জীবন যখন যেমন!
দিনে দিনে ঢাকা শহরের চেহারা বদলে যাচ্ছে। ঢাকা শহরের জীবন ব্যবস্থা পাল্টে যাচ্ছে বৈপ্লবিকভাবে। ঢাকার রাস্তায় এখন ঘোড়ার গাড়ী নেই। তবে শেরাটন হোটেলের সামনে "রাজকীয় ঘোটক-শকট"র একটি দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য সবার দৃষ্টি কাড়ে। ঢাকা মহানগরীতে এখন কোনো গরীবের বেড়া দেয়া পর্ণ কুটির চোখে পড়ে না। কিন্তু চোখে পড়ে দরিদ্রতর মানুষের বস্তি আর দরিদ্রতম মানবেতর জীবন যাপনকারী কিছু মানুষের ফুটপাত শয্যা। এইতো ষাট-সত্তর দশকের ঢাকা শহরের সচ্ছল পরিবারের ছিল এক দেড় বিঘা জমির ওপর বাড়ী, কারো ছিল পুকুর আর বাগানসহ বাড়ি। সেসব বাড়ীতে বসবাস আরামপ্রদ ছিল। কিন্তু অট্টালিকার জৌলুস ছিল না। সেইসব বাড়িওয়ালাদের বড়লোকি প্রদর্শনের মানসিকতা ছিল না। সেসব এক পরিবার ভিত্তিক বাড়ী আজ আর অবশিষ্ট নেই বললেই চলে। তদস্থলে মাটি ফুড়ে গড়ে উঠেছে বহুতল আকাশচুম্বি ফ্ল্যাটবাড়ী। ভদ্রনাম এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স। নিবাস পদ্ধতি বদলানোর সাথে সাথে জীবন পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। প্রতিবেশীদের নিয়ে বৃহত্তর পরিবারের আনন্দময় জীবনের পুরানো কাহিনী এখন কেবলই স্মৃতি। নতুন প্রতিবেশ-কৃষ্টি গড়ে উঠছে বিচিত্র মানসিকতার মিশ্রণে। এমনই এক কৃষ্টিচিত্র বাস্তব অবস্থা দেখানোর চেষ্টা করছি এই নিবন্ধে। ব্যবহৃত কিছু নাম, পরিচয় কাল্পনিক কিন্তু ঘটনা বাস্তবস্পর্শী।
জমিদারি নেই। জমিদারও নেই। জমিদারি মানসিকতা কিন্তু রয়ে গেছে। নব্য ধনীরা উত্তরাধিকারী হয়েছেন সেই জমিদারী মানসিকতার। আর ঢাকার অভিজাত এলাকার বড় বড় বাড়ীর মালিকেরাও হয়ে উঠেছেন নব্য জমিদার- অন্তত: মানসিকতার দিক থেকে। তবে সবাই নন। এদের মধ্যে রয়েছেন অনেক জ্ঞানী-গুণী বিদগ্ধজন। তৎকালীন ডিআইটির কল্যাণে এসব সুধিজন নামমাত্র মূল্যে অভিজাত এলাকায় মূল্যবান জমির মালিক হয়েছিলেন। কিন্তু নব্য ধনীদের আক্রমণে এরা কেউ কেউ সরে গেছেন অন্যত্র। কেউ আবার ডেভেলপারের সহায়তায় এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স বানিয়ে শেয়ার করছেন বহিরাগতের সাথে। নব্য জমিদার তথা নব্য ধনীদের দুলালেরাই জমিদার নন্দন। এমনি এক জমিদার নন্দনের কথা শোনাই,তবে একথা মোটেই রূপকথা নয়!
ধানমন্ডি ঢাকার একটি অভিজাত এলাকা। অধ্যাপক তবারক হোসেন ডি আই টি থেকে স্বল্পমূল্যে জমি কিনে বাস করছিলেন। বিশিষ্ট সুধিজন। বয়সের কাছে সবাইকেই হার মানতে হয়। তিনি একদিন বিদায় নিলেন নশ্বর পৃথিবী থেকে। সন্তানেরা অনেকেই সুশিক্ষিত। ছয় সন্তানের পাঁচ জনই বিদেশে পাড়ি জমালো কিন্তু দেশেই রয়ে গেল একপুত্র মুকিত। এই পুত্র লেখাপড়ায় তেমন নয়। চাকরির যোগ্যতাও নেই। ব্যবসার বুদ্ধিও রাখেন না। সারাক্ষণ হাপ প্যান্ট পরে ঘোরাঘুরি করে... আর বাবার রেখে যাওয়া বিত্ত ভোগ করে। মুকিতের বৃদ্ধা মা চিন্তিত হলেন-ওর কি হবে ভেবে!
প্রবাসী ছেলে মেয়েদের সাথে আলাপ করে সিদ্ধান্ত হলো- বাড়ীটি ভেঙ্গে এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স করতে। তাহলে দু-একটি ফ্ল্যাট ভাগে পেলে ভাড়া দিয়ে এই অথর্ব ছেলেটা খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে। তাই হলো। ইতোমধ্যে মা মারা গেলেন। চব্বিশটি ফ্ল্যাট হলো। তবারক হোসনেরে ৬ ছেলে-মেয়েরা ১২ টি ফ্লাটরে মালিক হলনে। প্রবাসী উচ্চ শিক্ষিত সন্তানরা তাদের ভাগ এর ফ্লাট নগদ মুল্যে বিক্রি করে আবার চলে গিয়েছে প্রবাসে। অথর্ব ছেলেটাই রয়ে গেল একটি ফ্লাটে, অন্য ফ্লাটটি ভাড়া দেয়া হয়েছে।
বাইশ জন ক্রেতা নতুন মালিক হয়ে বসবাস শুরু করলেন এই বিশাল অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট কম্পলেক্সে। খর্বিত মালিকানার মালিক পুত্র মুকিত অশ্বস্তিতে ভুগতে শুরু করলেন। তার কেবলই মনে হতে লাগলো, আমার বাড়ীতে এসব অনাকাঙিক্ষত লোকজন কেন? ওদের ঝেঁটিয়ে বের করে দাও! মুশকিল হলো, ওরা তো পয়সা দিয়ে কিনে নিয়েছে-ইচ্ছা করলেই বেড় করে দেয়া যায়না। মুকিত মিয়ার রাতে ঘুম হয় না। যেহেতু বেকার, কাজকর্ম নেই, অতএব হারানোর যন্ত্রণাটা সারাক্ষণ তাড়া করে ফেরে। বৌটির সাথে সারাক্ষণ ঝগড়া ঝাটি লেগেই থাকে! অন্য ফ্ল্যাটের মানুষ কমপ্লেক্সে ঢুকলেই ঘেউ ঘেউ করে ওঠে-"কেনো এ বাড়ীতে ঢুকেছেন"?
জবাব আসে- "আমিতো অমুক ফ্ল্যাটের মালিক"!
আগন্তকের উত্তর শুনে মুকিতের বুকটা ভারি হয়ে আসে। মনে মনে বিড় বিড় করে-"শালাদের শিক্ষা দেয়া দরকার। আমার বাবার বাড়ীতে ওরা থাকে। অসহ্য"!
মুকিতের অনাকাংখীত আচরণে ২২ টি ফ্ল্যাটের মালিকেরা প্রথমে অস্বস্তি, পরে কৌতুক অনুভব করতে লাগলেন। ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স থেকে মুকিতের মানসিক ভারসাম্য যতই বিপর্যস্ত হতে লাগলো, ততই নতুন মালিকদের কৌতুকের খোরাক বাড়তে লাগলো। শিশু-কিশোরেরাও বঞ্চিত হতে চাইল না এ চপল আনন্দ থেকে। ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সের তরুন-তরুনীরা আড়ালে-আবডালে মুকিতকে "মিঃ হাপ প্যান্ট" নামে ডাকে। কেউ কেউ ডাকে " চ্যাপো"(চ্যাডের পো)!
একদিন এক কিশোর তার ছোট্ট বাইসাইকেলে বারবার চড়ে বসে এবং বারবার পড়ে গিয়ে সাইকেল চড়া শিখছিল কমপ্লেক্সের নিচতলার বিশাল গ্যারেজে। মুকিত সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই চোখে পড়ল এ দৃশ্য। আর যায় কোথা! চিৎকার করে উঠলো-"এটা কি পল্টন ময়দান পেয়েছ? নাকি তোমার বাপের বিল্ডিং? এই দারোয়ান, শয়তানের বাচ্চাকে ধরে নিয়ে আয়"।
শিশুটি ততক্ষণে গেট পেরিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসছে তার মুকিতের দিকে তাকিয়ে ভেংচি কেটে বলছে-" মিঃ হাপ প্যান্ট, এটা কি তোমার বাপের বাড়ী? ধর তো কেমন পার"?
গেল পহেলা বৈশাখের ঘটনা। ফ্ল্যাট বাড়ীর শিশু-কিশোরদের নিয়ে ফ্ল্যাট কমপ্লেক্সের ছোট-বড়রা মিলে পহেলা বৈশাখ পালনের আয়োজন করলো। কমপ্লেক্সের মিলনকক্ষটি বেশ বড়। এটি কমনরুম-২৪টি ফ্লাটের বাসিন্দারাই এর বৈধ মালিক। ছোটরা রাত-দিন খেটে পরম উৎসাহে সাজিয়ে তুললো কক্ষটি। রং বেরং-এর কাগজ কেটে, ফুল দিয়ে, আল্পনা এঁকে সুসজ্জিত করা হল। বড়রাও দেখে খুশী হলেন তাদের সন্তানদের শৈল্পিক কর্ম-মুখরতায়। সন্ধ্যায় শুরু হলো সঙ্গিতানুষ্ঠান।
এক ফ্ল্যাট মালিকের স্ত্রী সঙ্গীত শিল্পী। তারই তত্ত্বাবধানে ছোটরা সপ্তাহব্যাপী রিহার্সাল করেছে। প্রধান অতিথি হয়ে এসেছেন কমপ্লেক্সের সবচেয়ে বয়জেষ্ঠ্য প্রবীণ ব্যক্তি। শিশু-কিশোর-প্রবীণেরা কণ্ঠ মেলালো উদ্বোধনী জাতীয় সঙ্গীতে- "আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।"
মুকিত দিনে বাইরে ছিল। সন্ধ্যায় ফিরেই দেখলো সুসজ্জিত মিলনকক্ষ। কানে প্রবেশ করলো-"তোমায় ভালোবাসি......"। তার মাথায় আগুন চড়ে গেল। চিৎকার করতে করতে মিলনকক্ষে প্রবেশ করে বললো-"এখানে কোন ভালোবাসাবাসি চলবে না। সবাই বেরিয়ে যাও। আমি এ বাড়ীর মালিক। আমার বিনা অনুমতিতে এখানে অনুষ্ঠান করা চলবে না।" মুকিত গিন্নী ব্যর্থ চেস্টা করলো মুকিতকে শান্ত করতে...
অগত্যা কয়েকজন কিশোর-তরুণ তাকে চ্যাং দোলা করে- "মুকিত মিয়া জিন্দাবাদ" ব্যঙ্গধ্বনী দিতে দিতে তার নিজস্ব ফ্ল্যাটে ঢুকিয়ে দিয়ে এল। বলে এলো-"এই ফ্ল্যাটের মালিক তুমি, পুরো বাড়ীটির নও"।
আরেক দিনের কথা। ফ্ল্যাট কম্পলেক্সের 'ফ্ল্যাট ওনার্স এসোশিয়েশন' এর সেক্রেটারী নীচে দাঁড়িয়ে ফ্ল্যাটের কিছু সমস্যা নিয়ে কেয়ার টেকারের সাথে কথা বলছিল। এমন সময় একজন মন্ত্রী ফ্ল্যাগ উড়ান গাড়ী নিয়ে ঢুকলেন এই কমপ্লেক্সে তার এক আত্মীয়ের ফ্ল্যাটে যাবার জন্য। মুকিত সিগারেট ফুকতে ফুকতে বিড় বিড় করছিল। গাড়ীটি দেখেই সামনে গিয়ে হাত দুই হাত ভূমির সাথে সমান্তরাল করে দাঁড়িয়ে গেল আর চিৎকার করতে লাগলো-"এসব গাড়ী ঢুকবে না। রাস্তায় রাখতে হবে। ঢুকতে হলে আমার অনুমতি লাগবে। আমি এ বাড়ীর মালিক।"
তৎক্ষণে মন্ত্রীর সিকিউরিটির লোকেরা নেমে মুকিতকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। রসিক মন্ত্রী নেমেই মুঁচকি হেসে কৌতুকোচ্ছলে মুকিতকে বললেন-"অনুমতি দিলেন তো!"
পুলিশের ধাক্কা খেয়ে হতভম্ব মুকিত! মুকিত একবার পুলিশের দিকে, একবার মন্ত্রীর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পর মন্ত্রী চলে যান। সেক্রেটারী মুকিতকে প্রশ্ন করেন-"কি হয়েছিল?"
মুকিত বললো-"আংকেল, আপনিতো জানেনই আমার রাগ উঠলে আমি ঐসব মন্ত্রী-টন্ত্রী কেয়ার করিনা! হু কেয়ারস ব্লাডি রাসকেল মন্ত্রী ফন্ত্রী! আই ডোন্ট কেয়ার শালার ফকিন্নী পুত মন্ত্রী! এই কমপ্লেক্সে আপনাদেরমত মুরুব্বী বাসিন্দাদের দিকে তাকাইয়া-আমি কিচ্ছু কইনাই-তানাহইলে আমি আইজ ফাটাইয়া ফালাইতাম!"
সেক্রেটারী সাহেব অবশ্য জিজ্ঞেস করেননি-'এখন পর্যন্ত কয়জন মন্ত্রীকে ফাটাইছে...'
নগরায়নের অচেনা প্রক্রিয়ায়, কত যে নতুন আনন্দ-যন্ত্রনার সৃষ্টি হচ্ছে, কে তার খবর রাখে।তারপরেও নগরায়নের যুগ-যন্ত্রণার তেমন চিত্র আজকাল চোখে পড়ে না। কিন্তু আমার চোখে কিছু কিছু বাস্তব ঘটনা দেখা হয়। যা দেখি-তাই সকলের সাথে শেয়ার করতে মন চায়। সক্ষম লেখনী আমার নাই। তাই স্বল্প জ্ঞানে সরল বয়ানে ছোট্ট একটি বেদনাচিত্র তুলে ধরলাম। এমন কত মানসিক জটিলতা বা মানবিক বিপর্যয় যে নির্দয় নগরায়নের গর্ভে জন্ম নিচ্ছে, কে তার খোঁজ রাখে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৪ সকাল ৮:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


