সোনারগাঁও ইবনে বতুতার মধ্যযুগের বাংলার দলিলঃ
কী বিচিত্র সুন্দর প্রাচুর্য ভরা এদেশ। মুঠো মুঠো প্রাচুর্যের ভেতর মোহনীয় রহস্য আর নৈঃস্বর্গীক সৌন্দর্য্য। ইবনে বতুতা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখেন। আশ্চর্য এ দেশ। তার নিজের ভাষায় "নদীর ভাটিপথে আমরা পনের দিন ধরে বিভিন্ন গ্রাম ও ফলমূলের বাগানের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি (সিলেট থেকে সোনারগাঁও) ঠিক যেন কোন বাজারের মধ্য দিয়ে আমাদের অর্ণবপোত এগিয়ে চলেছে, মনে হচ্ছে মিসরের নীল নদের তীরের শস্য সমাহারের মতো এ প্রাচুর্য"। ইবনে বতুতার বড় সাধ সোনারগাঁ দরবার দেখার। দিন-রাত পনেরো দিন চলার পর ইবনে বতুতা এসে পৌঁছলেন প্রাচ্যের রহস্য নগরী সোনারগাঁয়ে। অর্ণবপোত এসে ভিড়ল সোনারগাঁয়ের কূলে। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী উষ্ণ সংবর্ধনা জানাল ভিন্দেশী মহান অতিথিকে। ১৩৪৫ খৃষ্টাব্দে ইবনে বতুতা এসে পৌঁছলেন সোনারগাঁয়ে। তখন সোনারগাঁ শাসন করেন স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ। বাহরাম খানের শিলাহদার ফখরুদ্দীন রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে বাহরাম খানকে হত্যা করে সোনারগাঁয়ের একচ্ছত্র অধিপতি হন।
সোনারগাঁয়ের দরবারে সোনার ঘন্টা বাজে ঢং ঢং করে। প্রহরী হাঁকেন "মনসুর উল মুলক ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ আরাহা আয় হুঁশিয়ার-"। স্বনামে তিনি মুদ্রা অঙ্কন করেন। মুদ্রাতে লিখেন "আবুল মুজাহিদ ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ"। কিন্তু রাজ্যের অভ্যন্তরীণ কোন্দল তখনো শেষ হয়ে যায়নি। লাখনৌতির শাসনকর্তা কদর খান সেনাবাহিনী নিয়ে এগোলেন পূর্ববঙ্গের রাজধানী সোনারগাঁ দখল করার জন্য। মনে বড় আশা তাল তাল সোনার মোহর লাভ করবেন। শুরু হল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দ্রিমদ্রিম শব্দে কেঁপে ওঠে সোনারগাঁও। ফখরুদ্দীন তার বিশাল নৌবহর নিয়ে মেঘনা নদীতে কদর খানকে বাধা দিলেন। কিন্তু বিধিবাম। কদর খানের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলেন ফখরুদ্দীন। মেঘনার এক দ্বীপে পালিয়ে আত্মরক্ষা করলেন সোনারগাঁয়ের স্বাধীন সুলতান। কদর খানের হাতে সুবর্ণ নগরী আবার লুণ্ঠিত হল।
রাজ দরবারে জ্ঞানী-গুণীদের অনেক উপঢৌকন দেয়া হল। ফখরুদ্দীন তখন রাজ্য জয়ে ব্যাকুল হয়ে উঠেন। তিনি চাটিগাঁও দখল করার চিন্তা করতে থাকেন। প্রাচ্যের বেলাভূমি চাঁটিগাঁও (চট্টগ্রাম) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্দর। এ বন্দর অধিকারে আসলে মোটা শুল্ক আসবে। রাজ ভান্ডারে প্রচুর অর্থ সমাগম হবে। তার বিখ্যাত অনুচর শায়দাকে সোনারগাঁয়ে রেখে চাঁটিগাঁও অভিযানে যাত্রা করলেন। কিন্তু এরই মধ্যে সংবাদ পেলেন যে, তার বিশ্বস্ত অনুচর শায়দা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। ফখরুদ্দীনের নৌবাহিনী আবার ছুটল সোনারগাঁ বন্দরের দিকে। শিংঙ্গা ফুঁকে জানিয়ে দেয়া হল শায়দাকে ধরে আনার জন্য। সোনারগাঁয়ের লোকজন শায়দাকে ধরে ফখরুদ্দীনের নিকট আনলেন। বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য ফখরুদ্দীন তাকে হত্যা করলেন। বিপ্লবের পর পাল্টা বিপ্লব, রক্তাক্ত অভ্যুত্থান, স্বাধীনচেতা ফখরুদ্দীন দমবার পাত্র নন। এ অবস্থায় তিনি তার সহানুভূতির হাত প্রশস্ত করলেন রাজ্যের জ্ঞানী-গুণীদের প্রতি।
ইবনে বতুতার অর্ণবপোতে তখন কলগুঞ্জন। সুলতানের সাথে কিভাবে দেখা করা যায়। সুলতান যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যস্ত। এ সময়ের সাক্ষাৎকে তিনি কিভাবে গ্রহণ করবেন আল্লাহই জানেন। দরবারে দূত পাঠাবেন কি? হয়ত না যাওয়াই ভাল হবে। সুলতান যদি ভিন্দেশী গুপ্তচর ভাবেন? ইবনে বতুতার মনে চিন্তার কালোমেঘ উথাল-পাতাল করে। অবশেষে সাক্ষাৎ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু ইবনে বতুতা ভুলতে পারলেন না। সোনা-দানায় ভরা এ সুবর্ণ নগরীকে, স্বর্ণগ্রামকে সত্যিই প্রভু যেন নিজ হাতে মুঠো মুঠো ঐশ্বর্য ঢেলে দিয়েছেন এ বাংলায়। ইবনে বতুতার দৃষ্টি তখন জাভার দিকে। সোনারগাঁ বন্দরে জাভার বাণিজ্য জাহাজ ভিড়ে আছে। এ অর্ণবপোতেই যেতে হবে সুমাত্রা। "সুমাত্রা প্রাচ্যের রহস্য নগরী"- তাম্রপাত্রে লিখে রাখল মরক্কোর এক পর্যটক। হয়ত কোনদিন, যখন স্বাধীন বাংলার ইতিহাস লেখা হবে, তখন হয়ত ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের ইতিহাসের সাথে এই পর্যটকের কথাও আলোচিত হবে। সুগন্ধি মশলা, মিহি মসলিন, চাল বোঝাই করে ভিন্ দেশী অর্ণবপোত রওনা হবে সিংহলে, মালায়, সুমাত্রায়। পর্যটকের বড় সাধ জাগে জান্নাতুল বালাদ সোনারগাঁয়ের ঐশ্বর্য দেখার। কিন্তু সোনারগাঁয়ের আকাশে-বাতাসে শুধু বিদ্রোহের ঘনঘটা। দিল্লীর সুলতানের শ্যেণ্ দৃষ্টি সোনারগাঁয়ের প্রতি। তাছাড়া লাখনৌতির শাসকদের দৃষ্টি তো আছেই। তবুও ফখরুদ্দীন কত অমিত ত্যাজে রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। দিল্লী ও লাখনৌতির তরবারীকে উপেক্ষা করে ফখরুদ্দীন সোনারগাঁয়ে স্বাধীন রাজ্য গড়ার ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।
ইবনে বতুতার সোনারগাঁ ভ্রমণ মূলত তার বাংলা ভ্রমণের অংশ। তিনি বাংলাদেশের প্রথম যে শহরে প্রবেশ করেন তা ছিল চট্টগ্রাম। এটি সমুদ্রের তীরে অবস্থিত একটি বিরাট শহর। এর দূর কাছেই ছিল গঙ্গানদী যেখানে হিন্দুরা তীর্থ করে। এখানে গঙ্গা ও যমুনা একত্র হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়েছে। তিনি গঙ্গা নদীর তীরে অসংখ্য জাহাজ দেখে অভিভূত হন। বাংলার সবকিছুই তাকে বিমুগ্ধ করে, আবার কিছু বিষয়ে তিনি সচকিত হয়ে ওঠেন। তার চোখে বাংলা একটি বিরাট দেশ। এখানে প্রচুর পরিমাণে চাল উৎপন্ন হয়। পর্যটক বাংলার সর্বত্র ধানক্ষেত, কর্মঠ কৃষকের ধান কাটা, মাথায় ধানের বোঝা নিয়ে সারি সারি করে উঠোনে ধানের স্তূপ দেখে বিমোহিত হন। তিনি পৃথিবীর বহু দেশ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। কিন্তু সোনার বাংলার ন্যায় এত সস্তা দ্রব্য পৃথিবীর আর কোন দেশে দেখেননি। অধিক বৃষ্টিপাতের দরুন বিদেশীরা খুব একটা উপভোগ করতে পারে না এদেশের সম্পদরাজি। এদেশের আবহাওয়ায় তারা খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।
তাই তারা এই সোনার বাংলাকে "সম্পদে ভরা নরক" বলে অভিহিত করে। দেশের রাস্তার পাশে বাজার বসে। সে বাজারে চালের পসরা বসে। এক রূপার দিনার, যা ভারতের আট দিরহামের সমান। তার বিনিময়ে দিল্লীর ২৫ বরতল ওজনের চাল বিক্রি হয়। দিল্লীর এক বরতল ১৪ সেরের সমান। বাংলার লোকেরা এই দরকেই চড়া বলে মনে করে। এখানে তিনটি রূপার দিনারে একটি দুগ্ধবতী গাভী বিক্রি হত। বাংলাদেশে গরুর কাজ মহিষ দিয়েও চালানো হয়। এখানে অন্যান্য দ্রব্যের ন্যায় ক্রীতদাস-দাসীর প্রচুর সমারোহ দেখা যায় এবং এক্ষেত্রেও সস্তা রীতি প্রচলিত। একটি সুন্দরী ক্রীতদাসী বালিকা-যে সৌন্দর্য্যে জমিদারের উপ-পত্নী হতে সমর্থ তার দাম মাত্র এক সোনার দিনার। যা মরক্কোর আট সোনার দিনারের সমান।
ইবনে বতুতা তার বিখ্যাত গ্রন্থ "রিহলা"তে এসব ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করেন। তার মত এমন অনেক পর্যটক বাংলাদেশ ভ্রমণ করে তার বিবরণ লিপিবদ্ধ করে যান অতি প্রাচীনকাল থেকে। তন্মধ্যে ফা হিয়েন, ইত্সিন মা হুয়ান, ওয়াং তা ইউয়ান, ফেইশিন, নিকলো কস্তি, ভাস্কো-দা গামা, ভারথেমা, বারবারোসা, ভিনসেন্ট স্মিথ, তোমে পিতস প্রভৃতি পর্যটকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটা উল্লেখ্য যে, এই পর্যটকদের ভ্রমণ বিবরণী পড়ে ইউরোপীয় জাতিগুলো বাংলার সমৃদ্ধির প্রতি ধারণা লাভ করে। তারা বাংলা আবিষ্কারে নেমে পড়ে। এর মাধ্যমে বাংলা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রবেশ করে এবং এক পর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির লোলুপ দৃষ্টি কেড়ে নেয় এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
তথ্য সুত্রঃ ইবনে বতুতার বিখ্যাত ভ্রমন কাহিনী মুলক বই ফার্সী ভাষায় লিখিত "রিহলা"র কে আর সুব্রামনিয়াম কর্তিক ইংরেজী অনুবাদ " ইব-ন বতুতা'স এন্সিয়েন্ট বেংগল হিস্টরী"- থেকে অনুদিত এবং সংকলিত।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১০:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



