খুব ভোরে উঠেই হাঁক-ডাক আরম্ভ করে দেয় মিঠু। তার হাঁক-ডাকে ঘুম ভেঙে যায় মামুনের। অসময়ে ঘুমটা ভেঙে গেল দেখে খুব বিরক্ত হয় সে। একবার ঘুম ভাঙলে পরেরবার ঘুম আসতে খুবই দেরি হয়। কখনো কখনো ঘুম আর হয়ই না। উঠে এসে সে মিঠুকে বললো, 'এত হাউকাউ করছিস কেন?'
'তুই খবরদারী করতে এসেছিস?'
'কাকা করে অন্যের ঘুমের ডিস্টার্ব করবি, তাতেও কিছু বলতে পারবো না?'
'পিকনিকে যাচ্ছি। কখন নাস্তা করবো? কখন যাবো? সাতটায় বাস ছেড়ে যাবে!'
'সাতটায়? হুঁহ্!'
ঠোঁট উল্টায় মামুন। 'গিয়ে দেখবি কেবল তুই বসে আছিস? কম করে হলেও নটায় বাস ছাড়বে!'
'না, চৌদ্দটায় ছাড়বে আর কি! ম্যাডাম বলে দিয়েছেন সাতটার অর্থ সাতটা পাঁচ নয়! জানিস?'
'জানি, জানি! বাঙালীর ঘড়ি চেনা আছে আমার!'
'তোর মাথা!'
রাগি কন্ঠে বলে মিঠু।
ফজরের নামাজ পড়া অবস্থায় মা শুনতে পেয়েছিলেন দু''ভাইবোনের অপলাপ। নামাজ শেষ করে উঠে এসে তিনি মামুনকে বললেন, 'তুই নিজের কাজে যা!'
তারপর মিঠুর দিকে ফিরে বললেন, 'আর মিঠু, তুই নিজে কিছু তৈরী করে নিতে পারলি না? তোর তো জানাই আছে এমন সময় তোকে বেরিয়ে যেতে হবে!'
'এত কম সময়ের মধ্যে আমি খাবার তৈরী করবো কখন?'
বিস্মিত হয়ে তাকায় মিঠু।
'আর কিছু না হোক দুটো বিস্কিট মুখে দিয়েও তো বেরোতে পারতিস?'
এবার মিঠু কি বলবে ভেবে পায় না।
মামুন বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করার আগে টিপ্পনী কাটার মত করে বললো, 'উনার সাজতেই তো লাগবে একঘন্টা!'
'দেখলে মা? তোমার ছেলের যেন সহ্য হচ্ছে না!'
তারপর বাথরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে মিঠু বললো, 'তুই সারাদিন ধরে সাজ না, মানা করেছে কে?'
'হল্লা করিস না!' মা বললেন। 'মাসুদকে বল, ও তোকে কলেজে দিয়ে আসবে। ততক্ষণে দেখি তোদের খাবারের কি ব্যবস্থা করতে পারি!'
মাসুদের ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে গেল মিঠু। 'এত সকালে তুমি কি করছো ভাইজান? কোথাও যাবে নাকি?'
মিঠুর কন্ঠরে বিস্মিত মাসুদ বলে, 'তুই কোথাও যাচ্ছিস নাকি?'
'হ্যাঁ! পিকনিকে!'
'তাই তো বলি, অত সকাল সকাল কেন বাড়িটা মাথায় তুলেছিস!'
'আমি না হয় দরকারে জেগেছি, তুমি?'
মাসুদ হাসলো, 'সবাই তোর মত লেটরাইজার হবে এমন কোনো কথা আছে?'
'হয়তো মামুন ভাইয়ার মত কোনো কারণে ঘুম ভেঙে গেছে তাই লিখে সময় কাটাচ্ছো!'
'ঘুম থেকে উঠিস তো সাতটায়! আমি কখন উঠি জানবি কি করে?'
'তার মানে তুমি প্রতিদিনই ভোরে উঠে পড়?'
মাসুদ যত রাত করেই ঘুমাক না কেন, ভোর চারটা বেজে গেলেই আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না। প্রায়ই সে মাকে এ সময়টায় ডেকে তোলে। তিনি তখন ফজরের নামাজ পড়েন।
এ সমস্ত খবর মামুন বা মিঠুর জানার কথা নয়। অবশ্য প্রতিদিন এ সময় ঘুম থেকে উঠলে ওরাও দেখতে পেতো। আজ যেমন মিঠু দেখলো।
'ভোর চারটায় উঠলেই দেখতে পাবি!'
'বুঝলাম!' বলে, টেবিলের উপর খুলে রাখা মাসুদের ডায়রির উপর ঝুঁকে পড়লো মিঠু।
তারপর দু এক লাইন লেখা পড়ে আবার বললো, 'শুধু ভোরবেলাতেই কবিতা লেখ নাকি?'
'এ সময়টাই তো সবচেয়ে ভালো! বাবা বলতেন, যত সুন্দরতম সৃষ্টি ভোরের দিকেই হয়!'
মিঠু হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলে উঠলো, 'বাবাকে মনে আছে?'
'থাকবে না কেন? তোর মনে পড়ে না?'
'বাবাকে দেখেছি নাকি যে, মনে পড়বে?'
'দেখেছিস।'
'তাহলে মনে করতে পারি না কেন?'
'মনে থাকার তো কথা!'
মাসুদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় মিঠুর দিকে। ''তখন তো তোর চার বছর বয়স ছিলো!'
'বাবার মুখ ভর্তি কি সাদা দাড়ি ছিলো? দেখতে কেমন ছিলেন? খুব সুন্দর?'
'বাবার দাড়ি ছিলো না। বলা যায় কিছুটা সৌখিন ছিলেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে ব্রাশিং, শেভিং করতেন। গোসল সেরে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। নামাজ শেষ হলে জায়নামাজে বসে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। কন্ঠটাও ছিলো চমৎকার! বাবা যখন কোরআন তেলাওয়াত করতেন, তখন কী যে ভালো লাগতো জানিস? তখন ঘুম ভেঙে গেলে চুপিচুপি বাবার পেছনে গিয়ে বসে থাকতাম। প্রায়ই এমন হতো। বাবা দেখতে পেলেও কিছু বলতেন না। মুখটা হাসি হাসি হয়ে থাকতো কেবল।'
'বাবার কোনো ফোটোগ্রাফ নেই কেন? মাঝে মাঝে খুব দেখতে ইচ্ছে হয়!'
'ছবিটবি বাবা পছন্দ করতেন না। বলতেন, ছবি রাখা ঠিক না। মৃত্যুর পর আত্মার নাকি খুব কষ্ট হয়। তাই মাও কোনো ছবিটবি রাখতে দেননি!'
'ওঁরা পুরোনো আমলের মানুষ। ধ্যান-ধারণাও ছিলো পুরোনো। তুমি কি করলে? এ যুগের মানুষ হয়েও তুমি এতটা পেছনে পড়ে থাকলে কেন? বাবার স্মৃতি হিসেবে অন্তত একটা ছবি রাখতে পারতে!'
'ছবি রেখে কি হবে রে! মা, মামুন, আমি, তুই সবাই তো কোনো না কোনোভাবে বাবার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি! এর চেয়ে বড় স্মৃতি আর হয় নাকি?'
'না, এসব নয়। চোখ বুঁজলেই যাতে করে বাবার একটা সুন্দর স্ট্যাচু মনে করতে পারি!'
'হ্যাঁ, তেমন একটা অবশ্য আছে। তবে এক শর্তে দেখাতে পারি!'
মিঠু হঠাৎ অধীর হয়ে বলে উঠলো, 'যে কোনো শর্তে রাজি!'
'এ ছবির কথা মাকে বা মামুনকে জানানো যাবে না!'
'জানাবো না!'
ড্রয়ারের ভেতর একটি ফাইলের ভেতর পুরোনো কাগজ-পত্রের নিচ থেকে পাসপোর্ট সাইজ একটি সাদাকালো ছবি বের করে মিঠুর হাতে দিয়ে মাসুদ বললো, 'মার অগোচরে প্রায় একযুগ ধরে আগলে রেখেছি!'
কথাগুলো বলার সময় মাসুদের চোখ দু’টো কেমন ভিজে উঠলো।
ছবিটা হাতে নিয়ে একবার মাসুদ আর একবার ছবির মুখটার দিকে তাকাতে লাগলো মিঠু। ছবির প্রকৃত মানুষটা কে? এ নিয়ে মনের ভেতর দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেল তার। ছবির মানুষটা যে হুবহু মাসুদের মতই। এটা কেমন করে সম্ভব? মনে মনে ভাবে সে।
তারপর বলে, 'কেউ দেখলে এটা তোমার ছবি বলে ভুল করবে!'
'ঠিক! মাও তাই বলেন। বাবার কপালের ডান পাশের জরুলটা না থাকলে আমাদের চেহারা আলাদা করা কঠিন ছিলো!'
এতক্ষণে ছবিতে জরুলটার উপর চোখ পড়ে মিঠুর। ছবিটা দেখতে দেখতে সে বললো, 'একমাত্র জরুলটাই তোমার আর বাবার চেহারার অমিল!'
'হ্যাঁ। এবার দিয়ে দে! লুকিয়ে রাখি। তোর যখন ইচ্ছে হবে চুপি চুপি আমাকে এসে বলবি!'
'আর কিছুক্ষণ দেখি!'
বাবার ছবি দেখে মিঠুর মন তৃপ্ত হচ্ছিলো না কিছুতেই। বললো, 'আজ এটা আমার কাছে থাকুক ভাইজান! রাতের বেলা নিও!'
মাসুদ সস্নেহে বোনের মাথায় হাত রেখে বললো, 'বেশ, আজ তোর কাছেই থাকুক! তবে দেখিস, হারিয়ে গেলে কিন্তু ' ফিরে পাওয়ার কোনো পথ নেই!'
'হারাবে না!'
খুশিতে মিঠুর মনটা কাণায় কাণায় ভরে উঠলো। মনে হলো, মাসুদের মত ভাই আর কারো আছে বলে মনে হয় না।
মা রান্নাঘর থেকে বললেন, 'মিঠু, তোর হলো?'
'আসছি মা!'
সে ছবিটা লুকালো ওড়নার ভাঁজে।
তারপর মাসুদকে বললো, 'তুমিও এসো। আমাকে কলেজে পৌঁছে দেবে!'
'একা যেতে পারবি না?'
'এসো তো! সময় বেশি নেই!'
মিঠুর মন পরিপূর্ণ হয়ে আছে স্বর্গীয় এক বিভায়। তাই সাজসজ্জার দিকে তার মন লাগলো না। লিপস্টিক-কাজল ছুঁয়েও দেখলো না। এমন কি কপালে একটি টিপও নয়। তার এই সাদামাটা রূপ দেখে সন্যাসিনী বলে ক্ষেপাতে চাইলো মামুন। কিন্তু ও কথা সে গায়েই মাখলো না।
দু'ভাই বোনে যখন রিকশা থেকে কলেজের দোর গোড়ায় নামলো, তখন তাদের ঘড়িতে সময় সকাল সাতটা চার। রিকশা বিদায় করে দিয়ে কলেজ কম্পাউন্ডে ঢুকলেও ওরা কোনো মেয়েকে দেখতে পেলো না।
মাসুদ বললো, 'কিরে মিঠু, কোনো মেয়ে তো এখনো আসেনি! আর গাড়িই বা কোথায়?'
মিঠু কি বলবে ভেবে পায় না।
মাসুদ এদিক ওদিক তাকিয়ে আবার বলে, 'তোদের যাবার কথা ক'টায়?'
মুখ কাঁচুমাচু করে মিঠু বললো, 'নোটিসে তো ছিলো সাতটার কথাই!'
'ঠিক দেখেছিস তো?'
'দেখেছি!'
'কেউ তো আসেনি দেখছি!' নাকি তোর দেরি দেখে বাস চলে গেছে?'
'হতে পারে!' মিঠুর দু'চোখ কেমন ছলছল হয়ে উঠলো।
'বাবা মাঝে মাঝে অভিযোগ করে বলতেন, বাঙালীরা পাংচুয়াল নয়। আর এ কারণেই জাতিটার উন্নতি হচ্ছে না। অথচ ইংরেজরা সময়ের মূল্য দিতে পেরেছে বলেই দু'শোটা বছর পৃথিবীকে শাসন করেছে। অবশ্য আমি দু’জন বাঙালীর কথা জানি, যারা সময়কে হেলাফেলা করেনি কখনো। এক ছিলেন বাবা। আর আরেকজন হচ্ছিস তুই!' বলে মাসুদ হাহা করে হাসতে লাগলো।
মিঠু হাসতে পারলো না। সহপাঠি এক ছাত্রকে দেখে তাকে ইশারায় ডাকলো।
ছাত্রটি এগিয়ে আসতেই মিঠু বললো, 'আচ্ছা আজিজ, তুমি কি জানো বাস চলে গেছে কিনা?'
'বাস তো এখনো আসেইনি!' বলে আজিজ হাসলো।
তারপর 'আমি গিয়ে খোঁজ নিচ্ছি!' বলে সে চলে গেল।
আজিজ চলে গেলে মাসুদ বললো, 'এখন কি করবি? কতক্ষণ অপেক্ষা করবি? কোথাও বসি। দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে না!'
মিঠুরও খারাপ লাগছিলো। একবার কমনরুমে গিয়ে বসার কথা ভাবলেও সে তা প্রকাশ করলো না। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে সময় পার করলেও মিঠুর ধৈর্য বুঝি আর বাঁধ মানে না! সে বললো, 'তুমি কি চলে যাবে?'
'তোকে একা রেখে কেমন করে যাই?'
'অসুবিধা নেই! কাজ থাকলে তুমি চলে যাও!'
মাসুদ একবার হাসলো।
তারপর বললো, 'তোকে বসে তুলে দেওয়ার চাইতে এখন বড় কোনো কাজ হতেই পারে না!'
মাসুদ যে তার বোকামীকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলছে তা বুঝতে পারলেও কিছু বললো না। ভেতরে ভেতরে তার কান্না পাচ্ছিলো ভীষণ। একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মুখ তুলতেই সে হঠাৎ ইঞ্জিনের বিচিত্র গুঞ্জন শুনতে পেলো। দেখতে দেখতে ঝকঝকে তকতকে একটি বিআরটিসি বাস এসে থামলো।
মাসুদ ঘড়িতে সময় দেখলো, সাতটা চল্লিশ। ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে যাত্রা করতে হলে কম করে হলেও দু'ঘন্টার প্রয়োজন।
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



