'অসহ্য! একটু মনোযোগ দিয়ে যে পড়া-শুনা করবো, তারও উপায় নেই!'
মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে বই রেখে উঠে পড়ে মামুন। মশাগুলোও এমন যে, কয়েল জ্বালিয়েও রক্ষে নেই। ডিডিটির ধোঁয়া উপেক্ষা করে জোঁট বেঁধে গায়ের উপর হামলে পড়ে। শুধু কি তাই? ফুল স্পিডে ফ্যান চলা সত্বেও ওরা কেমন সহজে উড়ে বেড়াচ্ছে!
'নাহ, এভাবে বসেবসে মশার কামড় খেয়ে নিজের রক্ত বিষাক্ত করার কোনো মানে হয় না!'
বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে মামুন।
তার এই করুণ দশা দেখে, মশারীর ভেতর থেকে হেসে বলে মিঠু, 'ভাইয়া, তোর রক্ত মনে হয় খুব সুইট!'
'বসে তো আছিস মশারীর ভেতর, বেরিয়ে দেখ না তোর রক্ত বিস্বাদ কিনা!'
'মশারীর নিচে ঢুকলেই তো পারিস!'
'তুইই থাক! ফাজিল মেয়ে কোথাকার!'
মামুনের কথায় যেন আরো মজার খোরাক পায় মিঠু। বলে, 'মশাগুলো না আরো বেশি ফাজিল!'
মিঠু হাসে হিহি করে। এতে মামুন আরো বিরক্ত হয়। প্রায় খেঁখিয়ে বলে, 'এত হাসির কি ঘটলো?'
'হাসছি এজন্য যে...' কথা শেষ করতে পারে না সে। হাসির দমকে বাকি কথাগুলো হারিয়ে যায়।
'আরে, এত হাসছিস কেন?'
আরো গলা চড়ায় মামুন।
'হাসছি এজন্য যে, মশাগুলো তোকে রুমি আপার চেয়ে আরো বেশি ভালোবাসে!'
মামুন এবার সত্যি সত্যিই রেগে যায়। 'আবার রুমি?' বলে, বাইরে থেকেই মশারী সমেত মিঠুর চুল টেনে ধরে।
'উফ! ছাড়! লাগছে তো!'
ব্যথায় কন্ঠ বিকৃত হয়ে যায় মিঠুর।
'আর রুমি রুমি করবি?'
'ছাড়, ব্যথা পাচ্ছি!'
'রুমির কথা বলবি?'
'উফ, মাকে ডাক দেবো কিন্তু!'
জোরে চেঁচিয়ে উঠে বললো মিঠু।
ও ঘর থেকে মা বলে উঠলেন, ‘তোরা আবার লেগেছিস!'
মায়ের সাড়া পেয়ে মিঠুর চুল ছেড়ে দেয় মামুন।
তারপর নিজের জায়গায় ফিরে যেতে যেতে বলে, ‘আবার বলবি তো...'
'কিরে মামুন, শুরুটা করলি কি?
মায়ের কন্ঠস্বরে চমকে উঠে মামুন। কথা শেষ করতে পারে না।
ঘরে ঢুকে তিনি বললেন, 'এত হইচই কিসের?'
মিঠু মশারীর তল থেকে বেরিয়ে এসে বলে, ‘তোমার ছেলেকে সাবধান করে দিও বলছি! আর যেন আমাকে শুধু শুধু মারতে না আসে!'
মামুন ও চুপ থাকে না। বলে, ‘তোমার মেয়েকেও ফাজলামো করতে না করে দিও!'
মা কি করবেন? এমন একটা দিন নেই যে, ওরা নালিশ করেনি। কিন্তু পিঠাপিঠি এই দু’টি ভাইবোনের উপর কখনো রাগ করতে পারেন না তিনি। একজনকে খুশি করতে অন্যজনকে বকেন। আবার কখনো কখনো দু'জনকেই বকেন। তখন হয় আরেক জ্বালা!
মুখ ভার করে দু’জন দু’রুমে গিয়ে বসে থাকে। দু'চারদিন দু’জনের মুখ দেখাদেখি কথা বলা বন্ধ থাকে। তারপর আবার নিজেরাই ভাব করে নেয়।
দু'জনের অভিযোগ শুনে মার খুব হাসতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। কিন্তু যথাসম্ভব গম্ভীর থেকে বললেন, 'তোরা কি বড় হচ্ছিস না? এখনও যদি এমন করিস তো বাইরের মানুষ দেখলে বলবে কি?'
তারপর মামুনের দিকে ফিরে বললেন, 'তুই বা এমন কেন? ভার্সিটিতে পড়ছিস, অথচ টু-থ্রির বাচ্চাদের মত দিন-রাত ছোট বোনের সঙ্গে এটা ওটা নিয়ে লেগেই আছিস! লজ্জা হয় না?'
মার আড়াল থেকে চোখ-মুখের বিচিত্র ভঙ্গি দিয়ে মামুনকে বোঝাতে চাইলো মিঠু, কেমন জব্দ? আর তখনই মা ফিরলেন মিঠুর দিকে।
অবস্থা বেগতিক দেখে তাড়াতাড়ি মশারীর নিচে ঢুকতে যাচ্ছিলো মিঠু। কিন্তু মা হঠাৎ মেয়ের বাহু ধরে টেনে সামনে দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘এই যে মেয়ে, কলেজে পড়ছিস বলে কি এখনো খুকি আছিস?'
তারপর আবার বললেন, 'তোর মত বয়সে ছেলে-পেলে, সংসার দেখাশুনা করেও শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করেছি। সময় মত বিয়ে দিলে তো তুইও ছেলে কোলে নাস্তানাবুদ হতি, এটা নিজে বুঝতে পারিস না?'
মার শেষের কথাগুলো শুনে মিঠুর দু'গালে রঙের ছোপ ফুটে উঠলো। কিন্তু মা তা লক্ষ্য করলেন না। লক্ষ্য করলেও হয়তো দেখতে পেতেন না। কেন না, ততক্ষণে মিঠুর উন্নত শির আনত হয়ে এসেছে।
মিঠুকে ছেড়ে দিয়ে মা বললেন, ‘কাল থেকে তুই আমার ঘরেই পড়বি! বই-খাতা, টেবিল-চেয়ার সব নিয়ে যাবি এখান থেকে!'
চুপচাপ মশারীর নিচে গিয়ে ঢুকলো মিঠু।
মা আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলেন না।
এ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় হাসি আর চেপে রাখতে পারলেন না। মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসতে লাগলেন নিঃশব্দে।
মাকে এভাবে হাসতে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো মাসুদ। হঠাৎ সে ভেবে পেলো না যে মায়ের হাসির পেছনে কী এমন কারণ থাকতে পারে? তাই সে বলেই ফেললো, 'হাসছ যে?'
মা তেমনি হাসতে হাসতে বললেন, 'দু'টোতে একদন্ড বনিবনা নেই! যেই একটু শক্ত কথা বলেছি, অমনিই গুম! গিয়ে দেখ দু’টো কেমন প্যাঁচামুখ করে বসে আছে!'
মাসুদ এ ঘরে এসে দেখতে পেল, মামুন গালে হাত দিয়ে বসে আছে। মশারীর নিচে বই খুলে বসে আছে মিঠু। সে একবার খুক করে কাশলো। তারপর বলে উঠলো, ‘ভ্রাতা-ভগ্নিদ্বয়, নিরবতা খুব স্বস্তিকর! তাই না?'
'অসহ্য!' মশারীর ভেতর থেকে যেন ফুঁসে উঠলো মিঠু।
'তাহলে শব্দ করে পড়!'
'ভাল লাগছে না!'
'খারাপ লাগলে শুয়ে পড়!'
'অত তাড়াতাড়ি ঘুম আসবে না!'
'কি করবি?'
'কিছু না!'
'তাহলে বসে থাক!'
'তুমিও বস!'
'কেন?'
'আহা বসই না!'
মশারীর প্রান্ত সরিয়ে বিছানায় বসে মাসুদ বললো, ‘বলে ফেল! তোর কথা শুনে, হাত-মুখ ধোবো, চা খাবো, তারপর অনেক কাজও আছে। বল ঝটপট!'
'আমি তো ভেবেছি তুমিই বলবে!'
'কি বলবো?'
'যা হয় একটা কিছু বলো!'
মাসুদ আশ্চর্য হয় না। তবে, মিঠু যে কিছু একটা স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছে, তা বুঝতে পারলেও এ মুহূর্তে ধরতে পারছে না। বলে, ‘মতলবটা কি বলতো?'
'এই কয়েক ঘন্টায় ভুলে গেলে?'
‘কিছুর কথা বলেছিলি নাকি?'
‘সকালের দিকে বললাম না আমরা কলেজ থেকে পিকনিকে যাচ্ছি!'
‘যাবি যা! আমি তো না করছি না!'
'চাঁদা ছাড়াই যাবো?'
মিঠু বিস্মিত কন্ঠে বলে।
'চাঁদা কত?'
'তোমাকে বললাম না, দুশো পঞ্চাশ!'
চোখ কপালে তুলে, মাথায় হাত দিয়ে বিস্মিত হওয়ার ভান করে মাসুদ বললো, ‘সর্বনাশ! এত টাকা!'
মিঠুর মুখ কালো হয়ে যায়। বলে, 'কি, দিতে পারবে না?'
মিঠুর কন্ঠে আশাভঙ্গের সুর স্পষ্ট শুনতে পায় মাসুদ। বলে, 'কবে দিতে হবে?'
'কালই শেষ দিন!'
মনের ভাব গোপন রেখে মাসুদ বললো, ‘জানিস তো, জিনিসপত্রের যা দাম! তার উপর সারা বছরই সংসারে টানাটানি লেগে আছে। এমন অবস্থায় আড়াইশো টাকা বেরিয়ে যাওয়া মানে বুঝতে পারছিস?'
মনে হল কেঁদে ফেলবে মিঠু।
তবুও তার সহ্যসীমা পরখ করতে বললো, ‘পিকনিকে না গেলে হয় না!'
সত্যি সত্যিই চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো মিঠুর। ‘কোনো বারই তো যাওয়া হয় না। যাও এবার যেতে চাইলাম, তাও হচ্ছে না! আমার বন্ধুরা কী ভাববে?'
মিটমিট করে হাসতে হাসতে মাসুদ বললো, ‘কী আর ভাববে? ভাববে যে, মিঠুটা খুবই অভাবী ঘরের মেয়ে! এই তো?'
তারপরই আবার বললো, ‘থাক, আর ফ্যাঁচফ্যাঁচ করতে হবে না!' বলে হেসে ফেললো মাসুদ। ‘সকালে মার কাছে চেয়ে নিস!'
হঠাৎ কান্না ভুলে মাসুদকে জড়িয়ে ধরলো মিঠু। ‘ওহ মাই সুইট এল্ডার!'
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



