একটি শালগাছের গোড়ায় বসে খুব মনযোগ দিয়ে বাবার ছবিটা দেখছিলো মিঠু।
পেছন দিক থেকে নিঃশব্দে এসে 'হাউ!' বলে চেঁচিয়ে উঠলো সমরীতা।
অকস্মাৎ ভয় পেয়ে 'মাগো!' বলে আর্তনাদ করে উঠলো মিঠু।
হিহি করে হাসতে হাসতে মিঠুর পাশেই ঘাসের উপর ধপ করে বসে পড়ে সমরীতা বললো, 'তুই দেখছি ভিতুর ডিম একটা!'
'ভিতুর ডিম না ছাই!'
রেগে উঠলো মিঠু। 'অমন ভূতের মত হঠাৎ চেঁচালে তুইও ভয় পাবি! তোর যে কেমন আক্কেল না! হঠাৎ ভয় পেয়ে মানুষ হার্টফেল করে জানিস?'
'জানি! কিন্তু তুই তো মানুষ না। মানুষনী!' বলে, হাসতে লাগলো সমরীতা।
তারপর আবার বললো, 'ধ্যান করে কার ছবি দেখছিলি? প্রেমিক বুঝি?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ প্রেমিক! আমার প্রেমিক! আমার মা'র প্রেমিক! আমাদের ঘর- গোষ্ঠির প্রেমিক! এবার খুশি হয়েছিস তো?'
মিঠুর এমন উদ্ভট আচরণে মন খারাপ হয়ে গেল সমরীতার। বললো, 'আমি তো এমনিই দুষ্টুমি করলাম। আর তুই কিনা অমন বিশ্রী কথা বলতে পারলি?'
'না জেনে অ্যাডভান্স কথা বলিস কেন?'
'ভুল করেছি! মাপ করে দে!'
হাত জোড় করলো সমরীতা।
মিঠু খুশি হয়ে বললো, 'এটা আমার বাবার ছবি!'
'আগে তো কখনো দেখাসনি!'
'আমিও আজই পেলাম!'
তারপর ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার বললো সে, 'আচ্ছা রীতা, এ ছবিটা বড় করার কোনো প্রসেজ আছে?'
সমরীতা বললো, 'নেগেটিভ থেকে বড় করে নিলেই হবে!'
'সমস্যা তো সেখানেই! নেগেটিভ নেই!'
'তবুও মনে হয় তেমন একটা সমস্যা হবে না।'
'কিভাবে হবে?'
'স্টুডিওতে নিয়ে গেলেই দাদা একটা ব্যবস্থা করে দেবে! তুই এ নিয়ে ভাবিস না!'
কোলের উপর ফেলে রাখা পার্সটা খুলে ভেতরের একটা পকেটে ছবিটা রেখে চেন টেনে বন্ধ করে দেয় মিঠু। মনে মনে ভাবে যে, ছবিটা বড় করানো গেলে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখবে।
সমরীতা হঠাৎ মিঠুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, 'ওই দেখ, আমাদের কুংফু লিজা!'
লিজা এদিকেই আসছে। পরনের শাড়িটা সুন্দর হলেও তাকে দেখতে ভালো লাগছে না। প্যান্ট-সার্টে তাকে যেমন মানায়, শাড়িতে তেমনটা মানায় না।
কাছাকাছি এসে লিজা বললো, 'যাই বলিস রীতা, বিধবার বেশে মিঠাইকে কিন্তু বেশ লাগছে!'
মিঠু ঘাড় কাত করে বললো, 'মাছি হয়ে বসতে চাস নাকি?'
'নারে, কোনো কোনো মিঠাই অনেক আঠা ধরে। শেষে আটকা পড়ে না জানটাই বেরিয়ে যায়!'
লিজার কথা শুনে ওরা না হেসে পারে না।
সমরীতা হাসতে হাসতে বললো, 'শাড়ি পরে কি ফাইট করা যায়?'
'তেমন ভয় নেই। আজ কেউ লাগতে আসবে না!'
মিঠু বললো, 'শাড়ি পরেছিস, তোকে খুবই বাজে দেখাচ্ছে!'
'তাই তো আজ নহি আমি ভীতা, নির্ভয়ে এ কাননে একা বিরাজিতা!'
'এই না হলে কবি!' সমরীতা বললো। 'জঙ্গলকে বলছিস কানন?'
লিজা বললো, 'কবিতায় চোখের পানি যদি শ্রাবণধারা হতে পারে, তাহলে জঙ্গল কানন হলে দোষটা কোথায়?'
মিঠু বিরক্ত হয়ে বললো, 'পটর পটর না করে বসবি তো বয়। ঘোড়ার মত দাঁড়িয়ে থাকিস না!'
হাঁটু মুড়ে নামাজের ভঙ্গিতে বসে লিজা বললো, 'চাঁদা থেকে কে কত মেরেছিস?'
মিঠু বললো, 'পঞ্চাশের বেশি সাহস পাইনি!'
'আর রীতা তুই?'
সমরীতার কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দেয় লিজা।
'আমি ভাই আরো ভীতু! পঁচিশের বেশি পারিনি!'
লিজা বুকে আঙ্গুল ঠুকে বললো, 'আমি পুরো একশ টাকা!'
সমরীতা বললো, 'তাহলে দেখছি তোর তবিলটাই বেশি গরম!'
'নারে, সবটাই খরচ হয়ে গেছে!'
মিঠু বললো, 'বেশ হয়েছে! চুরির পয়সা এমনিই যায়!'
লিজা কি একটা বলতে চেয়েও না বলে বাতাসে কান পাতলো।
তারপর বললো, 'মাইকে আমাদের নাম ধরে কেউ যেতে বলছে!'
'মিঠু আর সমরীতাও কান পাতে।
'হ্যাঁ, তাই তো! সমরীতা বললো, 'আমাদের নামই তো অ্যানাউন্স হচ্ছে!'
মিঠু আর লিজা দাঁড়িয়ে বললো, 'চল যাই!'
কিন্তু ওরা তিনজনই ফিরে এসে দেখলো রান্না শেষ হতে এখনও অনেক দেরি। লিজা বললো, 'কোন শয়তান এমন চালাকিটা করলো? চল, আরো কিছুক্ষণ ঘুরি!'
ওরা হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাশে একটা পাকা ঘাটলায় এসে বসলো। লেকের পানিতে নৌকায় করে বেড়াচ্ছিলো ক'জন ছেলে-মেয়ে। তাদের মাঝ থেকে কুমকুম নামের মেয়েটি ডেকে বললো, 'লিজা তো একাই আছিস, চলে আয় না!'
'একা নই!' লিজা বললো।
তারপর আবার বললো, 'আমার সঙ্গে দু'জন আছে!'
'মনের কথা বলছি!'
'মিঠু ছাড়া আমরা দু’জনেই রিজার্ভ হয়ে গেছি! ওকেই বল!'
লিজা মিঠুকে দেখিয়ে বললো।
'আসো না মিঠু ভাই!' বলে, একটি ছেলে নিজে নিজেই হাসতে থাকে।
নৌকাটা ঘাটের কাছে চলে এলে মিঠু বললো, 'সবাইকে নামিয়ে দিতে পারলে রাজি আছি!'
নৌকা ভিড়তেই ছেলেটা বললো, 'সবাই নেমে পড়!'
নৌকা সত্যি সত্যিই খালি করে সবাই নেমে পড়লো। শেষে নিজেও নেমে এসে ছেলেটা মিঠুর সামনে কুর্ণিশের ভঙ্গি করে বললো, 'আঁইও নামি গেছি গো মা!'
একযোগে হেসে উঠলো সবাই। সেই সঙ্গে পরিবেশটাও যেন বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে উঠলো। দলটার সঙ্গে মিশে গিয়ে ওরা আরো ঘুরে বেড়ালো। আইসক্রিম খেলো। ভাগ করে চিনেবাদাম খেলো। রজনীগন্ধা কিনলো। ছবি তুললো বিভিন্ন ভঙ্গিমায়। কেবল সমরীতা ছাড়া সবাই সিগারেট টেনে কাশতে কাশতে আর চোখের পানিতে ভাসতে ভাসতে হাসলো।
অনেক সময় দল বেঁধে সামান্য কিছু করলেও আনন্দের ঘাটতি হয় না। এই যেমন মিঠু। আজ সেও কেমন যেন বাঁধনহারা।
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


