somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হৃদয়ের ব্যাপার-স্যাপার-২

০৭ ই মে, ২০০৮ রাত ১:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথম দিন রিয়াদ বিমান বন্দর থেকে আমাদের ওটিসি’র মাজমাহ টেকনিক্যাল অফিসে এসে কাগজ-পত্র বুঝে নিয়ে ঘুমিয়ে কাটালাম। যদিও বনানীর এনাম ইন্টারন্যাশনাল এর অফিসে ওটিসি’র অ্যাডমিন ডিরেক্টর আব্দুল্লাহ আল ওমায়ের আমাকে প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলো ফার্নিশড রুম দেবে। কিন্তু আসার পর তার সঙ্গে দেখা তো হলোই না। ভারতের কেরালার এক লোক হায়দার করে নাম, সে আমাকে একটি কম্বল, বালিশ আর একটি ফোমের বিছানা চাদর সহ দিয়ে অফিসের অদূরেই একটি কাঠের কন্টেইনারে ঢুকিয়ে দিয়ে হিন্দিতে বললো, ‘তুমি এখানেই বিশ্রাম নাও। পরে বেড আর ভালো জায়গার ব্যবস্থা হবে।
আমি আর ভারতের আরেক বিহারি ছেলের সঙ্গে মেঝের উপরই ফোম বিছিয়ে বিছানা করে শুয়ে পড়লাম। আগের দিন অর্থাৎ ১৯শে জুলাই ২০০৬, সকাল সাতটায় ঘর থেকে বেরিয়েছি। এয়ার ইন্ডিয়ার চুতিয়া সার্ভিসের টিকেট দিয়েছিলো এনাম ইন্টার ন্যাশনাল। সেই চুতিয়া সার্ভিস বিকেল পাঁচটায় আকাশে উড়ে দিল্লি বিমান বন্দরে গিয়ে থামে। সারারাত বিমানবন্দরের ভেতরেই বিনিদ্র আর ক্ষুধার্ত হয়ে বসে বসে সময় পার করি। সঙ্গে ডলার বা ভারতীয় মুদ্রা না থাকায় কিছুই কিনে খেতে পারছিলাম না। ভাগ্যিস বউ একটি প্যাকেটে করে আমার পছন্দের ছোলার হালুয়া বরফি বানিয়ে দিয়ে দিয়েছিলো। তা ফুরিয়ে গেছে রাতেই। এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ খাবার দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ভোর চারটায় আরেকটি বিমানে আমরা মুম্বাই বন্দরে বিমান বদল করি। সেই বিমানে করে বেলা দশটায় রিয়াদ বন্দরে অবতরণ করি। সেখানেই আমাদের জন্য ওটিসি’র লোক অপেক্ষা করছিলো গাড়ি নিয়ে।
যাই হোক সৌদি আরবের প্রাথমিক দিনগুলো যাপন শুরু করলাম মেঝেতে ঘুমিয়ে আর স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে কেরালার বাবুর্চির বিশ্রিী রান্না খেয়ে। আমি তখনই বুঝতে পারছিলাম যে চুতিয়া আব্দুল্লাহ আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। অবস্থা এতটাই খারাপ যে, কোথাও যাওয়ারও কোনো ব্যবস্থা নেই। ভালো জায়গা তো দূরের কথা। এখানে মরুভূমির মাঝেই ক্যাম্প বানিয়েছে বাটপার ওটিসি। একটি রুমে চার-পাঁচজন করে থাকে। লেবার ড্রাইভারদের তো আরো করুণ অবস্থা। কিন্তু আলাপে জানতে পারি একেকজন চার-পাঁচ-আটবছর ধরে আছে। সময় মত ছুটিতে যায় আবার ফিরে আসে। মন আমার দমে গেলেও মনোবল হারায়নি। নিজকে প্রবোধ দিলাম- ধরে নাও তোমার দু’বছরের জেল হয়ে গেল!
কিন্তু সবাই অপরিচিত বলে কোত্থেকে দেশে ফোন করবো তাও বুঝতে পারি না। পুরোনো বাঙালীরা ঠিকমত জবাব দেয় না। কেউ বলে, অনেক দূর ইন্টারনেটে কথা বলার সুবিধা আছে। গাড়ি ছাড়া যাওয়া সম্ভব না। বাঙালীদের যাদের গাড়ি আছে সবগুলোই কংক্রিট টানার মিক্সার কিংবা ডাম্প ট্রাক। তাদের মোবাইল ফোন থাকলেও দেওয়া উৎসাহ পায় না। হয়তো বন্ধুত্ব হয়নি বলে। জানায়, ফোনে পয়সা নাই। পরে একজন ভারতীয় ছেলে, ওটিসি ওয়র্কসপে মেকানিকের কাজ করে, বিহারের অধিবাসী। সোহরাব করে নাম। সে বললো, ‘একটি কার্ড নিয়ে এসো। আমি তোমার দেশে কথা বলার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।’ সেই দিনই তাকে দশ রিয়াল দিলাম। বেলা একটা দু'টোর দিকে তাকে নাম্বার দিতেই সে আমার ঘরে রিঙ করলো। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ত্যাগের দশদিন আর সৌদিআরবে প্রবেশের ন’দিন পেরুতে চলেছে।
আমার কন্ঠস্বর পেয়েই মটু হঠাৎ কেঁদে উঠে বললো, ‘এক লগে দশটা বসর কাডাইলাম! অহন যে তুমি নাই, দশদিন ধইরা তোমার কোনো খোঁজ-খবর পাই না, দেখি না, আমার খারাপ লাগে না?’
বউয়ের কথা শুনে আমার বুকের ভেতর উথাল-পাথাল শুরু হয়। বিবাহিত জীবনের দশ বছরের ভেতর এই প্রথম তার জন্য হৃদয়ের গহনে নদীর পাড় ভাঙার শব্দ শুনি। আর সেই নদীর ছলকে উঠা পানি অকস্মাৎ ছিটকে এসে বুঝি আমার চোখেও প্লাবন ঘটায়।
বিবাহিত জীবনের দশ বছর পার করে দিয়ে প্রথম মাজমাহ সানাইয়া (শিল্প এলাকা)র এই মরুভুমিতেই নিজের হাতে কাপড় ধুই। নখ কাটি। চাল-ডাল-তরিতরকারি সেদ্ধ করি। রান্না কি আর রান্না- আগুনে তাতিয়ে গলধঃবরণ করে ক্ষুধা নিবারণ করি আর কি!
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে আব্বাসীদের জন্য হুমকি হয়ে আসছে- কী হবে খালেদ মহিউদ্দিনের?

লিখেছেন হিমন, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৫০

হোমো ইরেক্টাসদের প্রায় বিশ লাখ বছর আগের আগুনের ব্যবহার থেকে শুরু করে ছয় হাজার বছর আগের চাকা আবিষ্কার, ১৮৩১ সালের বিদ্যুৎ, গত শতাব্দীর অ্যান্টিবায়োটিক, আর এই সেদিনের ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×