আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারত মহা সাগরের খুবই কাছে কিন্ত বংগপ্সাগরের ভিতরে অবস্থিত। ভারতের মুল ভুখন্ড থেকে অনেক দূরে এর অবস্থান। চেন্নাই(মাদ্রাজ)এবং ভিসাখাপট্টম থেকে যদিও কিছুটা নিকটে, কিন্তু কোলকাতা থেকে বেশ দুরে(যথাক্রমে ১০০ এবং ৯০ কিলোমিটার দুরত্বের পার্থক্য)। আমরা ১২ জন বাংলাদেশী এবং ২ জন ইন্ডিয়ান সিদ্ধান্ত নিয়েছি ৩ দিনের জন্য সেখানে ভ্রমনে যাব। ৮ ই মার্চ আমার ব্যাবসায়ীক বন্ধুকে সাথে গিয়ে আমি ভারতীয় টুরিজম কোলকাতা অফিস থেকে আন্দামান যাবার বিস্তারিত জেনে নিলাম। টুরিজম বিভাগের অনেক ধরনের প্যাকেজ টুরের ব্যাবস্থা আছে। তাতে খরচ কিছুটা কম। কিন্তু "প্যাকেজ ট্যুর" নিয়ে আমার অনেক তিক্ত অভিজ্ঞতা থাকায় প্যাকেজ চিন্তা বাদ দিলাম। কোলকাতা থেকে বিভিন্ন ভাবে আন্দামান যাবার সুব্যাবস্থা আছে। যেমন বিমান, হেলিকপ্টার এবং জাহাজ সার্ভিস। সময়ের মুল্য বিবেচনায়-জাহাজ সার্ভিস তুলনামুলক খুব এক্সপেনসিভ এবং সময় সাপেক্ষ।বাই এয়ার যাওয়াই সব চাইতে ভালো। ইন্ডিয়ান এয়ার লাইন্স জনপ্রতি ভাড়া নেয়-১৪,৩৮৬ ইন্ডিয়ান রুপী। প্রাইভেট এয়ার লাইন্সের জেট এয়ার’এর ভাড়া ১৪০৯৮ রুপী। এছারাও কিংফিশার এয়ার, এলিয়েন্স এয়ার নামেও দু'টা বিমান সার্ভিস আছে-যার ভাড়া আমি জানিনা।
আমি ঢাকাতে আমার পরিচিত মিঃ রাকীবের সাথে (জি এম জি এয়ারের জি এম)যোগাযোগ করি-বিশেষ কোন সুবিধা পাওয়া যাবেকিনা-সেই আশায়। রাকীব জানালেন-কিছুক্ষণ পর ফোন করে আমাকে জানাবে। ২০/২৫ মিনিট পর মিঃ রাকীব ফোন করে জানালেন ওর রেফারেন্সে জেট এয়ারের জি এম(কমার্সিয়াল)ব্রম্মাদত্ত শ্রীনিবাস'র সাথে দেখা করতে। সেই সাথে মিঃ বম্মাদত্ত শ্রীনিবাস'র ফোন নম্বর জানিয়ে দিলেন। আমি কল করি মিঃ ব্রম্মাদত্ত শ্রীনিবাস'কে। তিনি তাঁর অফিসে দেখা করতে বললেন। আমি ভারতীয় বন্ধুকে নিয়ে দেখা করি মিঃ ব্রম্মাদত্ত'র সাথে। ব্রম্মাদত্ত নামটা শুনতে কেমন দৈত্য দৈত্য ভাব আছে, কিন্তু মিঃ ব্রম্মাদত্ত দেখতে খুব হান্ডসাম, অত্যন্ত স্মার্ট এবং সদালাপী। কথা বলেন বৃটিশ ইংলিশ এক্সেন্সে। তাঁকে জানালাম-আমরা ১৪ জন(আমাদের বাংলাদেশী ১২ জনের সহযাত্রী হয়েছেন আমার ভারতীয় দুই বন্ধু) আন্দামান-নিকোবর যাবো এবং আসবো-আমাদের কি ধরনের হেল্প করতে পারেন।
ইতোমধ্যেই মিঃ রাকীব কলকাতায় মিঃ ব্রম্মাদত্তের সাথে আমাদের বিশয় আলাপ করেছিলো। তার রেফারেন্সে অনেক উপকার হলো। বেশ কিছু ফর্মালিটিজ কম্পলিট করে আমাদের টিকেটের সেলস এজেন্সী কমিশন(৯%) বাদ দিয়েই আরো ৫% ছাড় দিয়ে ১৪ টি আপ-ডাউন টিকেট ইস্যু করলেন। সেই সঙ্গে আন্দামানে জেট এয়ারের কমার্সিয়াল রিসোর্ট “জেট আন্দামান-নিকোবর রিসোর্টস”এ ২৫% লেস রেইটে থাকার ব্যাবস্থা করে দিলেন। এমন ভরা টুরিস্ট সিজনে যেখানে টিকেট এবং হোটেল/রিসোর্টে সীট মেলাই দুস্কর সেখানে এত কম মুল্যে টিকেট এবং আবাসন পাওয়া সত্যি বিরাট কিছু! মিঃ ব্রম্মানন্দ আমাদের যে খাতির করলেন-তা লিখে বোঝানো যাবেনা! থ্যাঙ্ক উ মিঃ ব্রম্মাদত্ত শ্রীনিবাস।
জেট এয়ারের সার্ভিস খুব ভাল।২ ঘন্টা ২০ মিনিট সময় কিভাবে পার হয়ে গেলো তা টের পেলাম বিমান বালার এনাউন্সমেন্টের কারনেই। ১৩০৩ কিলোমিটার আকাশ পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌঁছে যাই আন্দামানের পোর্টব্লেয়ার। চারিদিকে নীলাভ সবুজ পানিতে ঘেড়া অপুর্ব সুন্দর দ্বীপ শহর আন্দামান। প্রাকৃতিক উঁচু নীচু অসমতল ভৌগোলিক স্থাপত্য প্রথম দর্শনেই এক স্বর্গীয় অনুভুতি মনকে প্রশান্তিতে ভরে দেয়! পীচ ঢালা প্রশস্ত রাস্তা স্থানীয় উপজাতির মানুষদের বিশাল মনেরই প্রতিচ্ছবি যেনো! এখানে প্রথমেই নজর কারে এখানকার সুদৃশ্য পাহাড়গুলো। এখানকার ছোট ছোট পাহাড়গুলোর উচ্চতার একটা স্পেসালিটি আছে। একটা রিদম আছে। পাহাড়গুলোর উচ্চতার একটা পর্যায়ক্রম আছে। যেমন প্রথম পাহাড়টা যদি ১০০০ ফুট হয়, ২য় টা ৬০০০ ফুট নয়, কিম্বা ৮০০০ ফুট নয়! এখানকার পাহাড়গুলো অনেকটাই গাণিতিক ভাবে উচ্চতা। যেমন ১০০০, ২০০০- ৩০০০ ফুট। অর্থাৎ এবরো থেবরো উচ্চতা নয়।
পোর্টব্লেয়ারে আমাদের অভ্যর্থনা জানান জেট রিসোর্টের পক্ষে কামাক্ষা সাংভি। আন্দামানে বিভিন্ন ধর্মের প্রায় চার লক্ষ মানুষের বসবাস। আন্দামানে থাকার জন্য অনেক হোটেল রিসোর্ট আছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো-ডলফিন বীচ রিসোর্ট, পিয়ারলেস রিসোর্ট(পিয়ারলেস গ্রুপের মালিকের আদি নিবাস আমাদের নারায়গঞ্জ। কোলকাতার বিখ্যাত পিয়ারলেস হাসপাতালও একই মালিকানার), সিল্ভার ল্যান্ডস বীচ রিসোর্ট, আটলান্টা কটেজ ইত্যাদি। আমাদের জন্য নির্ধারিত অত্যাধুনিক মাইক্রোবাসে করে আমরা ২০ মিনিটের ভিতরেই পৌছে যাই “জেট আন্দামান-নিকোবর রিসোর্ট”।স্টীল স্ট্রাকচারের উপড় তৈরী রিসর্টের সব রুমগুলোই দামী কাঠের ফ্লোর। প্রতিটা রুম চমতকার সুস্বজ্জিত, আভিজাত্যের ছোঁয়া পরতে পরতে। আমাদের সকলকে প্রথমে ডাবের পানি এবং ফলের জুস পানে আপ্যায়িত করা হলে যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। আমাদের লাঞ্চ আজ রিসোর্টেই করার জন্য খাবার মেনু চুড়ান্ত করে নিলাম। এখানে কাছাকাছি ঘুড়ে বেড়ানোর জন্য রিসোর্টের নিজস্ব ২০ টি গার্ডেন কার রয়েছে। যেগুলো পাওয়ার সিস্টেম ব্যাটারী চালিত। আমার বয়স্ক বন্ধু ধর্মীয় আচার পালনে ব্যস্ত মানুষ। তিনি একটু পুজা-অর্চনা করবেন। পুজা করার জন্য তাঁর দেবতা গণেশ সাথে করেই নিয়ে এসেছেন।
গার্ডেন কারে কোন হুড থাকেনা। এর কোনটা ২ সীটের, কোনটা ৪ সীটের এমনকি ১২ সীটেরও আছে। এই গাড়ি চলার সময় কোন শব্ধ হয়না, ব্যাটারী চালিত বলে কোন ধুঁমাও হয়না। অর্থাত শব্দ এবং পরিবেশ দুষন মুক্ত গাড়ি। দেখতে অনেকটা খেলনা গাড়ীর মত লাগে। স্পীড অনেক কম। ছেলে বুড়ো সবাই ড্রাইভ করতে পারে। আমি আমার বৌকে নিয়ে একটি গাড়িতে এবং অন্য ৫ জুটি আলাদা আলাদা গাড়িতে আধাঘন্টা খানেক ঘুড়ে বেড়ালাম নানান বাহারি ফুল লতাগুল্ম আর নাম নাজানা গাছ পালায় ঘেরা পুরো রিসোর্ট এলাকাটা। চিত্র-বিচিত্র লতাগুল্মের প্রণোদনায় নাম নাজানা অনেক ফুলের স্পর্শে শিহরিত হলো শরির ও মন। শাল-সেগুণ, মেহগনি আর আকাশলীনার ছায়া গায়ে মেখে নিশ্বাস নিলাম বুক ভরে। আন্দামান-নিকোবর যেনো শুধুই রিসোর্ট আর টুরিস্ট বাংলোর নির্জণ শহর। আমার কি যে ভালো লেগেছে বলে/ লিখে প্রকাশ করা যাবেনা।
আমরা লাঞ্চ করলাম বেলা ২ টার সময়। লাঞ্চের মেন্যু ছিল-বাসমতি চালের সাদা ভাত, একদম তাজা রুপচান্দা ফ্রাই, গভীর সমুদ্রের রেড কিং লবস্টার, চিকেন, চীজ এবং টুনা ফিস মেশানো সালাদ। সব শেষে খাটি দুধ। এরা গ্লাশ ভর্তি দুধের উপড়ে এক চামচ করে খাটি গাওয়া ঘি দিয়ে পরিবেশন করে। বিশয়টাতে নতুনত্ব ছিল। খেতে বেশ মজাই লেগেছিল
শেষ পর্ব পড়ুন কালঃ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

