শীতেরদিন পাঁচটার আগেই সন্ধ্যা নেমে আসতে থাকে। বাসটা কলেজের দোড়গোড়ায় আসতেই কে কার আগে নামবে এ নিয়ে হুড়োহুড়ি আরম্ভ হয়ে যায়।
বাস থেকে নেমেই সমরীতার হাত ধরে মিঠু বললো, 'চল, তোদের স্টুডিওতে যাই!
আগে একটা রিকশা নেই।'
'পথ তো সামান্য। হেঁটেই চলে যাবো!'
হাঁটতে হাঁটতে ওরা যখন স্টুডিওতে এলে সমরীতার দাদা অজয় বললো, 'কিরে সমি, কখন এলি?'
'এই তো, বাস থেকে নেমেই সোজা এখানে চলে এসেছি!'
'আয়, ভেতরে আয়! সঙ্গে এটি কে?'
'না দাদা, দেরি করা যাবে না!'
তারপর মিঠুকে দেখিয়ে বললো, 'আমার ফ্রেন্ড মিঠু। একটা ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট ছবি এনলার্জ করাবে!'
'নেগেটিভ আছে?'
'না। একটা পাসপোর্ট সাইজ ফোটো আছে!'
'ঠিক আছে!' অজয় বললো। 'এখন দিয়ে গেলে আমি করে রাখবো!'
মিঠু পার্স থেকে ছবিটা বের করে অজয়ের হাতে দিয়ে বললো, আজ দেয়া যাবে না?'
'আজ তো ফেরত দেয়া যাবে না। তা ছাড়া অনেক পুরোনো। রি-টাচের কাজও করতে হবে বেশ কিছুটা!'
মিঠুর মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া পড়লো। কারণ ছবিটা আজই মাসুদকে ফিরিয়ে দেবার কথা।
'কী ভাবছিস? সমরীতা বললো। 'আজই টাকা দিতে হবে না!'
মিঠু বললো, 'টাকার জন্যে নয়। ছবিটা আজই ভাইজানকে ফেরত দিতে হবে!'
একটু ভেবে নিয়ে মিঠু আবার বললো, 'আজ তাহলে থাক। অন্যদিন করানো যাবে!'
সমরীতা বললো, 'মাত্র তো একটা দিনের ব্যাপার!'
অজয় বললো, 'ঘন্টা দুয়েক দেরি করতে পারলে এটা ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে পারি। কিন্তু নতুনটা নিতে হবে পরে!'
'আমার যে আজই দরকার!'
সমরীতা মিঠুর পক্ষ থেকেই যেন বলে, 'আজ হবে না কেন?'
অজয় হাসলো। 'বুদ্ধু আর কাকে বলে! নতুন ছবিটা তো কেমিক্যাল দিয়ে ওয়াশ করতে হবে। তারপর পরিষ্কার পানিতে কিছুক্ষণ ভিজিয়ে রেখে ধূতে হবে। হিটারে অল্প তাপে শুকোতে হবে। পরে যেখানে যেখানে রি-টাচ লাগে তা আবার করতে হবে। ম্যানুয়ালি ছবির কাজ অনেক ঝামেলা!'
'ঠিক আছে!' সম্মতি জানায় মিঠু।
তারপর আবার বলে, 'একটু তাড়াতাড়ি, প্লিজ!'
অজয় ডার্করুমের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
সমরীতা সোফার হাতলে বসে, মিঠুকে বসতে বললো। কিন্তু মিঠুর বসতে ইচ্ছে হচ্ছিলো না। তবুও সে বসে। অজয় কখন কাজ সারতে পারে সেটা ঠিক করে বলা যায় না।
আধঘন্টার মত সময় পার করে দিয়ে অজয় বেরিয়ে এলো ডার্ক রুমের ভেতর থেকে। তার মুখে চিবুকে ঘাম চিকচিক করছিলো। ছবিটা মিঠুর হাতে দিয়ে বললো, 'সকালের দিকে এলেও এনলার্জ করা ছবিটা পেয়ে যাবে! আর তুমি করেই বললাম। কারণ সমিটাকে আপনি করে বলতে পারি না!'
মিঠু লজ্জা পেয়ে বললো, 'না না, ঠিক আছে!'
'দাদা, বান্ধবীকে নিয়ে আজ খালি মুখেই গেলাম! আগামী কাল কিন্তু...'
কথা অসম্পূর্ণ রাখে সমরীতা।
'আচ্ছা আচ্ছা! আগামীকাল হোক না আগে!'
'চল মিঠু!'
সমরীতা তাড়া দেয়।
'কিন্তু টাকা?
মিঠু আপত্তির সূরে বললো।
'বেরো, বেরো!' বলে, প্রায় ঠেলতে ঠেলতে মিঠুকে বাইরে নিয়ে আসে সমরীতা।
তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় রিকশায় বসে মিঠু ভাবতে চেষ্টা করে যে, বাবার বাঁধানো ছবিটা ড্রয়িংরুমে হঠাৎ দেখতে পেলে কতটা অবাক হবে মাসুদ?
ভাবতে ভাবতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলো মিঠু। কিন্তু হঠাৎ একটা খ্যানখ্যানে কন্ঠরে চমকে উঠে ভয়-তরাসে তাকিয়ে দেখতে পেলো রিকশা জ্যামে আটকা পড়ে আছে। দু'পাশে দু'জন কদাকার যুবক ছোরা আর পিস্তল উঁচিয়ে ধরে ঘড়ি আর পার্সটা দিয়ে দিতে বলছে।
মিঠুর গলা যেন শুকিয়ে গেল। কিছু একটা বলতে চাইলেও সময় পেলো না। তার আগেই একজন হাত থেকে ঘড়িটা খুলে নিলো। অন্যজন ছিনিয়ে নিলো পার্সটা।
প্রাণপন চেষ্টা করেও সে চিৎকার দিতে ব্যর্থ হলো। সামনের পেছনের এমনকি পাশের রিকশা চালক ও রিকশারোহী সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখলো। কিন্তু টু-শব্দটিও করলো না কেউ। অথচ কত দামী একটা জিনিস ছিনতাই হয়ে গেল তার হাত থেকে, কেউ জানতেও পারলো না।
ছিনতাইকারী দু'জন যখন কয়েকটি রিকশা টপকে পালিয়ে গেল, তখন অনেকেই উঁচু কন্ঠে জানতে চাইলো, 'কি ছিনতাই হলো?'
রাগে আর দুঃখে এই মেরুদন্ডহীন মানুষগুলোর মুখে থুথু ছিটিয়ে ইচ্ছে হয় মিঠুর।
কিন্তু যেন কিছুই হয়নি এমন ভাব নিয়ে বসে থাকলো।
বাড়ি ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করলেন, 'এত দেরি হলো যে? তোর মুখটা এমন শুকনো শুকনো দেখাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ?'
'না মা। শরীর ঠিকই আছে। সারাদিন হৈ-হল্লা করে তার উপর জার্নির ধকলটা কেমন গেছে তুমি যদি জানতে মা! আগে বুঝতে পারলে পিকনিকেই যেতাম না!'
'যা যা! আগে গোসল করে বিশ্রাম নে। চা খা। ঠিক হয়ে যাবে!'
ছিনতাইয়ের ঘটনাটা চেপে গেল মিঠু। কিন্তু মাসুদ যদি ছবিটা ফেরত চায়, তাহলে কী জাবাব দেবে ভেবে ঘামতে আরম্ভ করলো। তখন কি ছিনতাইয়ের ঘটনাটা বলবে? নাকি বলবে, হারিয়ে গেছে?
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



