একজন ক্যানভাসারঃ
কয়েক দিন পুর্বে একটা কাজে আমরা কয়েক বন্ধু গিয়েছিলাম কাওরান বাজার।রাত ৯ টার দিকে যখন ওখান থেকে ফিরে আসছিলাম-তখন দেখি লালসালু দিয়ে বাউন্ডারী করে কয়েকজন ক্যানভাসার ঔষধ বিক্রি করার জন্য হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে আয়োজন সম্পন্ন করেছেন। ছোট বেলা থেকেই ক্যানভাসাদের অনুষ্ঠান আমার ক্যান জানিনা খুব ভালো লাগে।সুযোগ পেলেই আমি দর্শক শ্রোতা হয়ে যাই। সেদিনও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।
বন্ধু জি দেবনাথ, প্রফেসর ফ্রান্সিস সহ আমরা দাড়িয়ে দেখতে থাকি-ক্যানভাসাররের বিভিন্ন জিনিষ বিক্রয়ের কৌশল।প্রথমে একটি কিশোর দুটি বাচ্চা বানর নিয়ে কিছু খেলা দেখায়। তারপর দরাজ কন্ঠে গান শুরু করলো-"মা তুমি আমার আগে মরে যেওনা......"। দেখতে দেখতে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে গেলো। তারপর আবারো চিরন্তন ভিক্ষা করার গান-"দিনের নবী মোস্তফায় রাস্তা দিয়া হাইট্টা যায়...হরিণ একটা বান্দাছিল গাছেরো ছায়ায়গো, হরিণ একটা বান্ধাছিলো গাছেরো ছায়ায়"! এখন অনেক দর্শক শ্রোতার ভীড়। বেড়িয়ে এলেন একজন ষাটোর্ধ পরহেজগার টাইপের বেশভুষার মানুষ। লোকটার দাঁতগুলো অদ্ভুত রকমের সুন্দর! তিনি এসেই হ্যান্ড মাইক হাতে নিয়ে বললেন-"উপস্থিত ভদ্র মহোদয়গণ, মুসলিম ভাইদের আচ্ছালামু আলায়কুম, হিন্দু ভাইদের নমস্কার। আপনারা আপনাদের যার যার পকেট সাবধান রাখবেন। এখানে অনেক ডাবল ভদ্রলোক আপনার পকেটের টাকা পয়শা, মোবাইল নিজের মনে করে নিয়ে যেতে পারে, সাবধান! জনাব, আমরা শুধু গান শুনাইলেই আমাদের পেট ভরবেনা, আগে আমাদের পেট ভারানোর ব্যাবস্থা করেন-তারপর যত খুশী গান শুনাইবাম। এই ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চালোগ, তোমরা দুই কদম পিছাইয়া বসো। আগে অষুধ বেইচ্চা লই, তারপর ম্যাজিক দেখাইবাম, খেইল দেখাইবাম গান শুনাইবাম। ঐ ইলিয়াচ, কালনাগিণী সাপের ঝাপিডা ভাল কইরা বন্ধ করছোস্তো, নাকি বাইর হইয়া পোলাপালাপানগুলারে কামরাইবো"? ইলিয়াচ অভয় দিয়ে বললো-"হ ওস্তাদ, শক্ত কইররা আটকাইয়া থুইচি, আমি বাইরনা করলে জিন্দেগীতেও বাইরাইতে পারবোনা"। আমি ফ্রান্সিসকে টিপ্পনী কেটে বললাম-ক্যানভাসার সবাইকে ছালাম-নমস্কার জানিয়েছে-তোর কথা বেটার মনে নেই!
এবার কামেলবেশী ঔষধ বিক্রেতা কয়েকজন দর্শকের মুখ দেখে-তাদের অতিত, বর্তমান-ভবিষ্যত বলে দিতে থাকলেন। প্রায় প্রত্যেককেই বলেছেন-"জীবনে বহুত ট্যাকা কামাইছেন, কিন্তু ধইরা রাখতে পারেননাই 'রাহু আর শনি'র দশার কারনে। একজনকে বললেন-তুমি তোমার মায়েরে সেবাযত্ন করোনা, তোমার কপালে বহুত খারাবী আছে! অন্যজনকে বলছে-তোমার বুকের মাঝখানে একটা আঁচিল আছে, অন্য একজনের পিঠে একটা কালো জন্ম দাঁগ আছে-ইত্যাদি। সবাইকে সার্ট খুলে হাতে নাতে প্রমান দেখাচ্ছে! এক লোকের পকেটে ১ টা ১০ টাকার নোট এবং ৩টা ৫ টাকার নোট আছে তাও প্রমান করে দেখালেন। মোটামুটি দর্শকদের মন "ভজাতে" সক্ষম হয়েছেন এমন সময় এক ছাত্র টাইপের যুবক বললেন-"ঠিক আছে, আপনি বলেনতো আমার পকেটে কত টাকা আছে"? এবার ক্যানভাসার খুব বিরক্ত হয়ে বললেন-"এই যে শিক্ষিত ডবল ভদ্রলোক, আপনার পকেটে কি আছে-আমি তাতো এখনই বলে দেবো। তার আগে আপনার প্যান্টের ভিতর কি আছে-তাতো আমি দেখতে পাইতাছি-সেইটা আগে সবাইকে বলতাছি"! বেপরোয়া যুবক চ্যালেঞ্জ করে বললেন-"ঠিক আছে বলেন্তো কি আছে"? ক্যানভাসার সকলের সামনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে বললেন-"ভাইসব, আমি অল্প শিক্ষিত সাধারণ একজন ওষুধ বিক্রেতা। লোকে আমাকে ডাক্তার বলে। আসলে আমি ডাঃ নই, আমি কবিরাজ, সেই সঙ্গে আদ্ধাত্মীক কিছু জ্ঞান আমারে আল্লায় দিছে। মানুষের চেহারা দেখে আমি অনেক কিছু বলতে পারি-তার প্রমান এখনি আপনাদের সামনে দেখিয়েছি এবং এই ভদ্রলোকের ভিতরে কি আছে তাও প্রমান করে দেবো"।
"ভাইয়েরা, ফুলপ্যান্ট পিন্দানো এই শিক্ষিত যুবক বেশ্যা পাড়া যাইতে যাইতে কঠিন এক রোগ বাজাইছে! দুই নম্বরি করতে করতে তার '.... 'র গোড়া চিকন, মাথাডা শোউল মাছের মত মোটা এবং এক দিকে বাঁকা হয়ে গিয়েছে। আসেন ভদ্রলোক, আপনার প্যান্টটা একটু খোলেন-সবাইরে দেখাই-আমি মিথ্যা কথা কইতাছি কিনা"! এই বলেই ক্যানভাসার যুবকের প্যান্ট খোলার জন্য হাতটা যেই ধরেছে-অমনি যুবক ভো দৌড়! ক্যানভাসার বুক ফুলিয়ে বললেন-"এখন দৌড়াচ ক্যান বেডা, পারলে সাহস কইররা প্যান্ট খোল"!দর্শক শ্রোতা হাসছে!
এবার মহা উতসবে যৌণ শক্তি বর্ধক ওষুধের গুনাগুণ খুব অশ্লীল ভাবে উপস্থাপন করে দর্শক শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষনের চেস্টা করে ৩ জনের কাছে ওষুধ বিক্রি করলেন ৩০ টাকার। এর মধ্যে হঠাত এক রিক্সাওয়ালা এসে বললেন-"ওই হালার পুত, গত ১৫ দিন আগে তর থেইক্কা ৭ দিনের কোর্স নিলাম ৫০ টাকা দিয়া, কোনো কাম হইলনা। আমার ট্যাকা ফেরত দে কইলাম, নাইলে তোর চাপা ভাইঙ্গা হালামু"! যুবক চ্যালেঞ্জ করে তার অষুধের বিফলতা প্রকাশ করায় একটু পুর্বের ক্রেতা ৩ জন তাদের টাকা ফেরত চাইলো! ক্যানভাসার বললো-"দিলতো, হারামজাদায় মজমাডারেই ভাইঙ্গা দিলো"! ক্যানভাসার কাচুমাচু করে বললো-"ভাই, টাকা পয়শা হাতের ময়লা, জীবনে বহুত টাকা কামাইছেন। মধু আর গরম দুধ মিশাইয়া, এশার নামাজ পইরা পচ্চিম দিকে ফিইররা ওষুধ খাইয়া দেখেন, ফল পাইবেন। যদি উপকার না পান-তয় রোজ কেয়ামতের দিন রচুল আমারে শাফায়েত করবেনা, আমার জন্য বেহেস্ত হারাম হইয়া যাইবো! এই ওষুধ বেইচ্চা আমরা পেট চালাই। রিজিক নিয়া মিথ্যা কতা কইনা। ঐ ফাউল বেডা ওষুধের সাথে দুধ-মধু মিশায়নাই-ফল পাইবো ক্যামতে"!
কিন্তু হায়! কেউ ক্যানভাসারের কথায় বিশ্বাস করছেনা। টাকা ফেরত দিতেই হলো। এবার ক্যানভাসার তার বাক্স থেকে কিছু দাঁতের মাজন বের করে বিক্রি করার চেস্টা করেও ব্যার্থ হয়। কিছুক্ষণ পর ক্যানভাসার তার মুখের নকল দুইপাটি দাঁত খুলে রাখতে রাখতে বির বির করে ভাঙ্গা গলায় বলছিলো-"ইলিয়াচ, ব্যাচা-বাট্টাতো ঠন! ঠন!! আইজ লালু-ভুলুরেইবা(বানর বাচ্চা দুটো)কি খাওয়ামু, তুই আমিইবা কি খামু"!
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ রাত ৮:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


