মামুন ঘরে ঢুকেই কিমিকে বললো, 'তোমার দিদাকে বল আমার কথা!'
'দিদার শরীর ভালো না! তুমি দিদার ঘরে এসো!'
মিজানের মা শুয়েছিলেন। মামুনকে দেখতে পেয়ে শঙ্কিত কন্ঠে বললেন, 'বাবা, কি খবর?'
'একটা খবর পাওয়া গেছে!'
'কি খবর?' বলেই তিনি শোয়া থেকে উঠে বিছানা থেকে নেমে মামুনের পাশে চলে এলেন।
হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেলে মানুষ যেমন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে, কোনো দুর্বলতার লক্ষণ চোখে পড়ে না, তেমনি তিনি মামুনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
'এমনও তো হতে পারে মিজান ইন্ডিয়াতে আছে। যাওয়ার সময় কোনো কারণে খবর দিতে পারেনি বা সমস্যা হবে ভেবে জানায়নি!'
'কি করে বললি বাপ? আমার মাথায় তো এমন একটা ভাবনা এলো না!'
'ওর কি পাসপোর্ট ছিলো?'
'হ্যাঁ! পিকাডেলি যাওয়ার সময় বানিয়েছিলো!'
'ওটা কি ঘরে আছে?'
'দেখছি!' বলে তিনি ঘরের স্টিলের আলমারিটা খুললেন। কিছুক্ষণ এটা ওটা নেড়েচেড়ে বললেন, 'না নেই!'
'চেকবই?'
তিনি আবার মাথা ঢোকালেন আলমারিতে। 'না নেই!' বলে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে রইলেন মামুনের দিকে।
মামুনের মুখে হাসি ফুটে উঠলো। 'তাহলে ছেলেটা মিজানই!'
তিনি ছুটে এসে মামুনের কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে বললেন, 'খুলে বল! কিছুই গোপন করবি না!'
নাতাশার কাছ থেকে আর আবিদ মামার কাছ থেকে যা যা শুনেছে সবই বললো মামুন।
তারপর বললো, 'বিকেল চারটার দিকে নাতাশা পিজির গেটে থাকবে। বাকিটা তার কাছ থেকে জানতে পারবো! তার সঙ্গে দেখা করে সন্ধ্যার দিকে আবার আসবো!'
'না! আমি তোর সঙ্গে যাবো! আমাকেও নিয়ে চল!'
মামুন কি করবে ভেবে পায় না। কিন্তু তাও ভাববার সুযোগ সে পায় না। তিনি তাঁর পার্সটা হাতে নিয়ে বললেন, 'চল এখনই!'
ওরা চারটার দিকে পিজির গেটে এসে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো হাসপাতালের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে নাতাশা। গেটে দাঁড়ানো মিজানকে দেখতে পেতেই তার মুখটা অনাবিল হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো।
মামুন বললো, 'এই মেয়েটাই নাতাশা!'
মামুনকে কথা বলতে দেখেই বুদ্ধিমতী নাতাশা বুঝে ফেললো যে, সঙ্গের এই ভদ্রমহিলাই মিজানের মা। চোহারাও ঠিক মিজানের মতই মনে হচ্ছে তার কাছে। সামনে এসে সালাম দিয়ে বললো, 'ভালো আছেন খালাম্মা?'
তিনি নাতাশাকে প্রায় জড়িয়ে ধরে বললেন, 'কি খবর মা?'
হাসিতে সারামুখ আলো করে সে বললো, 'ভালো!'
যেন হাসির আলোয় মিজানের মায়ের মনের ভেতরকার কষ্টের অন্ধকারকে নিমেষেই দূর করে দিতে চায়। 'কলকাতা ইন্দিরা হাসপাতালে আছে! এই যে হাসপাতালের নাম্বার, মিজানের পাসপোর্ট নাম্বার!' বলে একটা কাগজ মেলে ধরলো সে।
তারপর আবার বললো, 'বাবা কথা বলেছেন। সন্ধে সাতটার দিকে মিজান বাশার স্যারের কাছে আসবে। তখন কথা বলা যাবে!'
রাস্তার উপরই মিজানের মা নাতাশার কপালে চুমু খেলেন। আর আকস্মিক লজ্জায় তার মুখটা কেমন গোলাপী আভায় ছেয়ে গেলো।
তিনি বললেন, 'মারে, কত্ত যে খুশি হয়েছি বোঝাতে পারবো না!'
'আমরা তো একজন মায়ের খুশিই দেখতে চেয়েছি!' নাতাশা তেমন ভাবেই বললো।
তিনি নাতাশার মুখটা তুলে ধরে বললেন, 'আল্লা যেন তোমাদের আজীবন খুশি রাখেন!'
তারপর মামুনকে বললেন, 'আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আয়!'
তারপর নাতাশার দিকে ফিরে বললেন, 'তুমিও চলো!'
'আজ না খালাম্মা! আম্মার শরীরটা ভালো না! আমি না থাকলে তাঁর খাওয়া হবে না!'
'তাহলে বলো, কবে যাবে?'
'যাবো!'
মামুনকে বললেন, 'কবে নিয়ে আসবি?'
'না খালাম্মা, ও আমাকে নিতে হবে না! আমিই সপ্তাহখানেকের ভেতর যাবো!'
'মনে থাকে যেন!'
'থাকবে!' বলে আবার সেই মধুর হাসিটি ছড়ালো নাতাশা।
তারপর একটা রিকশায় চড়ে বললো, 'যাই খালাম্ম! স্লামালেকুম!'
তিনি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নাতাশার চলে যাওয়ার দিকে। বললেন, 'মামুন, আমার তো এমন একটা মেয়ে থাকতে পারতো! পারতো না? কিন্তু আল্লা তো দিলেন না!'
তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস চেপে চোখ মুছলেন।
(চলবে...)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



