড়চোখে এসব দেখছি। আমার থেকে একটু দূরে একটা ল্যাম্পপোস্টের নিচে এসে পাগলটা দাঁড়ালো। রাগী রাগী চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি না দেখার ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকাছি। যেন ওকে গ্রাহ্য করছি না।
পাগলটা আমার ওপর বিরক্ত হয়ে উঠল।
ওই ব্যাটা, আতংক-ছড়ানো কণ্ঠে পাগল বলল, ওই... দুই ট্যাহা দে’...
উদ্যত লাঠিতে আমাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।
হুট করে আমার মাথায় রোক চেপে বসল।
কিছু না ভেবে চড়া গলায় বলে উঠলাম, ওই এহন তোর মার খাওয়নের টাইম অইছে।
পাগলটা যেন একটা ধাক্কা খেল।
বিড়ালের মতো নি:শব্দে কেটে পড়ল।
এবার আমার মন খারাপের কারণটা বলি।
ভার্সিটিতে পড়া অবস্থায় টুকটাক লেখালেখিতে জড়িয়ে পড়ি। একটা পত্রিকায় মাঝেমধ্যে লিখতাম। ওরা আগ্রহভরে ছাপাত। টুকটাক প্রশংসা করত। চাকরিতে আসার পর অনিয়মিত হয়ে পড়ি। তারপরো মাঝেমধ্যে চেষ্টা করি। ওরা ছাপায়। সমকালীন সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যাগুলো নিয়ে লিখি। এর জন্য কোনো প্রকারে সম্মানি নেই না। স্টুডেন্ট লাইফে অবশ্য নিজ থেকে চেয়ে নিতাম। তবে যা দেয়া হতো তা হাস্যকর রকম নগণ্য। তারপরো লিখতাম; এখনো লিখি। নিজেকে নির্ভার করার জন্য লিখি। নিজেকে দায়মুক্ত করার জন্য লিখি। আমার কষ্ট-আমার দ্রোহ পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করে এক ধরণের স্বস্তি পাই। কিছুদিন আগে একটা লেখা পাঠিয়েছিলাম। বিমানবন্দরের সামনে থেকে বাউল ভাস্কর্য অপসারণের প্রতিবাদে। কাল একটা মে’ল পেলাম ওই পত্রিকা থেকে। সাব এডিটর মহোদয়া লিখে পাঠিয়েছেন,
Shaplu,
tomar lekha niomito pai.kintu riply kora hoy na samoyovabe.
ebarer lekhta jacche na,dainiker simaboddhoya mathay rekhe ektu bujhe likho.
asha,bhalo aacho dhakay.
lekha pathio
আমি প্রত্যুত্তরে লিখি-
ব্যাপারটা কি বুঝলাম না ...।
তোমরা সরকারের বিরুদ্ধে যা খুশী লিখলে ছাপাও।
বিরোধীদলের বিরুদ্ধে লিখলেও ছাপাও।
আমেরিকার বিরুদ্ধে..
কেবল ছাপাও না মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কিছু লিখলে।
ঘটনা কি?
তোমরা কি নিজামীর দলে নাম লেখালে?
ভালো থেকো।
নইলে ভালো থাকার অভিনয় করো, কেমন
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বেশি সুফল ভোগ করছে সম্ভবত সংবাদপত্র জগত্। তারা যার খুশি তার বিরুদ্ধে লিখতে পারে। নিজেদেরকে একেকজন মন্ত্রী-মিনিস্টারের মতো ভাবে। সবসময় কুছ পরোয়া একটা ভাব। কিন্তু আশ্চর্য একটা ব্যাপার, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেলেই পত্রিকাগুলোর যেন গলা শুকিয়ে আসে। আর হুজুররা একটা হুংকার দিলে তো কথা নেই। দোর্দন্ড-প্রতাপশালী কমিউনিস্ট সম্পাদক পর্যন্ত হুজুর কাছে গিয়ে নাক খত্ দিয়ে আসে।
আমি বছর চারেক আগের একটা ঘটনা জানি। উল্লেখ করার মতো কিছু না। চট্টগ্রামের এক উঠতি লেখক তার গল্পের কোনো একটা জায়গায় লিখেছিল, গৌতম বুদ্ধের মতো কুকুরকুণ্ডলী পাকিয়ে...’। গল্পটা স্থানীয় একটা পত্রিকায় ছাপা হয়। এতে স্থানীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ক্ষেপে ওঠে। তারা কুকুর ও গৌতম বৌদ্ধকে এক লাইনে রাখাকে কোনো ভাবে মেনে নিতে পারছে না। তাদেরকে বোঝানোও যাচ্ছে না কুকুরকুণ্ডলী আসলে একটা আসনের নাম। বুদ্ধ এই আসনেই বেশি সময় কাটাতেন। এতে তাকে খাটো করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। শেষমেশ পত্রিকা ও লেখক দু’পক্ষকেই ক্ষমা চেতে হয়। সেই উঠতি লেখটি উঠে যান পত্রিকার কালো তালিকায়।
এতে ভয় কেন মৌলাবাদীদের। এরা সবগুলো মিলে তো নির্বাচনে ১০ শতাংশ ভোটো পায় না। কি করে বলি এদের পেছনে জনসমর্থন আছে। তাহলে কি এরা বর্বর বলে এই ভীতি? উন্মাদ বলে?
মোড়ের ওই পাগলটার মতো কি সবাই লাঠির ভয়ে ওদের সমীহ করছে।
কিন্তু কত কাল এই সমীহ।
জোরসে একটা ঝাড়ি মারা যায় না?
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



