২৭ জানুয়ারী ২০০৯ রাতের ফ্লাইটে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ড্রাগন এয়ারে যাচ্ছি হংকং। আমার সাথে ক্লাশ টেনে পড়ুয়া ১৪+ বছরের ছেলে সাজিদ। সাজিদকে কথা দিয়েছিলাম এবার ওকে নিয়ে হংকং-চীন বেড়াবো। যদিও আমার যাওয়া অনেকটাই ব্যাবসায়ীক। সাজিদের একশতভাগ বেড়ানো।
ঢাকা বিমান বন্দর পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশের বিমান বন্দরের জৌলুশের তুলনায় খুবই ম্লাণময়।বলতে গেলে হতদরিদ্র। যেকোন দেশের প্রধান প্রধান বিমান বন্দরে নেমেই সেই দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা অনেকটাই বোঝা যায়।যেমন ঢাকায় নেমেই বিদেশীরা বুঝতে পারে আমাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।আমাদের বিমান বন্দর খুবই এলোমেলো অপরিচ্ছন্ন, উপর্যপরি আনস্মার্ট অফিসিয়ালদের অহেতুক উতসুক আর কৌতুহলী চালচলন ছাড়াও খুব সাধারন মানের চেয়ার দিয়ে অপরিকল্পিত ভাবে সাজানো যা নিয়ে আমাদের মন সব সময় খারাপ লাগতো। বিশেষ ভাবে চেয়ারের দৈণ্যদশা দেখে খুব খারাপ লাগতো! কিন্তু এবার সেই গ্লাণী থেকে কিছুটা পরিত্রাণ দিয়েছে বিমানবন্দর কর্তিপক্ষ।
ব্যাবসায়ীক কিম্বা অন্য কাজে যখনই বিদেশ যাই-বিদেশী বড় বড় এয়ারপোর্টের সুদৃশ্য চেয়ারগুলো আমি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। আর ভাবতাম-কবে আমাদের এয়ারপোর্টেও অমন সুন্দর ঝকঝকে চেয়ার বসানো হবে! বিশেষ করে দুবাই, জেদ্দা, সিংগাপুর, ব্যাংকক, হংকং, নারিতা, জেএফকে নিউইয়্যর্ক, হিথ্রো, আর্মস্টার্ডাম বিমান বন্দরের সৌন্দর্যে আমি বরাবর মুগ্ধ হতাম। অনেক সময় প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জের চেয়ারগুলোর নীচ থেকে স্টীকার লাগানো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম দেখে অবাক হতাম-কি করে এতো সুন্দর চেয়ার তৈরী করে? কত দাম প্রতিটা চেয়ারের?-এই সব ভেবে। কিছু দিন পুর্বে আমি দুবাই এয়ারপোর্ট প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জের চেয়ারের নীচ থেকে চেয়ার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নিয়ে এসেছিলাম শুধু মাত্র ঐ চেয়ারগুলো সম্পর্কে একটা ধারনা নেবার জন্য। আমি ই-মেইল করলাম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জার্মানীর "Kus GMBH" কোম্পানীর সাথে। তারা জানালো-বাংলাদেশের একটা কোম্পানীর সাথে তারা যৌথভাবে কাজ করছে-ঢাকা বিমান বন্দরে ওই চেয়ার সরবরাহের জন্য। আমার মনটা খুশীতে ভরে গেলো। এবার বিদেশীরা এসে আমাদের জীর্ণ চেয়ারের পরিবর্তে বিশ্বমানের কাশ কোম্পানীর চেয়ার দেখে আমাদের রুচীবোধের প্রশংসা করবে ভেবে।
জার্মানীর কাশ কোম্পানী ১৯৩৬ সাল থেকে বিমানের সীট, প্যাসেঞ্জার/ বোর্ডিং লাউঞ্জের দামী চেয়ার তৈরী করে। বিশ্বের খ্যাতনামা ৫৪ টি দেশের(বাংলাদেশ সংযোজিত হওয়ায় ৫৫ টি দেশ) ২৩০ টি বিমান বন্দরে তাদের চেয়ার সরবরাহ করে আসছে। এবার সেই আশা পুরণ করেছে আমাদের এয়ারপোর্ট কর্তিপক্ষ।ঢাকা বিমান বন্দরের ছয়টি লাউঞ্জের ভিতর ইতোমধ্যেই তিনটি লাউঞ্জে আট শতাধিক অত্যাধুনিক চেয়ার বসানো কাজ সম্পন্ন করেছে-যা যাত্রীরা ব্যাবহার করে স্বাচ্ছন্দবোধ করছেন্। ধন্যবাদ বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তিপক্ষ। সেই সঙ্গে এটাও জানিয়ে রাখছি জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর মশার আধিক্য শুধু সেই আগের মতইনা, বরং অনেক অনেক বেশী। অন্তত মশার সেন্ট্রাল গোডাউনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগীতা হলে নিঃসন্দেহে আমরা চ্যাম্পিয়ন হবো। বাথ রুমের মেন্টেনেন্স নেই। পরিচ্ছন্নতার দিক থেকেও আমাদের এয়ারপোর্ট অত্যন্ত নোংড়া। প্রায় সবগুলো পানির কল থেকে অনবরত পানি পড়ছে! কর্তিপক্ষের এই বিশয়গুলোর দিকেও নজড় দেয়া দরকার।
সাজিদ আগেই আমাকে শর্ত দিয়েছে-আমাদের ভ্রমনের সময় কাস্টমস ইমেগ্রেশন সহ যাবতীয় কাজ ওরটা ও নিজেই করবে। এমন কি আমার সাথে ও যাচ্ছে-একথাটাও আমি কোথাও প্রকাশ করতে পারবোনা। অর্থাত সাজিদ দেখাতে চাচ্ছে-সে এখণ যথেষ্ঠ বড় হয়েছে এবং নিজের কাজ নিজেই করতে সক্ষম। আমি ওকে সেই সুযোগ দিয়েছিলাম।
কথা মত আমি কাস্টমস-ইমিগ্রেশনে ভিন্ন লাইনে দাড়াই এবং সকল ফর্মালিটিজ শেষ করে প্যাসেঞ্জার লাউঞ্জে যাবার জন্য অপেক্ষা করছি। আমার ছেলেকে আটিকিয়ে দিয়েছে ইমিগ্রেশন কর্তিপক্ষ।তাদের প্রশ্ন-সে একজন ছাত্র, বয়স মাত্র ১৫ ছুঁইছুঁই। ওর টুরিস্ট ভিসা আছে সিংগাপুর-হংকং, চায়না, তাও ডাবল এন্ট্রি...কাহিনীটা কি! কাগজ পত্র সব সঠিকতো! ওকে নানান প্রশ্ন করছে কর্তিপক্ষ, ইমিগ্রেশন ওসি এসে দাড়িয়েছে ওর সামনে। আমি সাজিদের চোখের আড়ালে থেকে কিছুটা দূর থেকে সব লক্ষ করছি।
সাজিদ বলছে-"আমি কোথায়, কেনো একাকী যাচ্ছি-তাতো আপনাদের জানার বিশয় নয়। আমার ভিসা সহ যাবতীয় ডকুমেন্টস ঠিক আছে কিনা-সেটাই আপনাদের দেখার বিশয়"।
ইমিগ্রেশন কর্তিপক্ষ/ ওসিঃ- "শোন, মনে করছি তোমার কাগজ পত্র সব ঠিক আছে সত্য, কিন্তু তুমি একা কেনো যাচ্ছ?"
সাজিদঃ "আমি একা গেলে আপনাদের অসুবিধা কি?"
কর্তিপক্ষঃ "আমরা দেখেছি অনেক সময় ছোটদের প্রতারকরা প্রতারনার জন্য বিদেশে নিয়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যে নিয়ে ঊটের জকি হিসাবে বিক্রি করে দেয়...-সেইসব সন্দেহেই আমরা এতোসব জানতে চাচ্ছি"।
এই কথা শুনেই সাজিদ হেসে হেসে বললো-"আংকেল, আপনারা যে কি সব কথা বলেন-আমাকে ঊটের জকি হিসাবে নিলে সেই ঊটতো নির্ঘাত লাড্ডুগুড্ডু হবে, এমন কি আমাকে পিঠে নিয়ে হয়ত ঊট দাড়াতেই পারবেনা"!
প্রিয় পাঠক, সাড়ে চৌদ্দ বছরের, ৫'-১০" লম্বা সাজিদের ওজন মাত্র ৭০ কেজি! ওকে নিয়ে উট যে দৌড়াতে পারবেনা-সে ব্যাপারে ইমিগ্রেশনের সবাই নিশ্চিত হয়েই ওকে ছেড়ে দিয়েছিল......
পরের কিস্তির জন্য অপেক্ষা করুনঃ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

