হৃদয়ের ব্যাপার-স্যাপার
০৬ ই মে, ২০০৮ রাত ২:০০
ইশতিয়াককে শাসন করতাম বলে সে আমাকে পছন্দ করতো না। বুঝতে পারতাম না সে আমাকে ভালবাসে কিনা। কিংবা আমিও বুঝতে পারতাম না। সৌদি আরব চলে আসবো শুনে সে খুবই খুশি হলো। বললো, ‘বাবা বিদেশে চইলা গেলে আমাকে আর মারতে পারবে না!’
যেদিন আসবো তার আগের দিন ফ্লাইট হওয়ার কথা ছিলো। বনানী এজেন্সিতে গিয়ে অপেক্ষা করলাম। টিকেট পেলাম না। গভীর রাতে ঘরে ফিরে আসি। মটুর কাছে শুনতে পাই ইশতিয়াক কেঁদেকেটে ঘুমিয়েছে।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই আমাকে দেখে সে বিছানা থেকে হঠাৎ লাফিয়ে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। আমি তাকে কোলে লুফে নিতেই আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে চুপ হয়ে রইলো। আমি অনুভব করতে পারছিলাম আসলে তারা আমাকে কতই না ভালোবাসে!
ইমতিয়াজের যখন তিন-চার মাস বয়স। একদিন রাতে আমি বাইরে থেকে ঘরে এলাম। দরজায় দাঁড়িয়ে জুতো মোজা খুলছিলাম। কিন্তু সে তার মায়ের কোলে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে চেষ্টা করছিলো আমার কোলে আসার জন্যে। কিন্তু আমি এগিয়ে গিয়ে তাকে কোলে নিচ্ছি না দেখে সে ক্রুদ্ধ হয়ে দু’হাত মুঠিবদ্ধ করে হিঁইঁ করে একটি বিচিত্র শব্দ করলো। আমার তখন এতই ভালো লাগছিলো। আমি এই ভেবে বেশ প্রশান্তি অনুভব করছিলাম যে, আমার বেঁচে থাকাটা অর্থহীন নয়। কেউ আমার জন্যে, আমার আদর ভালোবাসা বা স্পর্শ পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করে। আর তাই আমার আরো দীর্ঘদিন বাঁচতে ইচ্ছে করে।
এই তো মানুষের জীবন। এমনই বিচিত্র তার আকর্ষণ। শত কষ্ট হলেও, ঘরে এলে আমার যাবতীয় কষ্ট ভুলে যেতে পারি। মনে হয় স্বর্গ এটাই। আমার ঘরেই আমি অনুভব করি স্বর্গীয় সুখ। অফিস থেকে ঘরে ফিরে বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দে বিভোর হতে দেখে বউ বলতো, ‘তোমার জানে কুলায় কত? সারাদিন খাটাখাটনি কইরা আইলা, কই জিরাইবা না পোলাপাইনের লগে শুরু করছে কি!’
আমি আরো উৎফুল্ল হয়ে বলতাম, ‘ঘরে আইলাম মানেই তো রিল্যাক্স। এই-ই আমার রেস্ট। এই-ই আমার শান্তি!
ইমতিয়াজকে এগার মাস বয়সের রেখে আমি সৌদি আরবের আল মাজমাহ নামক এলাকায় চলে আসি। আসার এক সপ্তাহ পরেই নাকি সে হাঁটতে আরম্ভ করেছে। জুলাইর বিশ তারিখে এদেশে ঢুকেছি। অগাস্টের ষোল তারিখে ইমতিয়াজের এক বছর পূর্ণ হয়। সেদিন কোনো কাজ করতে পারিনি। ক্ষণেক্ষণেই আমার ভেতর থেকে হুহু করে কান্না উথলে উঠছিলো। চোখ ঝাপসা হয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাচ্ছিলো কম্পিউটারের মনিটর। রুমালে চোখ চেপে রাখি। কিন্তু অশ্র“ নিবারণ হয় না। সেদিন বৃহষ্পতিবার ছিলো বলে বেলা তিনটায় অফিস ছুটি হয়ে গেছিলো। কিন্তু আমার মনের ভেতর জমে থাকা অবশিষ্ট কান্নাগুলো কি করে বের করবো? অবশিষ্ট সময়টা কোনোভাবে কাটিয়ে সন্ধ্যার পরপরই চলে গেলাম মরুভূমির দিকে। অন্ধকারে বসে বসে দীর্ঘক্ষণ বিসর্জন করলাম অশ্র“। কিন্তু হায়, এ পোড়া প্রবাসে মরুর ছোঁয়ায় মনটা আরো ভেঙে এলো যেন। বুঝতে পারছিলাম আমার স্ত্রী-সন্তানদের কতটা ভালবাসি। বাংলাদেশে থাকতে কখনওই ব্যাপারটা অনুভব করতে পারিনি। তাই প্রবাস জীবনটা আমার জন্য আসলে একটি চমৎকার শিক্ষাকাল বলতে পারি। বলতে পারি আমার অনুভবের উন্মেষ কালও। হৃদয়ের ব্যাপার-স্যাপার এখানেই প্রথম উপলব্ধি করতে পারি; উপলব্ধি করতে পারি দেশে থাকতে কে আমাকে পাগলের মত ভালোবাসলেও মুখ ফুটে কোনোদিন বলেনি।
লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): হৃদয় ;
মাইনুল বলেছেন:
লেখাটি খুব ভাল লেগেছে। ঠিক বলেছেন দুরে থাকলে অনেক কিছু বোঝা যায়।
লেখক বলেছেন: সমান্তরাল অনুভূতির জন্য ধন্যবাদ।
রাতমজুর বলেছেন:
মন ছুঁয়ে যাওয়া লেখা।
জুলিয়ান সিদ্দিকী বলেছেন:
ধন্যবাদ আপনাকে।
বিষাক্ত মানুষ বলেছেন:
প্রিয়তে রাখলাম ... সময় করে পড়বো
লেখক বলেছেন: আপনার মতামত পেলেই আমার জবাব পাবেন।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।


















