প্রথম দিন রিয়াদ বিমান বন্দর থেকে আমাদের ওটিসি’র মাজমাহ টেকনিক্যাল অফিসে এসে কাগজ-পত্র বুঝে নিয়ে ঘুমিয়ে কাটালাম। যদিও বনানীর এনাম ইন্টারন্যাশনাল এর অফিসে ওটিসি’র অ্যাডমিন ডিরেক্টর আব্দুল্লাহ আল ওমায়ের আমাকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলো ফার্নিশড রুম দেবে। কিন্তু আসার পর তার সঙ্গে দেখা তো হলোই না। ভারতের কেরালার এক লোক হায়দার করে নাম, সে আমাকে একটি কম্বল, বালিশ আর একটি ফোমের বিছানা চাদর সহ দিয়ে অফিসের অদূরেই একটি কাঠের কন্টেইনারে ঢুকিয়ে দিয়ে হিন্দিতে বললো, ‘তুমি এখানেই বিশ্রাম নাও। পরে বেড আর ভালো জায়গার ব্যবস্থা হবে।
আমি আর ভারতের আরেক বিহারি ছেলের সঙ্গে মেঝের উপরই ফোম বিছিয়ে বিছানা করে শুয়ে পড়লাম। আগের দিন অর্থাৎ ১৯শে জুলাই ২০০৬, সকাল সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়েছি। এয়ার ইন্ডিয়ার চুতিয়া সার্ভিসের টিকেট দিয়েছিলো এনাম ইন্টার ন্যাশনাল। সেই চুতিয়া সার্ভিস বিকেল পাঁচটায় আকাশে উড়ে দিল্লি বিমান বন্দরে গিয়ে থামে। সারারাত বিমানবন্দরের ভেতরেই বিনিদ্র আর ক্ষুধার্ত হয়ে বসে বসে সময় পার করি। সঙ্গে ডলার বা ভারতীয় মুদ্রা না থাকায় কিছুই কিনে খেতে পারছিলাম না। ভাগ্যিস বউ একটি প্যাকেটে করে আমার পছন্দের ছোলার হালুয়া বরফি বানিয়ে দিয়ে দিয়েছিলো। তা ফুরিয়ে গেছে রাতেই। এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ভোর চারটায় আরেকটি বিমানে আমরা মুম্বাই বন্দরে বিমান বদল করি। সেই বিমানে করে বেলা দশটায় রিয়াদ বন্দরে অবতরণ করি। সেখানেই আমাদের জন্য ওটিসি’র লোক অপেক্ষা করছিলো গাড়ি নিয়ে।
যাই হোক সৌদি আরবের প্রাথমিক দিনগুলো যাপন শুরু করলাম মেঝেতে ঘুমিয়ে আর স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে কেরালার বাবুর্চির বিশ্রিী রান্না খেয়ে। আমি তখনই বুঝতে পারছিলাম যে চুতিয়া আব্দুল্লাহ আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, কোথাও যাওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। ভালো জায়গা তো দূরের কথা। এখানে মরুভূমির মাঝেই ক্যাম্প বানিয়েছে বাটপার ওটিসি। একটি রুমে চার-পাঁচজন করে থাকে। লেবার ড্রাইভারদের তো আরো করুণ অবস্থা। কিন্তু আলাপে জানতে পারি একেকজন চার-পাঁচ-আটবছর ধরে আছে। সময় মত ছুটিতে যায় আবার ফিরে আসে। মন আমার দমে গেলেও মনোবল হারায়নি। নিজকে প্রবোধ দিলাম- ধরে নাও তোমার দু’বছরের জেল হয়ে গেল!
কিন্তু সবাই অপরিচিত বলে কোত্থেকে দেশে ফোন করবো তাও বুঝতে পারি না। পুরোনো বাঙালীরা ঠিকমত জবাব দেয় না। কেউ বলে, অনেক দূর ইন্টারনেটে কথা বলার সুবিধা আছে। গাড়ি ছাড়া যাওয়া সম্ভব না। বাঙালীদের যাদের গাড়ি আছে সবগুলোই কংক্রিট টানার মিক্সার কিংবা ডাম্প ট্রাক। তাদের মোবাইল ফোন থাকলেও দেওয়া উৎসাহ পায় না। হয়তো বন্ধুত্ব হয়নি বলে। জানায়, ফোনে পয়সা নাই। পরে একজন ভারতীয় ছেলে, ওটিসি ওয়র্কসপে মেকানিকের কাজ করে, বিহারের অধিবাসী। সোহরাব করে নাম। সে বললো, ‘একটি কার্ড নিয়ে এসো। আমি তোমার দেশে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’ সেই দিনই তাকে দশ রিয়াল দিলাম। বেলা একটা দু'টোর দিকে তাকে নাম্বার দিতেই সে আমার ঘরে রিঙ করলো। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ত্যাগের দশদিন আর সৌদিআরবে প্রবেশের ন’দিন পেরুতে চলেছে।
আমার কন্ঠস্বর পেয়েই মটু হঠাৎ কেঁদে উঠে বললো, ‘এক লগে দশটা বসর কাডাইলাম! অহন যে তুমি নাই, দশদিন ধইরা তোমার কোনো খোঁজ-খবর পাই না, দেখি না, আমার খারাপ লাগে না?’
বউয়ের কথা শুনে আমার বুকের ভেতর উথাল-পাথাল শুরু হয়। বিবাহিত জীবনের দশ বছরের ভেতর এই প্রথম তার জন্য হৃদয়ের গহনে নদীর পাড় ভাঙার শব্দ শুনি। আর সেই নদীর ছলকে উঠা পানি অকস্মাৎ ছিটকে এসে বুঝি আমার চোখেও প্লাবন ঘটায়।
বিবাহিত জীবনের দশ বছর পার করে দিয়ে প্রথম মাজমাহ সানাইয়া (শিল্প এলাকা)র এই মরুভুমিতেই নিজের হাতে কাপড় ধুই। নখ কাটি। চাল-ডাল-তরিতরকারি সেদ্ধ করি। রান্না কি আর রান্না- আগুনে তাতিয়ে গলধঃবরণ করে ক্ষুধা নিবারণ করি আর কি!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

