somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মধুনিশা-৩

০২ রা আগস্ট, ২০০৮ রাত ৯:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ডোর বেল বাজতেই দরজা খুলে অবাক হয়ে যায় মামুন। ছিপছিপে ফর্সা এক মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। একে আগে কখনো দেখেনি। 'কারু খোঁজ করছেন?' জানতে চায় সে।

'না। মানে...'

মহিলা কেমন ইতস্তত করে পেছনে ফিরে তাকায়।

তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মামুন দেখতে পেল, সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসছে রুমি। সে দ্রুত ঘরের ভেতর অদৃশ্য হয়ে যায়।

ঘরে ঢুকে রুমি হাসতে হাসতে বললো, 'মামুন পালালি কোথায়? আমার রঙটা কি তোর এতই অপছন্দ?'

তারপর সঙ্গিনীকে বললো, 'আয় মিতা!'

মা রুমির কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে বললেন, 'রুমি কেমন আছিস? আয়!'

'আমি তো ভালো আছি খালাম্মা! আপনি ভালো তো?'

'ভালো তো আছি! কিন্তু' তোর সঙ্গে এটি কে?'

'ও মিতা! মামার বড় মেয়ে!'

'অ। সেদিন ওর কথাই বলেছিলি, না?'

'হ্যাঁ খালাম্মা!'

মিতার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মা বললেন, 'ভালো আছো তো মা?'

'জ্বি, ভালো!'

মিতাকে দেখে মার মনে হচ্ছিলো যে, অনেক আগে থেকেই যেন তাকে চেনেন। মুখটা কেমন যেন খুবই পরিচিত আর আপন বলে মনে হচ্ছিলো। কিন্তু তিনি তাঁর পরিচিত কারো মুখের সঙ্গে মিতার মুখের মিল খুঁজে পেলেন না।

রুমি বললো, 'খালাম্মা, মাসুদ ভাই ফিরবে কখন?'

'তার তো ঠিক নেই! কোনো দরকার ছিলো?'

'মিতার কিছু লেখা দেখাতাম!'

'তার কি সময় হবে? যাও দু'একদিন সন্ধ্যার পরপর ঘরে ফেরে তাও একগাদা কাগজ-পত্র নিয়ে বসে। তার সঙ্গে যে দু'একটা সাংসারিক কথা বলবো তাও পারি না!'

মিতা ভাবলো, তিনি বুঝি তাদের নিরুৎসাহিত করতেই এমন কথা বলছেন।

মা বুঝি মিতার মনোভাব টের পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে বললেন, 'না, মা। এমনিই বলছিলাম! কিছু মনে করো না! মাসুদ ফিরলেই তোমার কথা বলবো! তো যাক, তোমার কথা বলো, শুনি!'

মিতা আড়ষ্টভাবে বললো, 'বলার মত তেমন কিছু তো নেই!'

'আছে, আছে! বললে অনেক কথাই বলা যায়। এই ধর, এখন কি করছ, লেখাপড়া-করলে কিসে করছো, নাকি বিয়ে হয়ে গেছে, কি হয়নি, বা ঢাকায় এসেছ কতদিন হলো? ভালো লাগছে কি লাগছে না? এমনই তো হাজার কথা বলা যায়!'

মিতা আরো কিছুটা সংকুচিত হয়ে কেবল 'জ্বি!' বলতে পারলো।

পাশ থেকে রুমি বললো, 'খালাম্মা, বি.এস.সিতে পড়ার সময় ওর বিয়ে হয়ে যায়। তারপর সংসারের চাপে তা আর শেষ করা হয়নি। এখন আবার শুরু করতে চাচ্ছে!'

'জামাই কি করে?'

'ব্যাংকে চাকরি করতো!'

'এখন?'

'আজ থাক খালাম্মা! অন্যদিন বলবো!'

মা বুঝতে পারলেন যে, আলাপ প্রসঙ্গে কোনো অপ্রিয় সত্য বলতে হয় যাতে করে মিতার মন খারাপ হতে পারে! আর তাই যেন ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটা থামিয়ে দিলো রুমি।

'তোরা বস। আমি আসছি!' বলে, মা উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বসলেন।

'মিঠুকে দেখছি না যে?'

জানতে চায় রুমি।

'ওর কোন বন্ধুর নাকি জন্মদিন!'

'আজ উঠি খালাম্মা!' বলে উঠে দাঁড়ায় রুমি।

'চায়ের পানি চড়িয়ে এসেছি!'

'আজ না!'

'চুপ করে বয়!'

মৃদু ধমক দিলেন তিনি।

তারপর উঠে হয়তো আবার কিচেনেই গিয়ে ঢুকলেন।

মিতা অস্ফুটে বললো, 'ভদ্রমহিলা যেন কেমন! মনে হয় সারাক্ষণই রেগে আছেন!'

'নারে, খুবই ভালো! দু’একদিন আসা যাওয়া কর, দেখবি কত আপন মনে হচ্ছে! এই দেখ না, আমাকে কেমন ধমকে বসিয়ে দিলেন! আপন না ভাবলে মানুষ এমন করতে পারে?'

'কি জানি!' বলে ঠোঁট উল্টায় মিতা।

দিন দুয়েক পর আবার আসতেই রুমিকে ধরে বসলেন মা, 'কিরে, সেদিন তোর সঙ্গের মেয়েটার স্বামীর কথা উঠতেই চেপে গেলি কেন?'

'মিতার কথা বলছেন?'

'হ্যাঁ। ওর স্বামীর কি হয়েছে?'

'নেই খালাম্মা!'

'নেই মানে? এত মিষ্টি একটা মেয়ে...'

'বিয়ের ছ'মাসের মাথায় হার্টফেল করে মারা গেছে!'

'অ!'

মার মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমন সুন্দর আর মিষ্টি একটা মেয়ে জীবনের কিছু না জানতেই বিধবা হয়ে গেল? কেন এমন হয়?

একটা ব্যর্থ হাহাকার তাঁর সারা অন্তর জুড়ে তোলপাড় করতে লাগলো। যার বিষাদ ছাঁয়া তাঁর চেহারাকেও যেন ম্লান করে দিতে থাকে।

তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দুখী কন্ঠে বললেন, 'আবার বিয়েটিয়ের চেষ্টা হয়নি?'

'হয়েছিলো। কিন্তু ও রাজি হয়নি!'

'কেন?'

'বলেছে, সময় হলেই নাকি নিজের মুখে বলবে। তাই মুরুব্বিরা আর জোর করেননি।'

'তাই! মেয়েটা বড় দুখীরে রুমি! ওকে দেখেই আমার মনে হয়েছিলো। আরো মনে হচ্ছিলো যে, ওকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। আসলে মেয়েটার উপর কেন জানি মায়া পড়ে গেল। আজ তো ওকে নিয়ে এলেই পারতি!'

'খুলনা গেছে!'

'খুলনা কেন?'

'ওখানেই তো ওদের বাড়ি! কলেজে আবার ভর্তি হবে। তাই কাগজ-পত্র আনতে গেছে!'

'ওখানে ভালো কলেজ নেই?'

'আছে।'

'তাহলে ওখানেই পড়ুক না!'

'একে তো বয়স্কা। তার উপর বিধবা। ও যদি আবার কলেজে আসা যাওয়া করে, তো গ্রামের পাঁচজন পাঁচ কথা বলবে! তাই বাবা নিজ থেকেই ঢাকার কথা বলেছেন!'

'প্রত্যেকটা গ্রামেই কিছু খারাপ লোক থাকে। যাদের কাজ হচ্ছে পরের ভালো কিছু দেখলেই তাতে কালি ঢেলে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগা! সৃষ্টিকর্তা কি এদের খারাপ মাটি দিয়েই তৈরী করেন নাকি?'

'খালাম্মা, কথায় বলে না যে, গাই ভালো তার বাছুর ভালো, দুধ ভালো তার ঘি, বাপ ভালো তো পুত্র ভালো, মা ভালো তো ঝি!'

'ঠিক বলেছিস মা! এরা বংশগতভাবেই খারাপ হয়ে আসতে থাকে। বাপের যদি চরিত্র খারাপ থাকে, দেখা যায় তার ছেলেও একই পথের পথিক। মা খারাপ থাকলেও তার দু'একটা মেয়ে খারাপ হবেই!'

কথাগুলো বলার সময় মনে হচ্ছিলো এই উষ্মা তাঁর মনের ভেতরই কোথাও এতকাল লালন করে এসেছেন। এখন উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে তা বেরিয়ে এসেছে।


(চলবে...)
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×