চায়ে চুমুক দিতে দিতে আর্টিকেলের উপর বারকয়েক চোখ বুলায় মাসুদ। দু’একটা বানান ঠিক করে আবার পড়তে পড়তে ভাবলো যে, কোনো কিছু বাদ পড়েছে কি না। কিš' তেমন কিছু মনে না হওয়াতে একটা পরিতৃপ্তির শ্বাস ফেলে ওটা রেখে দিল। হররোজ এডিটরের প্যানপ্যানানি ভালো লাগে না। অবসন্ন শরীরটাকে চেয়ারের পেছনে হেলান দিয়ে রাখলো। চাকরিটা ছেড়ে দেওয়া না দেওয়ার ব্যাপার নিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ। কিš' মন থেকে তেমন কোনো উৎসাহ পেলো না।
একসময় চাকরির জন্য তাকে অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হয়েছে। হেঁটেহেঁটে এ অফিস সে অফিস, কত ফার্ম, স্কুল-কলেজে ধর্ণা দিয়ে দিয়ে জুতো স্যান্ডেল ক্ষয় করাই সার হয়েছে। কাজের কাজ কিছু হয়নি। শেষটায় কবিতা লেখার সূত্র ধরে দি বাংলাদেশ গেজেটের মালিক-সম্পাদক আজহার সাহেবের সঙ্গে ঘনি'তা হলে তিনিই একদিন জোর করে মাসুদকে ডেস্কে বসিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে রোজ সকালে বেরিয়ে যায়, ফিরতে কখনো রাত একটা-দেড়টা, কখনো দু’টোও বেজে যায়।
আজহার সাহেব যে তাকে খুব ভালোবাসেন তা সে বুঝতে পারে। তবুও মাঝে মধ্যে মন বিদ্রোহী হয়ে উঠতে চায়। যদিও সম্পাদকের দায়িত্ব তিনিই পালন করছেন, তবুও ঝামেলাগুলো পোহাতে হয় মাসুদকেই।
'মাসুদ! মাসুদ!'
ছেলেকে ডাকতে ডাকতে মা চলে এলেন এ ঘরে।
চেয়ারে হেলান দিয়ে মাসুদ চোখ বন্ধ করে ভাবছিলো। মায়ের শব্দ পেয়ে চোখ মেলে বললো, 'ডাকছিলে নাকি?'
'খেতে আয়!’
'মামুন মিঠু খেয়েছে?'
'সেই কখন! এতক্ষণে হয়তো ওরা ঘুমিয়েও পড়েছে!'
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয় মাসুদ। রাত মোটামুটি কম হয়নি। সে উঠে বললো, 'চলো! তুমিই বা এতটা রাত কেন জেগে থাকলে? খাবারটা ঢাকা দিয়ে রাখলেই তো চলতো!'
কাজের নেশায় খাওয়ার কথা ভুলে যাওয়ার স্বভাবের কথা জানেন বলেই মা মাসুদকে না খাইয়ে ঘুমুতে যান না।
খাবার টেবিলে বসে মা বললেন, 'এবার ভালো দেখে একটা মেয়ে বিয়ে কর। আমি আর পারি না!'
'বিয়ে করলে কি সে এত রাত পর্যন্ত আমার খাওয়ার অপেক্ষায় জেগে থাকবে? তুমি আমার জন্য যতটা ভাববে, পরের মেয়ে কি ততটা ভাববে?'
'মা মনে মনে খুশি হলেও বললেন, 'আরে ছাগল, ভাববে! এক কালে মা যেই যতœটা নেয়, তাই স্ত্রী করে। আরও পরে করে ছেলের বউ বা মেয়েরা!'
মাসুদ একবার হাসে।
তারপর আবার বলে, 'কিš' মা, সব মেয়েরা কিš' এক রকম হয় না। আমার এক বন্ধু মোস্তাককে তোমার মনে আছে? যে তার ভাই-বোনদের ভালোবাসতে পারেনি বলে নিজের জন্ম সম্পর্কে নতুন একটা গল্প চালু করেছিলো!’
'হ্যাঁ, তুই বল!’
'ও যদি কাজে ব্যস্ত থাকে, বউটা তখন নিজে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে! তুমি কি আমাকে এমন বউয়ের আশা দিচ্ছো?’
মা ছেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন।
তারপর বলেন, 'ওগুলো বউ নাকি? বিয়ে করতে হয় বলে বিয়ে করে। সংসার করতে হয় বলে সংসার করে। কোনো রকমে দিনরাত পার করা আর কি!’
মাসুদ মনেমনে ভাবে যে, এমন জীবন কাম্য নয়! মোস্তাকের মত দিনরাত বিষ হজম করতে পারবে না সে। একজন বিবাহিত পুরষের পক্ষে কি পাশে ঘুমন্ত স্ত্রী নিয়ে নপুংসকের মত রাত পার করা সম্ভব? অথচ মোস্তাক তাই করছে! মাঝেমাঝে আক্ষেপ করে বলে, দিনদিন আয়ানঘোষ হয়ে যাচ্ছিরে! সে নিজে হলে কবেই বউ তালাক দিয়ে দিতো!
ছেলেকে চুপ থাকতে দেখে মা বললেন, 'কিরে, বলছিস না যে কিছু?'
খেতে খেতে মাসুদ বলে, 'কি বলবো?'
'বিয়ে-টিয়ে করবি, না আজীবন আইবুড়ো হয়ে থাকবি?'
'আরো ক’টা দিন যাক!'
'এই করে করেই তো বুড়ো হলি! শেষকালে কেউ মেয়ে দেবে?'
'কেন দেবে না? কারো ঘরে কি আইবুড়ো মেয়ে থাকে না?'
মা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ভাবেন, কবে যে ছেলের ক’টা দিন পেরিয়ে সেই দিনটি আসবে কে জানে!
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

