মধুনিশা-১৩

০৮ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ১:৩২

শেয়ার করুন:                   Facebook

ফ্লুর কারণে সপ্তাহ খানেক ক্লাসে যেতে পারেনি মামুন।

য়্যুনিভার্সিটি বাস থেকে নামতেই ছুটে এলো ফৌজিয়া। 'মামুন!'

ফৌজিয়ার উদভ্রান্ত চেহারা দেখে থমকে যায় মামুন।

তারপর বললো, 'কোথাও গিয়ে বসি। তারপর খুলে বলো!'

মামুনের নরম কথায় ফৌজিয়ার অন্তর্গত কান্না উথলে উঠলেও কাঁদতে পারে না সে। শুধু একটা বোবা যন্ত্রণা পাক খেয়ে গলা দিয়ে উপরে উঠে আসতে চাচ্ছে।

মামুন অপেক্ষা করে ফৌজিয়ার কান্না দমনের প্রচেষ্টা দেখে। দেখে একজন সংযত নারীর আত্মপীড়ন।

কিছুক্ষণ পর নিজকে সামলে নিয়ে ফৌজিয়া বললো, 'মিজানকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না!'

কথাটা শুনে ভীষন ভাবে চমকে উঠে মামুন। মাত্র কয়েকদিন আগেই না দেখে এলো তাকে! আর এরই মাঝে এত কিছু হয়ে গেলো?

মামুনের হতবিহ্বলতা দেখে ফৌজিয়া আবার বললো, 'তুমি জান না কিছু?'

'কি করে? আমাকে তো কিছু জানায়নি!'

'সত্যি জান না?'

মামুন মাথা নাড়াতেই ফৌজিয়ার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে আসে।

মামুন কোনো সান্ত্বনা দেয় না তাকে। অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর বললো, 'চোখ মোছো! ব্যাপারটা কবে থেকে জানতে পারলে?'

ফৌজিয়া চোখ মুছে বললো, 'সেদিন ক্লাস করে আর বাড়ি ফেরেনি!'

'তাই তো ভাবি, ও ক্লাসে আসছে না কেন? কিন্তু তুমি জানলে কিভাবে?'

'কাল গিয়েছিলাম! আমাকে দেখে মিজানের আম্মা জিজ্ঞেস করলেন মিজানের কথা। আমি বললাম, ও তো দুুদিন ধরে ক্লাস করছে না! অমনি তিনি কাঁদতে আরম্ভ করলেন। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন যে, এমন কোনো জায়গা বাদ রাখিনি যে মিজানের খোঁজ করিনি! আমাকে না বলে তো কোথাও যাবার ছেলে নয়!'

'থানায় খোঁজ নিয়েছে?'

'জিজ্ঞেস করিনি!'

মামুন বিরক্ত হয়ে বললো, 'তুমিও জিজ্ঞেস করোনি?'

ফৌজিয়া কাতর হয়ে বলে, 'আমি কিরবো? তিনি তো শুধুই কাঁদেন! এমন অবস্থায় কিছু জিজ্ঞেস করা যায়?'

'ওর ভাই-ভাবি কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারতে!'

'ওর কোনো ভাই-ভাবির সঙ্গে আমার কথা হয়নি। আর ওদের কেউ জানলে অবশ্যই বলতো!'

'ঠিক আছে, আমিই যাচ্ছি!'

মামুন যেতে উদ্যত হলে ফৌজিয়া বললো, 'আমিও যাবো!'

'খামোখা গিয়ে কি করবে তুমি?'

'তবুও যাবো!'

'ঠিক আছে!'

আফতাব বললো, 'কোথায় যাস? ক্লাস করবি না?'

'না!'

আফতাব কিছু বুঝতে না পেরে কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। ব্যাপারটা দেখে মামুন বললো, 'একটা জরুরি কাজে মিজানদের বাড়ি যাচ্ছি!'

আফতাব কিছু বললো না।

ফৌজিয়া বললো, 'বেবিট্যাক্সিতে চলো! সময় কম লাগবে!'

'আমার কাছে অত টাকা হবে না!'

'আমার কাছে আছে!'

মামুন কোনো মন্তব্য করে না।

মিজানদের বাড়ি আসতেই ওরা মিজানের মায়ের মুখোমুখি হয়। তাঁর চোখ দুটো ফুলে আছে। বোঝাই যাচ্ছে কান্না তাঁর থামেনি। চোখের ভেতরের সাদা অংশগুলো কেমন লাল লাল হয়ে আছে।

ফৌজিয়া বললো, 'মিজানের কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে?'

'না, মা!' বলে তিনি আঁচলে দু'চোখ চেপে ধরলেন।

'থানায় জানিয়েছেন?'

জানতে চাইলো মামুন।

'ওরা এখনো কিছু জানতে পারেনি!'

'পত্রিকায় ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিলে মনে হয় ভালো হতো!'

'আজ ছবি নিয়ে গেছে!'

তারপর 'কী আর হবে!' বলে তিনি অঝোরে কাঁদতে লাগলেন।

মামুন বললো, 'আন্টি, আপনি কাঁদবেন না! মিজান ঠিকই ফিরে আসবে!'

কিন্তু তিনি থামলেন না। আরো শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। 'আমার মন বলছে অন্য কথা!'

'দিদা তুমি আবার কান্না শুরু করলে?' বলে, কিমি এসে তাঁর গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।

পর্দার আড়াল থেকে কোনো নারী কন্ঠ কিমিকে ডাকতেই সে ভেতরে চলে গিয়েও আবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে আসে।

তারপর ফৌজিয়ার কাছে গিয়ে বললো, 'আম্মু তোমাকে ডাকছে!'

ফৌজিয়া ভেতরের দিকে চলে গেলে মামুন বললো, 'আন্টি, আপনাদের এমন কোনো আত্মীয় আছে, যারা ঢাকা থেকে অনেক দূরে আছে?'

আন্টি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, 'না। সব আত্মীয় ঢাকাতেই! দূরের যারা, সবাই বাংলাদেশের বাইরে!

'মিজান যেদিন যায়, সেদিন ওর সঙ্গে টাকা-পয়সা বেশি ছিলো?'

'না। তবে অ্যাকাউন্ট থেকে তুলেছে কিনা জানি না!'

মামুন কিছুটা হতাশার সুরে বললো, 'কোথায় যেতে পারে, আমার মাথায় কিছু আসছে না!

ওর অন্যান্য বন্ধুদের জিজ্ঞেস করে দেখি। আপনি টেনশন করবেন না! এক্ষুনি যাচ্ছি! ফৌজিয়া কোথায়?'

'দেখছি, তুমি বস!'

তিনি চলে গেলে মামুন ভীষন একা হয়ে পড়ে। মনে হয় সে এখানে যুগযুগ ধরে বসে আছে।

কিছুক্ষণ পর ফৌজিয়া এসে বললো, 'আমাকে কি দরকার?'

'এখনই বেরুতে হবে!'

'খালাম্মা বলছিলেন একটু দেরি করতে!'

'সময় নেই! দেরি হলে সবাইকে পাওয়া যাবে না!'

সঙ্গে সঙ্গেই ফৌজিয়া বলে, 'চলো!'

বেরিয়ে এসে ওরা বেবিট্যাক্সি বা মিশুক কোনোটাই পায় না। বাধ্য হয়েই তাদেরকে রিকশায় চড়তে হয়। রিকশা ঘুরে পাটুয়াটুলী পার হতেই মামুন বললো, 'মিজানের বন্ধুদের সবাইকে চেনো?'

ফৌজিয়ার মুখে অন্ধকার ঘনায়। 'সবাইকে না, দু'চারজনকে চিনি!'

'তাদের কাছে কিছু জানা যেতে পারে!'

'ওরা তোমার মত অতটা ক্লোজ না!'

ফৌজিয়ার কন্ঠর নিরুত্তাপ শোনায়।

'সব সময় দেখে বোঝা যায় না! ওর একটা গাঁজাখোর বন্ধু আছে! তার সঙ্গেও কোনো ভেজাল হতে পারে!'

ফৌজিয়া শঙ্কিত কন্ঠে বললো, 'কে সেটা?'

'আমি জানি না! অনেক চাপাচাপি করেও নাম বের করতে পারিনি!'

ভার্সিটিতে এসে পাগলের মত বিভিন্নজনকে খুঁজে বেড়ালো ওরা। কিন্তু মিজানের কোনো হদিস বের করতে পারলো না। তবে সেই বন্ধুটার নাম জানা গেলো বিজন। মাস্টার্সের ছাত্র। বর্তমানে জেলে আছে।

মামুন ঠিক করলো যে, সে জেলখানায় যাবে বিজনের সঙ্গে দেখা করতে।

তারপর ফৌজিয়াকে বললো, 'পঞ্চাশটা টাকা দাও তো!'

ফৌজিয়া মামুনকে আশ্বস্ত করে বলে, 'আমি তো সঙ্গে আছি! তুমি ভেবো না!'

(চলবে...)

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): সাহিত্যউপন্যাস ;

 

  • ০ টি মন্তব্য
  • ৫২ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ১ জনের ভাল লেগেছে, ১ জনের ভাল লাগেনি

 



 


আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশী। দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের উত্তাপে ভালোবাসতে শিখেছি দেশকে। দেশের মানুষকে। তাই রাজাকারদের ঘৃণা করতে শিখেছি শৈশব থেকেই।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৬৯৬৫