প্রতিমাসে আমাদের টানতে টানতে মেজভাই-ভাবি হতাশ আর তিতি-বিরক্ত। ভাইটি যদিও মুখ ফুটে তেমন কিছু বলতেন না, তবে একদিন ভাবি বলে ফেললেন, তোদের আর কত টানবো? তিনি চাইতেন আমরা যেন অর্থনৈতিক প্রয়োজনে তাঁদের দ্বারস্থ না হই।
মোম যখন পুড়েপুড়ে নিঃশেষ হয় তখন তার সঞ্চালক সূতোটিও পুড়ে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু ওটা যদি কোনোও ভাবে নিভে যায়, তাহলে সূতোটি বিশ্রীভাবে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মোমের গায়ে লেগে থাকে দহনত্যাচারের ক্ষত।
সময় মত ভাবির নোটিস চলে এলো বাবামায়ের কানেও। কিন্তু যাবো না বললেই কি তা পালিত হয়? প্রয়োজন যেখানে হাত বাড়িয়ে আছে, অভাব যেখানে শিবের বুকে কালী! সেখানে যথাযথ অভিমানও রক্ষা হয় না। হওয়ার কথাও না। তবে আমরা যেতাম। তবে আগেকার মত সেই যাওয়াটুকুতে কোনো প্রাণ ছিলো না। আগে যাওয়া হতো নিয়মিত। তারপর সেটা পরিবর্তিত হতে লাগলো। তবুও যেতাম আমরা। নিষ্প্রাণ। জবুথবু। দায়ে পড়া। নিতান্তই টাকার জন্যে। না কোনো আত্মীয়তা বোধ, না কোনো সৌজন্য। অন্তর্গত দীনতা আর প্রচন্ড অনিচ্ছাকে চেপে রেখে যেতাম। ফলে হলো কি? দূরত্ব বাড়তেই লাগলো। আশেপাশেও তার ছোঁয়া লাগলো। যে কারণে বাবার মৃত্যুর পর সংবাদটা সঠিক সময়ে পৌঁছানোর মানুষটাও পাওয়া গেল না। মেজভাই সংবাদ পেয়েছিলেন এবং এসে উপস্থিত হয়েছিলেন বাবার দাফনের পর।
দুলাল একবার আক্ষেপ করে মাকে বলেছিলো যে, আমরা তাঁর বাসায় কেউ যাই না। মা তাৎক্ষণিক জবাবে বলেছিলেন, পয়সাপাতির দরকার হলেই তো যায়! যায় না কিভাবে আবার!
দুলালের উত্তর ছিলো, কোনো এক ছুতোয় গেলেও তো দেখা-সাক্ষাৎ হয়।
আসলে যে ভাবেই হোক না কেন, গ্রামীনফোনের বিজ্ঞাপন Stay in touch... কথাটা একবার ভেবে দেখলেই অনেকগুলো সমাধান কিন্তু হুড়োহুড়ি করে চলে আসে। বানিজ্যিক ভাষা বলে অতটা মাথা ঘামাই না।
যেতাম আমরা। কেউ না কেউ। পিতা থেকে শুরু করে পরবর্তী দুপুরুষ পর্যন্ত। শুধুই টাকা-পয়সার জন্যে। ফলে, আমরা Touched ছিলাম তাঁদের সঙ্গে। তাঁরা আমাদের... এভাবেই রক্ষা হচ্ছিলো যোগাযোগ।
একদিন আমার ছাপরা ঘরে মেজভাই ভাবি আসলেন। কোথায় বসতে দেই? আমার যে সোফাসেট নেই। ওরা কি বিছানায় বসবে? আমার কম্পিউটারের টেবলের সঙ্গে ছিলো একটি চেয়ার। তা কি য়থেষ্ট? অবশ্য গ্রামে হলে পাশের ঘর বা বাড়ি থেকে দু'একটা চেয়ার নিয়ে আসা যেতো। কিন্তু ইট-লোহার শহর বলে কথা। ভাবি সারাক্ষণই দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে একদিন দেখা হওয়াতে বলে ছিলাম যাওয়া তো ভুলে গেলেন! ভাববির উত্র ছিলো, বসার জায়গা তো দিতে পারলি না!
সেই থেকে ইতি। অনেক দিন। দীর্ঘ সময়। শুনতে পাই মেজ ভাই পুনরায় তাঁর পুরোনো প্রেমে মাঞ্জা দিয়ে কোমর বেঁধে নেমেছেন। বিয়ে করে খিলগাঁ থাকেন আলাদা বাসায়। কালেভদ্রে বড় বউয়ের কাছে আসেন। আমরা নিজেরা যার যেমন ব্যস্ত হয়ে পড়ার আগে যে কোনো ভাবেই হোক Touched ছিলাম কিন্তু পরে সেটা আর থাকলো না। আল খোবারে থাকা ছোট ভাই মাবু ফোনে একদিন জানালো যে, মেজ ভাবি আমেরিকা যাওয়ার আগে মানসিক যন্ত্রণা এড়াতে একবার আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। তার বউ কাজল উদ্ধার করেছে বলে মেজ ভাবি বেঁচে গেছেন। সত্য মিথ্যা আমার অজানা।
মেজভাবির কষ্টের আর একাকীত্বের সময়গুলোতে কাজলই ছিলো তাঁর নিকটজন। আমাদের কারো সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিলো না। কাজল তাঁকে সার্বক্ষণিক সঙ্গ দিয়ে পাহারা দিয়ে ঠিক রেখেছে। তবে আমার মনে হয় প্রতিটি পরিবারেই একটি করে কাজল থাকে। যার কাজ সেই কুকুরটির মত। যেই কুকুরটি একবাড়ির দরজার সামনে থেকে জুতো মুখে করে অন্য বাড়ির দরজায় ফেলে দিয়ে প্রতিবেশীদের মধ্যে অনৈক্যের সৃষ্টি করে। যদিও কাজল ছিলো মেজ ভাবির ঘনিষ্ঠজন তবুও তার মাধ্যমেই আমরা সব খবরাখবর পেয়ে যেতাম। মেজভাইয়ের গোপন বিয়ের খবর সেই রাষ্ট্র করে দিয়েছিলো।
আমার শৈশবে প্রচন্ড অভাব আর দারিদ্রের মধ্যে বেড়ে উঠেছি। এক সময় স্কুলে যাওয়ার জন্য আমার সার্টও ছিলো না। সার্টের অভাবে স্কুলে যেতে পারতাম না। টোকাইদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম। অভাব মানুষের মানসিকতার ক্ষতি করে দিয়ে যায়। অভাবী মানুষ বেশির ভাগই স্বার্থপর আর অনুদার। যে কারণে আমরা ও মাঝেমধ্যে উদারতা ভুলে যাই। মজ্জাগত আর চর্চিত ব্যাপার দুটোর মধ্যে নিশ্চয়ই পার্থক্য কম না?
সেই সময় মা বলতেন, টাইন্যা আনতে ছিঁড়া যায়। তার মানে সেই একই কথা। নদীর একূল গড়ে তো ওকূল ভাঙে। মেজভাবির শখ ছিলো টোনাটুনির সংসার পাতবেন। পেতেও ছিলেন। কিন্তু বাবুল হলো কাঁটা। থাকতো বারান্দায়। সে মরে গিয়ে তাঁদের নিষ্কৃতি দিলেও দুলাল গিয়ে উঠলো তাঁদের পল্লবীর বাসায়। যদিও দুলালের সঙ্গে ভাবির সম্পর্ক ছিলোদা-কুমড়ার। তবুও তিনি ছিলেন সেখানেই। কিছুদিনের জন্য ছিলাম আমিও। কিন্তু আমার কাছেই কেবল পরিষ্ফুট হয়েছিলো তাঁর হৃদয়ের আরেকটি উজ্জ্বল দিক। কিডনির অসুখে আক্রান্ত হয়ে আমি কিছুদিন শয্যাশায়ী ছিলাম। ছিলাম উত্থাশক্তি রহিত। একদিকে মা অন্যদিকে মেজভাবি। দু'জনের কাঁধে ভর করে বাথরুমে যেতাম। যিনি আমার আরেক অন্নদাত্রী। আমার জননীর আরেক ছায়া। এই প্রবাসে পরিজনহীন অবস্থায় নিদ্রছুট গহন রাতে যখন ভাবি তখনই পরিচয় পাই তাঁর মহানুভবতার। আমার চোখ ফেটে পানি বেরিয়ে আসে। এই যে বসে বসে লিখছি চেষ্টা করে যাচ্ছি রোধ করতে উদগত অশ্রু। প্রবাসে না এলে আমি বুঝতেই পারতাম না যে, দেশে আমি কী ফেলে এসেছি!
এ দেশে আসার আগের দিন মেজভাই আর ভাবির সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে শুধু তাঁকেই ঘরে পেয়েছিলাম। আমার তখন খুব বেশি করে আমার রোগশয্যার কথাগুলো মনে পড়ছিলো। বিদায় চাইতে পারিনি। ইচ্ছে হচ্ছিলো তাঁর পা ছুয়ে সালাম করি। কিন্তু কোনো এক বোধ আমাকে বিরত রেখেছিলো সেদিন।
আমি সৌদি আরবে আসার পর শুনেছি তিনি পাড়ি জমিয়েছেন আমেরিকায়। অথচ মেজভাই চাইতেন ভাইবোন বাপমা নিয়ে একসঙ্গে গিট্টু লেগে বাস করতে। কিন্তু এখানেও উল্টো হাওয়া। আগেই বলেছি যে মানুষের সব চাহিদা... তিনি পুরোনো প্রেম ঝালাই করে বিয়ে করে সয়সার পেতেছেন। টোনাটুনির সংসার। যেটা মেজ ভাবিরই কাঙ্ক্ষিত ছিলো। মেজভাই এখন ইচ্ছে করলেও সংসার বড় করতে পারবেন না। সময় থাকলে বয়স থাকবে না। বয়স থাকলে সময় থাকবে না। প্রকৃতির এ এক অদ্ভূত খেয়াল! তাঁদের দু'ছেলেমেয়ে দু'দেশে। বাব কোথায়, মা কোথায়, ভাই বোন কোথায়? কেন এমন ছিন্নভিন্ন অবস্থা। অবশ্য আমি এখানে বসে যেমনটা ভাবছি অত জটিল নাও হতে পারে। প্রবাসে বসে সব কিছু জানা সত্যিই দুষ্কর!
আমি চলে আসার আগে তাঁকে বলেছিলাম মেনে নিতে। হয়তো চেষ্টা করেও তিনি ব্যাপারটা মানতে পারেননি। তাই কষ্ট আড়াল করতে সরে গেলেন বিভূঁইয়ে। আমার মনে হয় পালিয়ে গেলেন।
জীবনের অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে কিছুটা হলেও । আপস করতে হয়। আপসহীন মনোভাব বেশিরভাগ সময়ই বিপর্যয় ডেকে আনে। বঙ্গবন্ধু এবং টিক্কা-ইয়াহিয়াদের আপসহীনতার জন্যেই আমাদের উপর চেপেছিলো ন'মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অগণিত মানুষের আবর্ণনীয় দুঃখ, শোক-তাপ-আহাজারি! ভাবি ক্ষাণিকটা কষ্ট স্বীকার করে হলেও যদি নিয়তিকে মেনে নিতে পারতেন, তাহলে মনের কষ্টটা এত বড় হয়ে বুকে বাজতো না। মেজভাই যখন আমেরিকায় যান, তাঁর সঙ্গে কি দেখা হয় না? কথাবার্তা হয় না? সতিনের কথা মনে পড়লে কি মানুষটিকে তিনি আচ্ছন্ন করতে পারেন অনাবিল ভালোবাসায়?
আমাদের মা সারাজীবন স্বামীকে ভালোবাসতে না পারলেও (শুধু ঝগড়া করতেই দেখেছি তো!) বৈধব্য বরণের পর স্বামীর প্রেমে আকূল হয়ে উঠলেন। সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিনি এখন গ্রামেই খুঁজে পেয়েছেন স্বর্গের অনাবিলতা। এখন স্বামীর ভিটাই তাঁর ধ্যান-জ্ঞ্যান। বেপথু নাতিদের কাছে অর্ধাহারে অনাহারে থেকে বিনা চিকিৎসায় কষ্ট পেলেও হাসিমুখে বরণ করে নিচ্ছেন সবই। নিজের তৈরী কষ্টের পিঞ্জরে ধাতস্ত হয়ে গ্রামের মানুষের কাছে এটিই প্রমাণ করলেন যে, ছেলে আর বউদের কাছে তিনি অবহেলিত। অথচ তাঁর প্রত্যেকটি ছেলে এবং বউ চায় তিনি তাদের সঙ্গেই বাকিটা জীবন কাটান। এটা তিনি বারবার শুনেও বুঝতে চান না। ছেলেদের কাছে থেকে তিনি স্বাচ্ছ্বন্দ্য বোধ করেন না।
আমরা সবাই এভাবে দূরে দূরে না থাকলে দুলাল'দাকে পরিজনহীনতার কষ্ট কুরে কুরে খেতো না। বাবার চোখের পানি মাড়িয়ে বেবির যে সাধের বিয়ে, তাকে বিচ্ছেদে রূপ দিয়ে একা একা প্রবাসী জীবনের দিকে পালিয়ে যাওয়ার জন্যে হন্যে হয়ে উঠতে হতো না। মাবুকে স্বেচ্ছাবন্দী হতে হতো না তার আপন কারা কুঠিতে। বাচ্চু'দার ছেলে-মেয়েদের কেউ কেউ এভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারতো না অঙ্কুরেই। আর তাঁর বিধবা বউ সুখ চেখে চেখে ক্লান্ত আর শ্রান্ত হয়ে ফিরে আসতো না পরিত্যাক্ত সন্তানদের আশ্রয়ে। যেখানে সে আসার পর জ্বেলে দিয়েছে অদৃশ্য আগুন। সুজন বউকে পুড়িয়ে মারতে চায়। প্রতিদিন নানাবিধ নির্যাতন চালায় বিধবা শাশুড়ির বৈভব করায়ত্ত্ব করার অপবাসনায়। অথচ নিজে পছন্দ করেই সে বিয়ে করেছিলো এই মেয়েটিকে।
তাই সারাদিনের মানসিক খাটাখাটুনির পর ইঞ্জিনিয়ার আর অশিক্ষিত মিশরিয় দুরাত্মাদের সঙ্গে হল্লাচিল্লা করে শ্রান্তিতে অবসন্ন হয়ে আসে শরীর। এই পাথুরে প্রবাসে মাঝরাতে কখনও কখনও ঘুম ভেঙে যায়। হিসেব কষি। মেজ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা নেই মনে হয় পাঁচ বছর। ছোট ভাইটার সঙ্গে দেখা নেই চারবছরের বেশি। আর তখনই একজোট হয়ে হামলে পড়ে যাবতীয় সুখদুখ! নিদ্রাছুট গহন রাতে একাকী সব টুকরো ছবি জোড়া দিতে বসি। একটির সঙ্গে আরেকটি মিলাই। কিন্তু মেলে না। ফাঁকগুলো বড় বেশি হয়েই চোখে লাগে। এখন যদিও খানিকটা অনুভূতি অবশিষ্ট আছে, তাও বোধকরি একদিন লুপ্ত হয়ে যাবে জাগতিক প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির হিসেবের আড়ালেই! পুরোপুরিই তখন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো আমরা। আমাদের উত্তরসূরীরা কেউ কাউকে চিনবে না। বিস্তিীর্ন জনারণ্যে একজন আরেকজনকে অতিক্রম করে যাবে অচেনা পথিকের মতই। তাকাবে না পিছু ফিরে। অনুভব করবে না পূর্বপুরুষের ঘাম আর রক্তের ঘ্রাণ! স্বার্থপরের মতই হয়তো তৎপর হবে না আপন শিকড়ের সন্ধানে! এ যে কত কষ্টের! এ যে কতবড় ব্যর্থতা! এ যে কতবড় পরাজয়- কী করে বোঝাই?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

