সকাল বেলা অফিসে যাবার সময় মিঠুকে ডাকলো মাসুদ।
কলেজে যাওয়ার জন্যে তৈরী হচ্ছিলো মিঠু। মাসুদের ডাক শুনে বেরিয়ে এসে বললো, 'ডাকছিলে ভাইজান?'
'মার কাছে টাকা চেয়েছিলি?'
'হ্যাঁ!'
'টাকার কি দরকার পড়লো?'
'আছে! পার্সোনাল!'
মাসুদ মিঠুর দিকে তাকিয়ে একবার হাসলো। কিন্তু কি বুঝে হাসলো কে জানে।
ওয়ালেট বের করে মিটুকে টাকা দিয়ে বললো, 'ওই মেয়েটাকে বলিস পত্রিকাটা দেখতে। আজ তার কোনো লেখা থাকতে পারে!'
মাসুদ বেরিয়ে যেতেই মাকে বললো, 'মা, মিতাপার কাছ থেকে আসছি!'
'মা অবাক হয়ে বললেন, 'তুই না কলেজে যাচ্ছিলি?'
'যাবো আর আসবো!'
মিঠু দ্রুত পায়ে গিয়ে মিতাকে বললো, 'আজকের বাংলাদেশ গেজেট দেখেছো?'
'সকালে পড়লাম তো!' মিতা অবাক হয়ে তাকায় মিঠুর দিকে। 'কেন?'
'তোমার লেখা বেরোয়নি?'
'না। আমার নাম তো দেখলাম না!'
মিঠু হেসে উঠলো। 'তুমি নিজের নাম দেখে লেখা খুঁজবে না তোমার লেখা খুঁজবে?'
মিতা বললো, 'এখন আর চান্স নেই! ফুপা পড়ছেন!'
'আমি এতক্ষণ বসে থাকবো নাকি?'
মিতা যেন বিরক্ত হয়। 'বসলে অসুবিধাটা কোথায়? আমি তো প্রতিদিন তোদের বাসায় গিয়ে বসে থাকি একা একা!'
'তুমি তো এমনি এমনিই যাও না! কলেজে যাওয়ার সময় যাও!'
'তবুও!'
'তবুও কি?'
'যে কারণেই হোক, যাই তো?'
'আচ্ছা, ভাইজানকে তোমার কেমন লাগে?'
কথাটা আচমকাই যেন বলে ফেললো মিঠু। আর তা শুনে মিতার বুকটা কেমন ধড়াস করে উঠলো। লজ্জা পেলে তার কান লাল হয়ে যায়। ব্যাপারটা মিঠুর চোখে পড়ে কিনা কে জানে! সে দু’হাতে কানের পেছনে চুল গোছানোর ছুতোয় কান দু'টো আড়াল করে। মিঠুটা কি টের পেয়ে গেল? বেশ চালাক তো!
'কি ভাবছো?'
মিতার পরিবর্তনটা তার চোখে পড়লো। 'বল না!'
'তুই এলি, তোকে কি খেতে দেই বলতো?'
'আমি কিছু খাবো না!'
'তোকে তো পান্তা ভাত খেতে বলিনি!'
মিতা ঘরের ভেতর চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর পত্রিকাটা হাতে করে এসে বললো, 'নিয়ে এলাম!'
তারপর দু’টো মিমি চকলেট বাড়িয়ে ধরে বললো, 'নে, ধর!'
'ওগুলো আনতে গেলে কেন?'
'তুই কি ভেবেছিস এগুলো আনতে বাজারে গেছি?'
'তা বলছি না!'
'তাহলে খেতে খেতে আমার লেখা খুঁজে বের করে দে!'
মিঠু পত্রিকাটা খুলে সাহিত্যের পাতাটা উল্টিয়ে দেখলো কবিতা বেশি নেই। মাত্র চারটা। দ্বিতীয়টাই মিতার। মধুনিশা শিরোনামের উপর তর্জনী রেখে বললো, 'এই তো তোমার কবিতা! মধুনিশা তোমার লেখা না?'
'কই দেখি!'
মিতা লেখাটা পড়ে বললো, 'লেখাটা তো আমারই! কিন্তু অন্যের নামে ছেপে দিয়েছে!' তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
নিজের লেখা অন্যের নামে ছাপা হলে কার না খারাপ লাগবে! মিতার ও খারাপ লাগছিলো। কিন্তু খারাপ লাগার পরিমাণটা যেন কিছুটা বেশিই।
আসল ব্যাপারটা মিঠু জানলেও বললো না। জিজ্ঞেস করলো, 'তোমার নাম মনোয়ারা বেগম না?'
'কিন্তু এখানে তো মিতা মনোয়ারা!'
'তোমার নাম তো মিতাও! ডাক নামটা আগে দিয়ে বেগমটা ছেঁটে দিলেই হয়ে গেলো!'
'এ নাম কোথাও লিখিনি!'
মিঠু জোর দিয়ে বললো, 'কবিতা যেহেতু তোমার, নামটাও তোমার না হয়ে যায় না!'
তবুও সন্দেহ দূর হয় না মিতার।
মিঠু বললো, 'তাহলে ভাইজানকে ফোন করে জিজ্ঞেস করো না কেন?' সে হাসতে থাকে।
মিতার হাসি আসে না। রাগত কন্ঠে বললো, 'ঠিক আছে, তোর ভাইজানকেই জিজ্ঞেস করবো!'
'এখন ফোন করবে? নাকি ঘরে গিয়ে বলবে?'
মিতা কেমন যেন চোখ পাকিয়ে তাকায় মিঠুর দিকে।
মিঠু তা দেখে বললো, 'কলেজে যাবে তো?'
'যাবো!'
'তাহলে তৈরী হয়ে এসো!'
মিঠু দেরি না করে বেরিয়ে পড়ে।
ক্লাস করার সময়গুলোতে সারাক্ষণই ছটফট করলো মিঠু। কখন ছুটি হবে। শেষটায় তার প্রতীক্ষার ঘন্টা যখন বাজলো, তখন কলেজ থেকে ফেরার পথে মিতাকে বললো, 'মৌচাক যাচ্ছি, তুমি যাবে?'
'মৌচাক কেন?'
'বাবার ছবিটা আনবো!'
মিতা কিছু বললো না। কবি হিসেবে তার নামের ব্যাপারটা নিয়ে তখনও ভাবছিলো।
'তোমাকে একটা রিকোয়েস্ট করি?'
'ঢঙ আর কি!'
'ব্যাপারটা সিরিয়াস!'
'বল!'
'বাবার ছবিটা তোমার কাছে রাখবে? সপ্তাহ খানেক!'
'আমার কাছে কেন?'
'কাজটার কথা এখনই বাড়ির কাউকে জানাতে চাচ্ছি না!'
মিঠুর এমন গোপনীয়তার বিষয়টা বুঝতে না পেরে মিতা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকলো।
'তুমি কেন বুঝতে পারছো না!'
'না বুঝিয়ে বললে বুঝতে পারবো কিভাবে?'
'ওহ! তুমি যে কী! শোনো! কদিন আগে ভাইজানের কাছ থেকে বাবার একমাত্র পাসপোর্ট সাইজ ছবিটা নিয়ে সমরীতার স্টুডিও থেকে এনলার্জ করিয়েছি! ভেবেছিলাম সবাইকে চমকে দেবো! কিন্তু ছবিটা আমার ব্যাগে ছিলো। রিকশা করে ফিরে আসার সময় ব্যাগ আর হাতঘড়িটা ছিনতাই হয়ে যায়। এখন ভাবছি যে, ভাইজান ছবিটা ফেরত চাইলে কি বলবো?'
মিতা অবাক হয়ে বললো, 'ছিনতাইর ঘটনা বাড়িতে জানে না?'
'না!'
'গোপন করাটা কি ঠিক হলো?'
'ও ঘটনা বললে হয়তো বাইরেই বেরুতে দেবে না! মাকে তো চেনো না! পারলে আবার আমাদের তিনজনকে পেটের ভেতর ফেরত নিয়ে নিতেন!'
মিতা অকস্মাৎ হেসে উঠে বললো, 'আচ্ছা দিস!'
'মাত্র একটা সপ্তাহ! পরের সপ্তাহের তেইশ তারিখ ভাইজানের জন্মদিন! সেদিনই ছবিটা দেয়ালে টানাবো! ভালো হবে না?'
মিঠু মতামতের জন্য তাকিয়ে থাকে মিতার মুখের দিকে।
মিতা কিছুক্ষণ পর মাথা দুলিয়ে বললো, 'আইডিয়াটা মন্দ না!'
(চলবে...)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

