ঢাকাবাসীর ঈদ উৎসব
ঢাকা যেমন চারশত বছরে ধীরে ধীরে বদলে গেছে তেমন এর অধিবাসীদের ঈদ উদযাপনের বিষয়টিও পরিবর্তিত হয়েছে। সময় আর রাজনৈতিক নানান পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এ বদলে যাওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে গিয়েছে। ঢাকার ঈদ উৎসবের অগ্রভাগ জুড়েই আছেন শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের সংশ্লিষ্টরা। বলা যায়, তাদের উৎসাহে উৎসবে পরিণত হতো ঈদের দিনগুলো। সে সময়ে ঢাকাবাসীরা ঈদের কেনাকাটা সারতেন বাদশাহী বাজারে (বর্তমান চকবাজার)। মোগল রাজধানী হিসেবে ঢাকা সবেমাত্র তৈরি হচ্ছে। ফলে ঈদের জামাত পড়ার জন্য তখনোও তেমন কোন ঈদগাহ গড়ে ওঠেনি। ঢাকাবাসীরা তখন হয়তো কোন খোলা প্রান্তরে ঈদের নামাজটা আদায় করে নিতেন। ১৫২৯-১৬৫০ খৃষ্টাব্দের দিকে ঢাকায় অভিজাতদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে সময়ে মোগলদের দ্বারা জমজমাট হয়ে উঠেছিল ঢাকা শহর। অনুমান করা যায় ঈদ উৎসবগুলোর ব্যাপকতাও সে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল। ঈদগাহবিহীন ঈদ জামাত বেশিদিন চলেনি কারণ বছর ত্রিশেক পরেই ঢাকার ধানমন্ডিতে তৈরি করা হয়েছিল ঈদগাহ। ঢাকার অভিজাত শ্রেণীর মুসলমানরা এই ঈদগাহতে যেতেন ঈদের নামাজ পড়তে। তবে সাধারণ নগরবাসীরা এতে প্রবেশ করার তেমন একটা সুযোগ পেতেন না। কখনো শাসকরা নতুন কোন রাজ্য জয় করলে ঈদ উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত হত বাড়তি আনন্দ।
১৭০২ খৃষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খান (করতলব খান) তার দেওয়ানি বিভাগ মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। এর কিছুদিন পর মোগল সুবে বাংলার রাজধানী একেবারে পরিবর্তন করে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানেই। ফলে ঢাকার গুরুত্ব কমে যায়। তারপর ঢাকার ওপর মূল ধাক্কা এসে লাগে ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ঐতিহাসিক সেই ক্ষমতার পালাবদলে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৬৫ খৃষ্টাব্দে মোগল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার রাজস্ব সংগ্রহের ভার পায়। ইংরেজদের রাজস্ব আদায় হতো কঠিন হাতে। ফলে পূর্ববঙ্গে প্রায়শই দুর্ভিক্ষ দেখা দিতো। ফলে সহজেই অনুমান করা যায় ঢাকাবাসীর ঈদ উদযাপন বিষয়টি সে সময় কেমন হত। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো অবস্থা সেখানে উৎসবের কথা বলাই বাহুল্য।
ঊনিশ শতকের প্রথম থেকে ঢাকার ধ্বংস শুরু হয়। পুরনো মোগল স্থাপনা, ইউরোপীয় বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। সংকুচিত হতে থাকে এর সীমানা। যাদের ঢাকা ত্যাগ করার সুযোগ ছিল তারা ঢাকা ত্যাগ করে চলে যান অন্যত্র। ফলে জনসংখ্যাও কমতে থাকে। ঢাকায় এ অবস্থাতেও এর জনসংখ্যা ছিল তিন লাখের মতো। পড়তি ঢাকার জৌলুস ধরার চেষ্টা করা হত ঈদ ও মুহররমের মিছিলের মাধ্যমে। এই মিছিলগুলোর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ঢাকার নায়েব নাজিমরা। নায়েব নাজিমরা নিজেদের শৌর্য বীর্য দেখানোর জন্য এসব মিছিলগুলোর ছবি এঁকে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। তাই সে সময়ের ঈদ উদযাপনের কিছুটা চিত্র আমরা পাই। ইংরেজদের শাসনকার্যে সুবিধার জন্য যেসব শ্রেণী গ্রামের জীবন থেকে উঠে এসে শিক্ষাকে উপজীব্য করে শহর জীবন বেছে নিয়েছিলেন, তাদের সংস্কৃতিটা যোগ হয়েছিল ঢাকায় ঈদ উৎসবের সাথে। যেমন আমরা বলতে পারি ঘরের তৈরি বিভিন্ন ধরনের পিঠা, সেমাই, ঈদের দিন মেলার আয়োজন ইত্যাদি। ঊনিশ শতকের শেষের দিকে ঢাকার মুসলমানরা (তখন সম্ভবত প্রায় সব শ্রেণীর মুসলমারা এক সঙ্গেই যোগ দিতেন) ধানমন্ডির সেই মোঘল ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়তে যেতেন।
ঢাকাবাসীদের ঈদসহ বড় বড় উৎসবগুলোতে প্রধান খাদ্য হয়ে ওঠেছিল মোঘল ঘরানার খাবারসমূহ। এক কথায় বলতে গেলে এইসব খাবারই হয়েছিল ঈদের আনন্দের অংশবিশেষ। গত শতাব্দীর ত্রিশ দশকে এসে ঢাকাবাসীর ঈদে কিছু বিভিন্নতা, নতুন কিছু বিনোদনের সংযোজন ঘটে। ততোদিনে ঢাকা জাদুঘর স্থাপিত হয়েছে, "টকি" সিনেমা এসেছে, এসেছে রেডিও, ধানমন্ডির ময়দানে নির্মিত হয়ে গেছে এ্যারোপ্লেন নামার জন্য এ্যারোফিল্ড। ঢাকায় তখন মহল্লাভিত্তিক জীবন-যাপন ছিল। এই জীবন-যাপন ঈদের আনন্দের মাত্রায় যোগ যোগ করতো বাড়তি আনন্দের। ঢাকার বিস্তৃতির সাথে সাথে সেই আবেগেরও মৃত্যু ঘটেছে। ঢাকায় এখন এক কোটির অধিক মানুষের বসবাস। ঢাকাবাসীদের এখনো বড় একটা অংশ ঈদ এলে ছুটে যায় গ্রামে। ফলে ঢাকা হয়ে পড়ে কিছুদিনের জন্য ফাঁকা, পরিবেশ দূষণ মুক্ত। আধুনিক প্রযুক্তি যুগে উৎসবের আনন্দের মাত্রাটুকুর শেষ নেই। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে বিভিন্ন থিম পার্কে বেড়াতে যাবার আনন্দ; ব্যস্ত নাগরিক জীবনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে আসে আরো নিকটে। আত্মীয়স্বজন অথবা বন্ধু-বান্ধবদের বাড়িতে সশরীরে যেতে না পারলেও ক্ষতি নেই- আছে সেলুলার ফোন। সেই ফোনেই হয়ে যায় শুভেচ্ছা বিনিময়। পরিবর্তন আসছে; আসতে বাধ্য।
সহায়ক তথ্য সুত্রঃ ঢাকার ইতিহাস,
লেখকঃ নাজির হোসেন।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ দুপুর ২:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



