মধুনিশা-১৯

১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ রাত ৩:২৬

শেয়ার করুন:                   Facebook


আগামীকাল মাসুদের জন্মদিন।

শুতে যাওয়ার আগে মা ছেলের ঘরে কি মনে করে যেন এলেন।

মাকে দেখেই মাসুদ বললো, 'কিছু বলবে মা?'

'কেন? এমনি এমনি কি আসতে পারি না?' বলে হাসলেন তিনি।

মাসুদ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, 'আমি কি তাই বলেছি? বস!'

'বসবো না! আমি জানতে এলাম আগামীকাল কত তারিখ?'

ক্যালেন্ডারের পাতায় চোখ রেখে মাসুদ বললো, 'তেইশ তারিখ!'

'কাল তেমন কোনো জরুরী কাজ আছে?'

'আছে মা!' বিপুল উৎসাহ নিয়ে মাসুদ বলতে আরম্ভ করলো, 'অনেক কাজ! একটা রিপোর্টিঙের ব্যাপারে খুব ভোরেই রাজশাহী রওয়ানা করতে হবে! তা ছাড়া...'

তিনি ছেলেকে কথার মাঝ পথেই থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'না গেলে চলে না?'

'উপায় নেই! খুবই জরুরী!'

'আমার চেয়েও জরুরী?' বলে তিনি তাকিয়ে থাকলেন মাসুদের মুখের দিকে।

মাসুদ হাসে। বলে, 'এমন কোনো কাজ কি হতে পারে না?'

'পারে! তবে, সেটা অন্যের। আমার ছেলের জন্যে নয়!'

মাসুদ হতাশ কন্ঠে বলে, 'তাহলে চাকরি থাকবে না মা!'

'তাহলে চাকরিটা ছেড়ে দে! অমন ক্রীতদাসের কাজ করতে হবে না!'

মাসুদ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। কিছু বলতে চেয়েও মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বললো না।

'তুই কি বুঝতে পারছিস কিছু?'

'চেষ্টা করছি!'

তারপর মাথা চুলকে সলাজ কন্ঠে বললো, 'বুঝতে পারছি না!'

'কাল বিকেল পাঁচটার আগে বাড়ি থেকে বেরুতে পারবি না!' বলে, ছেলেকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মা নিজের ঘরে চলে গেলেন।

মা চলে গেলে মাসুদ ভাবতে বসলো যে, এমন কী কারণ থাকতে পারে যার জন্যে তাকে পাঁচটা পর্যন্ত ঘরে থাকতে হবে? প্রয়োজনে চাকরিটাই ছেড়ে দিতে হবে? অনেক ভেবেও থই না পেয়ে সে মামুনের ঘরে এলো।

মামুন তাকে দেখে অবাক হয়ে বললো, 'ভাইজান তুমি?'

'তুই কিছু জানিস নাকি?' বলতে বলতে মাসুদ ছোট ভাইয়ের বিছানায় এক পা তুলে বসে।

মামুন আরো অবাক হয়ে তাকালেও কিছু বলতে পারে না। কি বলবে সে? কিছু জানলে তো!

'কাল আমাকে পাঁচটা পর্যন্ত ঘরে থাকতে হবে কেন বুঝতে পারছি না!'

মামুন জানলেও বললো না। মিঠু খুব করে বলেছে যে, ব্যাপারটা মাসুদের মনে না পড়লে যেন কিছুতেই প্রকাশ না হয়!

মাসুদ বললো, 'আচ্ছা, তুই পড়!'

তারপর নিজের ঘরে এসে আরো কিছুক্ষণ ভাবলো। কিন্তু নির্দিষ্ট করে কিছু ঠিক করতে পারলো না। শেষে মিঠুকে ডেকে চায়ের কথা বলে, দু'কাপ। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ পর মিঠু এক কাপ চা নিয়ে এলে মাসুদ বললো, 'তোকে না বললাম দু'কাপের কথা!'

'আমার সময় নেই!'

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে মাসুদ বললো, 'ভাবলাম চা খেতে খেতে তোর কথা শুনবো, তাও হলো না!'

'আমার কাজ আছে!'

'তোর আবার কি কাজ?' চায়ে চুমুক দিতে নিয়ে থেমে যায় মাসুদ।

'কত কাজ আছে!'

আসলে সে রঙিন কাগজ কেটে কেটে মাসুদের জন্য শুভ জন্মদিন কথাটা লিখছে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সেগুলো টেপ দিয়ে ড্রয়িং রুমের দেয়ালে লাগাবে। দিনের বেলা মিতার কাছ থেকে বাবার ছবিটা নিয়ে এসেছে। অনেক কষ্টে দেয়ালে তারকাঁটা বসিয়ে ছবিটা টানানোর জন্যে জায়গা ঠিক করে রেখেছে। এসব কাজের কথা মাসুদকে বলা যাবে না।

কিছুটা দুঃখিত হয়ে মাসুদ বললো, 'তাহলে তো বড় ডিস্টার্বড হলি! আচ্ছা বলতো, আগামীকাল কি বাড়িতে কোনো প্রোগ্রাম আছে? বিশেষ কেউ আসার কথা?'

'মিতা’পা ছাড়া বিশেষ কেউ আসবে শুনিনি। তবে স্পেশাল রান্না হবে! সকালে সবাই একসঙ্গে নাস্তা করবো! দুপুরে এক সঙ্গে পোলাও-কোর্মা আর ঘনদুধের খেঁজুরের গুড়ের পায়েস খাবো। বিকেলে সবাই এক সঙ্গে চায়ের আসর বসাবো!'

মাসুদ অবাক হয়ে বলে, 'হঠাৎ কেন এসব?'

'অনেকদিন তুমি দুপুরে খাবারটা আমাদের সঙ্গে বসে খেতে পারো না। বিকেলটাও তাই। শুক্রবারটাও বাইরে কাটাও। তাই মা ঠিক করলেন যে, আগামীকাল আমাদের যাবতীয় প্রোগ্রাম ক্যান্সেল! ঘর থেকে বেরুনো যাবে না!'

'মা আর দিন পেলেন না! শুক্রবার করলে কী হতো?'

'মার ইচ্ছে!'

'কাজটা যে কত জরুরী, মাকে বোঝাতে পারলাম না!'

'কী আর করবে ভাইজান! মাতৃআজ্ঞা বলে কথা!'

মনে মনে খুবই হতাশা বোধ করে মাসুদ। আর যখনই তার মানসিক অবস্থা এমন হয় তখনই সে বাবার ছবিটা বের করে দেখে। বাবার সঙ্গে কথা বলে। সমস্যার কথা জানায়। আলাপ আলোচনা করে সমাধান খুঁজে বের করে। আর এভাবেই তার মনে পড়ে যায় যে, বাবার ছবিটা ক’দিন আগে মিঠু নিয়েছিলো। কিন্তু ফেরত দেয়নি! সে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, 'বাবার ছবিটা তো আজও দিলি না! দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে! যা, নিয়ে আয়!'

'আজ পাবে না!'

'কেন? আছে তো, নাকি হারিয়ে ফেলেছিস?'

মাসুদের চোখেমুখে সন্দেহ ফুটে উঠলো।

'কাল দেখো! আজ কিছুতেই পাবে না!'

মিঠু তার দৃঢ়তা ব্যক্ত করতে কুন্ঠিত হয় না।

মাসুদ দ্রুত চা শেষ করে কাপটা ফিরিয়ে দিয়ে বলে, 'আচ্ছা যা!'

কাপটা ধূয়ে জায়গা মত উপুড় করে রেখে মিঠু আবার তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

মা বললেন, 'অত ঝামেলার কি দরকার?'

'আমার কাছে একটুও ঝামেলা মনে হচ্ছে না!'

মিঠুর আয়োজনে মনেমনে তিনি খুশি হলেও বললেন, 'আমরা তো উৎসব করতে যাচ্ছি না!'

'উৎসব না তো কি? জন্মদিনকে উৎসব বলা যায় না?'

মা কিছু বলেন না। শুধু শুধু তর্ক করে মেয়ের মন খারাপ করতে চান না। বললেন, 'আমি শুয়ে পড়ছি! তোর কাজ শেষ হলে লাইট নিভিয়ে দিস!'

'আচ্ছা!'

মিঠু আবার তার কাজে মগ্ন হয়ে গেল।

অনেক রাতে মিঠুর কাজ শেষ হলে মায়ের ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে ড্রয়িং রুমে এসে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেয় সে।

তারপর রঙিন কাগজের অক্ষরগুলো সাদা দেয়ালের উপর সাজিয়ে চারদিকে বিভিন্ন রকমের ফুলের আকৃতির কাগজগুলোও সেটে দেয়। ঠিক তার উপরেই দেয়ালে লাগানো তারকাঁটায় আটকে দেয় বাবার বড়সড় সাদাকালো ছবিটা।

কিছুটা পিছু সরে গিয়ে তাকিয়ে নিজের কাজে নিজেই মুগ্ধ না হয়ে পারে না সে।

তারপর বাবার ছবিটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললো, 'বাবা, তোমাকে কাল দেখতে পেয়ে এ বাড়ির সবাই অবাক হয়ে যাবে! ঠিক বলেছি না বাবা?'

বাবার হাসি হাসি মুখটা যেন আরো হাসি হাসি হয়ে উঠলো।

'এবার যাই!'

ছবির ভেতর থেকে যেন বাবা কন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এমন এক প্রশান্তিতেই ভরে উঠলো মিঠুর মন।

কাজ শেষ করে হৃষ্টচিত্তে ঘুমুতে এলে মা বললেন, 'এতক্ষণ ধরে কী করলি?'

'সকালবেলা অবাক হয়ে যাবে!'

'কী করেছিস যে অবাক হয়ে যাবো?'

'সকালেই বুঝতে পারবে!'

ছবির কথাটা আর বললো না সে। শ্রান্ত আর ক্লান্ত শরীর নিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে বেশি সময় লাগে না মিঠুর।

মা উঠে ধীরেধীরে ড্রয়িং রুমে গেলেন। অন্ধকারেই হাতড়ে হাতড়ে সুইচ খুঁজে লাইট জ্বালালেন। আর পুরো দেয়ালে-ছাদে রঙিন কাগজের হরেক রকমের নকশার ছড়াছড়ি দেখে অবাক হয়ে গেলেন। মেয়ের হাতের কাজে খুশি হয়ে বলে উঠলেন, 'পাগলী মেয়ে!'

তারপরই হঠাৎ ছবিটার দিকে চোখ পড়তেই ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠলেন যেন। মনে হচ্ছে ছবির অতি পরিচিত আর প্রিয় মানুষটা যেন তাঁর দিকেই তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন।

তাঁর মাথায় এতক্ষণ ঘোমটা ছিলো না। স্বামীর সামনে দীর্ঘকাল মাথায় ঘোমটা দেওয়ার ফলে নিজের অজান্তেই এক হাতে আঁচল টেনে মাথা ঢাকলেন। যেন জ্বলজ্যান্ত মানুষটাই রঙিন কাগজের ফুল-নকশার আড়াল থেকে উঁকি মেরে তাঁকেই দেখছেন।
কতকাল এ মুখটা তিনি দেখতে পান না! আনন্দে মায়ের চোখে পানি এসে যায়।

তিনি এগিয়ে গিয়ে ছবির মুখটাতে হাত বুলিয়ে বলেন, 'তোমার মেয়ের কান্ড দেখেছো? সত্যিই আমাকে অবাক করে দিয়েছে! আমি তো ভাবতেই পারিনি ওদের কাছে তোমার এত বড় ছবি আছে!'

তিনি স্বামীর ছবি দেখতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। বিড়বিড় করে এতকাল বুকের ভেতর জমে থাকা সুখ-দুখের সব কথা বলে বলে ক্লান্ত হয়ে সোফায় বসেই ঘুমিয়ে পড়লেন। আর সঙ্গে সঙ্গেই হারিয়ে গেলেন মধুর স্বপ্নে।

(চলবে...)

 

লেখাটির বিষয়বস্তু(ট্যাগ/কি-ওয়ার্ড): সাহিত্যউপন্যাস ;

 

  • ৬ টি মন্তব্য
  • ৯২ বার পঠিত,
Send to your friend Print
রেটিং দিতে লগ ইন করুন
পোস্টটি ৫ জনের ভাল লেগেছে, ০ জনের ভাল লাগেনি
১. ১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:০২
comment by: সূর্য পুত্র ও চাঁদ কন্যা বলেছেন: জুলিয়ান ভাইয়া !! তুমি অনেক বড় লেখকদের মত লিখতে পারো। তোমার লেখায় মন্তব্য করার সাহস আমার নেই। শুধু বল্লাম অনেক অনেক ভালো হয়েছে।
চাঁদকন্যা
১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:০৫

লেখক বলেছেন: কিছুই বুঝলাম না!

২. ১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:১৫
comment by: খিলালী বলেছেন: এত বড় লেখা পড়নের সময় নাইক্যা। আর কয় পর্ব আছে? শেষ পর্বে পুরাটার পিডিএফ লিংক চাই। ঘরে বইসা বইসা পড়মু। নাইলে মাইনাচ কইয়া দিলাম!
১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:১৮

লেখক বলেছেন: পাদরী সাব, নমষ্কার! কেমন আছেন? এক পর্ব বাকি আছে। মাইনাস দিলেও আপত্তি নাই। পিডিএফ লিংক দিতে চেষ্টা করবো। এখনই ব্যবস্থা করে রাখার চেষ্টা করছি। ধন্যবাদ।

৩. ১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৪:২৭
comment by: নিহন বলেছেন: জাক্কাচতো ,
চলুক।
৪. ১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ ভোর ৫:১৫
comment by: চাঙ্কু বলেছেন: ্চলুক

 

 


আমি জন্মসূত্রে বাংলাদেশী। দেখেছি মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের উত্তাপে ভালোবাসতে শিখেছি দেশকে। দেশের মানুষকে। তাই রাজাকারদের ঘৃণা করতে শিখেছি শৈশব থেকেই।
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ

    কোন বিভাগ নেই

সর্বমোট হিট

 ৮০৯৩