ঘি-পট্টিতে ঢুকে ফৌজিয়ার বলা কথাগুলো ভুলে গেল মামুন। তা ছাড়া, সে যে কাগজটিতে মিজানের ঠিকানা লিখে দিয়েছিলো সেটা হয়তো সার্টের পকেটেই রয়ে গেছে। চেষ্টা করেও ফৌজিয়ার নির্দেশিত পথে এগোতে পারছিলো না। একটা দোতলা পুরোনো বাড়ি। সদর দরজায় সাদা রঙ দিয়ে লালুভুলু লেখা আছে। এতটুকুই সে মনে করতে পারছিলো। কিন্তু ঘি-পট্টি দিয়ে ঢুকে সে কোন পথে যাবে তাই মনে নেই। হাঁটতে হাঁটতে সে নোংরা এবং ঘিঞ্জি একটা গলিতে ঢুকে পড়লো। ফৌজিয়ার সঙ্গে যে ফোনে কথা বলবে, তেমন কোনো দোকানও চোখে পড়ছে না। ড্রেনের দুর্গন্ধে তার পেট ফুলে যাওয়ার উপক্রম হলো। তাই দ্রুত পা চালিয়ে একটা বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় অসাবধানে গু মাড়িয়েদিচ্ছিলো প্রায়। হঠাৎ লাফ দিয়ে দুর্ঘটনাটা এড়ালো কোনোক্রমে।
অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর কোনো হদিস না পেয়ে একটা রড-সিমেন্টের দোকান থেকে ফৌজিয়াকে ফোন করে জেনে নিল মিজানের বাড়ির হদিস।
ফৌজিয়ার নির্দেশ মত পথ ধরে মামুন এগিয়ে গেল। দেয়ালের পাশে ময়লা আবর্জনা স্থপ করা। দুটো কুকুর গোঁ-গোঁ শব্দে লাড়াইর পূর্ব প্রস্থতি হিসেবে পেছনের পা দিয়ে আঁচড়ে ময়লাগুলোকে রাস্তার উপর ছিটিয়ে দিচ্ছে প্রবল পরাক্রমে। আর তা দেখে পাঁচ-সাতটা পাতি কাক কা-কা করে উড়ে বেড়াচ্ছে।
আরো খানিকটা এগিয়ে যেতেই দেখা গেল রাস্তার মাঝখানে ম্যানহোলের ঢাকনার ফাঁক গলে গুপ্ত ময়লা আর হলদে পানি বেরিয়ে দু’পাশের সরু নালায় গড়িয়ে যাচ্ছে।
সামনে এগোতে হলে এই নোংরা মাড়িয়েই তাকে যেতে হবে। তা ছাড়া গত্যন্তর নেই। সে নোংরা মাড়িয়েই এগোলো। ফলে, জুতোর তলা থেকে আরম্ভ করে কিছু অংশ পর্যন্ত ডুবে গেল নোংরা পানিতে।
মামুন ভেবেছিলো দরজার লেখাটা সাদা রঙ দিয়ে সুন্দর করে লেখা। কিন্তু দেখা গেল চুন দিয়ে লেখাটা হয়েছে। তাও আবার আনাড়ী হাতের কাজ। শেষটায় বিরস মনেই দরজার কড়া ধরে নাড়লো সে।
বেশ কিছুক্ষণ কড়া ধরে খটাখট-খটাখট করার পর আট-দশ বছরের একটি মেয়ে দরজা খুলে মাথাটা বের করে মামুনকে দেখলো।
তারপর বললো, 'কাকে চান?'
'মিজান আছে?'
'আছে।'
'তাকে গিয়ে বলো যে, ওর সঙ্গে দেখা করতে মামুন এসেছে!'
'আপনি দাঁড়ান!' বলে, মেয়েটা দরজা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল।
মিনিট খানেক পর মিজান এসে দরজা খুলে দাঁড়ালো। মামুনকে দেখে বার কয়েক চোখ পিটপিট করে বললো, 'আপনি আবার এসেছেন? আচ্ছা, কতবার নাম পাল্টাবেন? এপর্যন্ত তো তিনবার হলো!'
মামুন তেমনি ভাব দেখিয়ে বলতে চাইলো, 'না। ভুল হলো। এপর্যন্ত ন'বার চেষ্টা করেছি!' কিন্তু গাম্ভীর্য বজায় রাখতে না পেরে হেসে ফেললো।
মিজান বললো, 'ভেতরে আয়!'
মামুন ভেতরে ঢুকেই বললো, 'এমন নরকের মধ্যে থেকে যে, মাঝেমধ্যে সুস্থ থাকিস বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়! একদিন ঠিকই মারা পড়বি!'
'আরে অভ্যেস! তুই থাকলে তোরও সয়ে যাবে! অন্যান্যরা কি থাকছে না? তারা কি সবাই মারা গেছে?'
মামুন কিছু বললো না।
একটা মাঝারি রুমের ভেতর গিয়ে মিজান মামুনকে বললো আয়। কিন্তু ঘরের ভেতর দামী কার্পেট দেখে জুতো খুলতে উদ্যত হলে মিজান বললো, 'ঢুকে পড়!'
'নোংরা মাড়িয়ে আসতে হয়েছে!'
'অসুবিধা নেই!'
ঘরে ঢুকে একটা সোফাতে বসতে বসতে মামুন বললো, 'কিরে বদমাশ, তোর নাকি জ্বর?'
'ছিলো। কিন্তু খবর পেলি কিভাবে? চিনলি কি করে? ফৌজিয়া বলেছে?'
'এ দোযখের ঠিকানা তো ওকে ছাড়া কেউ জানার কথা না!'
'বল কেমন আছিস?'
'প্রশ্নটা আমি করার কথা!' বাধা দিলো মামুন। 'তাহলে জ্বর-টর নেই?'
'একদম নেই!'
'ভালো থাকলে ক্লাসে গেলি না কেন?'
'পরশু থেকে যাবো!'
'কাল নয় কেন?'
'আমার ইচ্ছে!'
'তোর যা ইচ্ছে তাই করিস? এ নিয়ে কি কখনো অপরাধ বোধে ভুগিস না?'
'মাঝে মাঝে কিছুটা খারাপ লাগে!'
'এমন কাজ করিস কেন?'
'আর করবো না!'
'প্রমিজ করছিস?'
'একটা মিশন এখনো শেষ হয়নি। রেজাল্টও পাইনি। ওটাতে সাকসেস এলেই যা ইচ্ছে তাই করা ছেড়ে দেবো!'
'কিন্তু একবার কি ভেবেছিস যে, যাদের ক্ষতিটা করছিস তাদের ক্ষতির পরিমাণটা কতটুকু?'
'আমার মনে হয় না কারো ক্ষতি হয়েছে!'
'তুই কি বলতে চাচ্ছিস নাতাশাকে আমার নাম ভাড়িয়ে চিঠি লিখে ক্ষতি করিসনি?'
'তোদের জোড়াটাকে মিলিয়ে দিলাম। খারাপ বলছিস কেন?'
'নাতাশাকে যে পছন্দ করবো বা সে আমাকে পছন্দ করবে সেটাই বা এত কনফার্ম হলি কি করে?'
'নাতাশার মুখে একদিন শুনেছিলাম, তুই টল, হ্যান্ডসাম। পারফেক্ট জ্যান্টলম্যান! তারপর তোর মুখে যেদিন শুনলাম যে, মোহিনী! ওতেই বুঝে গেলাম মূলো দেখালে দু'জনেই ছুটতে থাকবি!'
'তবে রে শালা লেজকাটা শিয়াল!' বলে, মামুন মারতে গেল মিজানকে। আত্মরক্ষার ভঙ্গি করে মিজান বললো, 'লেজ না থাকলে অনেক সুবিধা। পালানোর সময় কোথাও আটকে যাওয়ার ভয় থাকে না। গর্ত থেকে লেজ ধরে টেনে বের করার ভয়ও থাকে না!'
'নিজে তো ডুবেছিস, মাঝখান দিয়ে আমাদেরও ডোবালি!'
'কনগ্রেচুলেশন দোস্ত! নাতাশার সঙ্গে কথা হয়েছে তাহলে?'
'শুধু কথাই হয়নি। বলেছি যে, চিঠিগুলো আমি লিখিনি। লেখা মিলিয়ে দেখ যে, এগুলো মিজানের হাতের লেখা!'
মিজান হঠাৎ মাথায় হাত দিয়ে ডুবে যাওয়ার ভঙ্গি করে বললো, 'তুই তো দেখছি মেরে ফেলেছিস আমাকে! নামটা বলতে গেলি কেন?'
'অকাজ-কুকাজ করতে পারবি আর নাম বললেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়?'
'তুই জানিস, নাতাশা আমাকে কতটা ভালো জানে? এখন আমাকে দেখলেই মুখের উপর থুথু দেবে!'
'যেমন কর্ম তেমন ফল!'
মামুন আসলে কিছুই বলেনি। অনুমানের উপর ঢিল ছুঁড়তেই লেগে গেল দেখে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলো। সে নিজেও জানতো না যে, চিঠিগুলো মিজানই লিখতে পারে।
'নাতাশা তো তোর উপর রেগে টঙ হয়ে আছে। দেখা হলেই ঝাড়বে!'
'তাহলে তো মান-সম্মান যাবে দেখছি!'
তাদের কথাবার্তার এ পর্যায়ে পর্দা ঠেলে একজন প্রৌঢ়া ঢুকলেন। তাঁকে দেখিয়ে মিজান বললো, 'আমার মা!'
মামুন উঠে সালাম দিতে তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, 'বসো!'
মামুন তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল। সাদা ধবধবে শাড়ির আড়ালে একজন ব্যক্তিত্বসম্পন্না অভিজাত গৃহিণীর প্রতিকৃতি তার দৃষ্টি এড়ালো না।
মিজান একবার বলেছিলো যে, তার মা নবাব আহসান উল্লাহর কেমন আত্মীয়া হন। আর সে জন্যেই মিজানের দাদা ছেলেকে বিয়ে করানোর সময় কনের ওজনে সোনা মেপে যৌতুক দিয়েছিলেন।
মামুনের অবশ্য কথাগুলো বিশ্বাস হয়নি তখন। ভেবেছিলো যে, ঢাকা শহরের বেশিরভাগ মানুষের মত মিজানও গুল মারছে। এমন বিশ্বাসের কারণ হচ্ছে মিজানের চাল-চলন, পোশাক-আশাক দেখে তাকে কেউ বিত্তবান ঘরের ছেলে ভাববে না। চেহারা-সুরতে নিম্নমধ্যবিত্তের ছাপই প্রকট। কিন্তু এ বাড়িতে ঢুকেই মামুনের ধারণা পাল্টে গেল। বিস্ময়ে প্রথম সে নির্বাক হয়েছিলো কিছুক্ষণ। অস্থানীয় কেউ বাইরে থেকে এ বাড়ির বিপুল বৈভবের কথা কল্পনাও করতে পারবে না!
মামুন বসতেই তিনি তার সামনের সোফায় বসে বললেন, 'তুমি মামুন! ঠিক?'
'জি।'
'তোমার কথা এতই শুনেছি যে, মনের মধ্যে ছবিটা গেঁথে গেছে! ঢাকাতেই সবাই আছ?'
'জি।'
'কে কে আছে বাড়িতে?'
'মা, বড় ভাই আর একটা বোন।'
'বোন কি একজনই?'
'জি।'
'তোমার বড় না?'
'জি না! আমার ছোট!'
'বিয়ে হয়ে গেছে, নাহ?'
'ইন্টারমিডিয়েট পড়ছে!'
তারপর তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'তুমি বসো। আমি না আসা পর্যন্ত যেও না যেন!'
এ অন্তরঙ্গ পরিবেশটা খুব ভালো লাগছিলো মামুনের। এক পাশে মাথা হেলিয়ে বললো, 'আচ্ছা!'
তিনি যেতে গিয়েও ফিরে বললেন, 'দেখো কিন্তু!'
মামুন ঢোক গিলে বললো, 'জি, আচ্ছা!'
তিনি চলে গেলে মিজান সিগারেট বের করে বললো, 'নে, সিগারেট টান!'
'তোর বিষ তুইই টান!'
মিজান সিগারেট ধরিয়ে বললো, 'মা ফিরে আসতে অনেক দেরি! আসলে তিনি তোকে আটকালেন। এখন চা-নাস্তা আসবে। আমরা সেগুলো খেয়ে বসে থাকবো। কিন্তু তারপরও মা আসবেন না!'
'মানে?'
মামুন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে মিজানের দিকে।
'মানে খুব সোজা! দুপুরের খাবার সাজিয়ে মা দ্বিতীয়বার আসবেন। খেয়ে-দেয়ে তারপর যেতে পারবি!'
মামুন ঘড়ির দিকে তাকালে মিজান বললো, 'মাত্র পনের মিনিট!'
'দেরি হলে মা ভাববেন!'
'বেশি কিছু ভাববেন না!'
'নারে! প্রতিদিন যে সময় ফিরি, সে সময়টা পার হয়ে গেলে মা অস্থির হয়ে পড়েন!'
'যাই হোক, তবুও তুই ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে বেরুতে পারছিস না! মা কতবার তোকে নিয়ে আসতে বলেছেন! কিন্তু তুই কখনো আমার সঙ্গে আসিসনি!'
'তুই বলেছিস?'
'বলিনি? কতবার বললাম তার হিসেব নেই!'
'অমন কথা তো সবাই বলে!'
'তুই জানিস আমি সবার মত না!'
'তবু, মার কথা বললে, আসতামই!'
'মা খুব চটে আছেন তোর উপর। এখন সুদে আসলে সবটার শোধ নেবেন। সুতরাং...'
কথা শেষ করতে পারে না মিজান। প্রথম দরজায় দেখা মেয়েটি ঘরে এসে ঢুকলো। পেছনে দশ-বার বছরের একটি ছেলে ট্রে হাতে। মেয়েটি বললো, 'তোমরা গুলবাজী করতে করতে চা খাও! দীদা আসতে দেরি হবে!'
মেয়েটা চলে যেতেই মামুন বললো, 'মেয়েটা কে?'
'কিমি। ভাইয়ের মেয়ে!'
ছেলেটা ট্রে নামিয়ে রেখে ফিরে যেতেই মিজান বললো, 'নে, আপাতত এগুলো দিয়েই শুরু কর!'
তারপর একটা চায়ের কাপ তুলে মামুনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, 'তো নাতাশার সঙ্গে তোর কি কি কথা হলো, বলতো শুনি?'
কিন্তু নাতাশার মুখ না ভেসে মামুনের মানস পর্দায় ভেসে উঠলো মায়ের দুশ্চিন্তাক্লিষ্ট মুখ। কারণ মিঠু গিয়েছে পিকনিকে। অন্যদিকে সময় উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও মামুন যখন বাড়িতে ফিরবে না, তখন যতরকম অশুভ চিন্তা করে করে মন খারাপ করে বসে থাকবেন তিনি। হয়তো উদ্বিগ্ন হয়ে মাসুদকে ফোন করে জানাবেন ঘটনাটা। ওদিকে অস্থির হয়ে উঠবে মাসুদও।
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


