কেন এমন হয়!-১
আমি হিমেল। সব সময়ই আমার ঘুম পায় শেষ রাতে। অঘোরে ঘুমোচ্ছিলাম। ভোর সোয়া পাঁচটায় সেল ফোনটা "আমার দেশের মাটিরো গন্ধে ভরিয়াছে কাঁদা জল..." গেয়ে উঠলো। ঘুম জড়ানো চোখেই ফোন কল রিসিভ করি। অপর প্রান্ত থেকে সুললিত কন্ঠে ভেষে এলো--"can you get me from your Dhaka airport"? আমি কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বল্লাম-"who is speaking"? অপর প্রান্ত নিজের পরিচয় দিয়ে বল্লেন-"আমি ...... তোমাদের ঢাকা এয়ারপোর্টে...তুমি এক্ষুনি চলে এসো, আমাকে এখান থেকে তুলে নাও"। আমি তখনো বুঝতে পারছিনা-আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সপ্ন দেখছিকিনা! না, আমি তখন জেগে আছি-আমি স্বপ্ন দেখছিনা। যা শুনেছি সব সত্য। কথাটা শুনেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। কি করবো ভাবতে পারছিনা। পাশেই আমার বৌ ঘুমোচ্ছে...।
ঝটপট বিছানা থেকে নেমে বললাম-"ওয়েট প্লীজ, উইথইন ফর্টি মিনিটস আই য়্যাম কামিং"। বৌ জানতে চাইলেন-"কি হয়েছে? কোথায় যাচ্ছো"? আমি বললাম-আমার এক বিদেশী গেস্ট এয়ার পোর্টে ট্রাঞ্জিট নিচ্ছে-তাঁর সাথে দেখা করে আসি। মাত্র ১০ মিনিটেই ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে বেড়িয়ে পরি এয়ার পোর্টের উদ্দেশ্যে। সকাল বেলা রাস্তা একদম ফাঁকা। খুব স্পীডে ড্রাইভ করছি......। আমি জীবনে এক লাইন গান কোনদিন কারো সামনে কখনো গুনগুন করেও গাইনি। আজ আমার খুব প্রিয় একটা গান অন্তরের ভিতর থেকে বেড়িয়ে আসছে। যে গানের শিল্পী মান্না দে। গানটি হলোঃ-
যে ক্ষতি আমি নিয়েছিলাম মেনে
সেই ক্ষতি পূরণ করতে কেন এলে
কি খেলা তুমি নতুন করে যাবে আবার খেলে
আমি যেসব কথা গিয়েছিলাম ভুলে
রেখেছিলাম অন্ধকারের বন্ধ খাঁচায় তুলে
সে পাখিকে ডাকলে কেন নতুন পাখা মেলে
আমার যা কিছু আকাঙ্খা যা কিছু অনুভব
পাথর হয়ে বুকের মাঝে জমেছিলো সব
সেই পাথরচাপা ঝর্ণাকে আবার বললে কেন
সময় হলো নদী হয়ে যাবার
জানিনাতো কোন মরুতে রাখবে তারে ফেলে
যে ক্ষতি আমি নিয়েছিলাম মেনে
সেই ক্ষতি পুরন করতে কেন এলে
কি খেলা তুমি নতুন করে যাবে আবার খেলে
কস্টে আমার বুক ভেংগে যাচ্ছে কিন্তু চোখ ভিজেনা! তবুও জানিনা কেনো মনে হচ্ছে-আজকের দিনটা অনেক বেশী সুন্দর! অন্য সব দিনের থেকে সুন্দর। পাখীরা বাসা ছেরে বেড়িয়েছে খাদ্য অন্বেষনে... আমি বেড়িয়েছি আমার খুব প্রিয় এক শুভার্থীর কাছে-যাকে আমি দীর্ঘ কয়েক যুগ পর দেখব। যে ছিল ২৫ বছর পুর্বে শুধুই আমার, কিম্বা আমি শুধুই তার ছিলাম...। মহাখালী ফ্লাই ওভার পার হয়ে বনানী এলাকা দিয়ে চলছি এয়ারপোর্টের দিকে। সবুজে ঘেরা ক্যান্টন্মেন্ট এবং বানানী-দুই দিকেই প্রচুর পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। মন বলছে-আহা! ঐ পাখিগুলোর মত যদি আমার পাখা থাকতো তাহলে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে সোজা ক্যানটনমেন্টের উপড় দিয়ে উড়ে চলে যেতাম এয়ারপোর্ট। আমার পাখা নেই-তাই গাড়ি চালিয়েই যেতে হবে অনেক্ষণ সময় নিয়ে।
২৫/২৬ মিনিটের মাথায় আমি যখন এয়ারপোর্ট পৌছি তখন পুর্ব দিগন্তে সুর্য্য লাজ-রক্তিম আভা ছড়িয়ে পৃথিবী দেখছে। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি পৌঁছেই যে নম্বর থেকে তিনি আমাকে ফোন করেছিলেন-সেই নম্বরে কল ব্যাক করলে একটা মেয়ে কন্ঠ কল রিসিভ করে জানালেন-তিনি একজন ইমিগ্রেশন অফিসার, তাঁর নম্বর থেকে আমেরিকা থেকে আসা একজন মহিলা অন রিকোয়েস্ট কল করেছিলেন...তিনি প্রায় ১৫ মিনিট পুর্বে কাস্টমস পেরিয়ে চলে গিয়েছেন......। দেশে আমাদের গত ১৬ বছরে দেখা নাহলেও তার সাথে মাঝে মাঝে ফোনে কথা হয়। মাঝে মধ্যে ই-মেইলে যোগাযোগ হতো। তিনি আমার, আমার পারিবারিক সব কিছু জানেন। এমনকি তিনি আমার গাড়ির রঙ, মডেল, সেল ফোন ক্যামন... সব জানেন। এয়ারপোর্ট পার্কিং'এ গাড়ি পার্ক নাকরে আমি সোজা চলে যাই 'traveler / passenger pick up'-এ, গেইট পার হয়েই দেখি- সেই তিনি দাঁড়িয়ে আছেন হাসি মুখে হাতে একটা 'carry on bag' এবং একটা picnic basket নিয়ে। আমি গাড়ি দাড় করিয়ে নামতেই আমাকে হাই বলে আলতো করে হাগ করেন। আমি গাড়ির ট্রাঙ্ক খুলে তাঁর ব্যাগটা রাখি। তিনি আমার পাশের সীটে বসলেন এবং আমেরিকান অভ্যাসমত সীট বেল্ট বেধে নিলেন। গাড়িতে উঠেই আমি অবাক হয়ে বলি-"কী ব্যাপার, বলা নেই, কওয়া নেই- হঠাত করে হাজির"? তখন তিনি বললেন-"হিমেল, তুমি খুব কড়া একটা চিঠি(ই-মেইল)দিয়েছো...বেশ কিছুদিন পুর্বে। তারপর আর যোগাযোগ করছোনা। ঐ চিঠি আমাকে খুব হার্ট করেছে, আপসেট করেছে। আমি আমাকে ডিফেন্ড করার জন্য এলাম, "Let me explain everything"! - আমি আবারো অবাক হলাম-আমি তাঁকে কড়া চিঠি দিয়েছি-সেই জন্য সুদুর আমেরিকা থেকে ঢাকা এসেছো নিজেকে ডিফেন্ড করতে! আমি হেসে দিলাম... আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে বললাম 'you look very cute'! আমি তাঁকে একবারও বলিনি-"শুধু নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য সুদুর আমেরিকা থেকে ঢাকা আসার কোন প্রয়োজন ছিলনা"।
তিনি আমার হাটুতে সামান্য চাপ দিয়ে বললেন-হিমেল, আমাকে ভুল বুঝনা, আমাকে ক্ষমা করো। আমাদের খুব খারাপ টাইম যাচ্ছে, আমার বর'এর দু দুটো অপারেশন হয়েছে, ছেলেটা এক মেক্সিকান মেয়ে বিয়ে করে ডিভোর্স করে আমাদের অনেক ঝামেলায় ফেলেছে। নানান ঝামেলায় আমাদের দিন কাটছে-তাই আমি বোধ হয় তোমার সাথে ঠিকমত বিহেভ করতে পারিনি Plz forgive me। আমার মেয়ে ফিলাডেলফিয়া থেকে ১০ দিনের ছুটিতে ফিলিন্ট এসেছে। ওর কাছে ওদের বাবাকে রেখে আমি ঢাকা এসেছি! আমি আবারো হেসে বললাম-কি করে আসলে বলতো? -"Flint(মিশিগানের ছোট্ট একটি শহর) এয়ারপোর্ট থেকে Detroit, Detroit থেকে New York, New York থেকে Kuwait, Kuwait থেকে London হয়ে ঢাকা এবং এখোন তোমার পাশে......। আঠারো হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তোমাকে surprise দিতে এবং সেইসাথে sorry বলতে এলাম। বল, এখনো আমার উপড় রাগ করে থাকবে"? আমি ৭ দিনের ছুটিতে এসেছি। আসা যাওয়া ৪ দিন চলে যাবে। ঢাকাতে থাকব মাত্র এক দিন। আমার চিঠির যে সেন্টেন্স নিয়ে তুমি আপত্তি এবং অভিযোগ করেছ-তা নিতান্তই তোমার ভুল ধারনা। আমি যা লিখতে/প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম-তা সঠিক ভাবে লিখতে পারিনি ভাষাগত কারনে। যার কারনে তুমি আমাকে ভুল বুঝে রাগ করে আছ।
আমি শুধু বললাম-তোমার sorry খুব expensive!
এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে তাঁকে বললাম-এতো কাজ যখন একা করতে পেরেছো-তখন হোটেলের বুকিংটাও নিশ্চই দিয়ে এসেছো? হেসে বললেন-না, ঐ কাজটা তোমার জন্যই রেখেছি। আমি তাঁকে নিয়ে এলাম হোটেল সোনারগাঁ। তাঁর পাসপোর্ট নিয়ে তাঁকে হোটেল লবীতে বসিয়ে রেখে আমি কাউন্টারে গিয়ে একদিনের জন্য হোটেল বুকিং দেই ফুল পেইড করে। ফুল পেইড নাকরলে তাকে এইটুকুন খেদমতও আমি করার সুযোগ পাবোনা। ছয়তলায় স্যুইট/রুমটা তাঁর পছন্দ হলো। রুমে ঢুকেই তাঁর হাতে থাকা একটা ব্যাগ আমার হাতে দিয়ে বললো-"তোমার জন্য সুদুর Flint থেকে তোমার প্রিয় খাবার Mexican food TACO নিয়ে এসেছি"! আমার চোখে পানি এলো! জীবনটা এমন কেনো? আমরা যা চাই-তা কেনো পাইনা? নিয়তি কেনো মানুষের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে এমন নিষ্ঠুর খেলা খেলেন! রুমে বসে আমি বললাম-তুমি চেঞ্জ হয়ে নাও, শাওয়ার করে নাও-আমি ব্রেকফাস্ট অর্ডার করছি। আমি্ জানি তার পছন্দের খাবার কি... সেইমতো একটা ব্রেকফাস্ট অর্ডার করি। তাঁর জন্য হোটেল কর্তিক দেয়া কম্পলিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট আমি খেয়ে নিলাম। আমি অনেক খেতে পারি-যা তিনি জানেন। আমাকে বললেন-ট্যাকো দুটো খেয়ে নাও...
রুমের থাকা মাইক্রো ওভেনে গড়ম করে তার সামনেই সুস্বাদু ট্যাকো খেলাম অনেক বছর পর।
আমরা কথা বলছি আর খাচ্ছি। আমি লক্ষ করছি-তিনি খেতে খেতেই লম্বা হাই তুলছেন এবং ঘুম ঘুম চোখে তাকাচ্ছেন। বুঝতে পারছি-তার প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে। আমি জানি প্রায় ৪০ ঘন্টার Jet-Lag কি জিনিষ! তিনি আমার হাতে একটা গিফট বক্স দিয়ে বললেন-"এটার ভিতর কিছু চকোলেট, কুকিজ এবং গিফট আছে-তোমার বৌ-ছেলেদের জন্য"। তখন সকাল প্রায় দশটা। ঢাকায় বেড়াতে আসা আমার বিদেশী গেস্টদের জন্য রিজার্ভ সেল ফোনটা তার হাতে দিলাম। আমরা একসাথে লাঞ্চ করবো...আমি তাঁকে ঘুমাতে বলে বাসায় চলে আসি।
(বাকী টুকু পরের পর্বে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

