ভ্যালেন্টাইন ডে-ভালবাসার দিনঃ
আমরা এখন সবাই জানি-১৪ ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে- বিশ্ব ভালবাসা দিবস। ভালবাসার চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ এই দিনটি একটু আলাদা ঢং ও আঙ্গিকে অনুরণিত হবে। আহ্বান বাণী উচ্চারিত হবে ভালবাসার অবগাহনে সিক্ত হতে। প্রিয়জনের সাক্ষাৎ হলে নিশ্চয় আমরা ভুলে যাবো না ভ্যালেনটাইন ডের কথা মনে করিয়ে দিতে। যেমনি হয়ত নির্লিপ্ত থাকবো না কাছের প্রিয় মানুষটিকে ছোট্ট উপহার দিতে বা নিদেনপক্ষে টেলিফোন-মোবাইলের একটি কল বা এসএমএস পাঠাতে, হ্যালো, ভ্যালেন্টাইন ডে। তারুণ্যের আবেগ উচ্ছলতার ঢেউ হয়ত আছড়ে পড়বে প্রতি মুহূর্তে তীর ভাঙ্গা ঢেউয়ের বেগে মন ও মননে। কিন্তু ক'জনই বা আমরা জানি ভ্যালেন্টাইন দিনের গোড়াপত্তনের ইতিহাস।
ভ্যালেন্টাইন ডে'র ইতিহাস নিয়ে নানা ধরনের গল্পকাহিনী প্রচলিত আছে। আমি সেইসব কাহিনীর উল্যেখযোগ্য কয়েকটি আপনাদের কাছে তুলে ধরতে চেস্টা করছিঃ-
২৬৯ সালের এই দিনে রোমান সাম্রাজ্যের রোম নগরীতে ভ্যালেন্টাইন ডের উৎপত্তি হয়। পাদ্রী যাজক জেন্ট ভ্যালেনটাইনকে রোম সম্রাট দ্বিতীয় কডিয়াস খৃষ্টধর্ম পরিত্যাগ করতে আহ্বান জানালে তিনি ধর্ম ত্যাগে অস্বীকার করলে ২৬৯-এর ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে হত্যা করা হয়। পৌরাণিকে বর্ণিত হয়েছে-সে সময় রোমানদের মধ্যে দেবদেবীর পূজার প্রচলন ছিলো। পাদ্রী সেন্ট ভ্যালেন্টাইন রোমে খৃষ্টধর্মের প্রচার শুরু করেন। রোম সম্রাট কডিয়াস এজন্য ভালেন্টাইন-এর উপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। ভ্যালেন্টাইনকে বন্দী করে জেলে নিক্ষিপ্ত করা হয়। জেলখানায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে, যুবক-যুবতীরা ভ্যালেন্টাইনকে দেখতে আসতো এবং ভালবাসা ও একাত্মতা জানাতে জেলের জানালা দিয়ে চিঠি ও ফুল দিতো। তিনি নিজে একজন চিকিৎসকও ছিলেন এবং এই সুবাদে ঐ জেলের জেলারের অন্ধ মেয়ের চিকিৎসা করে দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন। মেয়েটির সাথে পরবর্তীতে ভ্যালেন্টাইনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবার আগ-মুহূর্তে ভ্যালেন্টাইন জেলারের কাছে এক টুকরো কাগজে মেয়েটির উদ্দেশে ভালবাসা ও বন্ধুত্বের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখে পাঠান লাভ ফ্রম ইয়োর ভ্যালন্টোইন।ভালবাসার এই হৃদয় ছোঁয়া আকুতিকে সম্মান দেখাতে ও ইতিহাস স্মরণীয় করতে পোপ ১ম জুলিয়াস ৪৯৬ খৃস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন ডে ঘোষণা করেন।
ভ্যালেন্টাইন ডে'র আরেকটি উপাখ্যান হলো- রোমের সম্রাট দ্বিতীয় কডিয়াস ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন ও স্বেচ্ছাচারী। তিনি প্রায় অযাচিত রক্তাক্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেন সামাজ্য সীমানা ও ক্ষমতা পরিবর্ধনে। এজন্য তার প্রয়োজন ছিল এক বিরাট সৈন্যবাহিনীর। একসময় সেনাবাহিনীতে সেনা সংখ্যা সংকট দেখা দিলে রোমবাসীর স্নেহ-মমতা-ভালবাসাকে দায়ী করেন কডিয়াস এবং যুবক-যুবতীদের বাগদান ও বিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। এসময় ভ্যালেন্টাইন নামের এক যুবক ভালবেসে সেন্ট মারিয়াসকে বিয়ের মাধ্যমে রাজার আদেশকে অবজ্ঞা করেন। শুধু নিজে বিয়ে করে থেমে থাকেননি বরং গোপনে আরও বিয়ের কাজ চালাতে থাকেন। এ সংবাদে কডিয়াস ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একসময় সেন্ট ভ্যালেনটাইন রাজার সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন। দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২৭০ খ্রিঃ। হাত, পা-বেঁধে টেনে-হিঁচড়ে কডিয়াসের সামনে হাজির করা হলে ভ্যালেনটাইনকে পিটিয়ে হত্যা ও শিরচ্ছেদ এর আদেশ দেন তিনি। এ দিনের শোক গাঁথায় আজকের ভ্যালেনটাইন ডে।
আর একটি কাহিনী হলো-প্রাচীর রোমে জুনোর সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি ছুটি পালন করা হতো। জুনো ছিলেন দেবতাদের রাণী। রোমানরা এও বিশ্বাস করতো জুনোর ইশারা-ইঙ্গিত ছাড়া কোন বিয়ে সফর হয় না। ছুটির পরদিন ১৫ ফেব্রুয়ারি লুপারকালিয়া ভোজ উৎসবে হাজারো তারুণ্যমেলায় র্যাফেল ড্র'র মাধ্যমে সঙ্গী বাছাই প্রক্রিয়া চলতো। লুপারকালিয়া উৎসবে উপস্থিত তরুণীরা তাদের নাম এক টুকরো কাগজের স্লিপে লিখে সবার সামনে রাখা একটি বড় পাত্রে (জার) ফেলে দিতো। একেক জন তরুণ একটি করে স্লিপ জার থেকে তুলে দিতো এবং তরুণী ললনার নাম ধরে কাছে ডেকে নিতো। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি পর্যন্ত চলতো হাজারো তরুণ-তরুণী যুগলের আনন্দ খুশী। কখনওবা এই জুটি সারা বছরের জন্য স্থায়ী হতো এবং এর মধ্যে দিয়ে চির ভালবাসার সিঁড়ি বেয়ে বিয়েতে পরিণতি ঘটতো।
এভাবেই অব্যাহত রূপে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে সেন্ট ভ্যালেনটাইন প্রেমের পূজারী সিদ্ধপুরুষরূপে ভালবাসার বাণী বিনিময়ের মূর্ত প্রতীক। ভ্যালেনটাইন ডে'র প্রচলনের এই হলো আদি ইতিহাস। ঐ পঞ্চম (৪৯৬ খৃঃ) শতক থেকেই দিনটিতে কবিতা, ফুল, উপহার সামগ্রী পাঠিয়ে প্রিয়জনকে বিশেষ স্মরণের রেয়াজ শুরু হয়।
যদিও ভ্যালেনটাইন ডে-কে ঘিরে মুখে মুখে এসব শোক, গল্প গাঁথা কিন্তু তার প্রমাণ একটু তার্কিক। তবুও সারা বিশ্বের প্রেমিকরা এ দিনের মর্মার্থ লালন করে গভীর আন্তরিকতায় ও আবেগের সাথে ভালবাসার চিরায়িত বহিঃপ্রকাশের এই দিনটি পশ্চিমা সংস্কৃতিতে উদযাপনের ইতিহাস হাজার বছরের। কিন্তু বাংলাদেশে এ দিনটির বহু প্রচলন তথা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তারুণ্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে বিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমানের হাতধরে।
যে সূত্র ধরেই ভ্যালেনটাইন দিবস আমাদের সংস্কৃতি ও তারুণ্যে উদ্ভাসিত হোক না কেন এ দিনের পেছনে শোক ও ভালবাসা দুটিই বিধৃত হয়েছে ইতিহাসে। দিনটি মূল্যায়নে খৃষ্টীয় নৃতাত্ত্বিকতা ওতপ্রোত। এটি আলোচনার ইঙ্গিতব্য বিষয় নয়। এদিনের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিশ্বাসের সাথে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের গুণগত তফাৎকে সামনে রেখেই আশা করবো ভ্যালেনটাইন ডে যেন সারা বছরই আমাদের হৃদয়ে প্রেম-ভালবাসা, মানবিক গুণাবলী উৎসরণে সহায়ক হয়। কডিয়াসের অনুরূপ আচরণ তিরোহিত হোক বিশ্বনেতৃত্বের হৃদয় থেকে। তাদেরই সুতিকাগারে প্রসারিত ভ্যালেনটাইন ডে'র মর্মবাণী তাদের হৃদয়ে অনুরণিত হোক। এই প্রত্যাশায় প্রিয় পাঠক আপনাদের প্রতি রইলো ভ্যালেনটাইন ডে'র একরাশ ভালবাসা।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ১০:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


