বেলা সোয়া এগারোটার দিকে ক্লাস থেকে বেরিয়ে এলো মামুন। করিডোরে দাঁড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে ভাবছিলো, কোথায় যাবে? বাড়ি না লাইব্রেরিতে? শেষটায় বাড়ি চলে যাওয়াই ঠিক করলো। আর তখনই ফৌজিয়া এসে দাঁড়ালো। 'কী ভাবছ এত?'
'ভাবছিলাম, বাড়ি না লাইব্রেরি যাবো!'
'কোনটা ঠিক করলে?'
'বাড়ি চলে যাব!'
'দু'একদিনের মধ্যে মিজানের সঙ্গে দেখা বা কথা হয়েছে?'
'না তো! কেন?'
মামুন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ফৌজিয়ার মুখের দিকে।
'গত পরশুদিন গিয়েছিলাম। জ্বর দেখে এসেছি! তোমাকে জানাতে বলেছিলো!'
'আমি তো ওর বাড়িটা চিনি না! শুধু জানি পাটুয়াটুলীর দিকে থাকে!'
'অ্যাড্রেস দিয়ে দিচ্ছি!' বলে, এক টুকরো কাগজে মিজানের ঠিকানা লিখে বাড়িয়ে ধরে সে।
তারপর আবার বলে, 'সমস্যা হলে ফোন দিও!'
কাগজটায় একবার চোখ বুলিয়ে পকেটে রেখে মামুন বললো, 'তবুও লোকেশানটা একবার বলো তো শুনি!'
'জগন্নাথ কলেজের পেছনকার ব্যাংকটার পাশ দিয়ে কিছুটা এগাবে। হাতের ডানদিকেই কিন্তু ঘি-পট্টি! সেই গলিটা দিয়ে ঢুকে দেখবে রাস্তাটা বাঁয়ে ঘুরে ডানে মোড় নিয়েছে। তারপর বাঁয়ে দিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে গেলে দেখবে একটা দোতলা পুরোনো বাড়ি। সদর দরজায় সাদা রঙ দিয়ে লালুভুলু লেখা আছে। মনে থাকবে তো?'
'চেষ্টা করবো!'
'আচ্ছা, চলি!' বলে, পেছন ফিরলো ফৌজিয়া।
ফৌজিয়া চলে যেতেই মামুন ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরই কোত্থেকে নাতাশা এসে তার পাশাপাশি হাঁটতে লাগলো।
মামুন বললো, 'আমার সাথে চললে, না আমাকে সঙ্গে নিয়ে চললে?'
কিন্তু নাতাশা কোনো কথা বললো না।
সে প্রায়ই মামুনের পাশাপাশি এভাবে হেঁটে হেঁটে শাহবাগ পর্যন্ত আসে। কিছু জিজ্ঞেস করলেও বলে না। তখন মামুনের অস্বস্তি বেড়ে যায়।
পাবলিক লাইব্রেরির সামনে আসতেই মামুনের খুব ইচ্ছে হয় লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়তে। কিন্তু নাতাশাকে আজ এড়িয়ে যেতে ইচ্ছে হলো না। ফুটপাতের উপর দাঁড়িয়ে পড়তেই নাতাশা তার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে মুখ নামিয়ে ফেললো। ভাবলো, আজ মামুন নিজের মুখেই কথাটা বলবে। তাই কথাটা শুনবার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো।
কিন্তু নাতাশাকে বিস্ময়ের অকূল পাথারে ঠেলে দিয়ে মামুন অকস্মাৎ বলে উঠলো, 'চলো, পার্কে গিয়ে বসি!'
তারপর আবার বললো, 'নাকি অন্য কোথাও বসবে?'
নাতাশার বুকের ভেতর তোলপাড় করে দিয়ে যেন একই সঙ্গে শতশত ড্রাম বেজে উঠলো। সে মুখ ফুটে কিছু বলতে না পারলেও একটা অজানা আনন্দ বা আশঙ্কা তার কন্ঠ চেপে ধরলো।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন রিকশাঅলাকে মামুন জিজ্ঞেস করলো, 'যাবে?'
'কই যামু?'
'ক্রিসেন্ট লেক!'
'চলেন!'
মামুন নাতাশাকে বললো, 'ওঠো!'
নাতাশা ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই হকচকিয়ে গিয়েছে যে, কি করবে ভেবে পাচ্ছিলো না। মামুন আবার তাড়া দিতেই সে রিকশায় উঠে পড়ে।
মামুন উঠে বসতেই নাতাশা কেমন আড়ষ্ট হয়ে গেল। ব্যাপারটা টের পেয়ে মামুন বললো, 'ভুল করলাম?'
'না। ঠিক আছে!'
নাতাশা মাথা দোলায়।
'সমস্যা হলে বলো!'
'না। সমস্যা কেন হবে?'
তারপর মনে মনে বললো, 'এজন্যে হাজার বছর অপেক্ষা করতে হলেও রাজি ছিলাম!'
'প্রথমটায় ভেবেছিলাম ইয়ার্কি মনে করে হয়তো রাজি হবে না!'
'ইয়ার্কি মনে করার কি আছে?'
'এমনটা হবে তুমি জানতে?'
'এমনটা না হলেও এমন ধরনের কিছু একটা ভেবেছিলাম!'
'খুশি হয়েছো?'
'তুমি বুঝতে পারো না?'
'বুঝতে পারলে কি আর জিজ্ঞেস করি?'
অপাঙ্গে একবার তাকালো নাতাশা।
তারপর বললো, 'তুমি সেয়ানা অবুঝ!'
'যেমন?'
মামুন মিটিমিট করে হাসতে থাকে।
'যেমন?' হাসলো নাতাশাও।
তারপর বললো, 'প্রতিদিন ইনিয়ে বিনিয়ে চিঠি লিখে আমাকে কাবু করে এখন সাধু সাজা হচ্ছে!'
মামুন তো হতবাক! কী বলবে সে? নাকি রিকশা থেকে নেমে একছুটে পালিয়ে যাবে? নাকি প্রতিবাদ করে তার মিথ্যে স্বপ্নটা ভেঙে দেবে? প্রতিবাদ করলেই বা হবেটা কি? নাতাশা এতদিন ধরে যা বিশ্বাস করে আসছে তা কি হঠাৎ করেই ভেঙে দেয়া সম্ভব? এতদিন মামুনের নাম ভাড়িয়ে যে বা যারাই কাজটা করে থাকুক, মেয়েটা সেই সূত্র ধরেই মনের দিক থেকে এগিয়ে এসেছে মামুনের দিকে। দুর্বলতা বাসা বেঁধেছে মনের ফাঁকে ফাঁকে। নাকি আগে থেকেই এক তরফা প্রেমে মজেছিলো? যে কারণে সত্য মিথ্যার ব্যাপারটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। হায়রে বোকা মেয়ে!
হঠাৎ করেই পরম মমতায় নাতাশার প্রতি মামুনের মন আর্দ্র হয়ে উঠলো। ভালোবেসে কি এমনই গাধা সাজতে হয়? একবারও কি তার মনে এলো না যে, চিঠি লেখার ব্যাপারটা কখনোই মানুষ আড়াল করতে পারে না! যে চিঠি লেখে, সে কখনোই নির্বিকার থাকতে পারে না। তবে আজ মামুনের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, এতদিন কোন ভরসায় সে পাশাপাশি হাঁটতো। আশা ছিলো যদি চিঠি প্রসঙ্গে কোনো কথাবার্তা হয়। এমনটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে ব্যাপারটা জানে না, তা নিয়ে মামুন কী করেই বা আলাপ করবে?
নাতাশা যে ভুল মানুষের লেখা চিঠি পড়ে পড়ে মামুনকে ভালোবাসতে শিখেছে সেই ভালোবাসায় অন্তত কোনো ফাঁকি নেই। তাই চিঠির অজ্ঞাত লেখককে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায় সে।
ক্রিসেন্ট লেকের সামনে নেমে ভাসমান ব্রিজটা পেরিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের ভেতর এগিয়ে যায় না মামুন। নাতাশার একটা হাত ধরে লেকের পাশে দেয়ালের উপর বসায়। নিজে পাশে বসে বললো, 'এবার বল, কেমন লাগছে?'
'কেমন আবার লাগবে?' বলে, সারা মুখ হাসির ছটায় ভরিয়ে দেয় নাতাশা। রিকশায় থাকা অবস্থার আড়ষ্ট ভাবটা এখন আর তার মাঝে নেই। সহজ হয়ে এসেছে অনেকটা।
নাতাশাকে বেশ ভালো লাগছিলো মামুনের। এই প্রথম সে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো তার প্রতি। আর কেমন যেন ইচ্ছে করেও চোখ ফেরাতে পারছিলো না। মনে হচ্ছিলো আরো কিছুক্ষণ দেখি! ঠিক এমনটাই ঘটেছিলো গতবারের আমরা ঢাকাবাসীর র্যালিতে।
তার মুগ্ধ চাহনি দেখে নাতাশার বুকের ভেতর অদ্ভূত এক ভালোলাগা শির শির করতে লাগলো।
খুব বেশি ভালোলাগাও মানুষ অনেক সময় সহ্য করতে পারে না। মামুনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে বললো, 'এভাবে তাকিয়ে থাকলে নজর লাগবে তো!'
'লাগবে না! যে চোখ মুগ্ধ হতে পারে সে চোখের নজর লাগে না!'
মামুনের কন্ঠের আন্তরিকতার ছোঁয়ায় নাতাশার সমস্ত শরীর যেন অবসাদগ্রস্থ হয়ে আসে। সে আর চোখ তুলে তাকাতে পারে না মামুনের দিকে।
মামুন নাতাশার মনের অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করে বললো, 'খারাপ লাগছে?'
'না।'
চোখ তুলে তাকায় নাতাশা। 'তোমার খারাপ লাগলে বল ফিরে যাই!'
মামুন হাসলো। বললো, 'আমার খারাপ লাগলে কি তোমাকে এতটা পথ টেনে আনি? তবে একটু খারাপ লাগছে এই ভেবে যে, এতদিন মুখ ফুটে বলনি কেন?'
নাতাশার মুখ রাঙা হয়ে উঠলো। বললো, 'এ কথা কি মুখ ফুটে বলা যায়?'
'কোন কথা?'
'চিঠিতে যে কথা জানতে চেয়েছিলে!'
মামুন নাতাশার একটা হাত ধরে বললো, 'আর কিছুই জানতে চাই না। আমার সব জানা হয়ে গেছে!'
তারপর আবার বললো, 'তবে চিঠিগুলো যেই লিখে থাকুক, তাকে আমার কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত!'
'মানে?'
ভূত দেখার মত চমকে উঠলো সে।
'তা না হলে কি তোমার মনে আমার ঠাঁই হতো? কেউ যে আমাকে এতটা ভালোবাসে কখনো জানতেই পেতাম না!'
বিস্ময়ে নাতাশার চোখ দু’টো আরো বড়বড় হয়ে উঠলো। বললো, 'চিঠিগুলো তুমি লেখনি?'
'তাতে কি? ওগুলোতে নিশ্চয়ই আমার মনের কথাগুলোই আছে!'
নাতাশার দুঠোঁট কেমন ফুলে উঠলো যেন। 'সত্যিই তুমি লেখনি?'
'না।'
'একটাও না?'
মামুন মাথা নাড়ে।
নাতাশার দু’চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বুকের ভেতর থেকে একটা হাহাকার ধ্বনি কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে, 'তাহলে কি এতদিন মিথ্যার পেছনে ছুটলাম?'
তারপরই ঝরঝর করে কেঁদে ফেললো সে।
মামুন ব্যস্ত কন্ঠে বলে, 'চোখ মোছো!'
কিন্তু নাতাশার চোখের পানি থামে না। মামুন তার দিকে ঝুঁকে বললো, 'তাহলে কি আমিও মিথ্যে? আজকের এই মুহূর্তগুলো? শাহবাগ থেকে একই রিকশায় চেপে এতদূর আসাটাও মিথ্যে? এই যে দু’জন পাশাপাশি বসে আছি, তা কিন্তু একটুও মিথ্যে নয়। ফাঁকি নয়। আমাদের সম্মিলিত ইচ্ছের ফল। তুমি শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছো। আমাদের অজ্ঞাত বন্ধু আমাদের কাজটাকে আরো সহজ করে দিয়েছে। এতে তোমারও উচিত ছিলো আমার মত খুশি হওয়া!'
নাতাশা কান্না বন্ধ করে ওড়নায় চোখ মোছে।
মামুন আবার বললো, 'আমি তোমাকে ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি যে, যতদিন তুমি আমাকে পাশাপাশি চাইবে ততদিন এর অন্যথা হবে না। প্রমিজ করছি!'
মামুন নাতাশার একটা হাত মুঠিতে নিয়ে বললো, 'আমার কথাগুলো বিশ্বাস হচ্ছে তো?'
তারপরই নাতাশার মুখের দিকে তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো সে।
কিছু না বুঝে অকারণে নাতাশাও হেসে বললো, 'আবার কি হলো? নাকি চিঠিগুলো সত্যিই তোমার?'
'না তা নয়। আয়না থাকলে চেহারাটা একবার দেখ! পেত্নিও ভয় পাবে!'
ব্যাগ থেকে ছোট্ট আয়না বের করে চেহারা দেখে আবার হেসে উঠলো নাতাশা। চোখের পানিতে কাজল গলে গিয়ে যাচ্ছেতাই অবস্থা! টিসু দিয়ে ঘষে ঘষে কাজল মুছে ফেলতে থাকে সে।
মামুন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো নাতাশার মুখের দিকে। শ্রাবণের বৃষ্টি থেমে গিয়ে বিষন্ন আকাশের কোলে সূর্য হেসে উঠবার মত কিছুক্ষণ আগের বিষাদ মুখে খুশির আভা ঝলমল করছে।
বসে থেকে থেকে মামুনের ডান পাটা কেমন বোধহীন মনে হচ্ছিলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে পা'টা দু একবার ঝাঁকি দিয়ে বললো, 'চলো হাঁটি কিছুক্ষণ!'
মামুন উঠে দাঁড়ালে পাটা কেমন ঝিনঝিন করতে থাকে।
নাতাশার মনে হয় মানুষ হিসেবে মামুন খুবই ভালো। মনটাও যেন কাদামাটির মত নরম! তার ইচ্ছে হয় মামুনের একটা বাহু জড়িয়ে ধরে পাশাপাশি হাঁটতে। কিন্তু কথাটা ভাবতেই তার কেমন লজ্জা করতে লাগলো।
মামুন বললো, 'চলো কিছু খাই!'
'এখানে কি খাবো?'
অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে সে।
তারপর আবার বলে, 'আমি তো বাইরের কিছু খাই না!'
'না খেলে জোর করবো না। কিন্তু ঘরে ফিরতে ফিরতে পেটের অবস্থা কি হবে বুঝতে পারছো?'
'ওরেব্বাপ! প্রথম দিনেই লেকচার?' ঠোঁট উল্টায় নাতাশা। 'না জানি পরে আরো কত কি শুনতে হবে!'
'এটা হলো পূর্বাভাস! পরে আমাদের সম্পর্কটা কেমন হতে পারে অনুমান করে নাও!'
মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে নাতাশা মিয়ানো কন্ঠে বলে, 'অনুমান যদি করতেই পারতাম, তাহলে কি আর মরিচীকার পেছনে ছুটি!'
'সব মরিচীকা কিন্তু মিথ্যে নয়। কখনো কখনো সত্যিও হয়!'
'ওটা তো কখনো কখনো! সবসময় তো না!'
চটপটির দোকানে এসে পাশাপাশি দু’টো চেয়ারে বসলো ওরা।
নাতাশার কানের কাছে মুখ নিয়ে মামুন ফিসফিস করে বললো, 'ফুচকা খেয়ে পেট ব্যথা হলে সেবা যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলার দায়িত্ব আমার!'
নাতাশা হাসতে হাসতে বললো, 'ইটস মাই প্লেজার!'
তারপর নিচু কন্ঠে বললো, 'সেবার নিশ্চয়তা পেলে আজীবন রুগি হয়ে থাকতে রাজি আছি!'
'মাপ চাচ্ছি! অমন কথা বোলো না!'
ঠোঁট উল্টে নাতাশা বললো, 'কী আর করা। আমারই দূর্ভাগ্য!'
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



