বিয়ের পনেরো বছর পর জন্ম হয় নীপার, তাই বাবা মায়ের ভীষন আদরের। চাঁদের মত সুন্দর ফুটফুটে একটি মেয়ে। শুধু লেখা পড়াতেই যা একটু দূর্বল। বাবা গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের হেড মাস্টার। বাম হাতটা প্যারালাইসিসে অবশ বহু দিন। পূর্ব পুরুষেরা বিস্তর জমি জমা রেখে গেছেন, তাই স্বচ্ছল ভাবে কেটে গেছে দিন। নীপার এরপর আরো দুটি ভাই জন্ম নেয়। বাবার শারিরীক অক্ষমতার সুযোগ আর মায়ের অতিরিক্ত আদরে বড় ভাইটা বি এ ফেল আর ছোটটা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত পড়ে। নীপাও বহু কষ্টে মেট্রিক পাশ করে।
আদরের মেয়েটিকে সুপাত্রস্হ করতে কোন বাবা মা না চায়। সব বাবা মাই স্বপ্ন দেখে তার সন্তানটি সুখে শান্তিতে স্বামীর সংসার করবে। নীপার মামাবাড়ী থেকে বিয়ের প্রস্তাব এল। পাত্রের নাম রফিক, পেশায় ব্যবসায়ী,ইন্টারমিডিয়েট পাশ। ঢাকায় বাড়ী আছে(ভাইরা যার যার ফ্ল্যাট তৈরী করে নিয়েছে),অনেক দিন কুয়েত ছিল। ছেলের বাবা নেই, সেই সবার বড়, বাকী সব ভাইবোনদের সেই বি এ, এম এ পাশ করিয়েছে। যাহোক সবার মোটামুটি পছন্দ হল। বয়সটা যা একটু বেশী। নীপার থেকে বছর বিশেক বড় হবে, সেসময় চল্লিশ চলছিল। দেখতে আহামরি কিছু না। শ্যামলা, গালে গভীর করে ব্রনের দাগ। পুরুষ মানুষের ব্রনের দাগ কোন ব্যাপার না!!
স্কুলের হেড মাস্টার বাবা যতটুকু পারলেন ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিলেন। বিয়ের দিন জানা গেল, ছেলে আগে একটা প্রেম করেছিল। সেই মেয়ের অন্যত্র বিয়ে হওয়ায় ছেলে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে এবং বেশ কিছুদিন তাকে চিকিৎসা নিতে হয়। এখন সে সুস্হ। রফিকের কোটিপতি মামা সাত আটটা গাড়ীবহরের সাথে বরযাত্রী নিয়ে বিয়ে করাতে আসে এবং খেয়ে দেয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সেরে নীপাকে নিয়ে চলে যায়। প্রথম প্রথম সুখেই দিন গুলো কাটছিল। অল্প দিনের মধ্যেই সন্তান সম্ভবা হয় নীপা। কিন্তু দুঃখজনক ভাবে আট মাসের মাথায় গর্ভপাত হয়ে যায়। এভাবে পর পর তিনবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। চার বারের বেলায় নীপা অবশেষে পুত্র সন্তানের মা হল। একের পর এক সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে নীপা অসুস্হ হয়ে পড়ল, একলাম্পশিয়া হল। পানিতে শরীর ফুলে গেল। তারপরও কষ্ট করে স্বামী সন্তানের সেবা করে যেতে লাগল।
দিনকে দিন রফিকের কুৎসিত রুপটা বেরিয়ে আসতে লাগল। সে নীপাকে অনেকটা বন্দি করে রাখতো। কোথাও বের হতে দিত না। কদাচিৎ বের করলেও নিজে নিয়ে যেত। ধীরে ধীরে সেটাও বন্ধ হয়ে গেল। নীপার কোন স্বাধীনতা ছিল না। আত্মীয় স্বজনের সাথে ফোনে কথা বলাও নিষেধ। উঠতে বসতে অপমান, সবার সামনে বলতো তুমিতো একা কিছু করতে পার না সব আমাকেই করতে হয়, অথর্ব ব্যর্থ একজন মেয়ে মানুষ, আমাকে শারিরীক সুখও দিতে পার না। রফিকের ঝগড়ার আর একটা প্রিয় বিষয় হল নীপার পরিবার। নীপাকে যন্ত্রনা দিত এই বলে যে তার ভাইরা সব বিএ এমএ পাশ, তোর ভাইরা সুশিক্ষীত না,নীপার মা নানী মামা সবাই খারাপ। । সে নাকি একটা অযোগ্য পরিবারে বিয়ে করেছে। রফিকের আবার শুধু ফুটানির অভ্যাস,তার অমুক আত্মীয় জজ তমুক আত্মীয় ব্যারিস্টার।
ছেলে যখন স্কুলে যাওয়া শুরু করল, তখন সুবিধাবাদীর মত ছেলের ডিউটি চাপিয়ে দিল নীপার উপর। খুব ভোরে উঠে নাস্তা বানানো তারপর ছেলেকে রেডী করে স্কুলে নিয়ে যাওয়া এবং এক ফাকে বাসায় এসে রান্না করে আবার ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে আসা। দুপুরের খাবারের পর আবার ছেলেকে নিয়ে কোচিংয়ে ছোটা। এভাবে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নীপার পরিশ্রম বিন্দু মাত্র স্পর্শ করত না রফিককে।উল্টো রফিকের নির্যাতন বেড়েই চলল। গায়ে হাত তোলা শুরু হয়েছে আরো আগে থেকেই। শারিরীক মানসিক অত্যাচার এবং হাড় ভাঙ্গা খাটুনিতে নীপা শুকিয়ে পাটকাঠির মত হয়ে গেছে।
নীপার বাবা মারা যাবার বছর কয়েক পরে মা ও মারা যান। ভাই দুটা হয়ে পড়ে ছন্নছাড়া। এরপর তারাও বিয়ে শাদী করে সন্তানের বাবা হয় এবং জমিজমা নেড়ে চেড়ে খেয়ে জীবন কাটাচ্ছে। বোনের জামাইকে শক্ত করে কিছু বলার সৎসাহস তাদের নেই। নীপার পিছনে দাড়ানোর কেউ নেই দেখে রফিকের নির্যাতনের মাত্রা যেন কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। বলে আমার বাড়ীতে থাকিস কেন বের হয়ে যা।
ছেলের জন্য টিচার রাখা হয়েছে। মেয়েটি নীপারই দূরসম্পর্কের বোন, নাম হোসনা। এই মেয়ে একদিন নীপার কাছে এসে বলল "আপা আমি আমার বড় বোনের বাসায় থেকে পড়ছি।কিন্তু দুলাভাইয়ের শারিরিক নির্যাতন সইতে হচ্ছে আমাকে,একটু আশ্রয় দাও। আমি তোমার ছেলেকে পড়ানোর পর এখানে বসে কিছুক্ষন নিজের পড়া পড়ব।"নীপা সরল বিশ্বাসে তাকে ঘরে জায়গা দেয় এবং মায়া করে এই মেয়ের কাছে ছেলেকে পড়তে দেয়। । ঢাকায় এসে সে নাকি সংগ্রাম করে এই পর্যন্ত এসেছে। অর্থাৎ জগন্নাথ থেকে বাংলায় এমএ এবং তিন বার বি সি এস দিয়েছে একবারও সুবিধা হয়নি। এখন রফিকেরই প্রবল চেষ্টায় একটি বেসরকারি কলেজে ডুকেছে। রফিক এখন এই মেয়ের গুণমুগ্ধ ভক্ত। রফিকের ভাষায় নীপার গাল আর হোসনার স্যান্ডেল এক সমান। দুজনের পরকী্য়া প্রেমের আগুনে নীপার অবশিষ্ট সংসারটুকু ভেঙে বালির সাথে মিশে গেছে।
হোসনা দিন নেই রাত নেই এখানেই পড়ে থাকে। বসে বসে নীপার দোষ খুজে বের করে এবং রফিকের কাছে নীপার নামে মিথ্যে অভিযোগ করে। রফিকও ওই মেয়ের কথায় রাগে অন্ধ হয়ে বেদম পিটায় নীপাকে। এই জন্যই কি বাবা মা ভরসা করে, একজন পুরুষের হাতে মেয়েকে তুলে দেয়। নীপার বিছানাতেই দুজনে বসে গল্প গুজুব করে এবং নীপার চোখের সামনেই দুজনে দরজা লাগিয়ে আদিম আনন্দে মেতে উঠে। হোসনার কি একবারও মনে হয় না নীপাও আমার মত একটি মেয়ে।
ছেলেটিও বাবার অস্বাভাবিক আচরনের কারনে কিছুটা অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠছে। বাপকে চোখের সামনে অন্য মেয়ের কাপড় উঠাতে দেখে সেও বাড়ীর মেয়েদের কাপড় তুলে দেখতে যায়(বয়স ১১/১২)। বাবার দেখাদেখি সেও মাকে মারে।চীৎকার গালি গালাজতো লেগেই আছে। রফিক ছেলেকে বোঝায় তোর মা একটা অলক্ষী। তোর মা চলে গেলে আমরা নতুন মা নিয়ে আসব, আমাদের বাড়ি গাড়ী হবে। ছেলেও বাবার কথায় সায় দেয়। মা কি জিনিস সেই উপলব্দী তার এখনও হয়নি। সর্বশেষ খবর ছেলের বার্ষিক পরীক্ষা পর্যন্ত রফিক নীপাকে রাখবে এরপর বের করে দিবে। তার ভাইরা নিজেরাই চলতে পারে না বোনকে কি দেখবে।
এই অসহায় মেয়েটা কোথায় যাবে। কি অপরাধ এই মেয়েটির কেউ কি বলবে। লেখাপড়াটাও ভালমত শিখেনি যে চাকরী করে খাবে, নেই কোন জায়গা সম্পদও। এরকম মানুষ রুপী পশুদের পিটিয়ে চুনকালি মাখিয়ে জুতার মালা পরিয়ে সারা দেশ ঘুরানো দরকার,বুকে লেখা থাকবে "আমি নারী নির্যাতনকারী, গত বিশ বছর আমি একটি মেয়েকে অত্যাচার করেছি-সবাই আমাকে থুতু মেরে জুতা দান করুন"। হোসনার মত তথাকথিত শিক্ষীত ডাইনীদের পাবলিক টয়লেট পরিষ্কার করতে দেয়া হোক, গলায় লেখা থাকবে আমি পরকিয়া করেছি, আরেকটি মেয়ের সংসার ভেঙেছি। সরকার কি এরকম উদ্যেগ নিতে পারে না। ভাবতে অবাক লাগে রফিকের মামাতো বোন যে কিনা এই দেশের প্রথম সারির হাইলি মডার্ন একজন শিল্পী, যার ছবি বড় বড় বিলবোর্ডে ঢাকা শহরে শোভা পাচ্ছে। সেই পরিবারেরই আরেকটি মেয়ের এমন করুন দশা।কেউ কি দেখার নেই?
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৩:৫২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



