বাংলাদেশ স্বাধীন হবার কয়েক বছর পরের ঘটনা। দরিদ্র ঘরের মেয়ে হামিদা বানু, কম বয়সেই বিধবা হয়েছিলেন।পাচটি ছেলেমেয়ে নিয়ে কোন রকমে দিন কাটান।
বাড়ীওয়ালি রওশনআরা খুব ভাল মানুষ, খুব স্নেহ করেন তাকে। বাড়ীওয়ালা হায়দার সাহেব পেশায় ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু করেন অটোমোবাইলসের ব্যবসা। ধনে জ্ঞানে মানী মানুষ। এলাকার এক নাম্বার প্রভাবশালী ব্যক্তি। ঢাকায় ৪/৫টি বাড়ীর মালিক। তৎকালীন পাকিস্তান পিরিয়ডে ঢাকা শহরের যে কয়জন গুটিকয়েক মানুষের গাড়ী ছিল তার মধ্যে তিনি একজন। বাড়ীর সামনে সাদা ফিয়াট গাড়ীটা রাজহাসের মত সগর্বে মাথা তুলে দাড়িয়ে থাকত। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিদারির আভিজাত্য গোধুলি আলোর মত তখনও জলমল করত। সেই আভিজাত্যকে নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে আরো বাড়িয়ে নিয়ে গেছেন বহু গুন।ভীষন হৃদয়বান মানুষ তিনি।
হামিদা, রওশনআরার টুকটাক কাজ করে দেয়,অন্য ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ভাড়া তুলে তা যথাযথ ভাবে রওশনআরার হাতে তুলে দিয়ে ক্রমেই সে তার আস্হাভাজন হয়ে উঠে। রওশনআরাও তাকে না দিয়ে কিছু খান না, পরম মমতায় হামিদার হাতে তুলে দেন নতুন শাড়ী কাপড়।নিজের ছোট বোনের মতই তিনি বিধবা হামিদাকে লালন করতেন।
বাড়ীওয়ালির সুন্দরী মেয়ে নীলার উপর চোখ পড়ে হনুমানমুখী বখাটে যুবক ফরিদের। ফরিদ লোভ দেখায় হামিদাকে। নীলাকে পেতে সাহায্য করলে সে তার হাত সোনায় মুড়িয়ে দিবে। হামিদা লোভে পা দিলো। ভুলে গেলো নিজেরও দুটি মেয়ে আছে। বাড়ীওয়ালার ঘরে অবাদ আসা যাওয়ার সুযোগে,তাদের বিশ্বাসকে পুজি করে এবং রওশনআরার ছোট ছেলেটির মৃত্যুর সুযোগে নীলার চুল নখ ওড়নার প্রান্তের কাপড় এবং ঘরের হাড়ির খবর সব পাচার করতে থাকল ফরিদের কাছে। কুফরী কালাম(অনেকেই বিশ্বাস করেনা আমিও করতাম না) করে এবং নীলার বয়সের সুযোগ নিয়ে ফরিদ বিয়ে করে ছাড়ে নীলাকে। অসহায় বাবা মায়ের মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। মেয়ের জন্য কত বড় বড় ঘরের ভাল প্রস্তাব এসেছে কিন্তু বাবা মা ফিরিয়ে দিয়েছেন, ভেবেছেন মেয়ে আরেকটু বড় হোক আরো লেখাপড়া শিখুক। মা বাবা কোনদিন এই বিয়ে মেনে নেননি। ভন্ড ফরিদের ফাঁদে পড়ে নীলাও সুখী হতে পারেনি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শুধু কষ্টই করেছে। ফরিদ চেয়েছে নীলাকে দিয়ে ভদ্র সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে এবং সে সফলও হয়েছে।আর নীলা ফরিদের সংসারে দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে অনেক সাধ আকাক্ষা বিসর্জন দিয়ে বেচে ছিল। সেই সাথে ছিল ফরিদের শারিরিক ও মানসিক অত্যাচার। প্রায়ই মাতলামি করে নীলার গলা টিপে মেরে ফেলতে চাইতো। নিজে নিজে বিয়ে করেছে বলে কাউকে বলতে পারত না তার কষ্টের কথাগুলো। বুকের গভীরে গুমরে মরত নীলা।নিদারুন মানসিক যন্ত্রনায় হার্টের অসুখ ধরা পড়ল তার। অবশেষে হার্টের অসুখে অনেকটা বিনা চিকিৎসায়ই মারা যায় নীলা।
মা রওশনআরা যতটা পেরেছেন মেয়ের সংসারে সাহায্য করেছেন। ভারতে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চাইলে ফরিদ বলত, যদি অপারেশন টেবিলে নীলা মারা যায়। ওকে কি ফেরত দিতে পারবেন। আমার ছোট বাচ্চা গুলার কি উপায় হবে। এই সব বলে ফরিদ সবাইকে চিকিৎসা করাতে বাধা দিত।
হায়দার সাহেবও পরবর্তীতে জটিল স্নায়বিক রোগে ভুগে দশ বছর বিছানায় শয্যাশায়ী ছিলেন।তার কোন বোধ শক্তি বিচার বিশ্লেষন ক্ষমতা ছিল না।তাকে শিশুর মত দেখাশোনা করতে হোত।স্বামীর সেবা নিষ্ঠার সাথে করে গেছেন রওশনআরা। স্বাভাবিক ভাবেই অবস্হা পড়ে যেতে লাগল। তার ছেলেরা বাবার মত দক্ষ হাতে ব্যবসা চালাতে পারল না। আর যা সম্পদ ছিল তাও শেষ করে দিল যার যার স্বার্থ উদ্বারে। ৮৬ সালে মারা যান হায়দার সাহেব।চার বার ব্রেন স্ট্রোক করে পা একসিডেন্ট করে আজও বেচে আছেন রওশনআরা। তিনিও শিশুর মত হয়ে গেছেন। এখন তার বড় মেয়েই তার দেখাশোনা করেন।বড় মেয়েটিও হয়েছে বাবা মায়ের মত কোমল মনের।
নীলার বিয়ের পর, হামিদাও আস্হা হারাল রওশনআরার। আগের মত রওশনআরা আর তাকে কাছে ডেকে নেন না। হামিদার বড় মেয়েটি বিয়ের যোগ্য হয়েছে। কোথায় পাত্রস্হ করবে সেই চিন্তায় তার ঘুম আসে না। অবশেষে পাশের ঘরে এল এক ভাড়াটিয়া যুবক। স্বল্প বেতনের ড্রাইভার গোছের কেউ একজন। মেয়ের জামাই হিসেবে যুবককে হামিদার পছন্দ হোল। কৌশলে সে মেয়েকে লেলিয়ে দিল যুবকের পিছনে। প্রতিদিন ভর দুপুর বেলা যুবককে নিজের ঘরে বসে আদর করে ভাত খাওয়াতো। খাওয়া শেষ হলে মেয়েকে যুবকের কাছে লুডু দিয়ে বসিয়ে দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে চলে যেত। ফলে যা হবার তাই হল। মেয়েটি গর্ভবতী হয়ে গেল। মেয়েটি মায়ের কাছে পাচ মাস পর্যন্ত এই তথ্য গোপন রেখেছিল। হামিদা চেয়েছিল শুধু তাদের মধ্যে ভাব ভালোবাসা হোক আর ছেলেটি তার মেয়েকে বিয়ে করুক। কিন্তু পানি এতদূর গড়াবে সে বুঝতে পারেনি। হামিদা যুবককে সব বলতেই সে সব অস্বীকার করল এবং বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দিল। তারপর রাতের অন্ধকারে সেই যুবক পালিয়ে গেল। লোকলজ্জার ভয়ে হামিদা শ্বাসরুদ্ধ পাখির মত ছটফট করতে লাগল। ভেবে ভেবে ঠিক করল এই বাচ্চা নষ্ট করতে হবে। অনেক ডাক্তারের কাছে গেল হামিদা কিন্তু কেউই পাচ মাসের বাচ্চা নষ্ট করতে রাজী হল না। কারন এতে মায়ের জীবনের ঝুকি আছে। অবশেষে এক ক্লিনিকের আয়া মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে এই কাজ করে দেয়ার আশ্বাস দিল। দুরু দুরু বুকে হামিদা মেয়েকে নিয়ে হাজির হল আয়ার কাছে। আয়া তার মেয়েকে নিয়ে হারিয়ে গেল ক্লিনিকের কোন এক দরজার আড়ালে। অদক্ষ আয়া উল্টা পাল্টা প্রসব করাতে গিয়ে প্লাসেন্টা জরায়ু সহ, প্যাচানো অবস্হায়, অপরিনত, মৃত ভ্রুন বের করে আনে। সেই প্যাচ ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে সে কাচি তুলে নেয় হাতে এবং কাটা শুরু করে। হামিদা দরজায় বসে আছেতো আছেই। অপারেশন শেষ হবার নাম নেই। বাইরে বসে শুধু শুনতে পাচ্ছে ভিতরে কুটুর কুটুর করে কি যেন কাটার শব্দ। ভয়াবহ অপারেশন এবং অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরনে মেয়েটি তখনই মারা যায়। রুম থেকে বের হয় মেয়েটির লাশ। হামিদা চীৎকার করে কাঁদতেও পারে না, পাছে লোকে এই কলংকের কথা জেনে যায়। তারপর লাশকে বোরকা পড়িয়ে রুগী সাজিয়ে রিকশায় বসিয়ে নিয়ে গেল বাড়িতে। রাতের অন্ধকারে কবর দিল মেয়েকে।
পরবর্তীতে, মমতাময়ী রওশনআরা হামিদার অনেক কান্নাকাটি এবং ক্ষমা প্রার্থনার পর তাকে ক্ষমা করে দেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০০৮ রাত ৮:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



